বাবার বদলির চাকুরির সুবাদে, দেশের বিভিন্ন জেলায় কেটেছে শৈশব এবং কৈশোরের অনেকটা সময় এবং তিনি কৃষিবীদ হবার দরুন খামারবাড়ীতেই থাকত আমাদের বসবাসের জন্য বরাদ্দ বাসা। খামারবাড়ী গুলো সাধারনত ছিল, শহর থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে গ্রামঘেষে। তেমনই এক জায়গায় আমার শৈশব, কৈশোরের সময়টা কেটেছে। পুরো অফিস, অফিসের স্টাফদের বাসা সব মিলে একটা কলোনি।
বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে শেষে সেই আগের জায়গাটা থেকে বাবা অবসরগ্রহন করবেন। কি যে খুশি লাগছে, সেই পুরনো জায়গাটায় আবার যেতে পারবো। কত শত স্মৃতি.....সেখানে যাবার জন্য ছটফট করছি। ছোট বাচ্চাদের মতো কখন যাবো, কখন যাবো করছি। কটা দিন ঢাকায় থেকে একদম হাপিয়ে উঠেছি.....
সেখানে পৌছেই দেখি চারিদিকে খালি কুয়াশাচ্ছন্ন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামে তবুও সূর্যের দেখা মিলে না। বাসার সামনেই বিশাল বড় এক মাঠ। সেই সময় এমনকোনো দিন ছিল না যে এই মাঠে খেলিনি। তখন মাঠটাকে আমার কাছে অনেক বড় মনে হতো, আজ একটু ছোট ছোট লাগছে। কেন যে জানিনা...। মনে হয় আমার পৃথিবীটাই এখন ছোট হয়ে গেছে! সব খেলার সাথিদের কথা মনে পড়ছে, নাজু, ইতি, রনি, বিথী আরো কত কে। সবাই মিলে কত রকমের খেলাই খেলেছি- গোল্লাছুট, বউচি, কানামাছি, ব্যাডমিন্টন আরও কত খেলা। বাসার পিছনে ধান শুকোবার জন্য সিমেন্ট দিয়ে বাধানো খোলা ছিল। সেখানে বোমবাস্টিং, সাত চারা খেলতাম। সামনে দাড়িয়ে ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে আছি....। মস্তিস্কে, ছবির রিউয়াইন্ডের মতো একের পর এক দৃশ্য ভেসে উঠছে। সব জীবন্ত ছবি...।
মাঠটার পাশেই ছিলো ঘাটলা বাধানো পুকুর ( উপরের ছবিটা সেই পুকুরের)। আমার সাতার শেখার হাতেখরি এই পুকুরেই। একদিন তো পাল্লা দিয়ে এপার থেকে ঐ পারে চলে গিয়ে ছিলাম। এই পুকুর নিয়ে কত কাহিনী। পুকুরে ঝাপাঝাপি করার জন্য কত ফন্দিফিকির......তার পরেও ফিরে এসে মায়ের কাছে বকুনি অথবা পিটুনি খাওয়া অবধারিতভাবেই।
মায়ের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পাই, চল ঘরে চল শিশির পড়ছে মাথায়। ঘরে ফিরে মা পিছে পিছে ঘোরেন পছন্দের খাবার নিয়ে। যতই বলি পেট ভরা, তারপরেও এটা খা নইলে ওটা খা। আহা!! কত আদর.....। চোখটা শুধু শুধুই শিশিরে ভরে উঠে। বেয়ারা চোখ, একদমই কথা শুনতে চায় না.....
ঘোরের মাঝেই দিনগুলো কেটে যায়। একসময় চলে যাবার সময় এসে যায়। বন্দরে যান সবাই বিদায় জানাতে। বিদায়ের ঘন্টা সমাগত, সবাই কে বিদায় জানিয়ে, মাকে জড়িয়ে ধরি, দু মিনিট মায়ের বুকে মাথা রাখি। আহ! কি পরম শান্তি। পৃথিবীর সব সুখ, শান্তি যেনো এই এক জায়গায়। মা বলে মন খারাপ করে না। একসময় ইমিগ্রেশানটা পার হয়ে যাই, মায়াভরা মুখটা আর দেখতে পাইনা। মনে হয়, দৌড়ে গিয়ে আর একটিবার দেখে আসি ঐ মায়াবী মুখ.....শিকড় ছেড়ার কস্টে ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যায়....
দেশ থেকে ফিরে এসে কবে থেকে ভাবছি, কিছু একটা লিখবো। কিন্তু যখনই লিখতে বসি, তখনই কেমন একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে যাই। আজ সব কুহেলিকা উপেক্ষা করেই লিখে ফেললাম....।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০০৯ বিকাল ৫:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



