কনিকার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে সে কোন সুখের সপ্ন দেখে হাসছে। মনে পড়ল শুভদৃষ্টির মুহুর্তটি। সেদিনও চোখ দু’টি বোজা ছিল। তবে তার দিকে তাকানোর ইচ্ছে হয়নি মোটেও। কাকীমা খুব করে মিনতি করছিল, তাই একটু করে তাকিয়েছিলাম। এরইমধ্যে কিভাবে যে তিনটি বছর পেরিয়ে গেছে টের পাইনি। বাড়ী ভর্তি লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে চোখ ভরা ঘৃণা নিয়ে। নাকি এ শুধু আমার সংকীর্ণ মনের কল্পনা? দর্শনার্থী প্রচুর তবু চারিদিক বড় চুপচাপ। থেকে থেকে পাশের কামরা হতে এক দিনের বাবুটির ভেসে আসা বিলাপে যেন শিবরঞ্জনী তান। পাঁচ মিনিট সময় চেয়ে নিয়ে একাকী ঢুকেছি এ কামরায়। সময় গুলো দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এই তিন বছরে সে আমাকে ভালবাসা দিয়েছিল আঁজলা ভরে। কিন্তু তা আমার আঙ্গুলের ফাঁক গলে পড়ে গেছে অবহেলায়, পান করতে পারিনি। আমি তাকে কিছুই দিইনি কখনো। না, তাকে বঞ্চিত করবার জন্যে নয়। ক্ষোভটা ছিল আমার মায়ের স্বামীর উপর। আমার পছন্দের মেয়েকে বলরামবাবুর পছন্দ হয়নি, পছন্দ হয়েছে তাঁর শ্যালকের মেয়ে কনিকাকে। মেয়েটি পিতৃহারা, একমাত্র অভিবাবক মেয়ের মেসোমশাই। মেসোমশাইটির টাকা পয়সার প্রতি একটু বেশী পরিমান ছোঁক ছোঁক ভাব আছে। ওব্যাটাকে দেখলেই রাগে আমার সমস্ত গা রি রি করে ওঠে। তিনি আজ দেবেন কাল দেবেন বলে বলে এর মধ্যেই দেড় লাখ টাকা ধার নিয়েছেন আমার কাছ থেকে।
বলছিলাম বলরামবাবুর কথা, সুস্মিতাকে ভুলতে না পারার বেদনা যতটুকু ছিল তার চাইতে বেশী ছিল রামবাবুর প্রতি তীব্র ঘৃনা। সেই ঘৃনা থেকে জন্ম নিয়েছিল প্রতিশোধের বাসনা। যে বাসনা বড় যত্ন করে মিটিয়েছি কনিকার প্রতি সচেতন ভাবে অমনযোগী থেকে। পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছিলাম, লোকটিকে যতটুকু খারাপ মনে হত উনি আসলে ততটুকু নন। বরং আমার প্রতি তাঁর ভালবাসা ছিল অগাধ। শুনেছিলাম নৌকা ডুবিতে উনার প্রথম স্ত্রী’র সাথে ছেলেটিও মারা গিয়েছিল, যার সাথে আমার মিল ছিল শুধুমাত্র নামের আদ্যাক্ষরে। সেটি জানতে পেরেছিলাম উনি গত হওয়ার পর। আধ্যাক্ষরের মাঝে কি এমন মায়া লুকিয়ে আছে বিধাতা জানেন। বাবার জায়গায় দাঁড় করাতে পারিনি বলে কোন ভাবেই তাঁকে মেনে নিতে পারতাম না। আমার এত ভাল মানুষ বাবার সাথে কেন যে মা’র বনিবনা হল না সেটা আজো রহস্যময়। বিশ বছর আগের বাবার বলা কথা গুলো মনে পড়ে মাঝে মাঝে। আমার বয়স তখন এগার। বাবা বলেছিলেন, ‘লোকটিকে বাবা বলে ডাকিস, তোকে আদর করবে।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার কথা রাখতে পারিনি। পরে নিজেই বিশ বছরের ধূলি পড়া স্মৃতি হাতড়ে দেখতে পেয়েছি আমার প্রতি রামবাবুর ভালবাসার বেশকিছু ছোট ছোট দৃশ্যপট। সেই থেকে কনিকার দিকেও ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ছিল মনটা। কিন্তু সংকোচের পাহাড় ডিঙ্গোতে পারছিলাম না কোন ভাবেই। রামবাবুর সাথে কোন সখ্যতা গড়ে ওঠেনি কখনোই। তবু কেন যেন মনে হল তাঁর পিণ্ডদানের পর থেকে আরো বেশী একা হয়ে গেলাম আমি। একদিন বিকেলে খোলা ময়দানে বসে বসে বেশ দূরত্বে ভেসে চলা একা একা মেঘ গুলোকে দেখছিলাম। ভেতরটা তোলপাড়। মনের গহীনে আমার কৃতকর্মের ময়না তদন্ত চলছে। উপলব্ধিগুলো গলার কাছে ব্যাথা হয়ে জমে আছে দলা পাকিয়ে। মন বলল, সব সংকোচ পায়ে দলে কনিকার কাছে ফিরে যাও। তাকে এতটাই অবহেলা করেছি যে এক ছাদের নীচে থেকেও কখনো তার খোঁজ রাখিনি। কি করে জানবো যে সেও অভিমানে মুখ ফেরাবে অসময়ে। মনটা যখন আমাকে টেনে নিয়ে তার কাছে ছুটে যাচ্ছিল তখন সে নতুন কিছু পাওয়ার যুদ্ধে হাসপাতালে লড়ছে। নবাগতের আগমন যে এতই সন্নিকটে তা আমি জানতাম না। আমার সৎ বোন মিলা হাসপাতাল থেকে আমাকে ফোনে খবর দিয়েছিল। না না, মিলাকে সৎ ভাবাটা ঠিক হবে না। এই হৃদয়হীন দাদাটিকে সে পাগলের মত ভালবাসে যে! আমার মাও অবশ্য তার সৎ মেয়েটিকে খুবই আদর করে। আহ্ আবারো সৎ ভাবলাম, মনটা সত্যিই পঁচে গলে নষ্ট হয়ে গেছে। মিলা বলছিল বাবুটির চোখগুলো নাকি দেখতে আমার মত হয়েছে আর নাকটা কনিকার। হৃদয়ের চোরাবালিতে ডুবে যাওয়া কত কথা বুদবুদের মত উঁকি দেয়, আবার মিলিয়ে যায় চট করে। একরাতে কনিকা তার নাকছাবিটা ঠিক করে দিতে অনুরোধ করেছিল। সেদিন আমার মনটাও ছিল দ্রবীভূত, হয়তো সম্ভোগের তৃঞ্চায়। নাকছাবি ঠিক করতে গিয়ে দেখলাম সেটি আসলে ঠিকই ছিল। আমার হাতের সামান্য ছোঁয়ায় কেন সে এতটা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল ওদিন? সেই স্পর্শে কি এমন ছিল বুঝিনিতো। ক’দিন আগে আলমারীতে কিছু দলিলপত্র খুঁজতে গিয়ে ওর ডায়রীটি চোখে পড়েছিল। কৌতুহল বশত কয়েক পাতা পড়েছিলাম। শেষ পাতার লাইন ক’টি এখন বেশ মনে পড়ছে,
‘চিতার মাঝে বসত ভিটা
তবু কেন মধুময়,
তবু কেন পোড়া মন
বঁধুয়ার কথা কয়?’
বুক ভরা বেদনা নিয়ে এত উচ্ছ্বাস সে রাখত কি করে পুষে? বসন্ত চলে গেলেই বুঝি কোকিলের ডাকটিকে মনে পড়ে আরো বেশী। ভালবেসে কখনো ভালবাসা দেইনি তাকে। দিয়েছি শুধু ছলনার রাঙতা মোড়ানো এক আধ ফোঁটা মৈথুন। ধূপের গন্ধটি নাকে লাগছে।
যতক্ষণ বাইরে থাকতাম কনিকা এত ঘন ঘন ফোন করত যে খুবই বিরক্ত হতাম। ধমকে উঠে অকারণেই লাইনটা কেটে দিতাম। কিন্তু তাতে সে কিছু মনে করত বলে মনে হত না। উপরন্তু মাতাল হয়ে বাড়ী ফেরার পর সে অনেক যত্নে আমার ঘুমানোর ব্যবস্থা করত। এবং প্রায় প্রতি রাতেই এক সাথে খাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করে করে অবশেষে না খেয়েই ঘুমুতে যেত। আমি শরীর মন দু’টোকে পূজো দিয়ে তবেই বাড়ী ফিরতাম, তার কথা আর মনে থাকত না। বাচ্চাটাকে নষ্ট করে ফেলতে বলেছিলাম। রামবাবুর জন্যেই তা হয়ে ওঠেনি। অবশ্য মাও আমাকে আর পাপ বাড়াতে নিষেধ করেছিল। কিন্তু কনিকা তেমন কিছু বলেনি। শুধু একটু করে বলেছিল, ‘জানি তোমায় পাবো না কোনদিনই, তবে বেঁচে থাকার জন্যে একটি অবলম্বন থাকলে ভাল হত।’এরপর আমি আর তেমন গা করিনি। পৃথিবীতে কার বেঁচে থাকার জন্যে কাকে প্রয়োজন সে হিসাব মেলানো সত্যি বড় কঠিন। বুকের ভেতরটা খালি খালি লাগছে। না চাইতে এত ভালবাসা পেয়েও কেন তাকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম? দরজায় টোকা পড়ল। কাকাবাবু আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন কনিকার মেসোমশাই তাড়া দিচ্ছেন। ও হ্যাঁ তাকে তো তাঁরা তাঁদের বাসায় নিয়ে যাবেন। নিবে নাইবা কেন? এতদিনের অবহেলার মানুষটি হুট করে তো আর অতিপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে না আমার কাছে। তাঁরাই নাকি কনিকাকে আদরে সোহাগে সাজিয়ে দেবেন যত্ন করে। হয়তো শেষ বিদায়ে প্রায়শ্চিত্ত করে বধূ বিদায়ের ভুল শোধরাতে চাইছেন তাঁরা। দরজায় আবার টোকা পড়ল। অকস্মাৎ বিশাল এক ঢেউ জেগে উঠল অন্তরের অতল গহীনে। এই প্রথম হৃদয়ের সবটুকু ভালবাসা নিংড়ে দিলাম তার জন্যে। নিথর দেহে পাথরের পরশটি তার ঠোঁটকে চুমু হয়ে ছুঁয়ে গেল। পাপ হবে কি? পাপ তো কতই করেছি। পূণ্য ভেবে আরো একটি পাপ না হয় যুক্ত হল বালাম খাতায়। ঘরময় ছড়িয়ে আছে কনিকার অযুত নিযুত দীর্ঘশ্বাস। ইচ্ছে হল আমিও যেন একাকার হয়ে মিলিয়ে যাই তাদের সাথে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



