somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কেমন কাটল আমার জন্মদিন ও এক অনাথের বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ

১৯ শে জানুয়ারি, ২০১২ বিকাল ৪:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনেক ভালো একটি জন্মদিন কাটল । বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষীর অনেক অনেক আদর,ভালবাসা পেলাম । ফেসবুক, ব্লগ, ফোন মিলিয়ে প্রায় ৪০০ এর মতো জন্মদিনের শুভেচ্ছা পেলাম , যার ভেতর রয়েছে ৩০০ পোস্ট, ৫০ টি মেসেজ , ৭টি কল , আর কিছু কমেন্ট । বন্ধু আতিক ( Nirjhor Atiq )তো পার্টনারসমেত হঠাৎ হাজির হয়ে গেল, অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম তিনজন কার্জনে, তারপর নতুন টিউশনিতে গেলাম, ছাত্রী জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালো, ছাত্রীর মা পায়েশ খাওয়াল । ধন্যবাদ Deluair Hossen মামা । রাতে ফিরে মিতালিতে ভরপেট খানপিনা হল ।

এত মানুষের ভালবাসা, এত শুভকামনা আমাকে আবেগ আপ্লুত করে ফেলেছে । শুভেচ্ছাগুলোর জবাব দিতে গিয়ে নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল । মনে হচ্ছিল এই পৃথিবীতে আসলেই আমার কেউ আছে, আর তাদের জন্য আমারও এই পৃথিবীতে বাঁচার প্রয়োজন আছে ।
এত মানুষের মাঝে বাবাকে খুব মিছ করেছি । আর মিছ করেছি ছোটবেলার সেই জন্মদিন উদযাপনের সৃতিগুলোকে ।মনে পরে গেল আমার বাবার কথা । আমি এক হতভাগা । অনেক কম বয়সে বাবাকে হারিয়েছি । আমার মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার মাত্র ১ মাস আগে বাবা মারা যায় । মেডিক্যালে চান্স পাইনি তাতে আমার দুঃখ নেই , কিন্তু বাবাকে হারিয়ে যে অপূরণীয় খতির সম্মুখীন হয়েছি, তা ভোলার নয় ।
আমিতো ঢাকায় আসার আগ পর্যন্ত (নটরডেম এ ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত) সবসময় বাবাকে কাছে পেয়েছি । প্রতিটা ক্ষণে বাবা আমাকে বোঝাতো, কোনটা করা উচিৎ আর কোনটা করা অনুচিত । আমি সবসময় বাবাকে কাছে পেতাম । বাবা যেন আমার পিছে ছায়ার মতো লেগে থাকতো । তার একমাত্র স্বপ্ন ছিল আমাকে মানুষ করা । সবার কাছে দোয়া চাইতো আমার জন্য । আমার জন্মদিনে পাড়ার সব লোকদেরকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াত । কেক কাটার সিস্টেম না । খাটি বাঙ্গালিয়ানায় আমার ২০ টি জন্মদিন পালিত হইছে । জন্মদিনে কোন গিফট নিতাম না আমরা । নিমন্ত্রণের কার্ডে আমার হাত দিয়ে বাবা লেখাতো, "লৌকিকতা বর্জনীয়" , যাতে কেউ গিফট না আনে, আনলে ফেরত দেওয়া হতো । তবে একমাত্র শিক্ষার উপকরণ আনলে রাখা হতো । আমার ঘুম ভাঙ্গান থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত বাবা আমার খেয়াল রাখতো । একটা কলেজ পড়ুয়া ছেলের গায়ে হাত দিয়ে সাবান ডলে গোসল কি কোন বাবা করায় ? আমার জানা নেই আর কেউ করায় কিনা, আমার বাবা করাতো ।আমি কি কি খেতে পছন্দ করি তা বাবা নিজে হাতে রান্না করে আমাকে খাওয়াত । ফুচকা,চতপতি,হালিম,ভেজিতেবল রোলসহ মাংস,রোষ্ট ,ইলিশ মাছের দোপিয়াজি - যা যা আমি ভালোবাসি খেতে সব আমাকে নিজে হাতে রান্না করা খাওয়াত । মা এত বুঝতনা আমি কি চাই । কষ্ট পেলে, কাঁদলে বাবাই আমাকে বুকে জড়িয়ে নিত । সেই ছিল আমার বন্ধু, অনুপ্রেরণা ,আমার দিক নির্দেশনা, আমার সবকিছু । আমার সবকিছুর রুটিন করা ছিল । আমার বাসায় যারা গেছো, তারা দেখছ । আমার ঘরে আমার রুটিন টাঙ্গান ছিল । আমি কখন কি করবো, কখন টিভি দেখবো, কখন ঘুরতে বের হবো, কখন খাবো, কোথায় কখন কি কি করবো সব আমাকে বাবা শিখিয়ে দিত । আমি মাঝে মাঝে রেগে যেতাম যখন বড় হলাম । অত বাঁধা ধরা রুটিন ভালো লাগতনা । এখন মনে পরলে একা একা কাঁদি । বাবা তখন একটা কথা বলত, "না থাকলে বুঝবি কি হারালি । আমি না থাকলে নিজের মতো করে চলিস । তখন আর আমি বলতে আসবনা ।কান্নাকাটি করেও কুল পাবিনা তখন । যতদিন আছি, সময় কাজে লাগা । পড় । আমি তোর দুই পয়সা খাবনা । শুধু এটুকু শুনতে চাই যে মানুষ বলবে বাবু ফরিদীর যোগ্য ছেলে । ওটুকুই আমার চাওয়া । তাই এত চেষ্টা, সারাক্ষণ তোর পিছে লেগে থাকা ।" সব কথা অবিকল আমার কানে বাজে । আমি যে কোনদিন বেয়াদপ ছিলাম তা হয়তো না, কিন্তু বাবার সাথে মাঝে মাঝে এমন করতাম । মেট্রিকের আগে কোনদিন তার কথার ওপর কোন টু-শব্দ করিনি । আজ বুঝতেসি আমার জন্য আজ বাবার উপস্থিতিটা কতটা জরুরি ছিল আজ, এই সময়ে । এখনও যখন বাবার কথা মনে পরে চোখের পানি আটকাতে পারিনা । আমি ভুলে যাই যে আমি বড় হইছি, আমার বংশের একমাত্র প্রদীপ আমি । আমি ভেঙ্গে পরলে চলবেনা । তাই, সবাইকে বলব, বাবা-মার সাথে কখনও খারাপ ব্যাবহার করবেন না । আমি চাইনা আমার কোন বন্ধু বা নিকটজন আমার মতো সময় হারিয়ে আফসোস করুক ।
আমার বাবার নাম বাবু ফরিদী । তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদ ফরিদপুর এর সভাপতি ছিলেন দীর্ঘদিন । মূলত সত্তরের দশকের কবি হলেও লেখালেখির সব শাখাতেই তার বিচরণ ছিল । প্রথম আলো তে গত বছর ২৩ জুলাই বাবাকে নিয়ে একটা লেখা ছাপা হয়েছিলো, "লোকটি কবিতা লিখতেন" শিরোনামে । লিখেছিলেন বাংলা একাডেমীর উপ-পরিচালক তপন বাগচী । জানিনা আজ বাবা কোথায় আছে, কেমন আছে । জানিনা ঐ দূর আকাশের কোণে কোথাও চুপটি করে বসে বাবা আমাকে দেখছে কিনা ; যদি দেখে তো দেখে কি ভাবছে ? ভাবছে তার এত আদরের ছেলেটা খারাপ হয়ে গেল ? নাকি আমাকে দেখে খুশি আছে ? খুব জানতে ইচ্ছে করে । কেন এমন হয় ? কেন আমার বাবার কত মানুষদেরকে আগে আগে দুনিয়া থেকে চলে যেতে হয় ? কেন ?
আমি বোধহয় অনেক বেশী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছি, দুঃখিত বন্ধুরা ! আমার জন্য, আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন ।
সবশেষে আরও একবার জানাতে চাই, ধন্যবাদ ও অশেষ কৃতজ্ঞতা সবাইকে ।
love you all :) :)
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৯:৫৪
৬টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×