somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নির্বাসনে যাওয়ার আগে।

২৭ শে জুন, ২০০৭ রাত ১১:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মা রান্নাঘরে ছিলেন।
চুলোর উপরে টগবগ করে কি যেন ফুটছে। আগুনের আঁচে মায়ের ফর্সা মুখটি লালচে লাগছিল।
"মা, তোমাকে বলতে এলাম। আমি যাচ্ছি।"
মা আমার দিকে ফিরে তাকান।
"এই অবেলায় কোথায় যাচ্ছিস আবার? সারাদিন টোটো করে না ঘুরলেই কি নয়?"
"আমি নির্বাসনে যাচ্ছি মা। আর দেখা হবে না তোমার সাথে। ক্ষুদিরামের গানটি মনে আছে মা? একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি। ব্যাপারটা অনেকটা সেই রকম। শুধু আমি আর ফিরে আসবো না। ওয়ান ওয়ে টিকিট।"
মা হাসেন। "কোথায় যাচ্ছিস বললি?"
আমি হালকা রাগ দেখাই। "তুমি আমার কথা মন দিয়ে শুনছো না। আমি নির্বাসনে যাচ্ছি।"
মা এবার আরো হাসেন। হাসতে হাসতে প্রায় গড়িয়ে পড়েন। আমি এবার সত্যি সত্যি রেগে উঠি। আমার কথা কেউই সিরিয়াসলি নেয় না।
একসময় মায়ের হাসি থামে। আঁচল দিয়ে তিনি মুখ মোছেন। তারপর বলেন, "তোর কথা শুনলে এতো হাসি পায়।"
আমি গম্ভীর হয়ে বলি,"আমি কি কোন মজার কথা বলেছি যে এতো হাসতে হবে?"
মা বলেন, "মজার কথাই তো। তুই নির্বাসনে যাবি কিভাবে? আমরা সবাইই তো নির্বাসিত। যা-ভাল করে হাতমুখ ধুয়ে আয়, ভাত খাবি। আমার রান্না শেষ।"

বজ্রাহত মানুষের মতো আমি রান্নাঘরের চৌকাঠে বসে থাকি। মা কি কথা বলে গেলেন?

সুনীল গাংগুলির একটি প্রিয় কবিতার লাইন অনেক আওড়েছি এক সময়। "যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অংগুরী ছোঁয়াবো, আমি বিষপান করে মরে যাবো।" তখন নির্বাসন শব্দটির অর্থ ছিল দূরদূরান্তর পেরিয়ে কোন এক অজানা স্থানে চলে যাওয়া। যেখানে পরিচিত কোন কিছু নেই। এখন বুঝি, নির্বাসন মানে অচেনা কোথাও চলে যাওয়া না, এর অর্থ পরিচিত, প্রিয়, ভালবাসার জিনিসগুলোকে হারিয়ে ফেলা। এখন বুঝি প্রকৃতই আমরা এক এক জন নির্বাসিত মানুষ। প্রতিদিনই আমরা একটু একটু করে আমাদের প্রিয়জনদের কাছ থেকে, প্রিয় জিনিসের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।

আমাদের বাড়ীর সামনে একটি বিশাল হাসনুহানার ঝোপ আছে। সেই ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি। শীতকালে স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলে বাড়ী ফিরতে দেরী হোত। তখন পা টিপেটিপে লুকিয়ে ঘরে ঢুকতাম। হাসনুহানার গন্ধে সারা মন অবশ হয়ে যেত, মনে হোত কোন এক স্বপ্নের জগত লুকিয়ে আছে ঝোপটির ওপাশে। হাসনুহানার ঝোপটি এখনও সেইখানেই আছে। এখনও তেমনি ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। কিনতু আমি তার পাশ দিয়ে চলে যাবার সময় আর তেমনভাবে অবশ হইনা। এখন মনে হয় ঝোপটি অনেক খানি জায়গা নষ্ট করছে। বিদায় তোমাকে, হে হাসনুহানা! আমি তোমার কাছ থেকে চলে গেলাম।

একই ভাবে বিদায় জানিয়েছি ঈদের দিনে ভোররাতে উঠে দিদিমার সাথে পোলাওয়ে দেবার জন্য মটরশুঁটির খোসা ছাড়ানোকে। বিদায় জানিয়েছি চকচকে একটি আধুলী পাবার আনন্দে নির্ঘুম সারা রাতকে, বিদায় জানিয়েছি নিজের নামে আসা প্রথম চিঠিটি বারবার পড়ার আনন্দকে, বিদায় জানিয়েছি পড়ন্ত বেলার রোদে দেখা লাল চটি পরা একজোড়া ফর্সা পায়ের পাতাকে। বিদায়, বিদায় তোমাদের সবাইকে। তোমাদের কাউকেই আমি আর কাছে পাইনা। নির্বাসনে চলে গিয়েছি আমি।

এখন বুকের মধ্যে একধরণের ভয় নড়াচড়া করে। আজকে কোন জিনিসটি হারিয়ে ফেলবো? তাই আশপাশের সব কিছুকে আরেকবার ভাল করে দেখে নেই। পাশে শুয়ে থাকা মানুষটির ঠোঁটের উপরের সৌন্দর্য্যময় তিলচিহ্নটিকে গোপনে ছুঁয়ে দেখি। আর যদি দেখা না হয় কোনদিন? আর যদি এমন ভাবে না দেখি? শিশুটির গায়ের সুবাসটি কি আমি কালকেও আবার পাবো এমনি করে? জানিনা। তাই আজই কোলে তুলে নেই তাকে। শিশুটি হাসে কোনকিছু না বুঝেই। তাকে বুকের মধ্যে নিয়ে বসে থাকি। শিশুটি বোঝেনা জাহাজঘাটে অপেক্ষা করছে জাহাজ। যে কোনদিন বেজে উঠবে ঘন্টা। চিরতরে হারিয়ে যাবে তার হাসিটি।

সুনীল গাংগুলি, আপনি কি বলতে পারবেন কতখানি বিষ পান করলে আমরা আমাদের দুঃখ ভুলতে পারবো?

সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুন, ২০০৭ রাত ১১:৪৫
১১টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×