যতদূর গেলে পলায়ন হয়, ততদূর কেউ আর পারেনা যেতে।

নির্বাসিতের আপনজন। পর্ব-১১(ক)।

০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ১:৫৭

শেয়ার করুন:                   Facebook

সেবার কোরবানীর ঈদের আগে জসিম বললো,"ভাই একটা ঈদ ঢাকায় বসে করেন না। প্রত্যেক ঈদেই তো বাড়ী যান। একবার না গেলে এমন কোন মহাভারত অশুদ্ধ হবেনা। আপনি যদি থাকেন তাহলে আমাদের বাসায় আপনার জন্য খানাপিনার বন্দোবস্ত থাকবে। সেই সাথে আরো থাকবে বিশেষ বিনোদনের ব্যবস্থা।"
কথাটা শেষ করে চোখ টিপলো জসিম।

আমি বিদেশী ভাষা শিখতে যাচ্ছি শুনে রুমমেট মিজান বললো, সেও শিখবে। ততক্ষণে আমার ভাষার ক্লাশটি ভর্তি হয়ে গেছে। সে যেয়ে ভর্তি হোল স্প্যানিশ ভাষার ক্লাশে। আমরা বললাম,"স্প্যানিশ শিখে কি হবে? এটাতো জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা না, এটা হচ্ছে অশিক্ষিত লোকের ভাষা। এই ভাষা শেখা আর আফ্রিকার সোয়াহিলি ভাষা শেখা একই জিনিস।"
এই কথা শুনে মিজান খুবই চটে গেল।
সে বললো,"জ্ঞান বিজ্ঞানের ভাষা হচ্ছে মৃত ভাষা। গ্রীক, ল্যাটিন এইসব ভাষা শিখে কি লাভ? কার সাথে কথা বলবো এই সব ভাষায়? সক্রেটিসের শ্বশুরের সাথে? তোমাদের যদি শিখতে ইচ্ছে হয়, শেখোগে। আমি স্প্যানিশই শিখবো।"

আমাদের দুজনের ভাষার ক্লাশ শুরু হোল। প্রতি ক্লাশে দুজনে নতুন নতুন শব্দ শিখি, আর ঘরে এসে সদর্পে সেগুলো আওড়াই এবং প্রমাণ করতে চেষ্টা করি যে আমার ভাষাটাই শ্রেষ্ঠতর। আমাদের দুজনের মাঝখানে পড়ে ঘরের অন্য দুই বাসিন্দার (আসাদ আর রফিক) প্রাণ ওষ্ঠাগত। একদিন তারা দুজন মিলে আইন জারী করলো যে এইসব বন্ধ করতে হবে তা না হলে আমাদের দু'জনকে বস্তাতে পুরে স্পেন আর জার্মান দূতাবাসের সামনে ফেলে আসা হবে, আমাদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা হবে এবং আমাদের দুজনের নামে হুলিয়া জারী করা হবে (কেন কে জানে?)।
এই হুমকিতে কিছুটা কাজ হোল, এবং আমাদের বকবকানি বন্ধ হোল।

ভাষা ক্লাশে যেয়ে নতুন কিছু লোকের সাথে আমাদের দুজনারই পরিচয় হোল। এদের মধ্যে একজন হোল জসিম। যদিও সে মিজানের ভাষাক্লাশের সহপাঠী, ক্রমে ক্রমে সে আমাদের ঘরের সবার সাথেই বন্ধুত্ব করে ফেললো। প্রায় প্রতিদিন ভাষার বৈকালিক ক্লাশ করে আমি, মিজান আর জসিম ফিরে আসতাম আমাদের ঘরে। সেখানে আর এক প্রস্থ আড্ডা মেরে তারপর জসিম বাড়ী যেতো। মাঝে মাঝে রাতের খাবারও সে আমাদের সাথে খেয়ে যেতো।

জসিম থাকতো পুরনো ঢাকার দিকে। খুব সম্ভবতঃ গেন্ডারিয়া এলাকায়। বি কম পাশ করে সে ছোটখাটো একটা ব্যবসা করতো। কেন যে সে স্প্যানিশ ভাষা শিখতে শুরু করেছিল সে কারণটি আমাদের কাছে পরিষ্কার ছিলনা। তবে মানুষ হিসেবে সে বেশ আড্ডাবাজ ছিল আমাদের মতো। একারণে কিছুদিন পরেই জসিমকে আমাদের সাথে প্রায়ই দেখা যেত।

যেহেতু সে পয়সা আয় করতো, প্রায়ই চা-সিগারেটের পয়সা সে আমাদের দিতে দিতনা।
"আরে আপনারা হচ্ছেন ছাত্র মানুষ, আমি থাকতে আপনারা পয়সা দেবেন কেন? পড়াশুনা শেষ করেন আগে, তারপরে আমার কাছে আসবেন। তখন আমি আপনাদের দেখাবো পয়সা খরচ করার কত রকম তরিকা আছে। তখন বুঝবেন এই ঢাকা শহরে কত রকম ফুর্তি করার জায়গা, দেখবেন কত রকম আনন্দ করে মানুষ। সেদিন আপনারা পয়সা খরচ করবেন, আমি কিছু বলবোনা।"
" কি রকম ফুর্তি জসিম?"
"কোন ফুর্তি চান বলেন? যেটা চান সেইটাই আপনাদের সামনে হাজির করে দেব।"

আনন্দের নিষিদ্ধ ফলটি মানুষের কাছে চিরকালই আকর্ষনীয়। আমরাও তার ব্যতিক্রম নই। ভবিষ্যতের ফুর্তির কথা ভেবে আমাদের চোখ চকচক করে ওঠে। আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপর ছাত্রজীবনের পশ্চাদ্দেশে লাথি মেরে প্রবেশ করবো আসল জীবনে। নিজেকে ভোগবিলাসী রূপে কেমন দেখাবে সেই চিন্তা করে অধৈর্য্য হয়ে পড়ি। কবে শুরু হবে সেই মধুর অধ্যায়টি?

যাই হোক, মূল প্রসংগে ফিরে যাই। কোরবানীর ঈদের আগে জসিমের অনুরোধে সিদ্ধান্ত নিলাম যে সে বারের ঈদটিতে আর বাড়ী যাবোনা। কাগজ কলম নিয়ে বসলাম চিঠি মুসাবিদা করতে।
চিঠিতে ইনিয়ে বিনিয়ে লেখা হোল, যে সামনে ভয়াবহ রকমের কঠিন তিনটি পরীক্ষা আসছে যার প্রস্তুতির জন্য আমাকে ঢাকাতে থাকতেই হবে। ঈদের ছুটির দিনগুলোতে আনন্দ করার পরিবর্তে আমাকে কাটাতে হবে বইয়ের পাতায় মাথা গুঁজে। চিঠির শেষে দীর্ঘশ্বাসসহ লিখলাম যেন পরিবারের অন্য লোকেরা আমার জন্য দুশ্চিন্তা করে তাদের ঈদের আনন্দকে মাটি না করে। আমার মত ভাগ্যাহতের জীবনে এটাই স্বাভাবিক।
চিঠিটি ঝটপট বাড়িতে পোস্ট করে দিলাম।

জসিমকে বললাম,"আপনার কথাই শুনলাম, বাড়ীতে যাচ্ছিনা এবার ঈদে।"
সে খুশী।"মিজানও থাকছে ঢাকায়। ঈদের দিন বিকালের দিকে আপনার দুজন চলে আসেন আমাদের বাসায়। তত ক্ষণে কোরবানীর মাংস রান্না হয়ে যাবে।"

তারপর বেশ কয়েকদিন জসিমের কোন দেখা পাইনি। মিজান বললো, কি এক কাজে সে নাকি ঢাকার বাইরে গেছে, ঈদের আগের দিন ফিরবে। ঈদের দিন তার বাসায় কি ফুর্তি হবে, তা জানার জন্য মিজানকে জিজ্ঞেস করলাম একদিন। মিজান মাথা নাড়লো। তার কোন ধারণা নেই।

ঈদের দিন সকালে উঠেই মেজাজটা খারাপ হোল অনেকগুলো কারণে। প্রথমতঃ বাড়ীর সবার কথা মনে হোল। এর আগে কোনদিন বাড়ির বাইরে ঈদ করিনি কখনো। দ্বিতীয়তঃ দেরীতে ঘুম থেকে ওঠার কারণে ঈদের নামাজটিও মিস করেছি। তৃতীয়তঃ কোরবানীর মাংস আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ীতে দিয়ে আসার কাজটি আমার প্রিয় ছিল। সেটাও করতে পারবো না মনে করে মন খারাপ।

হলের নীচ থেকে ডাইনিং হলের বেয়ারারা চেঁচাচ্ছে,"সার- ঈদের সেমাই খেয়ে যান।"
যাক-অন্ততঃ সেমাইটা জুটবে কপালে।

নিচে গিয়ে সেমাইয়ের চেহারা দেখে মন খারাপের পরিমাণ বাড়লো। সেমাই এর নামে তারা যে জিনিসট সামনে এনে দিল, সেটি হাল্কা সাদা রঙ্গের একটি পাতলা লিকুয়িড। তার মাঝে কাঠির মতো কি সব জিনিস। ছোট প্লেট নেই বলে জিনিসটি আনা হয়েছে ভাত খাবার বিশাল থালায়। এবং ডাইনিং হলে কোন চামচ না থাকায় তরল পদার্থটি হাত দিয়ে খেতে হবে। এমন সেমাইয়ের ছবি তুলে রাখা উচিত ছিল।

মনে পড়লো ঈদের দিন বাবার আতরের গন্ধ, মায়ের রান্নাঘরের ব্যস্ততা, ছোটভাইয়ের সাথে কোলাকুলি, বোনটির হাতের মেহেদী। বুঝলাম বড় হয়ে গেছি। সাপের মত ফেলে দিচ্ছি পুরনো খোলস।

দুপুরের পর আমি আর মিজান রওনা দিলাম। জসিমের বাসায় যাওয়ার রাস্তা মিজান চেনে।
রিকশায় বসে মিজান বললো,"আমি মনে হয় কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি যে জসীম কি করবে আজকে।"
"মানে ফুর্তি?"
"হ্যাঁ- আমার মনে হয় ও আজকে আমাদের মদ খাওয়াবে।"
"মদ? মানে অ্যালকোহল?"
"হুঁ।"

উত্তেজনায় আমার বুক ঢিপঢিপ করতে থাকে।

(বাকী অংশটুকু পরের পর্বে)।

 

 

  • ১২ টি মন্তব্য
  • ৪৭৭ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ১১ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ২:০৪
comment by: মোসতফা মনির সৌরভ বলেছেন: ৫
২. ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ২:২২
comment by: লাল দরজা বলেছেন: ভাই আপনি পারেন ও, চালাইয়া যান পড়তেছি।
বাংলাদেশের চ্যানেল অলাগ লাইগা কখনো সময় সুযোগ হইলে দুই চাইরটা সিরিয়াল লেইখা দিয়েন দর্শক মজা পাইব। নো, আই এ্যম সিরিয়াস ম্যান আপনি যানেন কখন কাট বলতে হবে, কোথায় থামতে হয়। যা জানে না আমাদের দেশের বেশীর ভাগ সিরিয়াল নির্মাতারাই। মন চাইলেই বেরেক মাইরা কয়, অহন শেষ আর দেহামু না।
আপনাদের ফুর্তির কথা পড়ার আগ্রহে রইলাম...
৩. ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ২:২৫
comment by: ফারহান দাউদ বলেছেন: "মনে পড়লো ঈদের দিন বাবার আতরের গন্ধ, মায়ের রান্নাঘরের ব্যস্ততা, ছোটভাইয়ের সাথে কোলাকুলি, বোনটির হাতের মেহেদী। বুঝলাম বড় হয়ে গেছি"
খুব বেশি নস্টালজিক।
৪. ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ২:৩২
comment by: মেহরাব শাহরিয়ার বলেছেন: ৫
৫. ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ২:৪৫
comment by: ইয়াহইয়া ফজল বলেছেন: হ ভাই চালায়ে যান
৬. ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ৩:০১
comment by: ৃৃমম বলেছেন: ভালো লাগছে। মনে ভাবনা জাগছে: আমার যে দিন গ্যাছে, তার সবই কি গ্যাছে, কিছুই কি নেই বাকি? রাতের সব তারাই থাকুক দিনের আলোর গভীরে। ৫+
৭. ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ ভোর ৪:৫৪
comment by: রাশেদ বলেছেন: চলুক...
৮. ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ সকাল ৭:১৮
comment by: মুনিয়া বলেছেন: ৫
৯. ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ সকাল ৯:০১
comment by: নরাধম বলেছেন: প্প্ম্র......
১০. ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ দুপুর ১২:১৬
comment by: পজিটিভ বলেছেন: ধুর !! বাকী পড়বো গুলো দেন, নইলে আগুন জ্বালিয়ে দেব।
১১. ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ দুপুর ১২:৩৯
comment by: আলী বলেছেন: সেমাই এর নামে তারা যে জিনিসট সামনে এনে দিল, সেটি হাল্কা সাদা রঙ্গের একটি পাতলা লিকুয়িড। তার মাঝে কাঠির মতো কি সব জিনিস। ছোট প্লেট নেই বলে জিনিসটি আনা হয়েছে ভাত খাবার বিশাল থালায়। এবং ডাইনিং হলে কোন চামচ না থাকায় তরল পদার্থটি হাত দিয়ে খেতে হবে। এমন সেমাইয়ের ছবি তুলে রাখা উচিত ছিল।
১২. ২১ শে মার্চ, ২০০৮ রাত ১১:০৬
comment by: স্বাপ্নিক বলেছেন: +

 

 

comment by:
যতদূর গেলে পলায়ন হয়, ততদূর কেউ আর পারেনা যেতে।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই

সর্বমোট হিট

 ৭১৮২৪