এত মানুষের ভালবাসা, এত শুভকামনা আমাকে আবেগ আপ্লুত করে ফেলেছে । শুভেচ্ছাগুলোর জবাব দিতে গিয়ে নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল । মনে হচ্ছিল এই পৃথিবীতে আসলেই আমার কেউ আছে, আর তাদের জন্য আমারও এই পৃথিবীতে বাঁচার প্রয়োজন আছে ।
এত মানুষের মাঝে বাবাকে খুব মিছ করেছি । আর মিছ করেছি ছোটবেলার সেই জন্মদিন উদযাপনের সৃতিগুলোকে ।মনে পরে গেল আমার বাবার কথা । আমি এক হতভাগা । অনেক কম বয়সে বাবাকে হারিয়েছি । আমার মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার মাত্র ১ মাস আগে বাবা মারা যায় । মেডিক্যালে চান্স পাইনি তাতে আমার দুঃখ নেই , কিন্তু বাবাকে হারিয়ে যে অপূরণীয় খতির সম্মুখীন হয়েছি, তা ভোলার নয় ।
আমিতো ঢাকায় আসার আগ পর্যন্ত (নটরডেম এ ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত) সবসময় বাবাকে কাছে পেয়েছি । প্রতিটা ক্ষণে বাবা আমাকে বোঝাতো, কোনটা করা উচিৎ আর কোনটা করা অনুচিত । আমি সবসময় বাবাকে কাছে পেতাম । বাবা যেন আমার পিছে ছায়ার মতো লেগে থাকতো । তার একমাত্র স্বপ্ন ছিল আমাকে মানুষ করা । সবার কাছে দোয়া চাইতো আমার জন্য । আমার জন্মদিনে পাড়ার সব লোকদেরকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াত । কেক কাটার সিস্টেম না । খাটি বাঙ্গালিয়ানায় আমার ২০ টি জন্মদিন পালিত হইছে । জন্মদিনে কোন গিফট নিতাম না আমরা । নিমন্ত্রণের কার্ডে আমার হাত দিয়ে বাবা লেখাতো, "লৌকিকতা বর্জনীয়" , যাতে কেউ গিফট না আনে, আনলে ফেরত দেওয়া হতো । তবে একমাত্র শিক্ষার উপকরণ আনলে রাখা হতো । আমার ঘুম ভাঙ্গান থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত বাবা আমার খেয়াল রাখতো । একটা কলেজ পড়ুয়া ছেলের গায়ে হাত দিয়ে সাবান ডলে গোসল কি কোন বাবা করায় ? আমার জানা নেই আর কেউ করায় কিনা, আমার বাবা করাতো ।আমি কি কি খেতে পছন্দ করি তা বাবা নিজে হাতে রান্না করে আমাকে খাওয়াত । ফুচকা,চতপতি,হালিম,ভেজিতেবল রোলসহ মাংস,রোষ্ট ,ইলিশ মাছের দোপিয়াজি - যা যা আমি ভালোবাসি খেতে সব আমাকে নিজে হাতে রান্না করা খাওয়াত । মা এত বুঝতনা আমি কি চাই । কষ্ট পেলে, কাঁদলে বাবাই আমাকে বুকে জড়িয়ে নিত । সেই ছিল আমার বন্ধু, অনুপ্রেরণা ,আমার দিক নির্দেশনা, আমার সবকিছু । আমার সবকিছুর রুটিন করা ছিল । আমার বাসায় যারা গেছো, তারা দেখছ । আমার ঘরে আমার রুটিন টাঙ্গান ছিল । আমি কখন কি করবো, কখন টিভি দেখবো, কখন ঘুরতে বের হবো, কখন খাবো, কোথায় কখন কি কি করবো সব আমাকে বাবা শিখিয়ে দিত । আমি মাঝে মাঝে রেগে যেতাম যখন বড় হলাম । অত বাঁধা ধরা রুটিন ভালো লাগতনা । এখন মনে পরলে একা একা কাঁদি । বাবা তখন একটা কথা বলত, "না থাকলে বুঝবি কি হারালি । আমি না থাকলে নিজের মতো করে চলিস । তখন আর আমি বলতে আসবনা ।কান্নাকাটি করেও কুল পাবিনা তখন । যতদিন আছি, সময় কাজে লাগা । পড় । আমি তোর দুই পয়সা খাবনা । শুধু এটুকু শুনতে চাই যে মানুষ বলবে বাবু ফরিদীর যোগ্য ছেলে । ওটুকুই আমার চাওয়া । তাই এত চেষ্টা, সারাক্ষণ তোর পিছে লেগে থাকা ।" সব কথা অবিকল আমার কানে বাজে । আমি যে কোনদিন বেয়াদপ ছিলাম তা হয়তো না, কিন্তু বাবার সাথে মাঝে মাঝে এমন করতাম । মেট্রিকের আগে কোনদিন তার কথার ওপর কোন টু-শব্দ করিনি । আজ বুঝতেসি আমার জন্য আজ বাবার উপস্থিতিটা কতটা জরুরি ছিল আজ, এই সময়ে । এখনও যখন বাবার কথা মনে পরে চোখের পানি আটকাতে পারিনা । আমি ভুলে যাই যে আমি বড় হইছি, আমার বংশের একমাত্র প্রদীপ আমি । আমি ভেঙ্গে পরলে চলবেনা । তাই, সবাইকে বলব, বাবা-মার সাথে কখনও খারাপ ব্যাবহার করবেন না । আমি চাইনা আমার কোন বন্ধু বা নিকটজন আমার মতো সময় হারিয়ে আফসোস করুক ।
আমার বাবার নাম বাবু ফরিদী । তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদ ফরিদপুর এর সভাপতি ছিলেন দীর্ঘদিন । মূলত সত্তরের দশকের কবি হলেও লেখালেখির সব শাখাতেই তার বিচরণ ছিল । প্রথম আলো তে গত বছর ২৩ জুলাই বাবাকে নিয়ে একটা লেখা ছাপা হয়েছিলো, "লোকটি কবিতা লিখতেন" শিরোনামে । লিখেছিলেন বাংলা একাডেমীর উপ-পরিচালক তপন বাগচী । জানিনা আজ বাবা কোথায় আছে, কেমন আছে । জানিনা ঐ দূর আকাশের কোণে কোথাও চুপটি করে বসে বাবা আমাকে দেখছে কিনা ; যদি দেখে তো দেখে কি ভাবছে ? ভাবছে তার এত আদরের ছেলেটা খারাপ হয়ে গেল ? নাকি আমাকে দেখে খুশি আছে ? খুব জানতে ইচ্ছে করে । কেন এমন হয় ? কেন আমার বাবার কত মানুষদেরকে আগে আগে দুনিয়া থেকে চলে যেতে হয় ? কেন ?
আমি বোধহয় অনেক বেশী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছি, দুঃখিত বন্ধুরা ! আমার জন্য, আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন ।
সবশেষে আরও একবার জানাতে চাই, ধন্যবাদ ও অশেষ কৃতজ্ঞতা সবাইকে ।
love you all

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

