প্রায় ২৫ বছর আগের একটি ঘটনা। মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর বাসস্ট্যান্ড। সময় সন্ধ্যা ৭টা। বাস থেকে নেমে এক ভদ্রলোক শহরের গোলাপাড়া যাওয়ার জন্য পাঁচ টাকা ভাড়ায় একটি রিকশা নেন। কিন্তু গন্তব্যে গিয়ে দিলেন তিন টাকা। রিকশাচালক এর প্রতিবাদ করলে যাত্রী ভদ্রলোক ক্ষমতা দেখাতে ক্ষেপে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোর বাড়ি কোথায়?’ রিকশাচালক উত্তর দেন, ‘পেটকাটা’! দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাস করলে আবারও একই উত্তর। যাত্রী এবার রেগেমেগে রিকশাচালকের শার্ট তুলে পেটের কোথাও কাটা না পেয়ে কষে চড় বসিয়ে দেন তাঁর গালে। গালাগাল দিয়ে চলে যান তিনি। রিকশাচালক এতে কষ্ট পেলেন না। উল্টো লজ্জায় তাঁর মাথা হেঁট! এ ঘটনার পর থেকেই গ্রামের নাম বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টা শুরু। গ্রামের নামটি কি আর পেটকাটা বলা যায়? রিকশাচালকের নাম রবিউল দেওয়ান। ওই দিনের ঘটনার পর তাঁর বিবেক তাঁকে জানান দেয়, একটি গ্রামের নাম ‘পেটকাটা’ হতে পারে না। এ গ্রামের একটি ভালো নাম হওয়া দরকার।
এই রিকশাচালক রবিউলের চেষ্টায়ই পেটকাটা গ্রাম এখন ‘ইসলামনগর’। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এ গ্রামের নাম বদলাতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন তিনি। বদলে যান তিনি নিজেও। এরপর থেকে এলাকার রাস্তাঘাট নির্মাণ, মেরামত এবং বাজার, স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠায়ও একের পর এক ভূমিকা রেখে চলেছেন এই নিরক্ষর রিকশাচালক রবিউল। এখন তিনি গর্ব করে বলেন, ‘সরকারি খাতায় গ্রামের নাম ইসলামনগর’। সাদামনের এই মানুষ রবিউল কোনোরকম রাখঢাক না করেই কালের কণ্ঠের কাছে চড় খাওয়া ও সংকল্পের কথা অকপটে বলেছেন। মানুষের কল্যাণে কাজ করার কারণে অশিক্ষিত রবিউল পরে একবার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যও নির্বাচিত হন।
মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার তালেবপুর ইউনিয়নে তাঁর ইসলামপুর (সাবেক পেটকাটা) গ্রামের অবস্থান। ইসলামপুর বা সিংগাইর উপজেলার মানুষের কাছে এখন রবিউল একটি প্রিয় মুখ। বিত্তের জোর না থাকলেও ব্যক্তিত্বের জোর আছে এই মানুষটির। তিনি উচ্চৈঃস্বরে কথা বলে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সবার।
তালেবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, “পেটকাটা গ্রামের নাম বদলে ‘ইসলামনগর’ হওয়ার পেছনে পুরোটা অবদানই রবিউলের। প্রচার চালিয়ে, বিনা পয়সায় ‘খেয়া পার করে’ রবিউল সবার কাছে ইসলামনগর নামটি পেঁৗছে দেন।’
‘স্পেশাল নৌকা’ আর প্রচার : স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে রবিউল স্থানীয় গণ্যমান্যদের কাছে গ্রামের নাম বদলাতে গিয়েছিলেন। তখন অনেকে তাঁকে পাগল বলে পাত্তা দেননি। শেষে নিজেই চেষ্টা শুরু করেন। গ্রামের কোল ঘেঁষে ধলেশ্বরী নদীতে নৌকা দিয়ে খেয়া পারাপার শুরু করেন তিনি। এর নাম দেন ‘স্পেশাল নৌকা’। তাঁর এই স্পেশাল নৌকার উদ্দেশ্য গ্রামের নাম বদল। তিনি তাঁর নৌকায় করে নদী পার করেন বিনা পয়সায়। তবে শর্ত, যাত্রীরা তাঁর গ্রামকে ইসলামনগর বলতে হবে। এ সময় একবেলা রিকশা চালিয়ে কোনোমতে সংসারের চাহিদা মেটাতেন তিনি। এরপর রবিউল নদীর পাড়ে, গ্রাম ও ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে সাইন বোর্ড লিখে রাখেন ‘ইসলামনগর গ্রাম’। একইভাবে শুরু করেন পোস্টারিং। এভাবে চলতে থাকে প্রায় সাত-আট বছর।
এর মধ্যে স্থানীয় আইনজীবী আব্দুল হক ও ম্যাজিস্ট্রেট আবু হোসেন রবিউলকে তাঁর কাজে উৎসাহ জোগান। ওই সময়ের স্থানীয় সংসদ সদস্য সামছুল ইসলাম খান ও সাবেক যুগ্ম সচিব গিয়াসউদ্দিন সরকারিভাবে নাম বদলে সহায়তা করেন। একপর্যায়ে ১৯৯২ সালে সরকার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, এখন থেকে তাঁর গ্রামের নাম ‘পেটকাটা’ নয়, হবে ‘ইসলামনগর’। কিন্তু এরপরও গ্রামটিকে ইসলামনগর বলাতে আরো পাঁচ-ছয় বছর প্রচারাভিযান অব্যাহত রাখেন।
থেমে নেই রবিউল : পাঁচ বছর আগে ধলেশ্বরী নদীর ওপর ‘ইসলামনগর ব্রিজ’ নির্মাণ, ইসলামনগর হাট, ইসলামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসহ অনেক সমাজকল্যাণমূলক কাজে রবিউলের প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে। স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, হতদরিদ্র রবিউল হাতে কিছু টাকা পেলেই এলাকার জনকল্যাণমূলক কাজে নেমে পড়েন। চাঁদা তুলেও কাজ করেন তিনি। এখন তাঁর ইচ্ছা, এলাকায় একটি পাকা কবরস্থান করার। জানালেন, ‘সবার কাছ থেইকা দুই মণ করে ধান নিয়া কবরস্থানের কাজ শুরু কইরা দিব।’
সংগ্রামী জীবন : রবিউলের সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ এলাকাবাসী জোর করে তাঁকে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করান। ১৯৯৬ সালে তিনি তালেবপুর ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের (বর্তমানে ২ নম্বর) সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু সৎ রবিউলের আর্থিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনো রিকশা চালান তিনি। নাম জিজ্ঞেস করলে রবিউল বলেন, ‘সাবেক রবিউল দেওয়ান মেম্বার।’ বয়স জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিবেচনা কইরা দেন ৪০।’ অথচ তাঁকে দেখে এই প্রতিবেদকের মনে হয়েছে, তাঁর বয়স পঞ্চাশ হবে। রবিউলের স্ত্রীর নাম চম্পা বেগম। তাঁর দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে আমজাদ দেওয়ান চটপটি বিক্রেতা, তিনি স্ত্রী নিয়ে আলাদা থাকেন। ছোট ছেলে সুজন দেওয়ান রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করে। একমাত্র মেয়ে জেসমিনের বিয়ে দিয়েছেন এক বছর আগে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



