শেষ কবে যে সত্যিই আমি ঘুমিয়েছি, মনে করতে পারছিনা! আসলেই কি কোনোদিন আমি ঘুমিয়েছিলাম; তাও ভুলে গেছি! সারাটা রাত বিছানাজুড়ে এপাশ ওপাশ করে যাই। এভাবে শিরদাঁড়াটা প্রচন্ড ব্যাথা হয়ে উঠেছে। কিন্তু ঘুম আর আসেনা। রাতের আধারে স্লো মোশন ছবির মতো এমন হাজারটা আধারে ভরা রাত চোখের সামনে চলে আসে। যেসব রাতের ঘন আধারে আমি তুমি কাছাকাছি ছিলাম। আমি তুমি লাউয়ের ডগার মতো জড়ানো ছিলাম পরস্পরে।
ঝড়ের মতো কাছে এসে যখন তুমি স্থায়ী হয়ে গেলে, তখন থেকেই ঘুমের সাথে আমার আড়ি। তখন থেকেই ঘুমের সাথে আমার না বলা অমিল। সেই যে ঘুমকাতুরে আমি ঘুম ভুলে গেলাম, আর কোনোদিন ঘুমাতে পারিনি। একটা ঘন্টার জন্যও না। একটা মিনিটের জন্যও কি পেরেছি?
তীব্র কামনায় তুমি আমাকে বুকে টেনে ধরতে। নাকে চলে আসতো তোমার নি:শ্বাসের চিরমাদকতায় ভরা ঘ্রাণ। সেই সময় ওই অবস্থাতে আমার ঘুমানোর কথা ছিলোনা। আমি ঘুমাই-ও নি। ঘুমানোটা সম্ভবও ছিলোনা। তোমাতেই যে তখন আমার সব শান্তি, সব স্থীরতা। মৃত্যু-ভগ্নী ঘুমের কাছে তখন আমার কোনো চাহিদা নেই। কোনো ভালো লাগার সম্ভাবনা নেই। তোমার ঘ্রাণের পাগল আমি তাই ঘুমকে সব সময়ই পিছনে রেখেছি। সামনে রেখেছি তোমাকে, তোমার নি:শ্বাসকে।
কিন্তু একটা সময় কিছু বিষয় বদলে গেলো।
তুমি পিঠ ঘুরিয়ে শুতে শিখে গেলে। তোমার নি:শ্বাসে মাদকতা থাকলো ঠিকই; কিন্তু তা উড়ে যেতে শুরু করলো বিপরীত দিকে। তুমি কামনায় কেঁপে উঠতে লাগলে আগের মতোই; কিন্তু তার স্থিতিকাল নেমে গেলো অর্ধেকে। “গায়ের একরোখা খোকা” আমি মানতে পারলাম না এসব। তোমার সাথে দ্বন্দের শুরুর বাঁশিটা বেজে উঠলোই। আমি চাইনি; তবুও। তোমাকে বুঝালাম, অমন সময় পেরিয়ে আসার পরে তোমার এমন হয়ে যাওয়াটা আমার ভালো লাগেনা। তোমাকে আগের সেই উম্মাদনায় চাই। আমার এই অমন-এমন তুমি বুঝলেনা। যেটা বুঝলে সেটা হলো- আমি নাকি ডোমেনেটিভ!
তুমি বদলেই গেলে। কিন্তু আমি পারলাম না নতুন একটা রূপে নিজেকে খুজে নিতে। পারলাম না পিছনে ফেলে রাখা ঘুমকে টেনে এনে চোখের কোটরে ছড়িয়ে দিতে। ঘুম তাই অভিমানে বুকে পাথর চাপা দিলো। তীব্র ঘৃণায় আমাকেও ফেলে দিলো। আমি পড়ে গেলাম। ঘুম যেনো তোমার মতো করেই হাজারটা আলোকবর্ষ দূরত্বে চলে গেলো...
আগে আমার সবই ছিলো; শুধু তুমি ছিলেনা। আর এখন তুমি ছাড়া আমার প্রায় সবই আছে। এই তুমি না থাকা সময়, বড় দু:সহ। কিছুতেই কাটতে চায়না। সময়টা যেনো ধারালো একটা ছুড়ি, আর আমি ছুড়ির কোপে মরার নেশায় পাগলপ্রায়; কিন্তু ছুড়ি আমাকে ছোঁয়-ই না! কাটেয়না আমাকে! বাধ্য হয়ে তাই এই পৃথিবীর আলো বাতাসে আমার বাঁচতেই হয়। আর বাঁচার জন্যই একটু আধটু প্রশান্তির অভাব আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই বোধ করি। কিন্তু কোথায়!
ঘুমের কাছে প্রশান্তি খোজার আশায় গোছানো বিছানাটাতে আমার নিরন্তর শুয়ে থাকা। কিন্তু ঘুমের খোজ মিলেই না। মাথার ভিতরে তোমার ভাবনার কীট, একটু একটু করে সমস্ত মনোযোগ খেয়ে ফেলে তারা। ঘুম আসেনা। আমি স্ট্যাচুর মতো করে চুপটি শুয়ে থাকি ঘুমের আদরের আশায়। কিন্তু ঘুম আসেনা। ভাঙ্গেনা আমার সাথে ঘুমের সেই না বলা অভিমান। ঘুমও তোমার মতোই হয়ে যায়। কাছে টানে, কিন্তু কাছে আসেনা। আসেনা। আসেই না...
আমার ভাড়ে বিছানাটা নুয়ে পড়ে। আমি তাই বিছানাটা ছাড়ি একটু। জানলার গ্রীলের ফাঁক গলে আমার দৃষ্টি বাইরে যায়। আহ, বাইরে শাওন-সোধা! একেবারে আকাশ ভেঙেই গেছে আজ!
এমন ঘুমহীন-গভীর ইনসমনিয়ার রাতে বৃষ্টি দেখতে আমার খারাপ লাগেনা। আমি বৃষ্টি দেখি। ভাবনা তার অভ্যেস ছাড়েনা- বৃষ্টিবেলায় বিনা নোটিশেই মাথার ভিতরে তোমার পোকা। আচ্ছা, আমাকে কি এমন বৃষ্টিরাতে তোমার পেতে মন চায় এখনো? এখনো কি তুমি কানের কাছে ফিসফিস করে বুকে ডাকার জন্য পাগল হয়ে যাও? আনমনা হয়ে শূন্য বিছানায় পড়ে থাকা আমার বালিশে ঠোট ঘেসে কি বলেই ফেলো- লাভ ইউ ম্যাডলি! হুঁ? পরক্ষণেই কি আবার জেগে উঠে তোমার ইগো- আরে, ওইটা তো আসলে আমার পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যই ছিলোনা! ....?
বৃষ্টির ফোঁটারা হঠাৎ করেই বিদ্রোহী হয়ে যায়। ঝড়বে, তবে আমার দৃষ্টিসীমায় কিংবা অনুভূতিসীমায় নয়! ঠিকাছে, মেনে নিলাম। আমার তো এখন সবই মেনে নিতে হয়। যার বুকের ভাঁজে আকাশ খুজেছি, যার চোখে মায়ার সাগর পেয়েছি- তার চলে যাওয়াটাই মেনে নিতে হয়েছে! আর এসব তো কেবল বৃষ্টি দু একটা ফোঁটা-ই। যাক!
ঘুমের অভাবে আবার আমি কাতর! একা একা পড়ে থাকা বিছানাটা আবার আমাকে ডাকে। একেবারে অজান্তেই চোখের কোণে চলে আসা অশ্রু মুছে নিয়ে আমি বিছানাটাতে আবার গা এলিয়ে দেই। একরাতে কতোবার যে এভাবে বিছানার কোলে নিজেকে রাখি; গুণে দেখতে হবে! কারণ, বিছানাটার কাছে অনেক ঋণী হয়ে পড়ছি আমি। জমে গেছে অনেক দিনের ঘুম।
ঘুমহীন আমাকে বহন করে করে বিছানাটাও ইনসমনিয়ার রোগী। তোমার ভাবনাদের এবার তুমি একটু কন্ট্রোল করো। ঋণ পরিশোধে আমার একটু ঘুমাতেই হবে... জমে থাকা ঘুম এবার একটু হলেও ফিরিয়ে দিবো অসহায় বিছানাটাকে।
আমি এবার একটু ঘুমাই...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



