মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, মাদারীপুরের মোঃ আবুল হোসেনের বয়স ছিল ৪ বছর ৪ মাস ১৫ দিন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঝালকাঠির অসীম কল্লোলের বয়স ছিল ৫ বছর ৭ মাস ১৩ দিন। স্বপন কুমার দে’র বয়স ছিল ৪ বছর ১১ মাস ৮ দিন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে তারা ৩৮ বছর পর প্রথম শ্রেণীর সাব-রেজিসল্ট্রার পদে যোগ দিয়েছেন। শুধু এই তিনজনই নন, মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে বৃহস্পতিবার ১২৬ জনের পদায়ন হয়েছে সাব-রেজিসল্ট্রার পদে। এরকম আরও ২৮ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সাব-রেজিসল্ট্রার পদে যোগদানের পর পদায়নের সময় ভালো জায়গায় পোসিল্টং পেতে কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে আইন মন্ত্রণালয়ে। মুজিবনগর সরকারের কর্মচারীর তালিকায় এখনও নতুন নাম অন্তর্ভুক্তি চলছে বলে জানা গেছে।
শিশু বয়সে এসব লোক মুজিবনগর সরকারের কোন পদে চাকরি করেছেন, জানতে চাইলে রেজিসেল্ট্রশন পরিদফতরের এক কর্মকর্তা জানান, তালিকা অনুযায়ী তাদের প্রায় সবাই ইনফরমার হিসেবে চাকরি করেছেন। মাত্র সাড়ে ৪ বছর বয়সে তারা কি ধরনের ইনফরমার ছিলেন, এর উত্তর নেই কারও কাছে।
এদিকে মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী দাবিদার ১২৬ জন যোগদানের পর রেজিসেল্ট্রশন পরিদফতরে এখন তাদের প্রাধান্য বিরাজ করছে। এই পরিদফতরে সাব রেজিসল্ট্রার পদে ২০০৩ সালে আরও ৫৩ জন মুজিবনগর কর্মচারী হিসেবে যোগদান করেছেন। বাকি একশ’ শূন্য পদেও মুজিবনগর কর্মচারীদের প্রাধান্য থাকবে—এ রকম আভাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। এই পরিদফতরের মহাপরিচালক মুন্সী নজরুল ইসলাম নিজেও মুজিবনগর কর্মচারী হিসেবে আশির দশকে সাব-রেজিসল্ট্রার পদে যোগ দিয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে সাব-রেজিসল্ট্রার পদে যারা যোগদান করেছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাছ-তরকারি, কেউ কেউ পান-বিড়ির ব্যবসা করতেন। কোনো রকমের পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া ছাড়াই প্রথম শ্রেণীর পদমর্যাদার সাব-রেজিসল্ট্রার পদে যোগ দিলেন তারা।
সাব-রেজিসল্ট্রার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অতীতের নিয়ম-কানুন ভঙ্গ করে তাদের এই পদে পদায়ন করা হয়েছে বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। নতুন সাব-রেজিসল্ট্রার হিসেবে পদায়নের আগে কমপক্ষে ৪০ কার্যদিবস প্রশিক্ষণের রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে ১২৬ জনকে মাত্র ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ কোর্সের পরই পদায়ন করা হয়।
যোগদানকারী ১২৬ জনের মধ্যে বৃহত্তর রংপুরের ৩৮ জন। এদের ২১ জনই কুড়িগ্রাম জেলার। মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী পদে তালিকাভুক্তির জন্য সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে যে চক্রটি জড়িত তাদের মধ্যে একজন কুড়িগ্রামের হওয়ায় ওই জেলার লোক বেশি বলে জানা গেছে। মুক্তিযুদ্ধের ৩৮ বছর পরও মুজিবনগর সরকারের কর্মচারীর তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি নিয়ে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য চলছে।
এতে রেজিসেল্ট্রশন বিভাগের কাজের গতি এবং দক্ষতা হ্রাস পাওয়ার আঙ্ককা করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। এই বিভাগে আশির দশকে যারা মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন, তারাই বেশি অদক্ষ, অযোগ্য এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে মন্তব্য করেন এক কর্মকর্তা। নিয়োগবিধি অনুযায়ী সাব-রেজিসল্ট্রার পদে যোগদান করতে হলে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যারা সাব-রেজিসল্ট্রার হিসেবে যোগ দেন তারা কর্মক্ষেত্রেও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যারা মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে যোগ দিয়েছেন সবাই হাইকোর্ট থেকে নির্দেশনা নিয়ে এসেছেন। হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রটি আরও জানায়, মুজিবনগর সরকারের কর্মচারীর কোনো সঠিক তালিকা সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে নেই। হাইকোর্ট বিভাগে মামলা করার আগে তারা যে তালিকা জমা দিয়েছে, সেই তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হচ্ছে। মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে দাবি করে রিট আবেদনকারীরা একাধিক তালিকা জমা দিয়েছেন। এই তালিকার একটির সঙ্গে আরেকটির মিল নেই।
যোগদানকারীদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাদের মধ্যে অনেকেই অবিশ্বাস্য রকমের দ্রুততার সঙ্গে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছেন। কিশোরগঞ্জের এএসএম শামসুজ্জামান ১৯৬০ সালের ৩১ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছেন মাত্র ২০ বছরে, ১৯৮০ সালে। এরকম অনেকেই রয়েছেন, যারা মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


