১০ মিনিটের মধ্যেই চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ও পাথর দিয়ে থেঁতলিয়ে শামাম, টিপু, ইব্রাহিম ও মুনিফকে হত্যা করে ওরা। মৃত্যুর আগে শুধু ওদের মুখের ‘মা গো, বাবা গো’ চিৎকার শুনেছিলাম। পরের আধ ঘণ্টায় কান্ত ও পলাশকে সাপ পেটানোর মতো পিটিয়ে হত্যা করে। পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলিয়ে ও ছুরি দিয়ে রগ কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে। ৭ সঙ্গীর একমাত্র জীবিত আল-আমিন ডাকাতির মামলা থেকে জামিনে ছাড়া পেয়ে গতকাল সাংবাদিকদের কাছে ৬ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর আগ মুহূর্তের ছটফটানি ও প্রাণভিক্ষার করুণ আর্তনাদের কাহিনী বর্ণনা করেছে। সারা শরীরে নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে সে বলে, চারজনকে একটি টংঘরে রেখে আমিসহ তিনজন একটু দূরে নদীর তীরে যাই। কিছুক্ষণ পরেই চার সঙ্গীর ‘মা গো, বাবা গো’ চিৎকার শুনতে পাই। ওদের আর্তনাদ শুনেই আমরা ভড়কে যাই। ছিনতাইকারী ধরেছে ভেবে নিজেদের মোবাইল ও টাকা-পয়সা লুকানোর চেষ্টা করি। ততক্ষণে ১৫-১৬ জন অপরিচিত যুবক ইব্রাহিম, কান্ত ও আমাকে ঘিরে ফেলে। সবার হাতেই ছিল রাম দা, চাপাতি, লাঠি ও রড। এদের একজনের হাতে ছিল শটগান ও কোমরে পিস্তল। প্রশ্ন করে- তোরা কারা? জবাব দিই- আমরা ছাত্র। দারুস সালাম থেকে ঘুরতে এসেছি। তোরা ছাত্র না, বল তোরা ডাকাত- এমন নির্দেশ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেছন দিক থেকে একজন আমার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করে বসে। আরও একজন চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়। ওই কোপ ঠেকানোর চেষ্টা করে পলাশ। তখন ওরা হুঙ্কার দিয়ে বলে, ওই শালারে আগে শেষ কর। সবাই তখন হামলে পড়ে তার ওপর। কেউ রড দিয়ে আঘাত করে, কেউ চাপাতি দিয়ে কোপাতে থাকে। ততক্ষণে কান্তকেও ওরা রক্তাক্ত করেছে। কান্ত ওদের পা জড়িয়ে ধরে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল। বলেছিল, আমার বাবা সুরুজ ড্রাইভার। সবাই চিনবেন। আমরা ডাকাত না। আমরা নামাজ পড়ে ঘুরতে এসেছি। ওর কথা শেষ না হতেই বড় পাথর দিয়ে ওর মাথা থেঁতলে দেয়। দাঁত ভেঙে দেয়। অচেতন হয়ে পড়ে গেলে উপর্যুপরি কোপাতে থাকে। এক পর্যায়ে দু’জন দুই পা ধরে দু’দিকে টানটান করে ধরে রাখে। অন্যরা ওর নিম্নাঙ্গে পাথর দিয়ে থেঁতলাতে থাকে। গতকাল দুপুরে দারুস সালাম থানাধীন ৪ নম্বর বাড়ির দোতলার ভাড়া বাসায় বসে আল-আমিন যখন হত্যাকাণ্ডের ওই বর্ণনা দিচ্ছিল তখন চারদিকে নানা বয়সের লোকজন ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠছিল। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আল-আমিন ডাকাতির মামলার আসামি হিসেবে আদালতের মাধ্যমে জামিন নেয়। হামলাকারীরা তার মাথা ফাটিয়েছে, হাতের দু’টি আঙুল ভেঙে দিয়েছে। এ ছাড়া তার পিঠসহ সারা শরীরে অর্ধশতাধিক চাপাতির কোপ ও ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে। আল-আমিন বলে, আমি একজনের কোপ খেয়ে অন্যজনের পা ধরে কেঁদেছি। সে-ও কোপ দিলে আরেকজনের কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছি। বারবার বলেছি, আমরা কোন অন্যায় কাজে আসিনি। সবাই কলেজের ছাত্র। কিন্তু ওরা কোন কথা শোনেনি। শুধু বারবার বলেছে, ‘মাইরা ফালা’ মাইরা ফালা’। এভাবে প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে বিভিন্নজনের পিটুনি খাওয়ার পর শটগানধারী এক ব্যক্তি ও একজন মুরব্বি গোছের মানুষের হস্তক্ষেপে আমি ছাড়া পাই। তখন আমার মাথাসহ সারা শরীর দিয়ে রক্ত ঝরছে।
যেভাবে আমিন বাজারে গিয়েছিল ৭ বন্ধু: আল-আমিন বলে, দারুস সালাম ফুরফুরা মসজিদে নামাজ পড়ে রাত ১২টার দিকে কান্তর সঙ্গে আমি দারুস সালাম রাস্তায় যাই। সেখানে যাওয়ার পর পলাশ, ইব্রাহিমসহ কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়। আমাদের দু’জনকে দেখেই ওরা বলে ওঠে, তোদের নেয়া যাবে না। তোরা শুধু ফাজলামো করিস। কোন দুষ্টুমি করবে না- এমন কথা দিয়ে ওদের সঙ্গে রিকশায় উঠি। এক রিকশায় তিনজন ও আরেক রিকশায় ৪জন চড়ে রওনা দেই। প্রতি রিকশার ভাড়া ঠিক করেছিলাম ৪০ টাকা করে। পরে আরও ১০ টাকা বেশি ভাড়া দিয়ে গাবতলী পৌঁছে রিকশা ছেড়ে দেই। সবাই ক্ষুধার্ত ছিলাম। তাই গাবতলীর হোটেল থেকে বিরিয়ানি কেনার জন্য কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করি। পরে ফেরার পথে খাবার খাবো বলে একপর্যায়ে তা না কিনেই পর্বত সিনেমা হল পার হয়ে গাবতলী ব্রিজ দিয়ে হাঁটতে থাকি। হেঁটে হেঁটে আমিন বাজার পুরান ব্রিজের কাছে যাই। সেখানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি শুরু হয়। আশ্রয় নেই একটি টংঘরে। সেখানে শামাম, টিপু, পলাশ ও মুনিফ মোবাইলে গান শুনতে থাকে। তখন ওদের রেখে আমি, ইব্রাহিম ও কান্ত নদীর দিকে যাই। কিছু দূরে গিয়ে সিগারেট ধরিয়ে টানতে থাকি। এর ১০-১২ মিনিটের মধ্যেই ‘মা গো বাবা গো’ চিৎকার শুনি। তখন মনে করেছি ওদের ছিনতাইকারী ধরেছে। আমরাও মোবাইল ও টাকা পয়সা লুকানোর চেষ্টা করি। ততক্ষণে ৩/৪টি টর্চ জ্বালিয়ে ১০-১৫ জন যুবক আমাদের ঘিরে ফেলে। ওদের বয়স ১৬-২২ বছরের মধ্যে হবে। সবার হাতেই নানা ধরনের অস্ত্র ছিল। আমাদের পেটাতে পেটাতে ওদের কাছে নিয়ে যায়। ওই সময় কান্ত ও ইব্রাহিমকে মৃত মনে হয়েছে। ওদের টেনেহিঁচড়ে বালুর মধ্যে ফেলে দেয়। আমার সামনেই ইব্রাহিম ওদের কাছে পানি চেয়েছিল। তখন একজন বলে ওঠে, শালা এখনও মরেনি। এ কথা বলেই বড় পাথর দিয়ে মুখ ও মাথা থেঁতলে দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। আল-আমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে ওঠে, অচেতন ও রক্তাক্ত চারজনের মধ্যে শামাম শেষ মুহূর্তে বড় করে শ্বাস নিয়েছিল। ওই শ্বাস গ্রহণের শব্দ পেয়ে ওরা দ্বিতীয় দফায় পেটাতে থাকে। একে একে সবার হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয়। সে আরও বলে, কান্ত ওদের উপর্যুপরি কোপ খেয়েও দৌড় দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল। কিস্তু পারেনি। এ সময় ধীরে ধীরে লোকজন বাড়তে থাকে। আমাকে চারজন পুলিশ ধরে পিকআপে তোলে। আমি তখন পুলিশকে ‘আঙ্কেল’ বলে ডাক দেই। আকুতি করে বলি, আঙ্কেল একটু হেল্প করেন। আমি বাঁচবো না মারা যাব বুঝতে পারছি না। শুধু আমার আব্বার মোবাইলে একটু ফোন করেন। তখন ওই পুলিশ বলে ওঠে, কুত্তার বাচ্চা এত কথা বলিস কেন। ৬ জন যেভাবে গেছে, তোকেও কিন্তু সেভাবে পাঠাবো। বাঁচার একটাই পথ আছে। যেভাবে বলবো সেভাবেই বলবি। তোরা ঘুরতে যাসনি। গিয়েছিলি ডাকাতি করতে। আমি তখন মেনে নেই। এরপর অচেতন হয়ে পড়ি। পরে হাসপাতালে চেতনা ফিরে আসে।
যেখানে হত্যা করা হয়েছে: আল-আমিন বলে, চারজনকে হত্যা করেছে পুরান ব্রিজ সংলগ্ন টংঘরের আশপাশেই। দু’জনকে হত্যা করেছে নদীর তীরে। পরে তাদের ‘ডাকাত ডাকাত’ চিৎকার ও মাইকিং করার আগেই লাশগুলো টেনেহিঁচড়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায়। পরে জড়ো হওয়া লোকজন মৃত লাশগুলোর ওপর দ্বিতীয় দফায় পিটিয়েছে। একপর্যায়ে এলাকার মুরব্বিরা আসার পর ওই ১৫-২০ জনের ঘাতক দল তাদের অস্ত্র লুকিয়ে সরে পড়েছে।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

