somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমি যে ছবিটা দেখে আসিনি!!! (আমার মেডিকেল কলেজ জীবন-১১)

০৩ রা নভেম্বর, ২০১১ বিকাল ৩:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(অনেক দিন পর আপনাদের মাঝে ফিরে এলাম। প্রফেশনাল ব্যস্ততার জন্য প্রায় এক মাসের হাইবারনেশনে যাবার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত)

যারা মেডিকেলে পড়ছে বা পড়েছেন, তাদের প্রত্যেকের কাছেই প্রফ একটা আতংকের নাম। জলাতঙ্ক রোগের মতো প্রফাতঙ্কও একটি মরণব্যাধি। জলাতঙ্কে যেমন খুব পানির পিপাসা পাবে, কিন্তু পানি দেখলেই ভয়ে সিটিয়ে যাবে, তেমনি প্রফাতঙ্কেও প্রফ দিতেই হবে, কিন্তু প্রফ সামনে চলে আসলেই গলা শুকিয়ে যাবে। শুধু পার্থক্য একটাই, জলাতঙ্কে রোগী মারা যাবে আর প্রফাতঙ্কে পরীক্ষার্থীর ফেল করার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে।

মেডিকেল জীবনে বর্তমানে তিনবার প্রফ মানে প্রফেশনাল পরীক্ষা দেওয়া লাগে। আমাদের সময় প্রথম দুই বছর পর একবার, আবার দুই বছর পর আরেকবার এবং সর্বশেষ এক বছর পর ফাইনাল প্রফ দেওয়া লাগতো। একবার খারাপ করলে আবার চারমাস পর দেওয়া যেতো। প্রফে লিখিত, ভাইভা এবং প্রাকটিক্যাল অংশ থাকতো এবং তিনটিতেই আলাদাভবে পাশ করতে হতো।

এই প্রফ পরীক্ষা দিতে গিয়ে প্রায় প্রত্যেকের জীবনেই অনেক মজার, আনন্দের আবার কষ্টের, তিক্ততার অভিজ্ঞতা হতো। বড়ো ভাইয়াদের কাছে প্রফের অনেক কাহিনী শুনে মনের অজান্তেই আমার প্রফাতঙ্ক রোগ দেখা দিলো, মনে মনে ফেল করার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। পরীক্ষার আগে আমরা চার বন্ধু এক রুমে চলে আসলাম, আমি, ফয়েজ, মাসুদ আর মনোয়ার। আমাদের পড়ার ধরন ছিলো একটু অন্যরকম। রাতের খাবার খেয়ে আমরা চারজন পড়া শুরু করতাম। তিন-চার ঘন্টা পরে দুইজন ঘুমাতে যেতাম। বাকী দুইজন পড়তে থাকতো। তারা আবার দুই ঘন্টা পরে আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তারা ঘুমাতে যেতো। এভাবে চলতেই থাকতো সকাল না হওয়া পর্যন্ত। আর কিছুক্ষন পর পর ম্যাগী নুডুলস আর স্যুপ বানিয়ে খাওয়াতো হতোই।

আমাদের ঢাকা বোর্ডে পরীক্ষার আগে সাজেশন বের হতো, মজার ব্যাপার হচ্ছে কখনো কখনো প্রশ্নও পর্যন্ত ফাস হয়ে যেতো। সেই সাজেশন বা প্রশ্ন পাওয়ার জন্য ঢাকা বোর্ডের অধীনের প্রায় সবগুলো মেডিকেল কলেজেই বন্ধু রাখতে হয়েছিলো। এভাবেই ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের শোভার (সঙ্গত কারণেই ছদ্মনাম)সাথে পরিচয়। এখন যেমন স্কুল পড়ুয়া ছাত্রদের হাতেও মোবাইল থাকে, কিন্তু সেই সময় মোবাইল অত সহজলভ্য ছিল না, বিশেষ করে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য। আমাদের চারজনের মধ্যে অবশ্য একমাত্র আমারই মোবাইল ফোন ছিল না। তাই অন্যান্য মেডিকেলে আমার যেসব বন্ধু ছিলো, তাদেরকে আমি ফয়েজের ফোন নম্বরটাই দিয়েছিলাম। একইভাবে শোভার কাছেও ফয়েজের নম্বরটা ছিলো।

আমাদের প্রথম পরীক্ষা ছিলো এনাটমি। দিনরাত আমরা এনাটমি পড়ে যেতাম আর সাজেশন বা প্রশ্নের জন্য ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। একদিন ফোন আসলো, শোভার কাছ হতে। ফয়েজ মোবাইলটা আমাকে দিলো, আমি কথা বলে রেখে দিলাম। কিছুক্ষন পর আবার শোভার ফোন এলো, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। ফয়েজ আমাকে আর জাগালো না, সে নিজেই কথা বললো। এক দিন পর দেখি, ঘুমাতে যাবার আগে ফয়েজ শোভার সাথে ফোনে কথা বলছে, ঘুম থেকে উঠে দেখি, তখনও ফোনালাপ চলছে। একসময় শুনি, ফোনে সাজেশন নিয়ে কথা হচ্ছে না, কার কোন রঙ প্রিয়, কোন খাবার খেতে ভালো লাগে, বৃষ্টির দিনে কি করতে ইচ্ছে করে, ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষন হচ্ছে! আস্তে আস্তে হারাধনের চারটি ছেলে থেকে আমরা তিনজন হয়ে গেলাম! ফয়েজ যখন হাসি মুখে রোমান্টিক স্বরে শোভার সাথে ওর স্বপ্ন নিয়ে কথা বলতো, তখন আমাদের চোখের সামনে তন্বীর উদ্বেগভরা চেহারা ভেসে উঠতো।

এভাবেই একসময় এনাটমি পরীক্ষার আগের দিন চলে আসলো। সকাল থেকেই বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল আজকে বোধহয় প্রশ্ন আউট হবে। ফয়েজের নিরুদ্বিগ চেহারা দেখে আমাদের ব্যাচের বাকী ছেলেরা সন্দেহ করলো ফয়েজ প্রশ্ন পাবে, আর আমরা চারজন যেহেতু একসাথেই পড়ছি, তারমানে আমি, মাসুদ আর মনোয়ারও প্রশ্ন পাবো। শার্লক হোমসের চেয়েও দুঁদে গোয়েন্দা আমাদের পিছনে লাগলো। একটু পর পর আমাদের রুমে এসে দেখে যাওয়া হচ্ছে আমরা কী কী পড়ছি। আমি আমার পুরানো পদ্ধতির প্রয়োগ আবার শুরু করলাম। রুমে কেউ আসলেই এটিপিক্যাল টপিক নিয়ে আমরা চারজন আলাপ করতাম এমনভাবে যেনো সেটা পরীক্ষায় এসে গেছে!

আমাদের রুমটা ছিলো লম্বা করিডরের শেষ মাথায়, একেবারে বাথরুমের পাশে। যে কেউ বাথরুমে যাবে, আমাদেরকে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে যাবে। ভাস্কর যখন বাথরুমে যেতো, একটা হিন্দী গান গাইতে গাইতে যেতো। যখনই আমাদের রুমের সামনে আসতো, গান থেমে যেতো, সন্তর্পণে রুমের সামনে দিয়ে যাবার সময় কায়দা করে দেখে নিতো আমরা কী করছি। ববি, চয়ন এরা সরাসরিই রুমে ঢুকে দেখতো কোন প্রশ্নটা আমরা পড়ছি। রিয়াদ, আল-আমীন, ফিস্টু তিন তলা আর চার তলা থেকে একটু পর পরই নিচে নেমে আমাদের রুমের সামনে দিয়ে বাথরুমে যেতো, মনে হচ্ছে পুরো হোস্টেলের একমাত্র আমাদের ফ্লোরেই বাথরুম আছে, অন্য কোথাও নেই। রাত যতো বাড়তে লাগলো, আমরা দরোজা-জানালা বন্ধ করে পড়তে লাগলাম। বাইরের ফিসফিসানিও বাড়তে লাগলো। গার্লস হোস্টেলেও সবার ধারণা হলো ফয়েজের কাছ হতে তন্বী প্রশ্ন পাবে। তন্বীর উপরেও চাপ বাড়তে লাগলো। বেচারা তন্বী! ফয়েজকে বার বার ফোন দিয়ে না পেয়ে মনোয়ারের মোবাইলে ফোন দিতো, আর ফয়েজ তখনো শোভার সাথে কথা বলায় ব্যস্ত!

মধ্যরাতে আমার স্নায়ুর উপর চাপ বেড়ে গেলো। একে তো প্রশ্ন পাচ্ছি না, অথচ সবাই ধরে নিয়েছে প্রশ্ন পাবো, তার উপর যা পড়ছি, একটু পরেই সেই সব ভুলে যাচ্ছি। যেগুলো আগে দুই ঘরের নামতার মতো মুখস্থ ছিলো, সেগুলোকে এখন হিব্রু ভাষায় লেখা বাইবেলের মতো মনে হচ্ছে। একটা পড়া শুরু করলে মনে হয়, ঐটা পড়া হয়নি, ঐটা পড়া শুরু করলে মনে হয় এইটা ভুলে গেছি। কিছুক্ষন পর পর নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করতে লাগলাম, কেনো মেডিকেলে ভর্তি হয়েছি! সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার সন্তানদের মধ্যে যে আমার কথা শুনবে না, তাকেই আমি মেডিকেলে ভর্তি করাবো, বুঝবে ঠ্যালা! একসময় এমন অবস্থা হলো, অস্থিরতাকে দূর করার জন্য রাত তিনটার দিকে গোসলও করে ফেললাম, তাও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না।

রাত শেষে ভোর হয়ে এলো, ক্লান্ত শরীরে চেয়ারেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাই নি। ফযরের আযান দেওয়ার পর মাসুদ দরোজা আর জানালাগুলো খুলে দিলো। ভোরের মিষ্টি হিমেল হাওয়া যখন গায়ে এসে লাগলো, অবসন্ন দেহে চেয়ারেই বসে শূন্য দৃষ্টিতে টেবিলের উপরে রাখা বইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম, বইয়ের পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে কখন যে মিড থাই লেভেলের ক্রস সেকশনের ছবি চলে এসেছে, খেয়ালই করি নি। ববিও যে কখন বাথরুমে যাবার সময় জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বইয়ের ঐ পৃষ্ঠাটাই খোলা দেখে গিয়েছে, বুঝতেই পারি নি। পরীক্ষার হলে যখন প্রশ্নপত্র হাতে পেলাম, তাই অনুভব করতে পারি নি আমার দিকে তাকানো কয়েক জোড়া চোখের অগ্নি দৃষ্টি।

দূর ছাই! কী প্রশ্ন এসেছে! মিড থাই লেভেলের ক্রস সেকশনের ছবি আঁকতে বলেছে, এটাতেই আট নম্বর। আমি যে ছবিটা দেখে আসিনি!!!
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×