somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নক্ষত্রের গোধূলি-৯

০৭ ই জুলাই, ২০১০ দুপুর ১২:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যে মনিকে সে অকৃত্রিম ভাবে ভালোবাসে, মনিও তাকে ভালবাসে। মনিকে ছাড়া রাশেদ সাহেব কিছুই ভাবতে পারে না। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সম্স্ত পৃথিবীকে চিৎকার করে বলে দেয় আমি মনিকে খুব বেশি ভালোবাসি, মনিই আমার জীবন, মনি শুধুই আমার, ওই আমার বেচে থাকা, ওই আমার সব, আমার জীয়ন কাঠি মরন কাঠি সবই মনি। কখনো আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে নিমন্ত্রণে গেলে ওদের জন্য ভিন্ন বিছানা দেয়া যাবে না তা সবাই জেনে গেছে।

বিয়ের পর মনির বড় বোনের ছেলের মুসলমানির অনুষ্ঠান গ্রামের বাড়িতে করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ওদের যখন নিমন্ত্রণ করতে এলো তখন রাশেদ সাহেব কোন লাজ লজ্জার বালাই না রেখে বলেই ফেললো যে, ওখানে যেতে বলছ বেশ যাব কিন্তু এতো মানুষ দাওয়াত দিয়েছ তারা সবাই এলে আমাদের থাকতে দিবে কোথায়?আমি কিন্তু মনিকে ছাড়া থাকতে পারবো না। এ কথা শুনে ওর বোন বলেছিল আমি সে ব্যবস্থা করে রেখেছি, তোমরা সে চিন্তা কোরনা। তোমরা ওই দক্ষিন ঘরে থাকবে, হয়েছে?হ্যা এবার যেতে আপত্তি নেই। সেই ছাব্বিশ বছর আগে বিয়ের দিনেই রাশেদ সাহেব তার মনির কাছে সব বুঝিয়ে দিয়ে বলেছিলেন আজ থেকে আমি বলে আর কিছু নেই যা আছে সবই তোমার, তুমি তোমার মত করে গড়ে নিও।
দাউদকান্দি ব্রিজের কাছে এসে একটা ঝাঁকুনি খেয়ে ফিল্মের ফিতা ছিড়ে গিয়ে রাশেদ সাহেবের সিনেমা দেখা থেমে গেল। রাশেদ সাহেব চমকে উঠলেন। সুপারভাইজারকে জিজ্ঞেস করলেন
কি ব্যাপার ভাই কি হয়েছে?
না কিছু হয়নি সামনে বিরাট কিউ তাই থেমেছে।
মিনিট পনের পর আবার গাড়ি চলতে শুরু করলেই সিনেমার ফিতা আবার জোড়া লেগে যায়।
একটা পরিবার, একটা সংসার, একটা বংশের উন্নতি ঘটানো কারো একার পক্ষে বা এক পুরুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ওরা চার ভাইয়ের মধ্যে রাশেদ সাহেব বাদে সবাই উচ্চ শিক্ষিত। রাশেদ সাহেব পড়াশুনার সুযোগ পেলেন কোথায়?তবুও তার সাথে কথা বলে, তার আচার আচরণ, পোষাক পরিচ্ছদ, চলাফেরা, মানুষের সাথে মেলামেশা দেখে বোঝার উপায় নেই। চমৎকার এক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ব্যাক্তি। তাদের বাড়ির একটা সুনাম আছে, পড়া লেখা বাড়ি।

নিজেদের বাড়ির একটা নাম ঠিক করে রেখেছেন কিন্তু বাড়িটা উপরে উঠার আগে এই নাম বেমানান তাই আর পয়সা খরচ করে নাম লেখা হয়নি। তিনি ভেবেছিলেন তার ব্যবসার উন্নতি হলে আস্তে আস্তে দোতলা, তিন তলা, চারতলা, পাচ তলা করে আকাশের একটু কাছে গিয়ে চার ভাই আর এক বোন মিলে এক বাড়িতেই সুখে দুঃখে মিলে মিশে থাকবে, যাতে করে সবাই সবাইকে কাছে পায় এরকম একটা ইচ্ছে ছিল। সে ইচ্ছে ইচ্ছে পর্যন্তই রয়ে গেল, এ আর কোন দিন হবে বলে মনে হয় না। আরো কত আশা ছিল। মনিরা এবং তার নিজের বাগান করার বেশ ঝোঁক।

চাকরীর উপলক্ষে যেখানে থেকেছে সেখানেই একটা অস্থায়ী বাগান বানিয়ে নিয়েছে। তা এই ঢাকা শহরে এতো জায়গা কোথায় পাবে যেখানে দালানের মাথা উঠে আকাশ ঢেকে ফেলেছে সেখানে বাগানের জায়গা কোথায় তাই ছাদের উপরে টব সাজিয়ে বাগান করবে। দুজনে মিলে এক সাথে পানি দিবে, গাছের যত্ন করবে, টব পরিষ্কার করে নতুন মাটি সার মিশিয়ে আবার নতুন গাছ লাগাবে।

মনিরা এর মধ্যেই ছাদের উপরে একটা ছোট বাগান করেছে যেখানে প্রতিদিন তার নিজের সন্তানদের মত করে ফুল গাছের যত্ন করে। যতক্ষণ বাগানে কজ করা যায় ততক্ষণ মনে কেমন সুন্দর একটা প্রফুল্ল ভাব থাকে, একটা স্বর্গীয় সুবাতাস এসে মনে জমা কালিমা গুলি ঝড়ের মত উড়িয়ে নিয়ে যায়, গাছ গুলি যেন কথা বলে আর ফুল গুলিত হাসতেই থাকে। আজে বাজে দুঃশ্চিন্তা গুলি মনে ঢুকার দরজা খুঁজে পায় না। তার আরো স্বপ্ন ছিল বাড়িটাকে লতায় পাতায় ঘেরা কুঞ্জবন বানাবে। যেখানে থাকবে নানা রঙের বাহার আর মৌ মৌ করা ফুলের গন্ধ। সেবার লন্ডন থেকে দেখে এসেছে কারুকাজ করা অক্ষরে বাড়ির নম্বর লেখা রয়েছে প্রায় বাড়িতে, তেমন করে নক্সা আঁকা বোর্ডের উপর কারুকাজ করা নম্বর প্লেট লাগাবে বাড়ির গেটে।

বিকেলে বা বৃষ্টির সময় সবাই মিলে বারান্দায় বসে চা পিঁয়াজু খেতে খেতে বৃষ্টি দেখবে, নয়তো জোসনা দেখবে, গল্প করবে। এর মধ্যেই সাভার হর্টাস নার্সারি থেকে ওয়াল কার্পেটের চাড়া এনে বাড়ির সীমানা দেয়ালে লাগিয়েছে, একটা মহুয়া গাছ লাগিয়েছে বাড়ির পিছনে দক্ষিন পশ্চিম কোনায়, সামনের উত্তর পূর্ব কোনায় লাগিয়েছে একটা স্বর্ন চাপা গাছ। বাড়ির নির্মান কাজ শেষ হলে সিঁড়ির এক পাশে একটা মাধবী লতা আর অন্য পাশে হলুদ আলমন্ডা গাছ লাগিয়ে একেবারে ছাঁদ পর্যন্ত উঠিয়ে দিতে চেয়েছিল।
আর সামনের দিকে পূর্ব দক্ষিন কোনায় যে বারান্দায় সবাই মিলে বসবে বলে ভেবে রেখেছে সেই বারান্দার নিচে গ্যারেজের পাশে একটা চামেলি গাছ থাকবে এটাও ছাঁদ পর্যন্ত উঠিয়ে নিতে চেয়েছিল যাতে সবাই বসলে সারা বছরেই চামেলি বা মাধবী লতার পাগল করা গন্ধে মনে কোন কলুষতা আসতে না পারে। নানা ফুলের গন্ধে পুরো বাড়িটা হয়ে উঠবে একটা স্বপ্ন পুরী বা মায়া কুঞ্জ কিংবা কুঞ্জবন।

নাম যেটা ঠিক করে রেখেছে তা হচ্ছে ‘পান্থ নীড়’ বাড়িটা তো কয়েক পুরুষ ধরে টিকে থাকবে কিন্তু এ বাড়িতে যারা বাস করবে তারাতো আর বাড়ির মত ইট বা লোহার তৈরী নয় যে বাড়ির সমান বয়স পাবে। বাড়ির বাসিন্দারা পুরুষানুক্রমে যখন এক এক করে আসবে তখন আনন্দের মেলা বসবে আবার যখন প্রকৃতির ডাকে চলে যাবে তখন তেমনি তার উলটো কান্না কাটির ঝড় বয়ে যাবে। এই যে আসা যাওয়া এই নিয়েই তো সংসার, সবাইত সংসারের পথিক। ক্ষণকালের জন্য আসবে আবার চলেও যাবে।
যারা এই বাড়িতে থাকবে তারা না জানি কে কি পেশা নিয়ে থাকবে। হয়ত কেউ শিক্ষক হবে, কেউ ডাক্তার হবে, কেউবা উকিল ব্যারিস্টার বা কেউ হয়ত নিতান্ত সাধারন জীবন জাপনই করবে। এরাই হয়ত পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে আবার কোন বিশেষ দিনে প্রিয় জনের সাথে মিলিত হবার আগ্রহে আধীর প্রতীক্ষা নিয়ে অপেক্ষা করবে। ও আসছে কে কি পছন্দ করে আহা বিদেশে থাকে কি খায় না খায় তার কি কোন ঠিক আছে?কি কি বাজার করতে হবে, কে কে এয়ার পোর্টে যাবে এই আয়োজনে ব্যস্ত থাকবে। যারা আসবে তারাও কার জন্য কি নিয়ে যাবে তাই নিয়ে মাস ধরে কেনা কাটার ধুম চলবে। সবাই এসে একত্র হবে।

বিশাল হৈ চৈ আনন্দ উত্সবে মেতে উঠবে ক্ষণিকের জন্য, আবার সবাই সুখের একটা স্মৃতি নিয়ে আবার তারা তারি ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মন ভার করে যার যার কর্মস্থলে ফিরে যাবে। যারা থাকবে তাদের কাছে কিছু দিন বাড়িটা ফাকা মনে হবে। এক সময় আবার তা সয়ে যাবে। সবাই তো পথিক, এটাতো পথিকের ঘর, ক্ষণিকের জন্য আসা আর যাওয়া তাই এর নাম ‘পান্থ নীড়’। রাশেদ সাহেবের এই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। এখনো যে তা বাস্তবায়নের কোন আভাস সে খুঁজে পায়নি, আজ চট্টগ্রাম থেকেও তেমন কোন আশার বাণী শুনে আসতে পারেনি। (চলবে)
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×