আমার প্রিয় পোস্ট

দর্শনের আলোকে নাস্তিক আস্তিক সমাচার

১৭ ই মার্চ, ২০০৮ দুপুর ১২:৫৩

শেয়ারঃ
0 0

একঃ আরম্ভ
আস্তিক বলতে আমরা সাধারণভাবে বুঝে থাকি ঈশ্বর বিশ্বাসী এবং নাস্তিক বলতে বুঝি ঈশ্বর অবিশ্বাসী। কিন্তু একটু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- শব্দ দুটি সবসময় একই অর্থ ধারণ করে না। বেশ কিছু ধর্মে যেখানে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই (জৈন, প্রথম অবস্থায় বৌদ্ধ, বিভিন্ন টোটেমদের ধর্ম) সেগুলোকে নিশ্চয় নাস্তিকধর্ম বা ঐ সব ধর্ম পালনকারীদের সাধারণভাবে নাস্তিক বলার রেওয়াজ নেই। .......

আবার, দর্শন শাস্ত্রে বিশেষত ভারতীয় দর্শন শাস্ত্রমতে আস্তিক- নাস্তিকদের সংজ্ঞা একটু অন্যরকম, কিছুটা মজারো বটে। ভারতীয় দার্শনিক সম্প্রদায়গুলোকে প্রধানত দু'ভাগে ভাগ করা হয়- নাস্তিক ও আস্তিক।
নাস্তিক সম্প্রদায় প্রধানত: তিনটিঃ
১। চার্বাক
২। বৌদ্ধ
৩। জৈন
আস্তিক সম্প্রদায় প্রধানত: ছয়টিঃ
১। সাংখ্য
২। যোগ
৩। ন্যায়
৪। বৈশেষিক
৫। পূর্ব-মীমাংসা বা মীমাংসা
৬। উত্তর-মীমাংসা বা বেদান্ত
কিন্তু এখানে আস্তিক মানে বেদ-বিশ্বাসী, নাস্তিক মানে বেদ-বিরোধী; - ঈশ্বরে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস আসলে প্রাসঙ্গিকই নয়। যাঁরা ঈশ্বর মানেননা তাঁরা যদি নাস্তিক হতেন, তবে মীমাংসকাচার্য ও সাংখ্যাচার্য নাস্তিক বলে অভিহিত হতেন, কেননা তাঁরা ঈশ্বর মানেন না। অধিকন্তু ঈশ্বর নাই- ইহা প্রচলিত সাংখ্য-দর্শনে যুক্তি দ্বারা প্রতিপন্ন করা হয়েছে।
আবার, যাঁরা ঈশ্বর মানেন না, গীতাতে ভগবান তাঁদেরকে অসুর-সম্পদ-যুক্ত বলে নির্দেশ করেছেন, নাস্তিক বলেননি। মীমাংসকাচার্য ও সাংখ্যাচার্য ঈশ্বর মানেননা, কিন্তু বেদের অনুসারী। তাই তাঁরা নাস্তিক নন, অতিশয় আস্তিক। অপরদিকে, চার্বাক দর্শনে, বৌদ্ধদর্শনে বেদের প্রমান অঙ্গীকৃত হয় না বলে তা নাস্তিক।

এবার ইসলাম ধর্মে শব্দদুটিকে দেখা যাক। এখানে আস্তিক শব্দের কাছাকাছি শব্দ হচ্ছে- মু'মিন বা ঈমানদার। এই ঈমান কিন্তু সর্বশক্তিমান আল্লাহে বিশ্বাস, সাথে সাথে আল্লাহর রাসুল হিসাবে মুহাম্মাদ সা. এর উপরও বিশ্বাস (কালেমা তাইয়েবা)। আর নাস্তিক্যের কাছাকাছি শব্দগুলো হচ্ছে-
১। কুফর
২। শিরক
৩। মোনাফেকি
তবে সম্ভবত সবচেয়ে কাছের শব্দটি হবে কুফর। একইভাবে এই শব্দগুলো সাধারণভাবে ঈশ্বরকে নির্দেশ না করে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি অনাস্থা/অবিশ্বাস/অংশীদ্বারকে নির্দেশ করে। 'কুফর' হচ্ছে আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় হিসাবে অস্বীকার করা। সেক্ষেত্রে আল্লাহকে অস্বীকার করে অন্য কোন ঈশ্বরে বিশ্বাস স্থাপন করলেও সে কাফির। শিরক হচ্ছে অংশীদার করা- অর্থাত আল্লাহর গুনসমূহে অন্য কাউকে অংশীদার করলে তা হয় শিরক; সে হিসাবে পৌত্তলিকতা বা মূর্তি-পূজা শিরক। এই শিরককে কিন্তু ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। উল্টোদিকে 'মোনাফেকি'ও আল্লাহে অবিশ্বাস- কিন্তু এটা হলো তাদের ক্ষেত্রে যারা মুখে বা উপরে-উপরে বিশ্বাস প্রদর্শন করে কিন্তু অন্তরে অবিশ্বাস ধারণ করে।

আবার, প্রচলিত অর্থে শব্দটিকে বিচার করি। ধর্ম পালনকারীদের সাধারণভাবে নাস্তিক বলা হয় না, তা সে ধর্মে ঈশ্বরকে অস্বীকার করা হলেও। অনেক সময়ই পৈত্রিক ধর্মকে অস্বীকারকারীকে নাস্তিক বলা হয়। একজন মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী কেউ হিন্দুধর্মের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুললে বা হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণকারী একজন ইসলামধর্মের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তুললে, তাকে হয়তো নাস্তিক বলা হয় না, কিন্তু যখন কেউ তার পৈত্রিক ধর্মের বিভিন্ন বিশ্বাস নিয়ে ক্রমাগত প্রশ্ন তুলতে থাকে এবং নতুন কোন ধর্মে নিজেকে সমর্পিতও না করে- তখন তাকে কখনও কখনও নাস্তিক বলে অভিহিত করা হয়। কিন্তু এখানেও বিপত্তি আছে। এখন যদি কেউ বলে- সে প্রচলিত কোন ধর্মের অনুশাসন মানে না, বিশ্বাসও করে না; কিন্তু সে জগত-সংসারের সৃষ্টিকর্তা একজন কেউ আছে বলে বিশ্বাস করে- তবে তাকে কি বলে আখ্যায়িত করা হবে? আস্তিক না নাস্তিক? ...............।

একের সংযোজনঃ
উপরের প্রশ্নের উত্তরে কেউ বলেছেন- তাকে নাস্তিক বলতে হবে, কেউ বলেছেন আস্তিক আবার কেউ বলেছেন সংশয়বাদী। এবং সংশয়বাদ নিয়ে অনেকে একটা ভালো আলোচনাও করেছেন। তাই এবারে সংশয় নিয়ে কিছু কথা বলি।

সংশয়বাদীদের কথা আসলে একালের দার্শনিকদের মধ্যে বার্ট্রান্ড রাসেলের কথা সর্বাগ্রে আসে। তাঁর 'দি প্রব্লেমস অব ফিলসফি' গ্রন্থ আরম্ভই করেছেন তিনি এভাবে, "এমন কোন সুনিশ্চিত জ্ঞান কি আছে যাকে কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনও সন্দেহ করবে না?" দর্শনের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, "সাধারণ চোখে যাকে জ্ঞান বলে মনে হয়, তার সম্বন্ধে আমাদের মনে সংশয় জাগে এবং এ সংশয়ের উত্তর পাওয়া যেতে পারে কেবল এক বিশেষ ধরণের অনুসন্ধানের মাধ্যমেই। এই অনুসন্ধানের আমরা নাম দেই দর্শন"।
এতো গেল হালের দার্শনিকের কথা। সে আমলে সংশয়বাদী দার্শনিকের কথাও একটু শুনে নেই। গ্রীক দার্শনিক পাইরো (৩৬৫-২৭০ খৃষ্টপূর্ব) বলেন, "আমরা ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষ দ্বারা বস্তুর বৈশিষ্ট নয়, এর বাহ্যিক রূপটাকেই শুধু জানতে পারি"। তাঁর মতে, "হয়তো কোন যুক্তির বিপরীত আরও মজবুত প্রামান্য যুক্তি পাওয়াও সম্ভব"। "কোন বস্তুর সংজ্ঞা নির্ণয় করতে হলে প্রমান দরকার- যা কিনা নিস্ফল তর্ক; আবার তাকে খন্ডানোর জন্য নতুন প্রমান চাই"। এই পাইরো কিন্তু সেকালের স্টোয়িকদের ঈশ্বরবাদকে ক্রমাগত যুক্তি দিয়ে খন্ডন করে গেছেন। সে আমলে আমাদের দেশের নাগার্জুনও কিন্তু পাইরোর অনুরূপ মত ধারণ করতেন।
এবার তাহলে আমাদের ভারতীয় দর্শনের দিকে একটু তাকাই। অনেকান্তবাদ ও স্যাদবাদ- খুবই চিত্তাকর্ষক ও মজার এই মতকে কি বলবেন? নিরীশ্বরবাদী জৈনধর্মের আধার হলো স্যাদবাদ। তা কিন্তু আবার এসেছে সঞ্জয় বেলঢ্বিপুত্বের অনেকান্তবাদের হাত ধরে। সঞ্জয় পরলোক, দেবতা প্রভৃতি তত্বের নিশ্চয়াত্মক রূপে কিছু বলতে অস্বীকার করেন এবং সেই অস্বীকারকেও চার প্রকার বলে বর্ণনা করেন-
১। আছে? - বলা যায় না।
২। নেই? - বলা যায় না।
৩। আছেও আবার নেইও? - বলা যায় না।
৪। আছে নেই আবার নাও নেই? - বলা যায় না।
এই চারের সাথে আরও তিন যুক্ত করে জৈনধর্মের সপ্তরূপ তথা তাদের স্যাদবাদঃ
১। আছে? - হতে পারে(স্যাদ আস্তি)।
২। নেই? - নাও হতে পারে(স্যাদ নাস্তি)।
৩। আছেও আবার নেইও? - হতেও পারে নাও পারে(স্যাদাস্তি চ নাস্তি চ)।
৪। স্যাদ কি একটা বক্তব্য? - না, অবক্তব্য।
৫। স্যাদাস্তি কি একটা বক্তব্য? - না, অবক্তব্য।
৬। স্যাদ নাস্তি কি একটা বক্তব্য? - না, অবক্তব্য।
৭। স্যাদ আস্তি চ নাস্তি চ কি একটা বক্তব্য? - না, অবক্তব্য।
একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে- ধরুন সামনে রাখা একটা কলমকে দেখে প্রশ্ন করা হলো-
১। কলম কি আছে?- থাকতে পারে(স্যাদ আস্তি)।
২। কলম কি নেই?- নাও থাকতে পারে(স্যাদ নাস্তি)।
৩। কলম আছে না নেই? - থাকতে পারে নাও পারে(স্যাদাস্তি চ নাস্তি চ)।
৪। স্যাদ কি একটা বক্তব্য? - অবক্তব্য।
৫। স্যাদাস্তি কি একটা বক্তব্য? - অবক্তব্য।
৬। স্যাদ নাস্তি কি একটা বক্তব্য? - অবক্তব্য।
৭। স্যাদ আস্তি চ নাস্তি চ কি একটা বক্তব্য? - অবক্তব্য।

কিছু বোঝা গেলো?
কি বলবেন?

দুইঃ গৌতম বুদ্ধ
...... যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস/ অবিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই আস্তিক/নাস্তিকের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেন, তবে তাকে আস্তিক বলতে হবে বৈকি!
এই সমস্যা দূরীকরণে দার্শনিকগণ আরো দুটি শব্দ ব্যবহার করেন- ঈশ্বরবাদী ও নিরীশ্বরবাদী। জৈন, বৌদ্ধ প্রমুখ ধর্মে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকৃত হওয়ার দরুন তাদেরকে নিরীশ্বরবাদী বলতে হবে এবং নিরীশ্বরবাদী অর্থে ব্যবহার করলে ঐসব ধর্মকে নাস্তিকও বলতে হবে। এই ঈশ্বরবাদ বনাম নিরীশ্বরবাদ কিন্তু দর্শন শাস্ত্রে শুধু কিছু অন্ধ-বিশ্বাসের বেড়াজলে আবদ্ধ গুরুবাদী বিদ্যা নয়, বরং ভাববাদ বনাম জড়বাদ বা সেই আমলের আস্তিক বনাম নাস্তিক (বেদ-বিশ্বাসী বনাম বেদ-বিরোধী) বিতর্কের মতই ধারাবাহিক তর্ক-বিতর্ক-যুক্তির হাত ধরেই অগ্রয়মান, গভীর উপলব্ধি ও চিন্তার খেলায় ভাস্কর। আমাদের ভারতীয় দর্শনেও সেই আমলে নিরীশ্বরবাদীদের যুক্তি, যুক্তি করার ধরণ, চিন্তার গভীরতা শুধু চিত্তাকর্ষকই নয়, বরং বিপ্লবাত্মকও বটে। চার্বাক, জৈন, বৌদ্ধ, সাংখ্য, মীমাংসা প্রভৃতি দার্শনিক সম্প্রদায় একাধারে যেভাবে এবং যে যে যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরকে খন্ডন করেছে মাঝে মাঝে মনে হয় আজও তা প্রাসঙ্গিক।
এবারে আসুন, তাঁদের কিছু যুক্তি দেখি। প্রথমেই বুদ্ধ বা গোতম বুদ্ধ বা গৌতম বুদ্ধঃ
" 'বাশিষ্ঠ!......ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মনের মধ্যে এমন একজনও নেই যিনি নিজের চোখে ব্রহ্মাকে দেখেছেন। .....এক আশ্চর্য.... এক আচার্য-প্রাচার্য..... সপ্ত-পর্যায় ধরেও আচার্যই হতে পারে না.... ব্রাহ্মনগণের পূর্বজ ঋষি, মন্ত্রকর্তা, প্রবক্তা.... অষ্টক,বামক, বামদেব, বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, অঙ্গিরা, ভরদ্বাজ, বশিষ্ঠ, কাশ্যপ, ভৃগু....... এদের মধ্যে কি কেউ ব্রহ্মাকে স্বচক্ষে দেখেছেন? ......যাঁকে দেখেননি, জানেননি তাঁরই অস্তিত্ব নিয়ে উপদেশ করেন!........ বাশিষ্ঠ! এ যেন সেই অন্ধগণকে ক্রমপর্যায়ে পংক্তিবদ্ধ করা; প্রথমজনও দেখতে পায় না, দ্বিতীয়জনও দেখতে পায় না, তৃতীয়জনও নয়....।'" (তেবিজ্জসূত্র, ১/১৩)।

এখানে বলে রাখা দরকার যে, তখনও পর্যন্ত উপনিষদে ঈশ্বর হিসাবে ব্রহ্মাই অপ্রতিদ্বন্দ্বী, শিব বা বিষ্ণু তখনও আজকের মত অবস্থায় আসেনি।

তিনঃ প্রভাকর
এবারে আস্তিকদের(বেদপন্থি) মধ্যে যারা ঈশ্বরকে অস্বীকার করেন, তাদের একটু দেখি। এদের মধ্যে সাংখ্য ও মীমাংসার নাম উল্লেখ করা হয়। সাংখ্য ও মীমাংসার মধ্যে মীমাংসা অধিক চিত্তাকর্ষক, কেননা সাংখ্যকে বেদমূলক বলে গ্রহণ করার বিরুদ্ধে শংকরাচার্য, রামানুজ প্রমুখ অগ্রণী আস্তিকেরা তীব্র আপত্তি তুলেছেন এবং সে আপত্তি ভিত্তিহীন নয়।
ঐতিহ্য অনুযায়ী মীমাংসা সম্প্রদায়টির প্রবর্টকের নাম জৈমিনি, মীমাংসা দর্শনের প্রাচীনতম গ্রন্থের নাম মীমাংসা-সূত্র এবং মীমাংসা-সূত্রের উপর সবচেয়ে বিখ্যাত ভাষ্যকারের নাম শবর। জৈমিনি ও শবরের পর প্রধান দার্শনিক দুজনঃ কুমারিল ভট্ট ও তাঁর শিষ্য প্রভাকর, এবং এ দুজনের মধ্যে মীমাংসা সূত্র ব্যাখ্যায় মৌলিক প্রভেদ থাকায় পরবর্তিতে ভট্ট-মীমাংসা ও প্রভাকর-মীমংসা নামে দুটি সম্প্রদায় তৈরি হয়।
যাহোক, প্রভাকর ও কুমারিলের মধ্যে নানা মৌলিক মতান্তর সত্বেও ঈশ্বর-প্রত্যাখান প্রসঙ্গে উভয়ের সম্প্রদায়ই একমত।

প্রথমে প্রভাকরদের যুক্তি দেখা যাক।

প্রভাকরদের 'প্রকরণপঞ্চিকা' গ্রন্থে জগত-স্রষ্টা অর্থে ঈশ্বর স্বীকার করা সম্ভব নয়, এই কথাটিই বিশেষভাবে প্রমান করবার আয়োজন হয়েছে। ইতিমধ্যে নৈয়ায়িকেরা ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রতিপাদনার্থে নানা যুক্তিতর্কের অবতারণা করেছেন; প্রভাকরেরা প্রধানত এই নৈয়ায়িকদের ও সেই সাথে ন্যায়-বৈশেষিকদের যুক্তি খন্ডন করেই ঈশ্বরকে প্রত্যাখান করেছেন। এবার আসুন এই যুক্তিতর্কে প্রবেশ করি।
নৈয়ায়িকগণঃ জগত-স্রষ্টা হিসাবে ঈশ্বরের সত্তা অবশ্য স্বীকার্য; ক্ষিতি, জল প্রভৃতি সমস্ত সংহত বা জটিল বস্তুই কার্যাত্মক, কেননা এগুলো অবয়বদ্বারা গঠিত; এবং কার্য বলেই এগুলোর কারণ থাকতে বাধ্য এবং সেই কারণ কোনো বুদ্ধিমান কর্তা না হয়ে পারে না; অর্থাত পরমাণুপুঞ্জ থেকে সুসামঞ্জস্য ও নির্দিষ্ট আকারে ক্ষিতি, জল প্রভৃতি সংহত বা জটিল বস্তুগুলো কোন বুদ্ধিমান কর্তার নিয়ন্ত্রন ব্যতিত উত্পন্ন হতে পারে না; অতএব এই বুদ্দিমান কর্তা অর্থে জগতের নিমিত্তকারণ হিসাবে সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর অনুমেয়- তাঁরই নিয়ন্ত্রনে সৃষ্টি ও প্রলয় ঘটে।
প্রভাকরগণঃ জাগতিক বস্তু অবশ্যই অবয়ব দ্বারা গঠিত, অতএব এগুলোর উত্পত্তি ও বিনাশ আছে। কিন্তু তাই বলে সামগ্রিকভাবে বিশ্বব্রহ্মান্ডের কোনো সৃষ্টি বা প্রলয়ের কথা কল্পনামাত্র; অতএব জগতের সৃষ্টি ও প্রলয়ের নিয়ন্ত্রণকর্তা ঈশ্বরের পরিকল্পনাও অবান্তর। পক্ষান্তরে প্রাকৃতিক বস্তুগুলির দৃষ্টান্তে সুস্পষ্টভাবেই অভিজ্ঞতা হয় যে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক কারণেই সেগুলোর জন্ম হচ্ছে- যেমন মানুষ ও জীবজন্তুর দেহ শুধুমাত্র তাদের পিতামাতার দরুনই উত্পন্ন হয়। এবং এ-জাতীয় অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে অতীত ও ভবিষ্যতের উত্পাদন ব্যাখ্যা করা সম্ভব। অতএব, জাগতিক বস্তুগুলোর স্রষ্টা হিসাবে কোনো অতি-প্রাকৃত নিয়ন্ত্রতার কথা অনুমিত হয় না।
ন্যায়-বৈশেষিকগণঃ মানবদেহ বুদ্ধিবিহীন বলেই তার নিয়ন্ত্রণের জন্য এক বুদ্ধিমান স্রষ্টা বা ঈশ্বর অনুমেয়।
প্রভাকরঃ নিয়ন্ত্রণ-কার্য উদ্দেশ্যবিহীন হতে পারে না; কিন্তু এই তথাকথিত নিয়ন্ত্রণের পিছনে ঈশ্বরের উদ্দেশ্য কি হতে পারে? কাষ্ঠাদি বস্তুর উপর সূত্রধরের নিয়ন্ত্রণ-কার্যর দৃষ্টান্ত অনুসারেই তাঁরা (নৈয়ায়িক/ ন্যায়-বৈশেষিকগ) জগত্স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণ প্রমান করতে চান; সূত্রধর দেহবিশিষ্ট, তারই উপমান অনুসারে কল্পিত ঈশ্বরও দেহবিশিষ্ট বলে প্রমানিত হবেন। এবং তা যদি হয়, তাহলে দেহবিশিষ্ট বলেই তাঁর নিয়ন্ত্রণের/ পরিচালনার জন্য আরো কোনন স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ-কর্তার কথা স্বীকৃত হতে বাধ্য- এবং এভাবে অনবস্থা দোষ ঘটবে।

এইভাবে প্রভাকরেরা স্রষ্টা বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব খন্ডন করেছেন। এবং তাঁরা সৃষ্টি এবং প্রলয় মানেননি বলেই বিশ্বজগত তাঁদের কাছে নিয়ত পরিবর্তনশীল ঘটনাস্রোত বলেই প্রতীত হয়েছে।

তবে মজার বিষয় হচ্ছে এই যে, শবর অনুভব করেছেন স্রষ্টার কথা স্বীকার করতে গেলে বেদ এর গুরুত্ব ক্ষণ্ণ হবার আশংকা থাকে এবং বেদের চরম প্রামান্য স্বীকৃতিই মীমাংসার; অতএব স্রষ্টার কথা যুক্তিমূলকভাবে প্রত্যাখান করবার আয়োজন হয়েছে। তাই শবরের যুক্তিগুলোর মধ্যেই মীমাংসা-দর্শনে ঈশ্বর-প্রত্যাখানের সূত্রপাত দেখা যায়; যদিও ঈশ্বর-প্রত্যাখানের আরও সুস্পষ্ট যুক্তিতর্ক পরবর্তী রচনাতেই পাওয়া যায় এবং সেগুলোর দার্শনিক মূল্য উপেক্ষণীয় নয়। আমরা ইতিমধ্যে প্রভাকরদের যুক্তিতর্ক দেখছি, এবার দেখ ভাট্ট-মীমাংসকদের যুক্তি।

চারঃ ভাট্ট সম্প্রদায়
ভাট্ট-সম্প্রদায়েও বেদের চরম আপ্তত্ব প্রতিপাদন করবার উদ্দেশ্যেই ভাট্ট মীমাংসকেরাও সৃষ্টি ও ঈশ্বরের অস্তিত্ব খন্ডন করেছেন। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো যে, এ জাতীয় রক্ষণশীল চাহিদায় উদ্ভাবিত হলেও স্বকীয় দার্শনিক গুরুত্বের দিক থেকে ভাট্ট মীমাংসকদের বিশেষত কুমারিলের যুক্তিগুলো ভারতীয় দর্শনের পটভূমিতে প্রায় বৈপ্লবিক। এবারে তাহলে কুমারিলের আলোচনার সংক্ষিপ্তসার উদ্ধৃত করা যাক।
কুমারিল বিশ্বস্রষ্টা প্রজাপতির(ঈশ্বর) পরিকল্পনা নিয়ে নানা রকম বিদ্রুপ করেছেন। "যদি বল, কোন এক কালে বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্ট হয়েছিল তাহলে প্রশ্ন করব, সৃষ্টির আগে বিশ্বের অবস্থা কি ছিল? এবং বিশ্বই যদি তখন না থাকে তাহলে বিশ্বস্রষ্টা প্রজাপতিই(ঈশ্বর) বা কোথায় ছিলেন? তাঁর রূপই বা কিরকম ছিল? আর তখন তো কোন মানুষেরই অবস্থান সম্ভব ছিল না; তাই প্রজাপতি(ঈশ্বর) তখন যে উপস্থিত ছিলেন এ কথা কার পক্ষেই বা জানা সম্ভব? এবং কেইই বা পরবর্তীকালে সৃষ্ট মানুষদের কাছে প্রজাপতির(ঈশ্বরের) কথা পৌঁছে দিতে পারেন? যদি বল, প্রজাপতির(ঈশ্বরের) পক্ষে কোন মানুষেরই প্রত্যক্ষাদি জ্ঞানের বিষয় হওয়া সম্ভব নয়, তাহলে প্রশ্ন করবো তাঁর যে একান্তই কোনরকম অস্তিত্ব আছে সেকথাই বা জানা গেল কিভাবে?"
"তোমাদের মতে কোন এককালে বিশ্বের সৃষ্টি বা শুরু হয়েছিল; কিন্তু তা কিভাবে সম্ভবপর হতে পারে? প্রজাপতির(ঈশ্বরের) ইচ্ছায় সৃষ্টির শুরু হলো? কিন্তু সেকথা তোমারা কি করে বলবে? কেননা, তোমাদের মতেই স্রষ্টা দেহবিশিষ্ট নয়; এবং দেহ ছাড়া ইচ্ছা সম্ভবই নয়। তাই দেহবিহীন স্রষ্টার পক্ষে সৃষ্টি করার ইচ্ছাও অসম্ভব। যদি বলো, স্রষ্টার দেহ আছে, তাহলে সে দেহটিকেও তাঁরই সৃষ্টি বলতে পারো না। অতএব তাঁর দেহ সৃষ্টির জন্য আরেকটি স্রষ্টার কথা, আবার তাঁরও দেহ সৃষ্টির জন্য আরেকটি স্রষ্টার কথা- এভাবে অবিশ্রাম ভেবে যেতে হবে। স্রষ্টার দেহকে নিত্য বা অনাদিও বলা যায় না, কেননা সৃষ্টির পূর্বে ক্ষিতি, অপ্ প্রভৃতি দেহের উপাদানই যখন নেই তখন কী দিয়ে তাঁর দেহ নির্মিত হতে পারে?" "তাছাড়া, প্রাণীদের পক্ষে নানারকম জ্বালা-যন্ত্রণায় পূর্ণ এই পৃথিবীটি সৃষ্টি করবার ইচ্ছাই বা তাঁর হলো কেন? এ-কথাও বলতে পার না যে প্রাণীদের কর্মফলের দরুনই এইসব জ্বালা-যন্ত্রণা। কেননা, সৃষ্টির পূর্বে এ জাতীয় কর্মফল সম্ভবই নয় এবং অতএব প্রাণীদের কর্মফল অনুসারে স্রষ্টার পক্ষে পৃথিবী সৃষ্টি করাও সম্ভব নয়।" "উপকরণাদি ব্যতিরেকেও সৃষ্টি সম্ভব নয় এবং সৃষ্টির পূর্বে এ-জাতীয় উপকরণ বলে কিছুর অস্তিত্ব অসম্ভব। উর্ণনাভ বা মাকড়সার জালও উপাদানহীন সৃষ্টি নয়, কেননা ভক্ষিত পতঙ্গ থেকে মাকড়সার লালা উত্পাদন হয় এবং জালের উপাদান হিসাবে এই লালা ব্যবহৃত।"
বৈশেষিকেরা যে মনে করেন, ঈশ্বরের ইচ্ছায় অকস্মাত সৃষ্টি- কুমারিলের মতে তা সম্ভব নয়; কেননা "ঘট প্রভৃতি নির্মাণের দৃষ্টান্তে দেখা যায় একটি বস্তুর নির্মাণ ক্রমপদ্ধতি মাত্র। দ্বিতীয়ত বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রলয় স্বীকার করা যায় না, কেননা তার কোন প্রমান নেই। তাছাড়া প্রলয়ের কথা স্বীকার করলে মানতে হবে যে ঈশ্বরের মনে প্রলয়ের ইচ্ছা জাগে; কিন্তু এ জাতীয় ইচ্ছায় লাভ কী? অর্থাত কোনো বুদ্ধিমান স্রষ্টার পক্ষেই নিজের সৃষ্টিকে ধ্বংস করবার ইচ্ছা জাগা সম্ভব নয়।" "তোমাদের মতে তাঁর মধ্যে সৃষ্টির ইচ্ছা জেগেছিল; কিন্তু বলতে পার কোন উদ্দেশ্য চরিতার্থর জন্য তাঁর এই ইচ্ছা জেগেছিল- এমন কোন উদ্দেশ্যই বা সম্ভব হতে পারে যা কিনা সৃষ্টি-ব্যতিরেকে চরিতার্থ হওয়া অসম্ভব? নির্বোধও উদ্দেশ্য-বিহীন কাজ করে না। অতএব তিনি যদি বিনা উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করে থাকেন তাঁর বুদ্ধিকে নিস্ফল বলতে হবে। যদি বল, এই সৃষ্টি তাঁর লীলা- প্রমোদ বা বিলাসমাত্র, তাঁকে আর সদানন্দ বা চিরসন্তুষ্ট বলতে পার না (অর্থাত সৃষ্টির পূর্বে তিনি নিশ্চয়ই প্রমোদের অভাব অনুভব করেছিলেন)।"
"বৈশেষিকেরা বলেন, সকলের দেহই বুদ্ধিমান দেহর নিয়ন্ত্রণাধীন। কিন্তু এই যুক্তি অনুসারে ঈশ্বর-দেহের নিয়ন্ত্রণ-কর্তা কে হবেন?"
ঈশ্বর এবং সৃষ্টি-প্রলয় সংক্রান্ত বৈশেষিক মত খন্ডন করেই কুমারিল ক্ষান্ত নন; এই প্রসঙ্গে তিনি বৈদান্তিক সৃষ্টিতত্বকেও খন্ডন করতে অগ্রসর হয়েছেন। "নিত্য শুদ্ধ বা পরম পবিত্র পুরুষ (ব্রহ্ম বা পরমাত্মা) থেকেই যদি জগতের সৃষ্টি হয়, তাহলে জগতটিও তো পরম পবিত্র বা বিশুদ্ধ হওয়ার কথা; কিন্তু জগতে পাপাদি দোষ বা অশুদ্ধতা বর্তমান"। "যদি বলা হয়, জগতের পাপাদি মানুষের অতীত অধর্মের ফল (অতএব এগুলোর জন্য নিত্যশুদ্ধ পরমাত্মা দায়ী নন), তাহলে", কুমারিল উত্তর দিচ্ছেন, "মানুষের এই অধর্ম তো তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন; অতএব পরম পবিত্র পরমাত্মার পক্ষে মানব ধর্মাধর্মকে সুনিয়ন্ত্রিত করে একটি পরম নিষ্কলুষ জগত সৃষ্টি করাই উচিত ছিল।"
বৈদান্তিকেরা বলে, জগত সৃষ্টির মূলে অবিদ্যা বা মায়া। কিন্তু কুমারিলের মতে এ কথা যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। কেননা "তাঁদের মতে সৃষ্টির সময় ঈশ্বর (বা ব্রহ্ম) ছাড়া আর কিছুরই সত্বা ছিল না; আর যদি তাইই হয় তাহলে কিসের প্রভাবে এই মায়ার পক্ষে কার্যকরী হওয়া সম্ভব? মায়া হলো স্বপ্নের মত মিথ্যা এবং ব্রহ্ম বিশুদ্ধ; তাই একথা বলা যায় না যে ব্রহ্মই এ মায়াকে সৃষ্টিকার্যে প্রণোদিত করেন।"

সংক্ষেপে, প্রভাকর ও কুমারিল উভয়েই সামগ্রিকভাবে জগতের সৃষ্টি বা প্রলয় স্বীকার করেননি; বিভিন্ন জাগতিক বস্তুর উত্পত্তি ও বিনাশ উভয়ের মতে জাগতিক কারণ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। ঐকান্তিক অর্থে বেদপন্থী বলেই মনে হতে পারে সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান ঈশ্বর অস্বীকার করলেও মীমাংসকেরা অন্তত বৈদিক দেবতাদের কর্তৃত্বে বিশ্বাসী হবেন, এবং এই অর্থে তাঁদের মত বহু-দেববাদী হওয়াই সম্ভব। কিন্তু আপাত বিস্ময়ের কথা, মীমাংসকেরা বৈদিক দেবতাদের কর্তৃত্ব - এমনকি তাঁদের সত্বাও - সম্পূর্ণ ভাবেই অস্বীকার করেছেন। ( ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা অন্যত্র হতে পারে, সময় সুযোগ ঘটলে)

এতক্ষণ, আমরা বেদপন্থী আস্তিক নিরীশ্বরবাদীদের মধ্যে মীমাংসকদের আলোচনা দেখলাম। এবারে আবারো একটু বেদ-বিরোধীদের দেখি। এবারে চার্বাক প্রসঙ্গ।
চার্বাক। নামান্তরে লোকায়ত বা বার্হস্পত্য (বৃহস্পতি-প্রতিষ্ঠিত) দর্শন। চার্বাক বা লোকায়ত বলতে প্রাচীণকালের কোনো এক বস্তুবাদী বা জড়বাদী বা দেহবাদী দার্শনিক সম্প্রদায় বোঝাত। আধুনিক যুগের বস্তুবাদের সাথে ঐ প্রাক-বৌদ্ধ যুগের সুপ্রাচীণ বস্তুবাদের অভিন্নত্ব প্রত্যাশা করা যায় না; তবু নিঃসন্দেহে বলা যায় এই সম্প্রদায়ের দার্শনিকেরা আত্মা অস্বীকার করে
জড়দেহকেই চুড়ান্ত সত্য মনে করেছিলেন এবং তাঁদের মতে ঈশ্বর ও পরলোকের কথা কল্পনামাত্র। তাঁরা দাবি করেছেন, বেদ বা শ্রুতির কোনো প্রামান্য নেই, এবং বৈদিক যাগযজ্ঞ শুধু অর্থহীনই নয়- প্রবঞ্চনামূলকও। ..........................।

(আগামী কিস্তিতে সমাপ্ত)

গ্রন্থসূত্রঃ
১। দর্শন দিগ দর্শন- রাহুল সাংকৃত্যায়ন ২। ভারতীয় দর্শন- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ৩। বার্ট্রান্ড রাসেল, দর্শনের রূপরেখা - অনুবাদ ডঃ আব্দুল মতিন ৪। লোকায়াত দর্শন- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

কৈফিয়াতঃ
১। বর্তমান পোস্ট আসলে রিপোস্ট, এর আগে এই দীর্ঘ পোস্টটি ৫টি আলাদা পোস্ট হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ২। আগের ৫ টির প্রথম পোস্ট উৎসর্গ করেছিলাম প্রিয় আইকোনাস ক্লাস্টাস কে। ৩। ভারতীয় দর্শন আমাকে অনেক টানে। কারণ- প্রথমত এটার মাধ্যমে আমি নিজেকে পাই, আমার মাটির গন্ধ পাই, আমার মানুষের গন্ধ পাই; দ্বিতীয়ত আমি আমার অতীত নিয়ে গর্বিত হতে পারি; এবং তৃতীয়ত একটা কষ্ট অনুভব করি যখন একটা সময় পর আমাদের মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়া দেখি, এবং অবশ্যই এই কষ্ট আমার মধ্যে একটা তাগিদ তৈরি করে।

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): দর্শন ;
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১:০৬ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

২. ১৭ ই মার্চ, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৪০
বিবর্তনবাদী বলেছেন: বিশাল পোস্ট। সময় করে পড়ব। আপাদত প্রিয়তে। ধন্যবাদ।
৩. ১৭ ই মার্চ, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:২১
সিহাব চৌধুরী বলেছেন:

১। বেশ কিছু ধর্মে যেখানে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই (জৈন, প্রথম অবস্থায় বৌদ্ধ, বিভিন্ন টোটেমদের ধর্ম) সেগুলোকে নিশ্চয় নাস্তিকধর্ম বা ঐ সব ধর্ম পালনকারীদের সাধারণভাবে নাস্তিক বলার রেওয়াজ নেই।

--> এ বিষয়টি আমারা কাছে যৌক্তিক ভাবে স্পষ্ট নয় । যদি ধর্ম দুটো ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করে, তবে তাদের কে নাস্তিক বলাটাই সমীচীন নয় ? ব্যাপারটা কি এরকম – কানাকে কানা বলিনা, খোড়াকে খোড়া?


২। আবার, যাঁরা ঈশ্বর মানেন না, গীতাতে ভগবান তাঁদেরকে অসুর-সম্পদ-যুক্ত বলে নির্দেশ করেছেন, নাস্তিক বলেননি। মীমাংসকাচার্য ও সাংখ্যাচার্য ঈশ্বর মানেননা, কিন্তু বেদের অনুসারী। তাই তাঁরা নাস্তিক নন, অতিশয় আস্তিক। অপরদিকে, চার্বাক দর্শনে, বৌদ্ধদর্শনে বেদের প্রমান অঙ্গীকৃত হয় না বলে তা নাস্তিক।

--> এটা কি ভগবানের বেদের প্রতি একচোখা ভালাবাসা প্রকাশের মহান প্রচেষ্টার ফলাফলে ঈশ্বর বিশ্বাসের মর্যযাদার স্খলন? ভগবান কি বেদের চেয়ে নিজেকে কম গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন?

৩। আর নাস্তিক্যের কাছাকাছি শব্দগুলো হচ্ছে-
১। কুফর
২। শিরক
৩। মোনাফেকি

---->

আপত্তি আছে । শিরক ও মোনাফেকি কিন্তু নাস্তিক্যের কাছা কাছি যায় না । এগুলো বিকৃত ও স্খলিত আস্তিক্য । তাই নয় কি?

৪। কিন্তু যখন কেউ তার পৈত্রিক ধর্মের বিভিন্ন বিশ্বাস নিয়ে ক্রমাগত প্রশ্ন তুলতে থাকে এবং নতুন কোন ধর্মে নিজেকে সমর্পিতও না করে- তখন তাকে কখনও কখনও নাস্তিক বলে অভিহিত করা হয়।

--->

হাস্যকর প্রপঞ্চটির সুন্দর প্রকাশ । ধন্যবাদ ।


৫ । এই চারের সাথে আরও তিন যুক্ত করে জৈনধর্মের সপ্তরূপ তথা তাদের স্যাদবাদঃ
১। আছে? - হতে পারে(স্যাদ আস্তি)।
২। নেই? - নাও হতে পারে(স্যাদ নাস্তি)।
৩। আছেও আবার নেইও? - হতেও পারে নাও পারে(স্যাদাস্তি চ নাস্তি চ)।
৪। স্যাদ কি একটা বক্তব্য? - না, অবক্তব্য।
৫। স্যাদাস্তি কি একটা বক্তব্য? - না, অবক্তব্য।
৬। স্যাদ নাস্তি কি একটা বক্তব্য? - না, অবক্তব্য।
৭। স্যাদ আস্তি চ নাস্তি চ কি একটা বক্তব্য? - না, অবক্তব্য।
--->
:) মজা পেলাম । ১-৩ কয়েকটি সংশয় , তারপর ৪-৭ সংশয়ের নিশ্চল স্বীকৃতি ! বহুত ভ্যাজাল । শেষ মেষে কি দাড়ালো, ১-৩ বলে অস্তিত্বর যথাক্রমে ধনাত্বক, ঋণাত্বক ও ধনাত্বক বা ঋণাত্বক সংশয় , ৪-৭ বলছে ১-৩ শুধু শব্দের ফাঁফা বুদবুদ ?

১৯ শে মার্চ, ২০০৮ বিকাল ৩:১৮

লেখক বলেছেন:
১। হুম- আসলেই যৌক্তিক নয়- কিন্তু বিষয়টির রেওয়াজটিই এরকম হয়ে আসছে। আপনি দেখবেন- যারা বৌদ্ধ তাদেরকে নাস্তিক বলা হবে না- কিন্তু কেউ যদি সেই ধর্ম ত্যাগ করে- তবে নিজ সম্প্রদায়ে তাকে কিন্তু নাস্তিক আখ্যা দেয়া হয়। কোরআনেও কিন্তু পৌত্তলিকদের কুফরি দোষের চেয়ে শিরকির দোষে বেশি অভিযুক্ত করা হয়েছে- যদিও পৌত্তলিকদের মধ্যে একক স্রষ্টার বা ঈশ্বরের চল কম পাওয়া যেত- বরং বিভিন্ন দেবদেবী- চন্দ্রের দেবী, সূর্যের দেবতা এরকম দেবদেবীর চল ছিল বেশী।

২। ভগবান কি মনে করেছেন- সেটা বলা মুশকিল- তবে এটা ঠিক যে, বেদ অনুসারী নিরীশ্বরবাদীরা বেদকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন- এবং ভগবানের অস্তিত্ব বেদে স্বীকৃত নয় বলেই মনে করতেন।

৩। এ কারণে যে, কুফরি মানে সরাসরি আল্লাহকে অস্বীকার করা, শিরক মানে- আল্লাহর বিভিন্ন গুনবাচকে অন্য কাউকে অংশীদার করা- মানে কোন দেবতা হয়তো পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন- কোন জন দেবী চন্দ্র, কোন দেবতা মানুষ সৃষ্টি করেছেন, কোন জন মানুষের ভালো দেখছেন- কোন জন মানুষের খারাপই হয়তো করছেন; কিন্তু এর মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের ধারণাকেই অস্বীকার করা হয়। ঈশ্বরের ধারণাটি কিন্তু- সমস্ত কিছুর মিশ্রণ- তিনি একই সাথে স্রষ্টা- একই সাথে প্রতিপালক এবং একই সাথে নিয়ন্ত্রক- সবকিছুরই।
অন্যদিকে- মোনাফেকি তো অবশ্যই- একধরণের কুফরি। কেননা, অন্তরে মানে বিশ্বাসের দিক থেকে তো মোনাফেক আল্লাহকে অস্বীকারই করে। শুধু পার্থক্য হলো এই যে, সে উপরে উপরে নানাবিধ সুবিধা গ্রহণের নিমিত্তে আল্লাহকে মানে বলে প্রচার করে।

৪। আপনাকেও ধন্যবাদ।

৫। হুম- এখান থেকে প্রথম আমরা প্রোবাবিলিটি থিউরেম এর সন্ধান পাই বলে কথিত আছে।


পরিশেষে আপনাকে ধন্যবাদ।

৪. ১৭ ই মার্চ, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:২৩
সিহাব চৌধুরী বলেছেন:

গৌতম বুদ্ধের আগ পর্যন্ত পড়লাম, বাকী টা এখন নয় ।
মাথাটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করছে !
১৯ শে মার্চ, ২০০৮ বিকাল ৩:২০

লেখক বলেছেন:
পোস্টের কারণে মাথা ঝিম ঝিম করছে??????

৫. ১৩ ই এপ্রিল, ২০০৮ রাত ১১:০৭
শিয়া বলেছেন: http://www.somewhereinblog.net/blog/shiablog দয়া করে এই ব্লগটি নিয়মিত পড়বেন।
৬. ১১ ই মে, ২০০৮ বিকাল ৪:০১
কাঙ্গাল মুরশিদ বলেছেন: নাস্তিকের বিভিন্ন অবস্থা বর্ণনা করলেন কিন্তু আপনি কোন ধরনের নাস্তিক তা তো বল্লেন না?
৭. ০২ রা জুলাই, ২০০৮ ভোর ৫:৩২
আশাবাদী!! বলেছেন: ভালো লেখা তবে অতি দীর্ঘ্

পছন্দের তালিকায় রাখলাম ধীরে ধীরে দেখবো।
৮. ২৮ শে নভেম্বর, ২০০৮ সকাল ৯:১৫
রাঙা মীয়া বলেছেন: পোস্ট পড়ার পর লগইন করলাম। পোস্টটি পড়তে ভালো লাগলেও, আপনি নিজে থেকে কিছু বলেননি। পোস্টের শেষের দিকে এসে গতি হারিয়েছে। ঈশ্বর সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হলে, আগে আত্মা নিয়ে অনুসন্ধান করতে হবে। পৃথিবীর সমস্ত মহাপুরূষ নিজের আত্মিক শক্তিকে বিকাশ ঘটিয়ে অজানা জ্ঞান আহরন করেছেন।অতীতের ঐতিহাসিক চিরন্তন সত্যকে আত্মিক দর্শন করেছেন, ভবিষ্যৎবানীও করে গেছেন । সমস্ত কিছুর মূলকেন্দ্র হল একটি পবিত্র আত্মা । এই পবিত্র আত্মার ভেতরেই শক্তি,কাল ও সৃষ্টিকর্তা।

আত্মিক শক্তিকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারলে পবিত্রাত্মার সুবাস পাওয়া যায়।
এগুলো সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব কথা,আরও অনেকেই বলতে পারেন।আপনার প্রতি অনুরোধ রইলো,ঈশ্বর নিয়ে লিখলে-এমন করে লিখুন যেন তাতে সংশয় না বাড়ে।সত্য মিথ্যা যাই হোক না কেন,আপনার নিজস্ব ভাবনা শেয়ার করতে পারেন।
আপনার নাম কি মামুন ?

২৯ শে নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১২:০১

লেখক বলেছেন: ঈশ্বর নিয়ে লিখলে-এমন করে লিখুন যেন তাতে সংশয় না বাড়ে======>>>>>
ঈশ্বর সম্পর্কে যদি আমি নিঃসংশয় না-ও হই, তারপরেও কি আমাকে এমন লিখতে হবে?

আপনার নাম কি মামুন? ===>>>> না

৯. ২৯ শে নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৩:০২
রাঙা মীয়া বলেছেন: লেখক বলেছেনঃঈশ্বর সম্পর্কে যদি আমি নিঃসংশয় না-ও হই, তারপরেও কি আমাকে এমন লিখতে হবে?

উত্তর--অবশ্যই না।

তবে আমি মনে করি ঈশ্বর সম্পর্কে নিঃসংশয় হওয়ার পরই প্রকৃত নাস্তিকতার শুরূ। যেমন-বিপরীতমুখী রূপ,সত্তার বৈচিত্র ইত্যাদি। এইপর্যায়ের এসে বিভ্রান্ত একজন নাস্তিকের কাছ থেকেও অনেক কিছু জানার আছে।

যেহেতু আপনি নাস্তিক হয়ে ধর্মের কথা বলবেন তাই আপনার কাছে প্রত্যাশা কিছুটা বেশী।

 

মোট সময় লেগেছে ২.৮৪৩৪ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
মানুষেরে ঘৃণা করি'/
ও কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি' মরি'/
ও মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর ক'রে কেড়ে,/
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই