রেলের লোকজনের উপর মেজাজটা খিচড়ে গেল তানসীম-এর।
ট্রেনের নাম দিয়েছে আন্তঃনগর, কিন্তু.... উপনগর, পাতিনগর কোন স্টেশনেই থামা বাকী রাখছেনা! কম্পার্টমেন্টের মাঝখানের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে অনেক প্যাসেঞ্জার, এদের ক'জন যে 'স্ট্যান্ডিং টিকেট' নিয়ে আর ক'জন যে এ্যটেন্ডেন্ট-এর ট্যাকে টাকা গুঁজে ট্রেনে চেপে বসেছে... বলা মুশকিল!
বিরক্তি দূর করতে অন্যদিকে মন দিল তানসীম। রেলের চাকায় আজব শব্দ তুলে ছুটে চলেছে একতা এক্সপ্রেস, গন্তব্য দিনাজপুর। সেই শব্দ অদ্ভূতএক ছন্দ তুলছে। মনে মনে যা আওড়াচ্ছে তানসীম... মিলে যাচ্ছে ছন্দে.. লয়ে.... তালে। .... 'রেলগাড়ী ঝুক ঝুক.... রুখে দাঁড়াও টিপাইমুখ' ! বাহ্ ... একদম মিলে যাচ্ছে.... বেশ মজা পেল তানসীম। ছুটে চলেছে একতা এক্সপ্রেস ...
এক মুরুব্বী তানসীম-এর সীট-এর পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমাচ্ছিল। আধা ঘন্টার জন্য নীজের সীট-টা মুরুব্বীকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল তানসীম... সিগারেটের তেষ্টা পেয়েছে! ...... ভীর ঠেলে, চালের বস্তা মাড়িয়ে করিডোরের শেষ প্রান্তে কম্পার্টমেন্টের দরজার পাশে এসে দাঁড়ালো সে। উল্লাপাড়া স্টেশন ছাড়লো একতা....
পঁচিশ পয়সার তামাকে তৈরী পাঁচ টাকার একটা শলাকা বের করে ধরালো তানসীম! দৃষ্টি দিল বাইরের দিকে...... সোনালী রোদ খেলা করছে ধানের শীষে... কাঁচা পাকা ধানের শীষগুলো দুলছে এলামেলো বাতাসে.. বাঁশ ঝাড়, মজা পুকুর আর গাঢ় সবুজ গ্রামগুলে ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলেছে পেছনের দিকে....... আহ! কি সুন্দর এই দেশ!।
দরজার পাশেই মাঝ বয়সী এক লোক দাঁড়িয়ে আছে তানসীম-এর গা ঘেষে... পড়নে নীল রঙের টেট্রনের পাঞ্জাবী আর সুতী চেক লুঙ্গী। মাথায় যা সামান্য চুল আছে তা পর্যাপ্ত তেল মেরে চাঁদির সাথে সেঁটে রাখার চেষ্টা করেছে লোকটি। কৃষকায়, কৃ্ষ্ণকায় চেহারা দেখেই বোঝা যায় .... গ্রামের সহজ সরল মানুষ! সাথে ১০-১২ বছরের একটা ছেলে। ...... একটি পাকা কাঁঠাল আর সিলভারের ঘটিতে দুধ নিয়েছে সাথে। ভীর ঠেলে খুব ভীতরে ঢোকার চেষ্টা করেনি, সামনের স্টপেজেই নামবে হয়তো.... ভীন গাঁয়ে বিয়ে দেয়া আদরের মেয়ে-কে দেখতে যাচ্ছে বুঝি!
তানসীমের মাথায় দুস্টুমী বুদ্ধি চাপলো ! পাশের লোকটাকে শুনিয়ে বেশ জোড়েই স্বগোক্তি করলো...' গ্রামের রোদগুলোও দেখছি আজব ! কোন কোন জমিতে রোদ পড়েছে বেশী.... ধান গাছগুলো পেকে গেছে। আর যে জমিতে রোদ পড়েছে কম... সে জমির ধান এখনও সবুজ!'
অব্যর্থ নিশানা.... এমন আজব মন্তব্য শুনে পাশের লোকটি রেসপন্স না করে পারলোনা ... ' না, তা লয়.... যে ক্ষ্যাতত্ ধান আগে নাগাইছে... সে ক্ষ্যাতত্ ধান আগে পাকিছে, আর যে ক্ষ্যাতত্ ধান পরে নাগাইছে... সে ক্ষ্যাতত্ ধান পাকবি পরে।'
- ' না .... তা হবে কেন?!' গম্ভীরভাবে পুশ করলো তানসীম...' আসল বিষয়টা হচ্ছে.... সুর্যের আলোর সাহায্যে ধান গাছের পাতার ক্লোরোফিল সালোক সংশ্লেষন প্রক্রিয়ায় নিজের খাদ্য নিজেই তৈরী করে... তাই, যে জমিতে সূর্যের আলোর ইনটেন্সিটি বেশী, সে জমিতে ধান আগে বেড়ে ওঠে এবং আগে পাকে... সূর্যের অলোর ইন্টেন্সিটি কম হলে ধান পরে পাকে!'...
কশ্মিনকালেও এমন কথা শোনেনি লোকটা...... নির্বাক সে! .... অবাক বিস্ময়ে হা করে তাকিয়ে রইল তানসীম-এর দিকে! ....... শহুরে লোকগুলো কি বোকা!?!
মনে মনে একগাল মুচকী হেসে আবার বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলো তানসীম..... হারিয়ে গেল নিজেতেই.....আহা!.. চোখ জুড়ানো প্রকৃতি!.. আহা!... আমার দেশের খোলা প্রান্তর, দিগন্ত জোড়া সবুজ মাঠ! কি সুন্দর আমার এই বাংলাদেশ!
ট্রেন ছুটে চলেছে আপন গন্তব্যে....
'রেলগাড়ী ঝুক ঝুক, রুখে দাঁড়াও টিপাইমুখ!.....
তানসীম লম্বা শ্বাস নিল.... যতটা পাড়লো বুকে ভরে নিল মাটির গন্ধ মাখানো বাতাস.... মন ভরে উপভোগ করতে লাগলো সবুজে মেশানো সোনা রোদ্দুর!
(আজই ব্লগে নিরাপদ হলাম। আমার ভাললাগা একটি লেখা রিপোস্ট দিয়েই শুরু করলাম সংকলিত প্রথম পাতা)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০১৮ দুপুর ১:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



