০১.
কেউ তো জানে না কিছু, হাওয়ার ওপাশে কে আসে ভেসে; কে আসে ঝিরিঝির ঝিরিঝির...
বেকেটকে অ্যাবসার্ড বলার মানে নাই; প্রকৃত অর্থে আমরা প্রত্যেকেই গডোর জন্যে প্রতীক্ষা করি।
০২.
যেমন ধরেন, এক বিকেলে যে কোনো যেটি একটি পদ্ধতির দিকে যাবে অথবা প্রমাণের অসমতল সরঞ্জামের সঙ্গে পরিচালনা করে একটি ধারণার দিকে শব্দ, বিশেষভাবে একটিতে একটি যে জীবন্ত এবং মতাশালী, সাময়িক রচনার আকার একটি রৈখিক, লাগাতার প্রেরিত দাবীর সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু জিনিশ উপযুক্ত মনে হয়েছিলো।
এমন দীর্ঘবাক্য অনেকেই লিখেছেন। কমলকুমার মজুমদারের একবাক্যে লেখা একটা উপন্যাস আছে।
০৩.
কবি অমিত চক্রবর্তীর বিকেল বিয়ষক কবিতা পড়তে গিয়ে মনে হলো বিকেল আমার কাছে গডোর জন্যে অন্তহীন প্রতীক্ষা ক্ষমাহীন প্রার্থনা, স্বপ্নের ভিতর ইফেলটাওয়ারের আকাশছোঁয়া ক্যাফেতে বসে এক কাপ ব্ল্যাক কফির স্বাদ। বিকেল আমার কাছে অর্থহীন রুমালের পাড়ে স্মৃতির বিষণ্ন ফুটো, উঁকি দেয় শঙ্খের নানাবিদ অস্থি আর অস্থিরতা পরম, ভিনেগারে ডুবে থাকে জলপাইবিতান আর কাজুবাদাম; মালাইকার আর স্যাকরার দোকানের পাশে পাশে হেঁটে পুড়ে যাওয়া অভিমান। বিকেল একটি জিরাফের দীঘলশ্বাস উড়িয়ে নেয় লেখার সমস্ত অরপাপ। এবং বিকেল আমার কাছে ছয়টি তারের মীড়ে কেটে যাওয়া আঙুলের গতি।
বিকেল মানে ছাতের আকাশে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে অমৃত কবি অমিত চক্রবর্তী।
০৪.
চাঁপাদিদি তার অপছন্দের মানুষদের একখানি তালিকা প্রস্তুত করেছে। তালিকায় আমি দৃশ্যমান। দিদি আমার নামের পরে লিখিছে, সে কোনো মানুষ কিনা আমার সন্দেহ আছে...। দেখলেই মন চায় গুলি করে দিতে... টিশিয়া... টিশিয়া...
দিদির সাথে কখনো মুখোমুখি বসি নি। তার খাতায় গিয়ে আমি চুপিচাপ লিখে দিয়ে এসেছি, হ! আমি কোনা মানুষ না, আমি হইলাম ভূত। ভূতুম!
০৫.
তার দুইটা কাঁথা ছিলো। আমার গায়ে দেয়ার কিছু ছিলো না বলে সে একটি কাঁথা আমাকে দিয়ে দেয়। নক্শিকাঁথা নয়, এমনিতেই শাদামাটা একটা কাঁথা। শুধু কাঁথার গায়ে রোদ রোদ একটা ব্যাপার ছিলো, এই যা।
তুই ভিলানেল খরা হলে কেউ মন্দাক্রান্তা বর্ষণ। কে আসে?
০৬.
বিকেল ঘনিয়ে আসে পাড়ার ছাদে। মেয়ে! আমি তোর দেয়া কাঁথাটা জড়িয়ে শুয়েছি। দেখছি বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি থেমে গেলে মেঘ উড়ে যাচ্ছে বৃষ্টিদগ্ধ আকাশের তলে। ওরা বিরামহীন। সিক্ত শীতল হাওয়া আগুন হয়ে আসে। তোর কাঁথাটা আমাকে যেনো বা দীঘল নদীর বাঁকে।
তুই যেদিন কেঁদেছিলি সেদিন মেঘ ছিলো না কোথাও। তারপরও মেঘহীন বৃষ্টিপাতে ধূলিরা রামধনু হলো। তুই জানিস না।
মুহূর্তের সুখের তলে হাহাকারে অতলান্ত যন্ত্রণা। তাও কি জানিস?
তোর কাঁথাটা জড়িয়ে শুয়েছি। মাঝে মাঝে এভাবেই হয়ে যায়, হয়ে যায়...
০৭.
বৃষ্টি নামে, রোদ উড়ে, মেঘচিল ডানা ঝাপটায় দিনে অথবা রাতে। যদিও এইখানে নগ্ন আগুন নিঃশ্বাস রাখে এক চুমুক তৃষ্ণা-- মেয়ে, তোর কাঁথার ভাঁজে আমি। মধ্যে মধ্যে কাঁথাটা বুটিদার হয়ে উঠে; কখনো ধীরে কোমল, ননীর মতো, অথবা প্লাবনরে মতো; ভাসায় না-- কেবল জড়িয়ে রাখে। তোর চিন্ময় স্তনের নিত্যতা...
মেয়ে, তোর দেয়া কাঁথাটির ভাঁজে আমি কাঁপি পৃথিবীর প্রথম পুরুষ।
০৮.
কবিতাকে কেবলি মন্ময় মনে করা কি ভুল? কবিকে হয়ে উঠতে হবে মাধ্যম, পরম ব্রহ্মার প্রতিনিধি, যিনি কবির ঠোঁট ব্যবহার করেন নিজেকে খোলার জন্যে?
দৃশ্যসকল অতিক্রম করার সাহস দেখাতে হবে কবিকে?
র্যাঁবো, তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দিয়ে ভের্লেনের বুকে গুলি চালাও, এর আগে নয়।
০৯.
ইকারুসের ছিলো সূর্যপ্রেম। তাই ডানার মায়া তাকে আচ্ছন্ন করতে পারে না। ডানা তার কাছে কেবলই মোম এবং সূর্যের স্পর্শ পাওয়ার সিঁড়ি। কোনো একটির জন্যে একটি প্রদত্ত। এইটিতে বিশ্লেষণ করে ভাগাভাগি করে; সব কিছু তার অভিপ্রায়, প্রদর্শন করা সহজ সুরলোক।
একদিন যদি ইকারুস হতে পারি পতনের আগে সূর্যকে ছুঁয়ে দেবো ঠিক।
১০.
বিশ্বের অনেক জিনিশের নামকরণ করা হয় নি; এবং অনেক জিনিশ, এমনকি যদিও তাদের নামকরণ করা হয়েছে, কখনও বর্ণনা করা হয় নি।
এটি মুদ্রণের দিকে ভেঙেছে। এ সম্বন্ধে কথা বলে যদি আত্মহারা করা যায়, এটি তার জন্যে যোগান দেবে অথবা সংঘাত এর মর্যাদা স্থির সংকল্প করে। নিজের জন্য, আমি, এবং আমার একটি সংঘাতে আমাকে দৃঢ়ভাবে আঁকা হয়, এবং এর মধ্যে দৃঢ়ভাবে এর সম্বন্ধে কথা বলতে চাই।
আমরা পাতার বাচালতায় মুগ্ধ হয়ে ভুলে যাই বাতাসের নীরঙ আচরণ।
১১.
কারো ইতিহাস আঁকতে একটি নাম গভীর প্রয়োজন বোধ করে পরিবর্তন আনে। যদিও আমি সম্বন্ধে কেবল কথা বলছি-- একটি এর সম্বন্ধে এবং যে অন্যান্য জিনিশের মধ্যে গুরুতর রূপান্তর দেখে। এগুলি বেশীরভাগ শুদ্ধভাবে সেই রহস্যময় আকর্ষণগুলিকে শ্রেষ্ঠত্বের অধীনে আনা হয়। যেমন, জীবনানন্দের ডাক নাম মিলু। আর বিনয় মজুমদারের ছেলের নাম কেলো।
১২.
কিছুই না, আরও বেশি চূড়ান্ত আবেগে দৃষ্টিগোচর স্বাদ এবং আইন আছে। মেধা, ভালো হিশেবে স্বাদের একটি ধরন সত্যি: চিন্তাসমূহে স্বাদ হতে ঘটনার একটি খুব বিকশিত রূপ মূল্যবিচার প্রবণ হয়। এটি বিরল যে একই পদ্ধতি একটি যুক্তির মতো; যেটি একটি নিশ্চিত স্বাদকে বৃদ্ধি হতে দেয়। যেমন, বৃষ্টির স্বাদ নোনতা নয়, কিন্তু চোখের জলের লাবণ্য ঠিকই ধরা দেয় নিবিড় চুম্বনের কালে।
১৩.
প্রিয়তম অসুখ এসে শাদা করে দিয়ে যাক বিছানার মলিন চাদর। চোখে নামুক উজ্জ্বলতার দুপুর। দুপুরের হলুদ বাগানে জ্বরাক্রান্ত পেয়ারা পরে আছে সবুজপাতা; আমি তার সহচর হবো।
আমি উড়াই সুতোছেঁড়া সুখের ঘুড়ি; লাটাই আছে সুতোও আছে। শুধু সংযোগহীন তৃপ্তি। সে বুঝি আমাকে উড়ায়, নাকি আমি।
চন্দনের ঘ্রাণে রাত আরো নিঝুম আর প্রগাঢ় হলে ছায়াহীন হরিণেরা আসে। তবে তো অভিমান ভেঙে গেলো জলোচ্ছ্বাসে একাকার, বাসুকীজলের তলে দেখা হলে আবার পেয়ারার বনে শীতকাল বিবসন, বর্ষার ছায়ায় ঘনাবে গাঢ় হনন...
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০১০ দুপুর ১:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



