০১.
উল্টো যাচ্ছি। যা আশঙ্কা করেছিলাম তাইই ঘটেছে। উল্টো বসে আছি।
ইঞ্জিনের উল্টো। তার উপর যোগ হয়েছে কীটনাশকের গন্ধ। শোভনচেয়ারে ছারপোকা হয়েছে। ছারপোকা মনে হয় একপ্রকারের কীট। এবং যথারীতি অমর। জিন্দেগি মে কোই কাভি আয়ে না রব্বা। সুলতান খান শুনে যেনো গন্ধ তাড়ানোর চেষ্টা করছি। বিষের গন্ধ।
০২.
এই পথ যেখানে শেষ হবে তার যেকোনো একপ্রান্তে আমার জন্যে কেউ প্রতীক্ষা করে বসে আছে। সে সারক্ষণ প্রতীক্ষা করে। অথচ আমি কিছুই পারি না।
আমার ভয়ানক শূন্যতা দরকার।
০৩.
আপনিও তবে এই নগরের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছেন!
হয়তো।
আসছি, একটু দাঁড়ান।
লবণ তার মুদ্রা ভাঙতে পারে না। কিন্তু অহঙ্কারে একা পড়ে থাকে।
তার শূন্যতা অনুর্বর।
০৪.
সেখানে অন্ধকার থাকে আলোর মধ্যে। আলো আর তৃষ্ণা অবিমিশ্র হলে অন্ধকার ভাঙে তার গর্ভ। তার গর্ভের ঘ্রাণে বেলপাতার বন আলোসবুজ হয়।
অন্ধকার তোর মৃত্যু সুন্দর নয়।
০৫.
বেহাগের সময়। নিম আর পাথরের যৌবন খেলা করে চোখের ভিতর। ওগো চোখ, তুমি ধারণ করো সেইসব আরাধ্যপ্রান্তর।
প্রান্তর একদিন বিস্তারিত পানকৌড়ি হবে।
০৬.
আমি ঠিক করেছিলাম যাবো। আমি ঠিক করেছিলাম যাবো না। আমি আসলে কিছুই ঠিক করি নি। পৃথিবীর পাড়ে থরথর কাঁপছে ভয়। কোথায় চিন্ময়?
আমি কোথাও যেতে চাই না।
০৭.
এই ট্রেন কতোক্ষণ চলবে।
আমার অতৃপ্তশৈশবে একদিন আমি ঠিক করেছিলাম, পৃথিবীর সবচে’ দীর্ঘ গাড়িটার ড্রাইভার হবো। আমার ছয়সাত বয়সে প্রথম ট্রেনে চড়ি। ট্রেনের জানলা দিয়ে পাহাড় দেখতে ভালো লাগতো; এখনো লাগে। তবে এখন বেশি ভালো লাগে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে ছুটন্তট্রেন দেখতে।
পাহাড় থেকে ট্রেনকে খেলনাগাড়ি মনে হয়।
০৮.
আমার সাথে একজন কবি আছেন। বিষের গন্ধ। জামাকাপড়। সস্তার ব্যাগ। ডটপেন না বলপয়েন্ট। ঠুমরি, আরো অনেক গান আছে।
হাত আছে একটি, প্রধানত ক্লান্ত।
০৯.
দুদিক থেকে টানছে হাওয়া
কোথায় আমার হারিয়ে পাওয়া
ইদানীং বড়বেশি ক্লান্তি লাগে। আগে অনেক হাঁটতে পারতাম-- পথ সব রাখালের মতো ধূলি ধূলি চোখে বাঁশির সুর হয়ে যেতো, সুর হয়ে যেতো...
১০.
কলমের কালি শেষ হয়ে গিয়েছিলো। তাই মাঝখানে একটি দিন অন্যদিনে পা রাখলো, রাতের বেলা। কলম খুব দরকারি জিনিশ। অনেকটা আঙুলের মতো।
কলম হারালে পাওয়া যায়। আঙুল হারালে পাওয়া যায় না।
১১.
লোহা পরস্পর সঙ্গমে রত। একজন বৃত্ত। অন্যজন রেখা। প্রথমে আমার বিন্দুর কথা ভাবি। বিন্দু থেকে রেখা। আর রেখা থেকেই সবকিছু। সমস্ত আকার। এইসব বিশ্বব্রহ্মাণ্ড।
আমার রেখাকে ভালো লাগে। তার দেহের রেখাও সুন্দর ছিলো একদা। এখনো কি নেই?
দিল চিজ কিয়া হ্যায় আপ মেরে জান লিজিয়ে...
১২.
এই থানে ছুঁয়ে গেলে চন্দনরাত-- বর্ষা আনে না আর বাদলপ্রপাত। এতো শব্দ! হা ভগবান, কেনো তুমি এতো শব্দের উৎস হলে? তুমি তো ভগ-বান।
আমি নৈঃশব্দ্য, মৃত্যুসহচর। তোমার কাঠগোলাপের চারা তছনছ করি। ঢেঁকিকলে চালগুঁড়ো করে রুটি বানাই।
নৈঃশব্দ্য মানে একটি হাওয়াচুর চেরাইকল।
১৩.
উজ্জয়িনী পাঠ করি। সংস্কৃত বুঝি না কিছু। এটা ভয়ালরহস্যের নিধান। বাজারমূল্য তেমন নাই।
একবার দিঘিজলে ডুবে যেতে যেতে একটা ব্যাঙাচি ধরেছিলাম।
ব্যাঙাচির নাম পুঁই।
১৪.
ট্রেন থামছে ধীরে এটা কোন ইস্টিশন? ঝালমুড়ি খেতে ইচ্ছে করছে। এইখানে কি জোছনার পা আছে, নির্জনমাঠে?
১৫.
জাম, বুট. চাল একসাথে শুয়ে আছে ভিখিরির থালায়। ভিখিরির মুখে ফোকলা হাসি। আঁচলে বাঁধা মহাবিশ্বের সফেদ সব তরকারি।
একটা গান ধরো।
সে গোঁ গোঁ করে তিনটাকা পঁচিশপয়সা নিয়ে চলে গেলো, সাথে একটা শার্ট, শুধু একটা বোতাম নেই।
১৬.
উত্থিত আঙুল ফাগুনের গন্ধের ভিতর ঘুমিয়ে পড়েছিলো। জেগে দেখে সে একটা গাছ হয়ে গেছে।
গাছে কোনো ডালপালা নাই, শুধু পাতা আছে।
১৭.
রাত্রি যতো, যাত্রি ততো। মেঠোপথে ঘাস হয় আপনাকে কে বলেছে দাদাবাবু? আপনি একটা পারিজাত গাছ। বাঙলাদেশে আমরা যেটাকে মান্দারগাছ বলি।
১৮.
আমার বন্ধু জোনাক উড়ে উড়ে চলে যায়। ভরা পড়ে থাকে তার টাকিলার গ্লাস, কায়রোর আতর, বেনামি পর্দা, জার্নি বাই কার, কুটুকুটু খেলা এইসব। সে উড়ে যায়, উড়ে গিয়ে লুকোয় একটা কামিনীর ঝাড়ে, তুমুল অন্ধকারে। সেখানে তার সাথে একটি অর্ধসত্য সাপ দেখা করে।
সাপটির চিবুকের নিচে কাটাদাগ আছে।
১৯.
বাদামের ঘ্রাণ আসে। বাদামের বাড়িতে দুটো ঘর। তোমরা যারা এইভাবে থাকো তোমাদের সিঁথিপথে রামধনু নেই। বাজারি রঙ আছে।
রামধুনতে নয়টা রঙ।
২০.
আমি মাধব। আপনার সাথে পরিচিত হতে এলাম।
আমি তার সাথে হ্যান্ডশেক করলাম।
শুভ জন্মদিন।
ধন্যবাদ।
একটা কথা।
কী?
আপনি যে সিটে বসে লিখছেন, ঠিক একই সিটে ওই মাথায় বাথরুমের সাথে লাগোয়া সিটে বসেই আরেকজন আপনার মতো একটা প্যাডে কিছু একটা লিখছে।
co-incidence.
হ্যাঁ।
মাধব চলে গেলো। আমি সম্ভবত তার কলম দিয়েই বাকিটা লিখছি। ও হ্যাঁ, ব্যাপার টা co-incidence নয়, কাকতাল মানে crow-incidence.
২১.
আমার চিবুকের নিচে একটা কাটাদাগ আছে। এটা হতে পারে আমাকে সনাক্ত করার চিহ্ন। আর শাদা আর কালোকেও আমি রঙ মনে করি। সুতরাং রঙধনুতে নয়টি রঙ।
২২.
পৃথিবীর ডাবক্ষেতে ঝুলে আছে শেয়ানা বানর। পরলৌকিক নদীদল ক্ষয়ে গেছে পাহাড়ে পাহাড়ে। নানারকম কীটের কামড়ে মনে হচ্ছে আমার প্রাণ আছে।
ছারপোকারা জানালো আমিও প্রাণি।
২৩.
এই ট্রেন মনে হয় দীর্ঘদিন জঙ্গলে ফেলে রাখা হয়েছিলো। এখানে শুধু ছারপোকা নয় পৃথিবীর যাবতীয় কীটপতঙ্গ বাসা বেঁধেছে, উড়ে বেড়াচ্ছে। বিষের গন্ধে তারা আনন্দিত। মাংসের গন্ধ পাচ্ছি, সেহেরির বাকশে। আহা। গাড়ি তারমানে বাড়ি ঢুকতে বেশিক্ষণ নেবে না।
ক্লান্ত আঙুলদল, এবার হাওয়ার ছায়া হও।
------------------------------------------------------------------------------
রচনাকাল: ২৪-০৮-০৯.

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

