মানবাধিকার সংগঠন অধিকার গত এক বছরের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে নির্বাচন ও রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্বাচিত সরকার, সংসদ নির্বাচনোত্তর সহিংসতা, পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের আবাসিক হল দখল, উপজেলা নির্বাচন সহিংসতা, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, নিপীড়ন, হেফাজতে নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও দায়মুক্তি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়েছে।
অধিকারের ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়- ১লা জানুয়ারি থেকে ৩১শে ডিসেম্বর ২০০৯ পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায়২৫১ জন ব্যক্তি নিহত ও ১৫৫৫৯ জন আহত হন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৮ জন নিহত, ৬০৯২ জন অহত এবং বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ২ জন নিহত, ৮৬৫ জন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি এই এক বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছে ১৫৪ জন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে নিহত ১৫৪ জনের মধ্যে র্যাবের হাতে ৪১ জন, পুলিশের হাতে ৭৫ জন, যৌথভাবে র্যাব-পুলিশের হাতে ২৫ জন, সেনাবাহিনীর হাতে ৩ জন এবং আনসারের হাতে ২ জন, জেল পুলিশের হাতে ১ জন, বনরক্ষীদের হাতে ১ জন, বিডিআর’র হেফাজতে ৫ জন এবং কোস্টগার্ডের হাতে ১ নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উল্লিখিত ১৫৪ জনের মধ্যে ৩৫ জন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে থাকাকালে মারা গেছেন। তাছাড়া বিডিআর বিদ্রোহের পর থেকে ৩১ শে ডিসেম্বর ২০০৯ পর্যন্ত মোট ৫১ জন বিডিআর সদস্য মারা গেছেন। এর মধ্যে হেফাজতে মারা গেছেন ২৬ জন। উক্ত ২৬ জনের মধ্যে ৬ জন নির্যাতনে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অধিকারের তথ্যানুযায়ী ২৯শে ডিসেম্বরের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১লা জানুয়ারি থেকে ১৫ই জানুয়ারি ২০০৯ পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় ১৭ জন নিহত এবং ৫ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের কর্মী-সমর্থকরা জড়িত ছিলেন।
পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচনী সহিংসতা রোধে তেমন কার্যকরী ভূমিকা রাখেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে পুলিশ অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সক্রিয় বা ভিকটিম হিসেবে খুব একটা দেখা যায়নি। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের হামলা-পাল্টা হামলাসহ বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনা রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা রাখা উচিত ছিল। পুলিশ মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ এর ভাষ্য অনুযায়ী সারাদেশে মাত্র ১৩টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। অথচ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী শ’ শ’ নির্বাচনোত্তর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা
সারা বছর ধরেই রাজনৈতিক সহিংসতা অব্যাহত ছিল। গত ২৯ শে মার্চ ২০০৯ বরিশাল জেলার বানারীপাড়ায় পূর্ব বিরোধের জের ধরে পৌর সেচ্ছাসেবক লীগের প্রচার সম্পাদক মো. বাবুলের সঙ্গে উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক রাহাত আহমেদ ননির কথা কাটাকাটি এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ খবর পেয়ে ননির মেজ ভাই উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মাওলাদ হোসেন সানা ঘটনাস্থলে আসেন। সানা এবং ননি দুই ভাই বাবুলকে রাস্তায় ফেলে তার শরীরে অস্ত্র ঠেকিয়ে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি করে বলে বাবুলের পরিবার অভিযোগ করেছে। এ ঘটনার পর উভয় গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হলে ১১ জন অহত হয়। ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ড উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে বিএনপি নেতা সিরাজুল ইসলাম মাস্টার এবং আওয়ামী লীগ নেতা মতিয়ার রহমানের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গোলযোগ চলে আসছিল। গত ২৪ শে সেপ্টেম্বর ২০০৯ আওয়ামী লীগের লোকজন বিএনপিকর্মী আবদুল বারীকে মারধর করলে উভয়ের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পরে এবং পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষে উভয় দলের ২০ জন অহত হয়।
হেফাজতে থাকাকালে বিডিআর সদস্যদের ওপর নির্যাতন
ঢাকা মেডিকেল কলেজে যে সমস্ত বিডিআর জওয়ানদের চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছে তাঁদের মধ্যে অনেকেই নির্যাতনের শিকার হন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাঁদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে বলে আদালতে অভিযোগ করেছেন বিডিআর জওয়ান জফুর আলী, নায়েক শেখ মনিরুল ইসলাম, জওয়ান মাসুদ, সোহরাব ও ইউসুফ আলী। গত ১৭ই এপ্রিল বিডিআর’র উপসহকারী পরিচালক নাসিরউদ্দিন এবং বিডিআর জওয়ান নাসিরকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। তাঁদের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়। এছাড়া হার্বনুর রশিদ মিয়া নামে একজন বিডিআর সিপাহি ২২শে এপ্রিল আদালতে বিচারকের সামনে বলেন, র্যাব তাঁকে ১৫ই এপ্রিল থেকে তাদের হেফাজতে রেখে ইলেকট্রিক শক্সহ বিভিন্ন পন্থায় নির্যাতন চালায়। তিনি আদালতের কাছে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানান। যদিও বিচারক সুপ্রিম কোর্টের ২০০৩ সালের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে তাঁর রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির মিছিলে পুলিশের হামলা
৮০ শতাংশ রপ্তানির সুযোগ রেখে গত ২৪শে আগস্ট ২০০৯ সমুদ্র বক্ষের তিনটি তেল-গ্যাস ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের জন্য সরকার বহুজাতিক কোম্পানি কনোকো ফিলিপস্ ও তাল্লো অয়েল-এর সঙ্গে উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নেয়। এর প্রতিবাদে এবং দেশের স্বার্থবিরোধী এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর না করার দাবিতে গত ২রা সেপ্টেম্বর ২০০৯ তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির পেট্রোবাংলা কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচির মিছিলে পুলিশ বাধা প্রদান করে ও বিনা উস্কানিতে হামলা চালায়। পুলিশের বেধড়ক লাঠিপেটায় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকসহ ৭০ জন আহত হন এবং এদের মধ্যে ৩০-৩৫জন গুরুতর জখম হন। মিছিলে অংশগ্রহণকারী নারী কর্মীরাও ব্যাপকভাবে পুলিশি হামলার শিকার হন।
সীমান্তে সহিংসতা
১লা জানুয়ারি থেকে ৩১শে ডিসেম্বর ২০০৯ পর্যন্ত ৯৬ জন বাংলাদেশী নাগরিককে বিএসএফ হত্যা করেছে বলে জানা গেছে। এছাড়া ৭৯ জন বাংলাদেশী আহত, ২৫ জন অপহৃত, ৯২ জন নিখোঁজ এবং ১১ জন বাংলাভাষী ভারতীয় নাগরিককে বিএসএফ বাংলাদেশে পুশইন করেছে বলে জানা গেছে।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


