টমের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে আমি কষ্ট পেতাম ঠিকই-কিন্তু মেনে নিতাম।কিন্তু টমের মৃত্যু ছিল একটা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র যা আমি আজও মেনে নিতে পারিনি।ঢাকা থেকে ফিরে এসে সব শুনে আমি গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদেছিলাম।আমরা যেদিন ঢাকায় আসি সেই দিনই বিকালে কিছু সন্ত্রাসী টমকে ধরে নিয়ে যায় এবং টমকে জবাই করে ভুরিভোজের আয়োজন করে।সেই সন্ত্রাসীরা ছিল এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ছেলেএবং তাদের বন্ধু-বান্ধব।আব্বুর কিছু কলিগও এর সঙ্গে জড়িত ছিল।আমাদের পারিবারিক সমৃদ্ধির প্রতি তারা ঈর্ষান্বিত ছিল।তারা চেয়েছিল আমাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলতে যাতে আমি আসন্ন বৃততি পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করি।তারা ভালো করেই জানতো টম আমার একটা অংশ।কোনোভাবে টমের ক্ষতি করা হলে আমার ওপর তার প্রভাব পড়বে ভয়াবহ।
টম মারা যাবার পর আমি ভীষণভাবে মুষড়ে পড়ি।সাতদিন কোন খাবারই মুখে তুলতে পারিনি।সারাক্ষণ টমের কথা ভাবতাম আর কাঁদতাম।কি স্কুলে,কি বাসায় কোন জায়গাতেই চোখের পানি বাঁধ মানতো না।শুধু মনে হতো আমার জন্য টমকে প্রাণ দিতে হয়েছে,আজো তাই মনে হয়।তবে আমার টিচার আর আব্বু-আম্মুর অক্লান্ত সহযোগিতার কারণে বৃততি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃততি পেয়ে শত্রুদের আশা পূরণ হতে দিইনি।আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আমি শত্রুদের জিততে দেবো না।কারণ ওরা জিতলে আমার টম কষ্ট পাবে-আমি তা কিছুতেই হতে দিতে পারি না।
আমার স্কুলে যাবার পথে একটা হোটেল পড়তো।সেখানকার বাবুর্চি ভাইয়ের সঙ্গে আমার বেশ খাতির ছিল।সন্ত্রাসী ছেলেগুলো ওই বাবুর্চি ভাইয়াকে দিয়েই টমের মাংস রান্না করিয়েছিল।উনি অবশ্য জানতেন না যে ছাগলটা আমার।আমি আবার ঘটনাক্রমে ব্যাপারটা জেনে যাই।তারপরও তাকে ক্ষমা করে দিয়ে আগের মতোই আন্তরিক ব্যবহার করতে থাকি।যেদিন তিনি অন্যের কাছ থেকে পুরো ব্যাপারটা শোনেন এবং দেখেন যে সব কিছু জানার পরও আমি তার সাথে আগের মতোই আন্তরিকভাবে কথা বলি সেদিন তিনি ভীষণ অবাক হন।এরপর প্রায় এক মাস উনাকে আমি হোটেলে দেখতে পাইনি।হঠাত একদিন তাকে দেখি রিকশা চালাতে।
আমি অবাক হয়ে কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন,যে হাতে আমি আপনার ছাগলের মাংস রান্না করেছি সে হাত দিয়ে আর কোনদিন কোনো কিছু রান্না করা আমার পক্ষে সম্ভব না।তার এই কথা শুনে সেদিনও আমি চোখের পানি আটকাতে পারিনি।মনে হয়েছিল,সমাজে যারা তথাকথিত উঁচুদরের মানুষ তাদেরই বিবেক বলতে কিছু নেই।আর সমাজের চোখে সামান্য বাবুর্চি ভাইয়ের মতো বিবেকের তাড়না কতোই দুর্লভ! সেদিন আমি বুঝেছি মনুষ্যত্ব আসলে সবার মাঝে থাকে না-সবাই অর্জনও করতে পারে না।
আটটা বছর পার হয়ে গেল-টমকে হারিয়েছি।কিন্তু টমের সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত আজো আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে।এখনো মনে হয় টমের শেষ মুহূর্তের কথা।অনুভব করি ওর কতোই না কষ্ট হয়েছিল!টম নিশ্চয়ই শেষ মুঞূর্ত পর্যন্ত আমার জন্য অপেক্ষা করেছিল।আশা করেছিল তার বোন যে করেই হোক টম ভাইকে বাঁচাতে আসবে।কিন্তু আমি পারিনি-পারিনি ওকে বাঁচাতে।
আজো রাতের আকাশে হাজারো তারার মাঝে আমি টমকে খুঁজে বেড়াই।আজো ওর কথা মনে করে হাউমাউ করে কাঁদি। মাঝে মাঝে ভাবি-টমেরও কি আমার জন্য কষ্ট হয়? টমও কি ওই দূর আকাশ থেকে আমাকে খুঁজে বেড়ায়??
হয়তো বা হ্যাঁ.......হয়তো বা নয়......।
বি.দ্র.-লেখাটি এ বছর যাযাদি ভালোবাসা সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। ২রা নভেম্বর আমার সেই কষ্টের দিন যেদিন আমি টমকে হারিয়েছিলাম।তাই সবার সাথে আমার কষ্টটুকু ভাগ করে নিতেই লেখাটি ব্লগে পোস্ট করলাম।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০০৭ দুপুর ১২:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



