তাহের, জাসদ এবং ৭ই নভেম্বরে জিয়ার উত্থান নিয়ে অতি নিকট ভবিষ্যতে অনেক কথাই বলা হবে, এবং আমার ধারণা, আগামী মাস থেকেই এমন অনেক লেখায় পত্রিকা আর ব্লগগুলো ভরে উঠবে। এসব লেখায়, আমার ধারণা, তাহেরের ফাঁসি আর জিয়ার উত্থানের মধ্যে যে সম্পর্ক আছে, তা নিয়ে কেউ কেউ এক চোখ বন্ধ করে মন্তব্য লিখে যাবেন। বেশির ভাগ লেখাতেই তাহেরকে ‘ত্যাগী’ আর জিয়াকে ‘ তাহেরের কৃত কর্মের বেনিফিসিয়ারি’ বা সংক্ষেপে ‘বেঈমান’ বলে চিত্রিত করা হবে। আফসোস, আসল কথা কেউই বলবেন না। বলবেন না যে জিয়া আর তাহের দুই জনেই ছিলেন একই সময়ে ক্ষমতা প্রত্যাশী দুই ব্যক্তি।
তাহের কেন বংগবন্ধু সরকারের সময়ে [ এখন তাহেরের অনুসারীদের কথা মোতাবেক ১৯৭২-৭৫ ছিল স্বর্ণ যুগ ] কুমিল্লার ৪৪ ব্রিগেড কমান্ড থেকে বিদায় নিয়েছিলেন ১৯৭৪ সালে? সে সময়ে সেনা প্রধান কে ছিলেন? তিনি কি জানতেন না যে তাহের সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেবার পর থেকে সরকারবিরোধী কর্মকান্ডে লিপ্ত ছিলেন? সে সময়ে ৪৬ ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল জিয়াউদ্দীন তার অধীনে থাকা সৈনিকদের সামনে গণবাহিনী তথা জাসদের পক্ষে জ্বালাময়ী ভাষণ দেবার মত ঔদ্ধ্যত কি ভাবে দেখাতে পেরেছিলেন?
সময়টা খেয়াল করুন। সে সময়ে ক্ষমতায় কিন্তু শেখ সাহেবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার, এবং অব্যাহতি পরেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি আসবে ‘বাকশাল’ সরকার। সে সময়ে শেখ সাহেব হবেন আজীবনের প্রেসিডেন্ট। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘জাতির পিতা’ শব্দটি সংবিধানে প্রবেশ করবে। আমরা সেই মহেন্দ্রক্ষনে সংসদীয় ধারার সরকার পদ্ধতিকে বিদায় জানাচ্ছি, চলে যাচ্ছি সর্বময় ক্ষমতার প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির দিকে।
১৯৭২ সালে নতুন সংবিধান প্রনয়ণের জন্য ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে গণপরিষদ সদস্যরা যে দায়িত্ব হাতে নিলেন, তার শেষ দেখা গেল একই বছরের শেষের দিকে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সেই সংবিধানে সই করলেন না, আর সিরাজুল ইসলাম খান বেরিয়ে গেলেন বংগবন্ধুর ছায়াতল থেকে, গঠন করলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, সংক্ষেপে যাকে আমরা চিনি জাসদ নামে। সে দলে ছিলেন সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল, হাসানুল হক ইনু, আনোয়ার হোসেন, শাহজাহান সিরাজ, আ স ম আ রব, প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।
সরকারের বিরোধী হবার কারনে কিনা জানি না, মেজর জলিলের বীর উত্তম খেতাবটি কেড়ে নেওয়া হল ১৯৭৩ সালে। এ নিয়ে তিনি উচ্চবাচ্য করেন নাই। না তাঁর সহযোগীরা কোন উচ্চবাচ্য করেছেন পরবর্তী কালে। তেমন কোন দলিল আমার গোচরীভূত হয় নাই।
জাসদ ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েও ভালো করতে পারলো না। তাদের অনেক প্রার্থীকে হারিয়ে দেওয়া হলো। যেটাকে অনেকে, শেখ সাহেবের মৃত্যুর পরে, ভুল রাজনৈতিক চাল হিসাবে দেখেছেন।
নবগঠিত জাসদ-এর সভাপতি হলেন জলিল সাহেব, আর সাধারন সম্পাদক হলেন আ স ম আ রব সাহেব। সরকারের অজান্তে গঠিত হল জাসদের গোপন সামরিক শাখা, যার নাম ছিল গণবাহিনী। পূর্বে উল্লেখিত কর্নেল তাহের তার অবসরের পরে এই গণবাহিনীর দায়িত্ব নেন।
কিছু দিন আগে ‘ক্রাচের কর্নেল’ নামে এক উপন্যাস বেরিয়েছে। তাতে কর্নেল তাহেরের জীবনী নিয়ে বিস্তারিত লেখা হয়েছে। আমার মত সাধারণ পাঠক তা পড়ে যা বুঝেছিলাম, তার সারমর্ম হচ্ছে এমন “তিনি একমাত্র বিপ্লবী যিনি বিপ্লবের কথা মাথায় রেখে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন”। তিনি ছিলেন একজন ‘রোমান্টিক বিপ্লবী’। আমার জানা মতে রোমান্টিক বিপ্লবী তারাই হন যারা তাদের অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন না, এবং ক্ষমতার ‘রেসে’ তারা হেরে যান। ১৯৭৫ সালের ক্ষমতার দৌড়ে তাহের ছিলেন তেমনই একজন ‘রোমান্টিক বিপ্লবী’।
যাই হোক, আমার আসল কথায় ফিরে আসি। কর্নেল জিয়াউদ্দীন জাসদের পক্ষে জ্বালাময়ী ভাষন দেবার পরে সরকার সেনাবাহিনীতে খোঁজাখুজি করে গণবাহিনীর ‘এলিমেন্ট’গুলোকে বের করতে সচেষ্ট হয়। তৎকালীন মুজিব সরকারের জন্য জাসদ আর গণবাহিনী ছিল অত্যন্ত বিরক্তিকর, বিব্রতকর ও আতংককর একটি বিষয়। সে সময়ে বাবরিওয়ালা বেলবটম প্যান্ট পরিহিত যুবকদের সংগঠন জাসদ ছাত্রলীগের কাছে মুজিবের ছাত্রলীগ অসহায় হয়ে পড়ে।
মুজিব সরকার বেশী মাত্রায় ভোগান্তিতে পড়ে যায় যখন জাসদের ছেলেপেলেরা প্রভাবশালী মন্ত্রী মনসুর আলীর হেয়ার রোডের মন্ত্রী পাড়ার বাসায় আক্রমন করে বসে। সে ঘটনায় অনেক হতাহত হয়েছিল বলে খবরে প্রকাশ। এই মনসুর আলী যারা চিনেন না, তাদেরকে বলি, এই মনসুর আলী হলেন এখনকার সদ্য-প্রতাপহীন মোহাম্মদ নাসিমের পিতা।
জাসদের ভাষ্য মতে ৭ নভেম্বর তাদের সৃষ্টি। যদি তাইই হয়ে থাকে, তা হলে তো ৭ নভেম্বরের ‘বিপ্লবে’র ফসল তাদের ঘরে ওঠার কথা। কোন ভাবেই তো তা হাত ছাড়া হয়ে জিয়া নামক ‘বেঈমানে’র হাতে যাবার কথা না। প্রশ্ন হচ্ছে সে দিনে সৈন্যরা কেন জিয়ার মুক্তিকে বড় করে দেখেছিলেন? কেন তাহেরের নেতৃত্বে গণবাহিনী সেনানিবাসের সাধারণ সৈনিকদের তাদের পক্ষে নিতে ব্যর্থ হয়েছিল?
জাসদের সেই সময়কার রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন যে কয়জন, তাদের এক জন হলেন হাসানুল হক ইনু; আরেকজন হলেন তাহেরের ছোটভাই, গণবাহিনীর নেতা আনোয়ার হোসেন; অপরজন তাহেরের সাথে সাজাপ্রাপ্ত তার ভাই আবু ইউসুফ। ইনু এখন মহাজোটের প্রভাবশালী নেতা, আনোয়ার হোসেন এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং এরা দুইজনেই প্রচন্ড আওয়ামী। আবু ইউসুফ এখন খুব একটা আলোচনায় আসেন না। যাঁরা উৎসাহী, তারা কিন্তু একটু খোজ করলেই তাহেরের সে সময়কার সহযোগীদের খুঁজে পেতে পারেন।
যেহেতু জাসদ কৃতিত্ব দাবী করে, তাই তাদের কাছেই নীচের প্রশ্নগুলি করা যায়।
১। কেন বেআইনি গণবাহিনী কতৃক সেনা ছাউনির সেনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল যার ফলশ্রুতিতে তারা উচ্ছৃংখল হয়ে ‘চেইন-অব-কমান্ড’ ভেঙ্গে ফেলে?
২। তাহের ও তার অনুসারীরা কেন একটি সুশৃংখল সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ সংগঠনের চেষ্টা করেছিলেন? কেন তারা প্রতিষ্ঠিত সরকারের মন্ত্রীর বাড়িতে সশস্ত্র হামলা করেছিলেন যা কিনা একটি রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কাজ?
৩। কেন সে সময়ে [ মনে রাখতে হবে সে সময়ে দেশের স্বাধীনতার বয়েস মাত্র পাঁচ বছর ] সেনাবাহিনীকে খেপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রকে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নেয়া হয়েছিল? সেখানে কার স্বার্থ জড়িত ছিল?
৪। তথাকথিত বিপ্লবের নামে কেন মধ্যসারির সেনাকর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়েছিল?
সঠিক ইতিহাস জানার কথা আমাদের নেত্রী বলেছেন। তিনি সঠিক ইতিহাস বলতে কি বুঝিয়েছেন আমি জানি না। ইতিহাস কখনোই কারো পক্ষে যায় না, না তাকে কারু পক্ষে টেনে নেওয়া যায়। ইতিহাস নির্মম, নিষ্ঠুর। ইতিহাস যেমন ‘বংগবন্ধু’ সৃষ্টি করে, তেমনই সেই বংগবন্ধুর করুণ পরিণতির কথাও লিখে রাখে। ইতিহাস যেমন জিয়াকে ক্ষমা করবে না, তেমনি তাহেরকেও কি ইতিহাস থেকে ক্ষমা করাতে পারবেন তার স্বজনেরা?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


