শায়লার আজ মনটা খুব ভাল। ডাক্তারের কাছ থেকে এসেছে একটু আগে। এই সময়টা খুব ভাল কাটছে ওর! খুব উত্তেজনা, আর সব কষ্টের মাঝেও এক অন্যরকম ভাললাগা। সেই ছোটবেলা থেকে সবাইকে লুকিয়ে যেদিনের চিন্তা করছিল, যে অনুভূতির অপেক্ষা ছিল, সেটাই বাস্তবে ধরা পড়েছে আজ।
ছোটবেলার পুতুল খেলার সময় থেকে ‘মা - মা’ ব্যাপারটা খুব টানত। আর কৈশোর থেকে যখন আসলেই অনুভব করতে শিখল, তখন থেকে শত কষ্টের পরও মুখিয়ে থাকত। আর কখনও মাসের সেই বিশেষ কয়টা দিন একটু দেরি হলেই ভয় পেয়ে যেত ও। ভেতরে ভেতরে মা এর সত্তাটা জন্ম হয়েছিল বোধহয় তখন থেকেই। লজ্জা লাগত, কিন্তু কোন ছোট বাচ্চা দেখলে নিজের ভেতরের সেই মা’টা আদুরে হয়ে যেত, আর স্বপ্ন বুনতে শুরু করত নিজের একটা সন্তানের জন্য।
ছেলে মেয়ে দু’টোই খুব পছন্দ ওর। কিন্তু মেয়ের ব্যাপারে কেন যেন একটা দুর্বলতা কাজ করে। মনে হয়, মেয়েটাকে কি সুন্দর করে সাজাতে পারবে, মেয়েদের প্রতিটা মুহূর্তকে বুঝতে পারবে, মেয়েটাকে বুঝিয়ে দিতে পারবে....মা হয়ে মেয়েটার সবকিছুকে আপন করে নিতে পারবে! আর যখন যেভাবে ইচ্ছা নানান রকম সাজুগুজুর জিনিস কিনে সাজিয়ে দিবে তার কন্যাটাকে। এসব ভাবার জন্য নিজেকে তখন নিতান্তই ছেলেমানুষ মনে হত। লজ্জায় কাউকে বলতে পারতনা। সবাই যদি বলে, বেশি পাকামো ওর! কিন্তু ও জানে, সব মেয়েই কম বেশি মনে মনে মাতৃত্বের স্বপ্ন দেখে।
আজ তো সেই দিন! আজ ডাক্তার বলেছেন, ওর মধ্যে যেই প্রাণটা ছোটাছুটি করছে, সেটা ওর সেই কৈশোরের স্বপ্নের রাজকন্যাটা! ওর নিজের কেউ! যার জন্মটাতে ওরও অবদান থাকবে! যার প্রাণটাকে নিজের মধ্যে ধরে রাখার গর্ব আছে, কোন সৃষ্টির আনন্দ আছে, আর আছে প্রচণ্ডভাবে হারানোর ভয়। প্রচণ্ড উত্তেজনা, কবে আসবে রাজকন্যা তার এই বাস্তবের রাজ্যে!! কিন্তু নিজের ভেতরে একটা অদৃশ্য ছোট প্রাণ লুকোচুরি খেলছে ভাবনাটা যে ওকে কত স্বর্গীয় আনন্দ দেয়....সেটা শুধু ও-ই জানে।
খুব ফুরফুরে মেজাজে নিজের রুমে জানালার পাশের টেবিলটাতে বসে শায়লা। পড়ন্ত বিকেল। একটা ঠাণ্ডা বাতাস আসছে জানালার শিক গলে। হঠাৎ চোখে পড়ল কিছু খামের দিকে। হুম! আজ অফিস থেকে এগুলো ভর্তি ফাইলটা আনিয়েছে সে। একটি বেশ নামকরা পত্রিকার নারীপাতার সম্পাদক শায়লা। ফাইলের ভেতরেই ছিল খামগুলো। কিছু চিঠি। আস্তে আস্তে প্রথম খামটা খোলে শায়লা।
একটা বাচ্চা হাতের লেখা....লেখার ধরন দেখে বোঝা যায়, ১৫-১৬ বছরের একটা মেয়ে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক....পড়তে শুরু করল শায়লা।
“আমি তখন খুব একটা বড় না, ক্লাস থ্রি’তে পড়ি। সেদিন বাসায় ছিলাম, আমাকে একা রেখে বাবা-মা কোথাও যেত না। ঐদিন আমাকে আমাদের নিচতলার আমারই সমান এক বন্ধুর সাথে রেখে একটু কাছেই এক মামার বাসায় গেল, আমি আর আমার ঐ বন্ধু একই ক্লাসে পড়ি, একসাথে আম্মুর কাছে পড়তে বসতাম। আমরা খেলছিলাম, তখন কলিং বেল বাজল, দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললাম। ফুপির দেবর এসেছেন। আমাকে অনেক আদর করেন মামা। এবার পড়া শেষ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের। চাকরি খুঁজছেন।
কি হল আজ মামার?
ঐ রুম থেকে হঠাৎ ডেকে পাঠালেন কেন?
রুম অন্ধকার, মামা হঠাৎ কোলে করে নিয়ে আসলেন রুমে।
ছোট আমি তখন কিছুই বুঝতে পারছিলামনা।
কি হল? মামাকে আজ এমন কেন লাগছে?
মামা সামনে আসতে থাকলেন, চেনা মুখ কিন্তু আমি যেন ভয় পাচ্ছি তাকে।
“কি হয়েছে, মামা? লাইট জ্বালান, অন্ধকার কেন? কারেন্ট আছেতো মামা!”
মামা কিছু বলেন না। আবছা আলোতে দেখলাম, কেমন যেন একটা হাসি দিলেন। ভয় পেয়ে গেলাম আমি।
“মামা আমি ঐ রুমে যাব। অনিক বসে আছে। আমাদেরকে মা হোমওয়ার্ক দিয়ে গেছেন। আমার অন্ধকার ভয় লাগে মামা।”
মামা তাও কিছু বলেন না। শুধু হাসেন আর আস্তে আস্তে একদম কাছে চলে আসলেন। আর হাতটা তার আমার দিকে বাড়তেই থাকে...এবং আরেকটা হাত....!?
কোন কিছু না বুঝেই অনিকের নাম ধরে ডাক দিলাম....অনিক...অনিক..! অনিক দৌড়ে এলো। লাইট জ্বালিয়ে দিল রুমটার।অবাক হয়ে বলল-
“কি হয়েছে মামা? এরকম ভাবে আছেন কেন? লাইট জ্বালাননি কেন?”
ঐদিনের মত আপন আর কখনও মনে হয়নি অনিককে। মনে মনে ঠিক করলাম, ও যদি আমার হোমওয়ার্ক নকলও করে, মেয়ে মেয়ে বলে খেপায়ও, আর কখনো রাগ করবনা ওর সাথে।
.....আপু তখন আমি কিছু বুঝতামনা, কিছুনা। কিন্তু প্রায়ই এ স্বপ্নটা দেখে ভয় লাগত। মামা আসলে কেন জানি কুঁকড়ে যেতাম, কেন জানিনা। মাকে বলেছিলাম, মা আর বাবা একদিন উনাকে অন্যরুমে নিয়ে গিয়ে অনেক কিছু বলেছিলেন। এরপর থেকে ঐ মামা আর আমাদের বাসায় আসেননি। কিন্তু এখন যখন বুঝি, কেমন যেন লাগে আপু! ঐ দিনের ঘটনার মানে বুঝতে পেরে যেন আরও কুঁকড়ে যাই। দুঃস্বপ্নটার কারণ বুঝতে পেরে ক্রোধ অথবা ঘৃণায় ফ্যাকাসে হয়ে যাই, আমি ঠিক বুঝতে পারিনা। খুব ভয় লাগে আমার। আর সেদিনের অনিককে বারে বারে ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছা করে। আমার সেই ছোটবেলার বন্ধুটা না জেনেই যে কি করেছিল আমার জন্য, সেটা ওর মনে আছে কিনা জানিনা। আমি কি করে এই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাব আপু? একটু বলেননা?”
শায়লা চুপচাপ তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। নিজেকে এত তুচ্ছ লাগতে থাকে। কি বলবে ও এই না-জানা, না-চেনা মেয়েটাকে?
বেশ কিছুক্ষণ পর আরেকটা খাম খোলে সে।
“আমি রেহানা বেগম। বয়স প্রায় ৬০ এর ঘরে। একটা মাত্র ছেলে আমার। ছেলেকে বিয়ে দিয়েছি। ছেলের বাবা, আমি আর আমাদের ছোট সোনা মানিক মিলে খুব ছিমছাম দুনিয়া আমাদের। ছেলেটা বড় হয়ে যায়। দিনদিন দূরে যেতে থাকে যেন, আমার চোখের সামনে ছেলেটাকে বড় হতে দেখি।
ছেলের এখন আমার সবকিছু সেকেলে লাগে, আমি কেন এটা পারিনা, ওটা পারিনা- কত অভিযোগ ছেলের! আমার শুধু মনে পড়ে, তখন ছেলের প্রথম লিখতে শেখার কথা। কতভাবে যে শিখাতে চাচ্ছিলাম, নাহ সে লিখবেইনা! হাতে হাত ধরে লিখতে বসলাম। কত কি দেবার কথা বলে তাকে লেখানো সম্ভব হল। তারপর অংক করাতে বসা। ম্যাচের কাঠি দিয়ে সংখ্যা চেনানো। খুব বেশি শিক্ষিত না আমি। কিন্তু কাছের একটা স্কুলে শিক্ষকতা করতাম। ছেলে যখন পেটে আসল, তার পর থেকে আস্তে আস্তে গুটানো শুরু। আর পরে যখন ছেলেটা আসল, তখন ওকে কে দেখবে ভেবে আরও কাজ করা হল না। ছেলেকে মানুষ করাই প্রধান কাজ হয়ে গেল। একটু বড় হবার পর যখন ভাবলাম ঢুকি আবার। ওমা! ছেলের আমার কি রাগ! অভিমানের জন্য ভাতই খেলনা রাতে! দোলাচাল চলল মনে। নাহ! ঢুকবনা আর কাজে। সত্যিই তো! আমি না থাকলে ছেলেকে আমার দেখবে কে!
আজ ছেলে আমার সাথে ঠিক মত কথা বলেনা। ছেলের বাবাও আর বেঁচে নাই। চেষ্টা করলাম কাজে ঢুকতে। সেই স্কুলটাতেই আর নিল না আমাকে। বলল- বয়স বেশি। ছেলের বাড়িতে থাকি। চেষ্টা করি ছেলের আর ছেলের বউ এর মন জুগিয়ে চলতে, তাও ছেলে মাঝেমধ্যে খুব খেপে যায়। বলতো মা, আমি কি আসলেই এখনের সব বুঝি? এইসব কি ছিল আমাদের সময়? জানো মা, আমার শুধু তখন আমার ছেলের প্রথম দিনের লিখতে না পারার কথা মনে পড়ে যায়....?”
শায়লা আবারও তাকিয়ে থাকে। মন ভাল করা একটা দিনে কেন এমন সব চিঠি দেখতে হচ্ছে? কি করতে পারে ও? ভাবতে ভাবতে আরেকটা খাম খোলে।
ছোট একটা চিঠি।
“আর পারছিনা আমি আপু! পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়েছে, কিন্তু দিনদিন এভাবে নিজেকে বিকিয়ে দিতে পারছিনা। মাঝে মধ্যে নিজেকে খুব শরীরসর্বস্ব মনে হয়। আমারও কি একটা সত্তা নেই আপু? কেউ আমার চাওয়া পাওয়া, আমার খারাপ লাগা, ভাল লাগা, আমার স্বস্তি, আমার ইচ্ছার কেন কোন মূল্য দেয়না? বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা একজন মেয়ে হিসেবে এভাবে নিজেকে প্রতি পদে বিসর্জন দিতে দিতে আমি বুঝি নিজেকে হারিয়ে ফেলছি আপু। পরিবারকে বললে তারা কিভাবে প্রতিক্রিয়া করবে বুঝতে পারছিনা। তাদের হয়ত মনে হবে, আমারই সহ্য-ক্ষমতা কম। কি করব আপু? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা। একটু যদি বলে দিতেন....।”
শায়লা চোখ বন্ধ করে, চোখের কোণটা ভিজে আছে। একটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যাটা যেন অনেক বেশি মনখারাপ করা লাগতে থাকে। নিজের অজান্তেই একটা হাত চলে যায় নিজের পেটের কাছে। আর এই প্রথমবারের মত ভয় হতে থাকে, অন্যরকম। খুব আস্তে নিজের রাজকন্যাটাকে যেন বলে ওঠে-
“মা, তুই কি সত্যি আসবি? আমি কি পারব তোকে রক্ষা করতে? দিতে কি পারব এমন একটা সমাজ, যেখানে তোকে সব কথার পর দিনের শেষে এটা শুনতে হবেনা- ‘কিন্তু এটা তো মানবেই যে, একটা মেয়ে তুমি’?
কবে তোকে একটা মানুষ হিসেবে সবাই নিবে? তুই কি পারবি মা সবার চোখে নিজেকে একটা মানুষ হিসেবে প্রমাণ করতে? মা’রে....যদি না পারি আমি, যদি এইটুকু নিরাপত্তা দিতে না পারি, তবে তুই তোর মতই লুকিয়ে থাক। আমি আর স্বপ্ন দেখবনা মা তোর জন্য। আমার যে বড্ড ভয় হয়..........।"

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


