গল্প ধাঁধাঁর আসর পর্ব -১
এক
"মহাজাগতিক প্রাণের সন্ধান"- শব্দ ক'টা ড. অনৃন্যের মস্তিস্কের কোষে কোষে আনন্দ স্ফুরণ ছুটাতে থাকে । ড. অনৃন্য চেয়ার ছেড়ে ওঠে দাঁড়ান । তার ঠোঁটে লেগে থাকে স্মিত হাসি । ঠিক এ-মুহূর্তে ড. অনৃন্যের যা ইচ্ছে করছে , তা হলো,--পৃষ্ঠদেশে দুটো ডানা গজিয়ে যাক , তিনি উড়াল দেবেন ! উঁচু এই পাহাড় চূড়া থেকে উড়াল দেবেন আকাশে । আকাশের বুক ছুঁয়ে মনের আনন্দে বার কয় চক্কর লাগিয়ে পর্বতে নেমে আসবেন ফের । মহাকাশ যানের বদৌলতে আকাশের বুক ফুঁড়ে অসীম দূরত্বে হারিয়ে যাবার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে । কিন্তু নিজের দুটো ডানায় ভর করে আকাশে উড়ার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই হবে আরো অনন্য । আনন্দের অতিশয্যে মানুষের এরকম ইচ্ছে করে । ডানা মেলে উড়তে ইচ্ছে করে বিহংগের মতো । ড. অনৃন্যের এখন সে ইচ্ছেটাই করছে । ক্ষণিকের জন্য হলেও পাখি হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে । বিজ্ঞানীদের এরকম ইচ্ছে করাটা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কিনা তার জানা নেই । অপরাধ হলেও এ-মুহূর্তে এরকম অপরাধের দ্বিধাহীন অপরাধী হতে তিনি রাজি আছেন । বিশেষ কারণে তিনি পুলকবোধ করছেন । ভীষণরকম পুলকবোধ করছেন । দীর্ঘদিন এমন গভীর আনন্দ তাকে ছেঁকে ধরেনি । রক্তের কণায় কণায় তিনি উত্তাল আনন্দ টের পান ।
দ্বিতল বিজ্ঞান ভবনের নীচ তলাটা সুরক্ষিত । বিশেষভাবে সুরক্ষিত এই নীচতলার অবস্থান মাটির নীচে । হঠাৎ দেখে মনে হয়, দরজা - জানালা বিহীন বদ্ধ একটি ঘর । জানালা অবশ্য একটি আছে । সাধারণ দৃষ্টিতে এর অস্তিত্ব চোখে পড়ে না । জানালার মতো দেখতে হলেও, এর কাজ আসলে দরজার । কালে-ভদ্রে এ দরজাটি ব্যবহৃত হয় । অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী পদে দেয়ালের কাছাকাছি এসে দাঁড়ান অনৃন্য । দেয়ালের হালকা নীল রং আর ঝারবাতির নীলাভ আলো মিশে রহস্যপূর্ণ এক আবহ ছড়ায় । অদৃশ্য জানালা বরাবর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার তাকান অনৃন্য । জানালার অদৃশ্য পরৎটি সরে যায় । হুড়মুড় করে জানালা ফুঁড়ে নেমে আসে স্বয়ংক্রিয় একটি সিঁড়ি । জানালার অদৃশ্য পরৎ সরে গিয়ে সিঁড়ির এই নেমে আসা ব্যাপারটি অলৌকিক কিছু নয় । অনৃন্য যোখানে দাঁড়িয়ে আছেন তার পায়ের নীচেই আছে বাটন । ক্ষুদ্রাকার নীল বাটন । তিনি সেটা পায়ে চেপে আছেন । পায়ে চেপে আছেন বলেই জানালা ফুঁড়ে আকস্মিক এই সিঁড়ির আবির্ভাব । ড. অনৃন্য সিঁড়িতে পা রাখেন । চলতে শুরু করে সিঁড়ি । জানালা রূপী দরজার কাছে এসে সিঁড়ি দাঁড়িয়ে যায় । ছোট্ট জানালা দিয়ে অনৃন্য নিজেকে গলিয়ে দেন বাইরে । পাহাড়ে পা রেখে অভিভূত অনৃন্য আকাশপানে তাকান । অজস্র তারকামন্ডলী জ্বলজ্বল করে জ্বলছে । প্রকান্ড এক চাঁদ জেগে আছে আকাশে । হঠাৎই অনৃন্যের মনে প্রশ্ন জাগে-- 'পৃথিবী থেকে ২০.৫ আলোকবর্ষ দূরত্বে আবিস্কৃত পৃথিবীর কাছাকাছি জলবায়ূর সেই গ্লীস ৫৮১সি গ্রহটির চাঁদের আলোও কি এমন মায়াময় ?'
অনৃন্য তার হাত দু'খানা দু'পাশে প্রশ্বস্ত করে মেলে ধরেন । আঙ্গুলগুলো মুষ্ঠিবদ্ধ করেন আবার খোলেন । মুঠো ভরে ভরে জোছনা ধরছেন যেন । সুড়ুৎ করে একটি উল্কা ছিটকে যায় । আকাশমুখো অনৃন্য আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করেন এবার,-- 'মহাজাগতিক প্রাণের সন্ধান এখন ইতিহাস ! মানবজাতির সাফল্যের ইতিহাস !' রাতের নিস্তব্ধতাকে ফালি ফালি করে অনৃন্যের শব্দরা ছড়িয়ে যেতে থাকে পহাড় থেকে পাহাড়ে, আকাশে - আকাশে,--মানবজাতির সাফল্যের ইতিহাস...মানবজাতির সাফল্যের ইতিহাস...!
দুই
দৃশ্যটি দেখে সুবোধ 'তব্দা' খেয়ে যায় । 'তব্দা' শব্দটির বয়স পৃথিবীর বুকে হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও সুবোধ শিখেছে নতুন । পৃথিবীর মানুষের সমাগমে, সংস্পর্শে খুব একটা যাওয়া হয়নি তার । চলার গন্ডিও সীমাবদ্ধ । চলার গন্ডি সীমাবদ্ধ বলেই শব্দটি এর আগে তার শুনা হয়নি । শুনলে সে ঠিকই অর্থ বুঝে নিতো । সুবুধের একটি বিশেষ গুণ হলো , যে কোন ভাষা খুব দ্রুত সে রপ্ত করে নিতে পারে । এমনকি যে কোন সংকেত বা সাংকেতিক ভাষা ব্যাখ্যা করতে তার লাগে এক সেকেন্ডের তিন ভাগের এক ভাগ সময় । বলা ভালো, এই একটি বৈশিষ্টই সুবোধকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেই । কি দৃশ্য দেখে সুবোধ তব্দা খেল, আর তব্দা শব্দটি শেখার তার সেই কাহিনীতে আমরা একটু পরে যায় , তার আগে সুবোধের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় পর্বটা হয়ে যাক ।
সুবোধের মাথার পেছন দিকটায় মৃদু চাপ দিলে একটি ঢাকনা খুলে যায় ! দেখা যায়, ভেতরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেকগুলো তারের সম্মিলন । অত্যন্ত শক্তিশালী সফটওয়্যার দিয়ে সুবোধের মস্তিস্ক পরিচালীত । সুবোধ একটি চর্তুমাত্রিক রোবট । ড. অনৃন্যের ব্যক্তিগত সহকারী রোবট । অনৃন্যের জন্য তার গভীর মমত্ববোধ এরকম একটি ভাব ধরে থাকার চেষ্টায় তাকে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় । যদিও মমতা জিনিসটি রোবটদের মাঝে অবর্তমান , তবু, ভাবধরার প্রবণতাটা চতুর্মাত্রিক এই রোবটটির মাঝে প্রকটভাবেই পরিলক্ষিত হয় । সুবোধ অবশ্য খুবই অনুগত এটা ঠিক । দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে অনৃন্যের সঙ্গে বলা আজ ভোরের কথাগুলো মনে পড়ে সুবোধের । মুহূর্তেই সে একটু পেছনে ফিরে গিয়ে, মেমোরি সেলে স্মৃতিগুলো জাগরুক করে তোলে । আজ ভোরে অনৃন্য তাকে ডেকে বললেন,-
'সুবোধ !'
'জ্বি, জনাব ।'
'ভোরের এ কোমল প্রকৃতি তোমার লাগছে কেমন ?'
সুবোধ একটু অপ্রস্তুত হয় । খানিকক্ষণ চুপ মেরে থাকে । প্রকৃতি নানারূপে বদলায় । প্রকৃতির এই নানারূপ মানুষের মাঝে প্রভাব তৈরী করে । তার ভেতরে প্রভাব তৈরী হয়না । প্রভাব তৈরী হওয়া সম্ভব না । তবে , কিসে ড. অনৃন্য খুশী হন এইটুকু বুঝার মতন বোধ তার ভেতরে পর্যাপ্ত পরিমাণেই দেয়া আছে । সে মতেই সে উত্তর দেয়--
'হে ভোরের প্রকৃতি ! তোমাতে মোর সুন্দরের আরতী !'
'বাহ্ ! বেশতো ! এটা কি এখনি বানালে ?'
'জ্বি, জনাব !'
'তোমার এই সাহিত্য প্রতিভাটা আমি উভোগ করি । তোমাকে তৈরীর সময় কি মনে করে জানিনা, খানিকটা সাহিত্য বীজ তোমার ভেতরে দিয়ে দেয়া হয়েছে । আমার সাহিত্যপ্রেমের কথা মাথায় রেখেই হবে হয়তোবা । কাজটা খুবই ভালো হয়েছে বলতে হয় । মাঝে মাঝে তুমি বেশ কাব্যিক হয়ে ওঠো ।'
'ধন্যবাদ, জনাব ।'
শব্দ দু'টা উচ্চারণ করেও সুবোধ খানিকটা বিষন্নতার ভঙ্গি করলো ।
সে যে একজন রোবট, এটা মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে-এজন্যই তার এই বিষন্ন ভঙ্গি ! ড. অনৃন্য অবশ্য অতটুকু খেয়াল করলেন না । তার দৃষ্টি বাইরে । দু'তলার জানালা দিয়ে দৃষ্টি প্রসারীত করে তিনি শিশিরের ঝরে পড়া দেখছেন । তার মন অবশ্য শিশিরেও নেই । মন পড়ে আছে দু'তলার করিডোরের শেষ মাথার ঘরটিতে । যেখানে কম্পিউটার সামনে করে বসে আছেন পৃথিবীর সবচে' রূপবতী মানবী--ইরিনা । ইরিনাও এই বিজ্ঞান ভবনের একজন বিজ্ঞানী । ড. অনৃন্য আর ইরিনার ব্রত একটাই --মহাজাগতিক প্রাণীদের সঙ্গে বিজ্ঞানীদের যোগাযোগ স্থাপন । কাজের সূত্রেই বেশীর ভাগ সময় তাদেরকে কাছাকাছি পাশাপাশি থাকতে হয় । রাতভর তারা দু'জন একসঙ্গে কাজ করেছেন । গতরাতে বিজ্ঞানভবনের শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোফে ধরা পড়েছে মহাজাগতিক প্রাণীদের কিছু সিগনাল । সিগনাল গুলো ব্যাখ্যার জন্য তারা মরিয়া । কুল-কিনারা পাচ্ছেন না কোন । ইরিনার পাশে বসে কাজ করতে অনৃন্যের খুব সমস্য হচ্ছিল । যতোবার ইরিনার গায়ের মোহনীয় গন্ধ তার নাকে আসছিল, তার মনোনিবেশ নষ্ট হচ্ছিল । এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল মাথা । এখনও সে মাথা পুরোপুরি ঠিক হয়নি । অনৃন্য তার অস্থির মনটাকে ভোরের নরম প্রকৃতি আর শিশিরে স্থির করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছেন । তার খুব ইচ্ছে করছে, ইরিনার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ান । ইরিনার তুলতুলে একটা হাত ধরে তাকে নিয়ে পাহাড়ে নেমে যান । গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মতো করে ঝরে পড়া শিশির বিন্দু ছুঁয়ে দেখেন দু'জনে । এমনকি ইরিনার ভ্রু-তে আটকে যাওয়া শিশির কণা আঙ্গুলে তুলে নিয়ে তার রক্তিম গালে লেপটে দেন । এসব কিছুই করতে না পারার যন্ত্রণা বুকে নিয়ে তিনি নিজের মনের সঙ্গে লড়াই করেন । সাধারণ মানুষদের মতো বিজ্ঞানী সমাজেও বদ্ধমূল ধারণা চালু আছে, --অসম্ভব রূপবতীরা সবসময়ই বিপদজনক । ভয়ঙ্কর বিপদজনক । এদের রূপ হচ্ছে আগুনের মতো । কাছাকাছি থাকলেই মোমের মতো গলে যাবার সম্ভাবনা । নিরাপদ দূরত্বে থাকাই তাই শ্রেয়তর । তাছাড়া হৃদয়ঘটিত ব্যাপার এই শতকের বিজ্ঞানী সমাজে গুরুত্ব পায়না । 'হৃদয় নয়, মস্তকে পরিচালীত হোন'--এই শ্লোগানটিই বিজ্ঞানীদের সদর দপ্তরে বড় বড় হরফে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে । গ্লীস ৫৮১সি নামের গ্রহটিতে মানুষের আবাস গড়ে তোলার খুব কাছাকাছি অবস্থানে বিজ্ঞানীকূল পৌঁছে গেছেন । এই মুহূর্তে প্রেমের কেলেঙ্কারীতে জড়ানো অনৃন্যের জন্য আত্মাহুতির সামিল । এমনকি মহাজাগতিক প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে তার নিরলস প্রয়াসের জন্য অর্জিত সম্মানসূচক তারাটিও খসে যেতে পারে । হুশশ... করে একটা দীর্ঘশ্বাস বের করে দেন অনৃন্য । হুড় হুড় করে ভোরের নির্মল হাওয়া ফুসফুসে ঢুকে পড়ে তার । মন স্থির হয় । ফুরফুরে ভাব ফিরে আসে । মনে পড়ে, সুবোধ পেছনে দাঁড়িয়ে তখনও । নিজের অন্য মনস্কতার জন্য খানিকটা লজ্জিত বোধ করেন অনৃন্য । ধীর পায়ে ভিডি মডিওলের সামনে এসে ঝুঁকে পড়েন । স্কৃন উজ্জ্বল করে ওপাশ থেকে অপূর্ব হাসি ছড়িয়ে দেন ইরিনা ,- 'আমি একটু বেরুতে চাই ।' বলেন ইরিনা ।
'কোথায় ?'
'প্রাত ভ্রমণে !'
'বেশতো !'
'আপনিও চলুন না ।'
'না । গতরাতে আমাদের রেডিও টেলিস্কোফে ধরা পড়া মহাজাগতিক প্রাণীদের সিগনাল গুলো ভিন্ন মাত্রা থেকে নতুন করে ব্যাখ্যা করতে চাই । কাজটা আমি এখনি শুরু করবো ভাবছি । আপনার সঙ্গে সুবোধ যাক ।'
'ধন্যবাদ ।'
ভিডি মডিওলের সামনে থেকে সরে আসেন অনৃন্য । চোখের ইশারা পেয়ে সুবোধও বেরিয়ে যায় । সে জানে তার করণীয় ।
পাহাড় থেকে নেমে সমতলের পথ ধরে তারা হাঁটছে । প্রায় আধমাইল পথ হেঁটে ফেলেছে । পাহাড় থেকে নামা-ওঠার কাজটা তাদের জন্য আনন্দদায়ক । স্বয়ংক্রিয় লিপটে পা রাখলেই ঝামেলা শেষ । পাহাড় থেকে সমতলে কিম্বা একটানে সমতল থেকে পাহাড়ে । হাঁটাহাঁটির এই কাজটিও আনন্দদায়ক । তবে, এতে খানিকটা কষ্ট আছে । হেঁটে অভ্যস্ত নয় তারা । ইদানীং অভ্যস্ত হবার চেষ্টায় আছে । ভোরের সূর্যের আলো পৃথিবীতে ছড়িয়ে যাবার আগে আগে এই হন্টন পর্বটা তারা বেশ উপভোগ করছে । ইরিনা সামনে, পেছন পেছন সুবোধ । রাস্তাঘাট ফকফকা, খালি । এত ভোরে এখনও লোকজন নেই--এটাই এ সময়ে হাঁটার আনন্দ । সামনের বাঁকটা পেরুলেই একটা বাজার । বাজার পর্যন্ত তারা যায় না, লোকজন কেমন কেমন চোখে তাকায় । বাঁক থেকেই ফিরে আসে । বাঁকে পৌঁছেই তারা দেখলো দু'টা ছেলে ঘোর লাগা চোখে ইরিনার দিকে তাকিয়ে আছে । দু'জন যুবক । তাদের একজন ফিসফিস করে বললো, -'দোস্ত! তব্দা খাইয়া গেলাম !'
অন্যজন চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে তার দিকে তাকালো । প্রথমজন আবার বললো,- 'শালার ! এইরকম আগুনের গোলা নিয়া ঘুরতেছে একটা রোবট ! আহা ! কতোইনা পোড়া কপাল আমাদের !'
তাদেরকে খেয়াল করলো ইরিনা । ঘুরে গিয়ে চট করে ফিরতি পথে হাঁটতে শুরু করলো ।
ভোরের স্মৃতি থেকে সামনে দৃশ্যমান দৃশ্যে ফিরে আসে সুবোধ । এ দৃশ্যটি দেখেই ভোরের ওই যুবকটির মতো তব্দা খেয়ে গেছে সে । এমন দৃশ্য সে এ জীবনে আর দেখেনি । ইরিনার রুমের দরজায় এসেই সে ভয়াবহ ধাক্কাটা খেল । ইরিনা তাকে ডেকে পাঠিয়েছিল একটি জটিল সংকেতের ব্যাখ্যায় সাহায্য করতে । আসতে তার দেরি হয়েছে এক মিনিট । এরমধ্যেই এ ঘটনা । সে দেখলো, ইরিনা আর অনৃন্য মুখোমুখি দাঁড়িয়ে । ইরিনার রক্তিম দু'গাল ধরে তার ঠোঁটে ঠোঁট চেপে আছে অনৃন্য । ঠিক কি করা উচিৎ ভেবে পাচ্ছেনা সুবোধ ! সাহিত্যের ভাষায় ঠিক এই অবস্থাটাকেই বোধকরি বলা হয়--কিংকর্তব্যবিমূঢ় !
পহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে মুঠো ভর্তি জোছনা ধরতে ধরতে হঠাৎই ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন অনৃন্য । ছেলেমানুষী একটা কান্ড তার মাথায় আসে । এই কান্ডটা তিনি করবেনই , নিশ্চিত হন । ইরিনার ঘরে ছুটে আসেন । ইরিনার দু'বাহু ধরে তাকে টেনে তোলেন । তারপরই বিনা বাক্যে তার ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে দেন । ঠেঁটে ঠোঁট চেপে ধরে রাখেন ! মুহূর্তগুলো গড়গড় গড়িয়ে যায় । ঠিক এ মুহূর্তে ইরিনার প্রতিক্রিয়া বুঝা ভার ! সে যেন এক কলের পুতুল !
তিন
খুক করে কেশে ওঠে সুবোধ । গলা দিয়ে শব্দ বেরুয় না তার । যেটুক বেরুয় নিজের কানেই পৌঁছায় না । আবারো গলা দিয়ে খুক শব্দ বের করে দেয় ! অনৃন্যের হাত আলগা হয়ে যায় । ঘাঁর ঘুরিয়ে তাকান তিনি । তাকে কিঞ্চিত উত্তেজিত দেখা যায় । অপ্রস্তুত হয়েছেন, এমন বোধ হয় না । চেহারা হাস্যোজ্জল । সুবোধকে দেখে বরং তিনি হইহই করে উঠেন ,--'মাই ডিয়ার ! ভিন গ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে চূড়ান্ত যোগাযোগ স্থাপনের মাত্র মুহূর্তকয় আগে অবস্থান করছি আমরা । আমাদের টেলিস্কোফে ধরা পড়া সিগনালগুলোর গাণীতিক সমীকরণ মেলানো সম্ভবপর হয়েছে !"
'অভিনন্দন মহোদয় !'
'ধন্যবাদ ।'
অনৃন্য আবার ইরিনার দিকে ফিরে তাকান । ভদ্রতার চূড়ান্ত করেন তিনি । খানিকটা সামনে ঝুঁকে পড়ে করজোরে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন ,-'আমি দুঃখিত , মহামতি ইরিনা ! আনন্দে বাঁধ ভাঙ্গা হয়েছিলাম আমি !' ইরিনার নামের আগে সম্মানসূচক শব্দ 'মহামতি' ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা জারি হয়েছে আজ থেকে । আজ দুপুরে সবার কাছে মেসেজ পৌঁছে গেছে । বিজ্ঞানীদের সদর দপ্তর থেকে প্রধান বিজ্ঞানী ক্রিশু এ আদেশ জারি করেছেন । অনৃন্য অপেক্ষায় থাকে ইরিনার জবাবের আশায়। চুপচাপ ইরিনা । দৃষ্টি অবনত । সবসময়ের মতনই শীতল । তাকে দেখে , তার ক্রোধ, ক্ষোভ, ভালবাসা, উচ্ছাস কিম্বা ঘৃণা বুঝার উপায় নেই । তিনি হাসেন । শ্লেষ জড়ানো কন্ঠে বলেন,- ''তারপর ?' 'অনৃন্য অসহায়বোধ করেন । তাকে বিভ্রান্ত দেখা যায় । ইরিনার এই 'তারপর' এর অর্থ তিনি ধরতে পারেন না ! তার চোখে জিজ্ঞাসা । হঠাৎ করেই ইরিনাকে তার অচেনা এক রহস্য মানবী বলে ভ্রম হয় । ইরিনা কথা বলে উঠেন,--'তারপর? তারপর আমিই বলি । আপনি ড. অনৃন্য মানবজাতির জন্য অনন্যসাধারণ একটি মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন । মহাজাগতিক প্রাণীদের প্রতিটি সিগনালকে একেকটি গাণিতিক মানদন্ডে দাঁড় করিয়েছেন । তারপর আপনার নিজস্ব গাণিতিক সমীকরণে সেগুলোকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে ক্রমশ এগিয়ে গেছেন চূড়ান্ত সমাধানে । শেষ পর্যন্ত সবক'টি সিগনালেরই যে একক গাণিতিক সংখ্যাটি আপনি পেলেন, তা হলো,--দুই !' বিস্মায়িভিভূত অনৃন্যের মুখে কথা সরেনা । এই তথ্য এখন পর্যন্ত কারো জানার কথা না । কিন্তু ইরিনা জানে ! কি করে জানে ! তার ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে অন্য কারো প্রবেশাধিকার নেই । প্রবেশ সহজও নয় । শক্ত বাঁধা । চায়লেই কেউ সেই বাঁধা ডিঙ্গোতে পারবেনা । তাহলে কি করে সম্ভব ? বিড়বিড় করেন অনৃন্য,- 'আপনি কি করে জানেন ?'
'আপনি খুব অবাক হচ্ছেন অনৃন্য । এই সংবাদ পৃথিবীর সবগুলো মিডিয়াতে চাওর হয়ে গেছে ইতোমধ্যে । পৃথিবীর মানুষেরা এখন উৎসব করছে মানবজাতির এই মহান সাফল্যে ! তারা এখন নানাভাবে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছে । কিন্তু সাময়িক ভাবে আপনাকে সবরকম নেটওয়ার্ক এর বাইরে রাখা হয়েছে ।'
কিন্তু কিভাবে সম্ভব ? কি করে জানলো তারা ?'
'আমিই তাদের জানিয়েছি !'
'আপনি ?'
'আমি খুব-ই দুঃখিত অনৃন্য ! আপনার ওপর আমাকে নজরদারী করতে হচ্ছিল । প্রথম থেকেই আমি এ-দায়িত্বে ছিলাম । সদর দপ্তর থেকে ড. ক্রিশু (বিজ্ঞানীদের প্রধান) আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন । তাছাড়া...!'
'তাছাড়া কি ?'
'তাছাড়া আপনার নেটওয়ার্কের ভেতর ঢুকে সমীকরণ মেলানোতো আমি আপনাকে সাহায্য করেছি । আপনার অজান্তে । আপনাকে বুঝতে দেয়া হয়নি ।'
হঠাৎ করেই একরাশ বিষাদে ছেয়ে যায় অনৃন্যের মুখ । এরা তার সাথে একধরণের খেলা খেলছে, গোপন খেলা । এরা তাকে বিশ্বাস করে না ! এতো বড় প্রতারণা !' ইরিনা তার মনের ভাব বুঝতে পারন । আলতো করে মমতার একখানা হাত রাখেন তার কাঁধে ।
'অনৃন্য; আমাদের সবার মঙ্গলের জন্যই এটা করতে হয়েছে । আমাদের নিরপত্তার জন্য । একটি অশুভ চক্র বলয়ে আমরা আবদ্ধ হয়ে আছি । যে কারণেই হোক , অশুভ এ- চক্রটি চায় না আমাদের লক্ষ্যে আমরা সফল হই । সমস্যা হলো এ চক্রটি অদৃশ্য । আমাদের কাছে এরা অচেনা । এর আগেও এলিয়েনদের সঙ্গে যোগাযোগের একদম প্রান্ত সীমা থেকে আমরা বিফল হয়ে ফিরেছি, আপনি জানেন । অশুভ চক্র বলয় থেকে নিজেদের বাচানোর জন্যই আমাদের এ নিরপত্তা ব্যবস্থা !'
অনৃন্য একটু আশ্বস্থ হবার চেষ্টা করেন । সহজ হয়ে ওঠেন কিছুটা । মুহূর্তকয় ঘরময় নীরবতা ঘুরে বেড়ায় । বিরতি দিয়ে ফের বলতে শুরু করেন ইরিনা, - অনৃন্য, আপনার জন্য দারুণ সুখবর এবার ! একক গাণিতিক সংখ্যা- ২ এর যে ব্যাখ্যা আপনি দাড় করিয়েছেন, এক,- মানবজাতির বসবাস আমাদের এই পৃথিবী
দুই,-ভিনগ্রহবাসীদের বাস গ্লীস ৫৮১সি গ্রহটি
= একক গাণিতিক সংখ্যা-- ২ !
বিজ্ঞান পরিষদের সব বিজ্ঞানী একমত হয়ে আপনার এই ব্যাখা অনুমোদন করেছেন । এই সমাধানে দাড়িয়ে আমরা এখন গ্লীস ৫৮১সি গ্রহের এলিয়েনদের রেডিও সিগনাল দিতে পারছি । পরপর দুটো সিগনাল । বিরতি দিয়ে আবার দুটো সিগনাল । একাধারে বিস্ময়কর এবং ভীষণ আনন্দদায়ক সংবাদটি এখন আমি আপনাকে দেবো । আমাদের রেডিও টেলিস্কোফ ধরে ফেলেচে এলিয়েনদের আরো কিছু ফিরতি সিগনাল । আপনার উদ্ভাবিত সমীকরণ মতে এই সিগনালগুলো সমাধান করে যে একক গাণিতিক সংখ্যাটি পাওয়া যায় , তা হলো --১ ! আপনি কি একক সংখ্যা ১-এর কোন ব্যাখ্যা দাড় করাতে পারেন ? '
ইরিনার দিকে তাকান অনৃন্য । আনন্দে উদ্ভাসিত দৃষ্টি তার । হড়বড় করে তিনি বলে যান-- ১, আমাদের পৃথিবী । ২.ভীনগ্রহ গ্লীস ৫৮১সি । গ্রহ দুটো যদি কখনও এক হয়ে যায়, তাহলে আমরা পাই একক গাণিতিক সংখ্যা -১ ! '
'আপনার সাফল্যে অভিনন্দন ড. অনৃন্য ! ড. ক্রিশু ইতোমধ্যে আমাকে জানিয়েছেন, বিজ্ঞান সদর দপ্তরে আগামীকাল আপনাকে সম্বর্ধনা দেয়া হবে । আপনার সাফল্য অটুট হোক !'
গল্পের এ-পর্যায়ে এসে যদি আমরা কল্পণা করে নিতে পারি, এলিয়নরা তাদের উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে পৃথিবী নামের গ্রহটিকে তাদের গ্রহ গ্লীস ৫৮১সির সঙ্গে সংযুক্ত করে নিয়েছে । এলিয়েন এবং মানুষ সেখানে যাপন করে এমন একটি জীবন যেখানে কোন দুখ নেই, দ্বন্ধ নেই ,জরা কিম্বা মৃত্যু নেই । আছে শুধু আনন্দ ভরা জীবনের গান , তাহলে খুবই ভালো হয় । কিন্তু একটা সমস্যা ইতেমধ্যে আবিস্কার করেছেন অনৃন্য । ইরিনার প্রতি ব্যক্তিগত উতসাহ থেকে বিজ্ঞান পরিষদের সমস্ত বিজ্ঞানীদের পারিবারিক ডাটা খুজেও ইরিনার পরিবারের কোন সন্ধান মেলাতে পারেন নি অনৃন্য । এতেদিন কেবল শুনে এসেছেন ইরিনার পিতা-মাতা তার শৈশবেই দেহত্যাগ করেছেন । ইরিনা বেড়ে ওঠেছেন বিজ্ঞান পরিষদের প্রধান বিজ্ঞানী ড.ক্রিশুর ঘরে । ড.ক্রিশু তার নিকটাত্মীয় । কিন্তু ডাটা খুজে তার পিতা-মাতার নাম কিম্বা কোন বংশ পদবী অনৃন্য মেলাতে পারেন নি !
তারও বেশ কিছুদিনপর বছরের শেষ দিনে গ্লীস ৫৮১সি গ্রহের এলিয়েনদের একটি মেসেজ পৃথিবীর রেডিও বার্তায় পৌছায় । সুবোধ সেটি নিজের মেমোরিতে আপলোড করে অনুবাদ করে জানায়, নতুন বছরের প্রথম প্রহরে এলিয়েনদের একটি দল স্পেইস শিপ নিয়ে অবতরণ করবে । মানব জাতির দু'জন প্রতিনিধিকে তাদের গ্রহে নিয়ে যেতে চায় । এলিয়নদের উন্নত প্রযুক্তির সবরকম তথ্য আর শিক্ষা এই দু'জন প্রতিনিধিকে দিয়ে যথারীতি ফিরিয়ে দেয়া হবে । বিজ্ঞানীদের জরুরী বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, মানবজাতির পক্ষ থেকে এ-দুজন প্রতিনিধি হবেন, যাদের সাফল্যে আজ এতোদূর সে মহান দু'জন বিজ্ঞানী ড.অনৃন্য এবং ইরিনা ।
যথারীতি নতুন বছরের প্রথম প্রহরে বিজ্ঞান ভবনের অদুরে খোলা সমতলে অবতরণ করে স্পেইস শিপ । বিজ্ঞান পরিষদের সব বিজ্ঞানী তাদের গর্ব ড. অনৃন্য এবং ইরিনাকে এগিয়ে দিতে যান, আরেক সাফল্যের পথে । ড. অনৃন্য প্রথমে স্পেইস শিপে পা রাখেন । তারপরই ইরিনা । ইরিনা পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে স্পেইস শিপের পারদের মত টলটলে পর্দা ঝুলে পড়ে তার সামনে । ভেতরে প্রবেশে তিনি ব্যর্থ হন । দ্রুত স্পেইস শিপটি পাহাড় কাপিয়ে উড়াল দেয় । যাবার আগে এলিয়েনরা দুর্বোধ্য ভাষার একটি মেসেজ রেখে যায়। সুবোধ সেটির অনুবাদ করে শোনায়--"গ্লীস ৫৮১ সি গ্রহে রোবট প্রবেশের অনুমোদন নেই । অনুমোদন নেই ক্লোন মানুষের । ইরিনা একজন ক্লোন মানবী । যার জন্ম ল্যাবরেটরীতে "
পৃথিবী জুড়ে একটা হাহাকার পড়ে যায় । এ-হাহাকার অনৃন্যের জন্য । পৃথিবীর মানুষের মহান সম্পদ ড. অনৃন্যকে কি এলিয়েনরা ফিরিয়ে দিয়ে যাবে ? সময়-ই হয়তো বলে দিবে সে উত্তর ।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


