এখন বিশ্বে ঋণের চাহিদা নেই। সবাই অলস অর্থ নিয়ে বসে আছে। বাংলাদেশও তার ঋণ বিক্রি করতে পারছে না। এখানকার ব্যাংকগুলোতে অলস অর্থের পাহাড় জমেছে। তবুও বাংলাদেশের অবস্থা কিছুটা ভালো এজন্যই যে, আমাদের অর্থনীতিকে বিশ্বমন্দা অতটা আক্রমণ করতে পারেনি। সেই না পারাও ঘটেছে আমাদের অর্থনীতি উন্নতির অনেক নিচের ধাপে আছে বলে। আর যে কারণে আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আজও ভালো লাভ করে চলেছে সেটা হল শেয়ারবাজারে টাকা খাটিয়ে। অন্য অর্থে এই বাজারের লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর কাছে ঋণ বিক্রি করে এবং তাদের থেকে বেচা-কেনার বিপরীতে কমিশন আদায় করে। অন্যত্র বাংলাদেশের বিনিয়োগের অবস্থা মোটেই ভালো নয়।
প্রতিবেশী ভারত তার অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রার একটা অংশ ব্যয় করে আইএমএফ থেকে স্বর্ণ কিনেছে। সে তার দেশের উদ্যোক্তা শ্রেণীকে অতি উদারভাবে বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করে চলেছে। এরও অর্থ দাঁড়ায় ভারত তার উদ্বৃত্ত অর্থকে তাদেরই শিল্প উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বিদেশী সম্পদ সংগ্রহ করার কাজে উৎসাহ দিচ্ছে। ভারত বিদেশের কাছে সরাসরি ঋণ বিক্রি করতেও তৎপর। এই ঋণ তারা আমেরিকান ও ইউরোপীয়দের কাছে বিক্রি করতে যতটা না সক্ষম হচ্ছে তার থেকে বেশি সফল হচ্ছে নেপাল-ভুটান-বাংলাদেশের মতো সার্ক প্রতিবেশীদের কাছে, যারা ভারতের কথা শুনে বা শুনতে বাধ্য হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও ভারত ঋণ বিক্রি করছে বটে, তবে সেটা তাদের ট্রেজারি বন্ড তথা সরকারি ঋণপত্র কিনে ডলারে। ডলারের উত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতেই ভারত ওদের ট্রেজারি বন্ড খরিদ করছে। কিন্তু সেটারও লাভ অনেক কেমে গেছে।
অন্যদিকে ভারত অন্যদের সঙ্গে এ নিয়েও শংকিত যে, মার্কিন ডলার ভবিষ্যতে শুধু মূল্যটা হারাবে। আর তাই যদি ঘটে তাহলে যারা আজকে ডলারে বিনিয়োগ করছে তারা আগামী বছরগুলোতে প্রকৃত বিচারে কম ডলার ফেরত পাবে। সবচেয়ে ভালো স্ট্র্যাটেজি হল ট্রেডিং পার্টনারদের ডলারে বা নিজ দেশের মুদ্রার ঋণ দেয়া, যাতে করে ঋণের ক্রেতা দেশ ওই ঋণ ব্যবহার করে তাদের থেকে আরও বেশি পণ্য কিনতে পারে। এতে ঋণ বিক্রেতা দেশের লাভ বেশি। কারণ ঋণের ক্রেতা দেশ তো শর্তানুযায়ীই ঋণ বিক্রেতা দেশের থেকে পণ্য কিনতে হবে, আর সেই ঋণ যদি রাস্তা-রেললাইন নির্মাণসহ অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয় তাহলেও ঋণ বিক্রেতা দেশের থেকেই নির্মাণের উপাদানগুলো কিনতে হবে।
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালে ওই দেশ আমাদের ১০০ কোটি ডলারের ঋণ দেয়ার প্রস্তাব করল, ওই ঋণের আসল সুবিধা পাবে কিন্তু বিক্রেতা দেশ ভারতই। একে তো আমাদের ঋণের দরকার নেই। ওই দেশের ঋণ ব্যবহার করে বাংলাদেশ যেসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন করবে বলে বলেছে সেসব কাজ আমাদের জমে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ব্যবহার করেও করা যেত। তাতে অন্তত আমাদের অলস বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের ভালো ব্যবহার হতো। ভারতীয় ঋণে কি কেনা হবে, কি করা হবে সেটাও দুই দেশের সরকার প্রধানদের যৌথ ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেই ঋণ ব্যবহার করা হবে সিএনজি বাস কেনার, রেল ও সড়কপথ উন্নয়নে। বাসও নিশ্চয়ই কেনা হবে ভারত থেকে। আর রাস্তা ও রেলপথ নির্মাণের উপাদান সামগ্রীও কেনা হবে ভারত থেকে। ভারতের দু’রকম লাভ হয়েছে ওই ঋণ বিক্রয় থেকে। তারা তো অবশ্যই ঋণের মূল্য সুদ পাবে, তাও ডলারে। সেই সুদও হবে তারা অন্যত্র যে সুদে ঋণ বিক্রি করছে তার থেকে বেশি। অন্যদিকে তারা এই ঋণের বিপরীতে তাদের দেশের জন্যই বিক্রি করছে আমাদের কাছে। তাদের কন্ট্রাক্টর আমাদের রাস্তা বানাবে। তাদের ক্রেন তাদের কৌশলীরা সেই প্রজেক্টের বড় উপাদান হয়ে কাজ করবে। বাংলাদেশ এসব প্রজেক্টের ক্ষেত্রে খুব কমই উপাদানসামগ্রী সরবরাহ করতে সক্ষম হবে।
ভারতের ঋণ বিক্রেতারা অবশ্যই আমাদের আমলা ও রাজনীতিবিদদের থেকে অনেক বেশি চালাক। তারা ঋণ বেচল, আবার পণ্যও বেচল। আর আমাদের লোকেরা ওই ঋণ কিনে আবার জাতিকে গর্ব করে বলছে। আমরা তো চেয়েছি তিস্তার পানি, সেই পানির পাওনাকে যৌথ নদী কমিশনের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরের পূর্ব দু’সপ্তাহে যখন ভারতীয় আমলাদের সঙ্গে বাংলাদেশ পক্ষের বনিবনা হচ্ছিল না তখনই আমরা বুঝে নিয়েছিলাম এই যাত্রায় তিস্তার পানি নিয়ে কোন কিছু হচ্ছে না। ওরা তো এখন প্রায় সবই পেয়ে গেছে। এ অবস্থায় তিস্তার পানির অংশ দেয়া অনেকটা তাদের করুণার ব্যাপার। যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকও সময়মতো হবে বলে আমাদের বিশ্বাস হয় না, হলেও সেথায় এমন একটি মতৈক্য হবে যে মতৈক্য শুধুই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যাবে। ওরা চলছে ওই ওই মৌসুমে অত অত কিউসেক পানি বাংলাদেশকে দেয়া হবে। কিন্তু দেখা যাবে বাংলাদেশ ওই প্রতিশ্র“ত পানি অবশেষে পাচ্ছে না। যেমন করে পাচ্ছে না পদ্মার পানি। এক হাজার কোটি টাকার তিস্তা ব্যারাজ এখন প্রায় অকেজো পানির অভাবে। এ নিয়ে বিস্তৃত প্রতিবেদন তুলে ধরেছিল একটা টেলিভিশন চ্যানেল প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রাক্কালে। কিন্তু ওইসব প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর ভাবনাকে একটুও বদল করতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হয় না। যদি হতো তাহলে সামগ্রিকভাবে সব ইস্যুতে কথা বলে আমাদের পানির হিস্যা এবং সমুদ্রসীমার ব্যাপারে একটা ন্যায়সঙ্গত চুক্তি করতে পারলে অন্য ইস্যুগুলোর ব্যাপারে যে ছাড় দেয়া হয়েছে তারও একটা ব্যাখ্যা মিলত।
এখন তো মনে হবে ভারত যা আশা করেনি, তার থেকে অনেক বেশি পেয়েছে। আর বাংলাদেশীরা যা অর্জনে প্রধানমন্ত্রী থেকে আশা করেছিল তার কিছুই পায়নি। সবার ধারণা ছিল ভারত-বান্ধব প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য অনেক কিছু আনবেন। কিন্তু সে আশা এখন থমকে দাঁড়িয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী আবেগ দিয়ে সবকিছু বিবেচনা করেছেন বলে মনে হয়। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ওদের কোন আবেগ নেই। ওরা নিয়েছে অনেক, দিয়েছে বা দেবে বলেছে অনেক সামান্যই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় এসে যদি বলেন ভারতকে উদার হতে সেটা বলার কোন অর্থ নেই।
আবু আহমেদ : অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক, ঢাবি

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



