somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডলার, জোড়াপাতা পাসপোর্ট- সমস্যার কি শেষ আছে?

৩১ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১০:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বৃহস্পতিবার অফ ডে, তাই ঘুমোতে হবে বেলা ১২ পর্যন্ত। তাই ৯টা না বাজতেই কেন আমাকে ডাকাডাকি করা হচ্ছে তা বুঝতে পারছিলাম না। চোখ বুজে সেকেন্ড খানিক চিন্তা করার পর বুঝতে পারলাম আজকে পাসপোর্টে ডলার এন্ডোর্স করার কথা। লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম। মেলা কাজ- বেশ কয়েকটা ব্যাংক থেকে এজীবনে যত টাকা কামাই করেছি সব তুলে আবার অন্য আরেক ব্যাংকে গিয়ে নতুন এ্যাকাউন্ট বানিয়ে তাতে টাকা ভরে ও সাথে সাথে আবার সেই টাকা তুলে ডলার বানিয়ে পাসপোর্টে সেটার একটা প্রমাণ স্বরূপ সিল বসাতে হবে। এই ব্যাংকে যাওয়াকে আমি সবচেয়ে ভয় পাই , কারণ ২ মিনিটের সামান্য একটা কাজ কি করে ২ ঘন্টা লাগতে পারে তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ সোনালী ব্যাংক, বুয়েট শাখা। ব্যাংকের গেটে অবশ্য বেশ বড় বড় করে লেখা আছে - 'উদ্ভাবনী ব্যাংকিং' তাদের মূল বৈশিষ্ট্য।

আজকে কপাল ভালো আছে মনে হলো। চেক দিয়ে টাকা তোলার কাজটা মাত্র ১ টা অ্যাপ্লিকেশন আর হাফ ডজনের মত সাইন দেবার পর শেষ হয়ে গেল। ম্যানেজারের কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় সিভিলের বসুনিয়া স্যারের সাথে দেখা হলো। আমাকে উনি ব্রাক্ষ্ণণ হবার পরামর্শ দিলেন। তার ভাষায় আমেরিকায় দুই জাতের বাঙ্গালি পড়তে যায়। এর মাঝে যারা বুয়েটের ছাত্র তারা ব্রাক্ষ্ণণ, মানে জাতে শ্রেয়। স্যারের মেয়ে জামাই ব্রাক্ষ্ণণ নয়- আমাকে কথাটা বলার পর স্যারের মাঝে সামান্য একটু আক্ষেপের সুর অনুভব করলাম। (আমি ব্যাক্তিগত ভাবে এটাকে সমর্থন করিনা। বুয়েটের বাইরের যারা বিদেশে যাচ্ছে পড়তে, তারা বরং নিজ যোগ্যতায় যাচ্ছে, ইউনিভার্সিটির ইমেজকে তাদের কাজে লাগাতে হচ্ছেনা।)

যাই হোক, স্যারের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে গাড়ি ছুটিয়ে ইস্টার্ণ ব্যাংকে হাজির হলাম। পাসপোর্টে সব ব্যাংক ডলার এন্ডোর্স করতে চায়না। ইস্টার্ণ ব্যাংকের সাথে আগেই কথাবার্তা বলে তাদেরকে রাজি করিয়েছিলাম যে আমাকে যে করেই হোক হাজার খানেকের মত ডলার দিতে হবে, কারণ আমেরিকার ইউনিভার্সিটিগুলো পি,এইচ,ডি ছাত্রদের ফুল ফান্ডিং দিলেও স্টাইপেন্ডের প্রথম কিস্তি দেয় মাস তিনেক পর। বাসাভাড়া, কেনাকাটা এসবের জন্য অন্তত দুই হাজার ডলার আমাকে নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। আমি ইচ্ছে করলে পকেটে করে যে কোন পরিমাণ ডলার নিয়ে যেতেই পারি, কিন্তু কাজটা বেআইনি এবং একই সাথে রিস্কি। লোকাল লোকজনের কাছ থেকে ডলার কিনে নিয়ে তারপর আমেরিকায় গিয়ে আবিষ্কার করলাম যে সব ডলারই নকল, তখন পি,এইচ,ডির প্রথম কয়েক সেমিস্টার হয়ত আবু গারিব কারাগারে কাটাতে হতে পারে।

ইস্টার্ণ ব্যাংকে এ্যাকাউন্ট খুললাম। বেশ চিন্তা বিবেচনার পর তারা আমাকে ২০০০ ডলার ক্যাশ আর ১০০০ ডলার ট্রাভেলার্স চেক দিতে রাজি হল। এ্যাকাউন্ট খোলার জন্য মনে হলো প্রায় ডজন খানেক স্বাক্ষর দিলাম। ৩০০০ ডলারের সম পরিমাণ টাকা ডিপোজিট করার পর ভাবলাম আমাকে এখন ডলার দিয়ে দেবে। কিন্তু না, ডলার এন্ডোর্স করার জন্য এখন নাকি আমাকে 'স্টুডেন্ট ফাইল' খুলতে হবে। তার জন্যে ম্যাট্রিক, ইন্টারমিডিয়েট ও বুয়েটের সব সার্টিফিকেট ও মার্কশিট, ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার, পাসপোর্টের ফটোকপি, ছবি এসব চাইল। আমার কাছে কিছুই নাই, তাই আবার এগুলো নিয়ে ঘন্টা খানেক পর গেলাম। আজকে এর শেষ দেখেই ছাড়ব।

সব কাগজ পেয়ে মনে হলো ব্যাংকার সন্তুষ্ট। নিজেদের ফটোকপি মেশিনে আমার কাগজপত্র ফটোকপি করা শুরু করলো। ফটোকপি শেষ হলে একহাতে কাগজপত্র দেব আর অন্য হাতে ডলার পাব- এমনটা ভাবছি। বিধি অলওয়েজ বাম। পাসপোর্টের দুটো পৃষ্ঠা প্রচন্ড ভালোবাসা নিয়ে একে অপরের সাথে আটকে গেছে। আমার ছবি ও স্বাক্ষর যেই পেজে, ওটাতেই সমস্যা। এত নিখুঁত ভাবে দুটো পৃষ্ঠা আটকে আছে যে, পেজ নম্বর না থাকলে কেউ ধারণাই করতে পারবে না যে ওখানে দুটো পেজ আছে। আমি এখন কি করি? ডলার তো ছাই, আমার বোধহয় আর আমেরিকাই যাওয়া হচ্ছেনা। আমি মনে মনে ঠিকও করে ফেলছিলাম এবারতো বাদ হয়েই গেল, নেক্সট টাইমে আবার কোথায় এ্যাপ্লাই করব, ভাগ্যিস চাকরিটা এখনও রিজাইন দিইনি, এবার তাহলে বিয়েটা করেই যাব ইত্যাদি। নানান লোক নানান বুদ্ধি দিতে লাগলো- 'চাক্কু দিয়ে টান দিলেই হবে', 'ভাই, পাসপোর্ট অফিসে যান', 'ফ্লাইট তো দেরি আছে আরেকটা করিয়ে ফেলেন'- ইত্যাদি। একজনের বুদ্ধিটা ভালো লাগলো- 'নীলক্ষেতে একবার খোঁজ নিয়ে দেখেন- ওরা পারতে পারে।'

মাথায় সীমাহীন দুশ্চিন্তা বোঝাই করে নীলক্ষেতে এসে পাসপোর্ট দেখিয়ে দেখিয়ে খোঁজ করতে লাগলাম। সবাই বলল- 'স্বদেশ ফটোস্ট্যাট'। বিদেশে যাবার আশা আমার এই স্বদেশই পূরণ করতে পারবে। গিয়ে পাসপোর্টটা দেখাতেই স্বদেশের লোকটা বলল- 'কইতে হইবো না- ১০০ টাকা দিবেন'। আমি ১০০ ডলার চাইলেও আজকে রাজি। আমার হাত থেকে পাসপোর্ট ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অন্য আরেক দোকানে। আমি পেছন পেছন দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে সেখানে হাজির। গিয়ে দেখি লোকটা একটা গরম ইস্ত্রি দিয়ে কিছুক্ষণ ওটাকে ডলাডলি করে একটা সূঁচ টাইপ জিনিস ঢুকিয়ে ৫ মিনিটে কার্যসিদ্ধি করে ফেলল। আমি এবং পেজদুটোর মাঝে আটকে থাকা আমার পাসপোর্ট সাইজ ছবি দুজনেই একি সাথে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এটা নাকি খুবই কমন একটা প্রবলেম। লোকটা আমাকে স্ট্যাটিস্টিক্স সহকারে বলল যে, শতকরা ৯৯ জনের পাসপোর্ট নাকি এই সমস্যা যুক্ত।

শেষমেশ ডলার হাতে পেয়েছি। ব্যাগ ভর্তি টাকা জমা দেবার পর এই টুকুন ডলার দেখে মনটা একটু খারাপ লাগলো। হবে না কেন? আমেরিকা যে আমাদের চেয়ে ৭০ গুন বেশী ধনী। তবে একটা দিকে আমাদের দেশ সেরা। সেটা হলো- নীলক্ষেত। আমেরিকায় গিয়ে আমার প্রথম প্রায়োরিটির কাজ হবে সেখানে নীলক্ষেতের বিকল্প খুঁজ়েবের করা।



















সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১০:২৪
১৯টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×