আজকে "ক্ষ" ব্যান্ডের গাওয়া আমার সোনার বাংলা গানটির উপরে একটি লেখায় মন্তব্য করতে গিয়ে এই ব্লগের সূত্রপাত। সেই লেখার সাথে আরো কিছু যোগ করেছি আমি ব্লগটি লেখার সময়ে। আমি গায়ক না, তবে আর সবার মত আমিও গান শুনতে ভালোবাসি, ভালোবাসি গানের সুরগুলোকে নিয়ে যারা খেলেন তাদের সেই যুগান্তকারি কাজগুলোকে।
শুরুতেই বলে নেই, আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের সাথে রবীন্দ্রনাথের গানকে গুলিয়ে ফেলা উচিৎ হবে না। আমি অন্তত সেই ভাবে দেখি। জাতীয় সংগীত আমাদের গর্ব, আমাদের চোখের জল। বিদেশের মাটিতে এই গান গেয়ে কতবার যে আমি নয়ন জলে ভাসি, তার কোন ইয়ত্তা নেই।
যদি স্মৃতি আমাদের পীড়া না দেয়, স্মরণ করে দেখি কিশোর কুমারের গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গানগুলোকে। উনি যে ঢং-এ সেই গানগুলি গেয়েছিলেন, সেই ঢং সেই সময়ে কেউ মেনে নেয় নি, উল্টো রবীন্দ্রনাথের গানকে কিশোর কুমার কলংকিত করেছেন বলে রব উঠেছিল। সেই রব হারিয়ে গেছে, রয়ে গেছে কিশোর কুমারের রেখে যাওয়া সেই গায়কি। একটুকু ছোঁয়া লাগে কিংবা মায়াবন-বিহারিনী-হরিনী কিশোর কুমার যেভাবে "লুকোচুরি" সিনেমাতে গেয়েছিলেন, তার থেকে বর্তমানের কোন শিল্পী কি সরে আসতে পেরেছেন? পারেন নাই। কেন পারেন নাই? কেননা হয়ত মূল সুরের চেয়ে এই গায়কীটাই সবার মনে ধরেছে। তাই রবীন্দ্রনাথের গানের পরিবর্তন হতে যে পারে না, সেইটা ভুল ধারনা।
সত্যজিৎ রায়কে চিনেন না এমন বাঙালি ব্লগার পাওয়াটা দুস্কর। উনার "চারুলতা" [ ব্লগার শার্লককে ধন্যবাদ, আগে ভুল লেখা হয়েছিল "ঘরে বাইরে" ] সিনেমাতে আমি চিনি গো চিনি তোমারে / ওগো বিদেশিনী গানটি যেভাবে ব্যবহার হয়েছে, তাতে কি রবীন্দ্রনাথের গান পচে গিয়েছে? আর সত্যজিৎ রায় রবীন্দ্রনাথের কাজকে বিকৃত করবেন, এইটাও কেউ আশা করে না। কিন্তু এই গানের শেষে একটু টুইস্ট দেওয়া আছে, না শুনলে বুঝতে পারবেন না কেন সৌমিত্র গেয়ে ওঠে আমি চিনি গো চিনি তোমারে / ওগো বউ-ঠাকুরাণী।
তাই আমার মনে হয়, জাতীয় সংগীত হিসাবে রবীন্দ্রনাথের যে গানের অংশটা আমরা গ্রহন করেছি, সেইটা নির্দিষ্ট। সেইটা নিয়ে কোন আলোচনা করার কোনই প্রয়োজন নেই। কেননা জাতীয় সঙ্গীত অন্য কোন ঢং বা গায়কীতে গাইলে তা সংবিধানের ব্যতয় হবে। সুতরাং সেই ব্যাপারে আলোচনার কিছুই নাই।
কিন্তু যারা "ক্ষ" কর্তৃক গাওয়া আমার সোনার বাংলা গান নিয়ে আলোচনা করছেন বা জাতীয় সঙ্গীতের অমর্যাদা হয়েছে বলে সমালোচনা করছেন, তাঁদের বলছি, "ক্ষ" একটা রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ছে শুধু। তাই আলোচনার ব্যাপারটা হতে পারে রবীন্দ্রনাথের গানের পরিবর্তন নিয়ে। আলোচনা জাতীয় সংগীতের দিকে ঘুরে যাওয়াটাই দুঃখজনক।
জনগনমন-অধিনায়ক হে ভারত-ভাগ্যবিধাতা যে ঢং গাওয়া হয়, তা কি রবীন্দ্রনাথের সূরের সাথে মেলে? সেইটা তাদের সংবিধানে সংরক্ষিত। এর বাইরে অন্য কোন সূরে গাইলে কেউ ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের অবমাননা হয়েছে বলে কথা বলে না তো? স্মরন করে দেখুন, "কাভি খুশি কাভি গাম"-এ ব্যবহৃত সেই সুরটি, স্কুলে ফাংশানের দৃশ্যটি।
মনে রাখা আবশ্যক যে, আমাদের জাতীয় সঙ্গীত মূলত রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি গান, সেখান থেকে দশটি চরণ আমাদের জন্য আমরা বেছে নিয়েছি। এর বাইরে কে কি ভাবে গাইল সেইটা আমদের মাথা ব্যাথা না। তাই এই গান গেয়ে "ক্ষ" যা করেছে, সেটা নিয়ে এতো হট্টগোলের কিছুই নাই।
আবারে আসি কিছু আধুনিক কালের উদাহরনে। "দি বং কালেকশান" সিনেমাতে গাওয়া পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে অথবা "রঞ্জনা আমি আর আসব না" সিনেমাতে জাগরনে যায় বিভাবরি অথবা "ডাকঘর" সিনেমাতে মায়াবন-বিহারিনী-হরিণী। আমার কাছে মনে হয়েছে "ক্ষ" ব্যান্ড "দি বং কালেকশান" সিনেমাতে গাওয়া পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে গানটিকে অনুকরন করেই গেয়েছে। আমার সোনার বাংলা আমাদের দেশের একটি সিনেমাতেও গাওয়া হয়েছিল। খুব সম্ভবত সেই সিনেমার নাম "'জীবন থেকে নেওয়া" [ব্লগার শার্লককে ধন্যবাদ ত্রুটি দেখিয়ে দেবার জন্য, আগে ভুল করে লেখা হয়েছিল "আবার তোরা মানুষ হ" ]। সেখানে তা স্রেফ রবীন্দ্রনাথের গান হিসাবেই গাওয়া হয়েছিল। তবে উল্লেখ থাকে যে সে সময়ে গানটি জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পায় নি [ সূত্র ব্লগার শার্লক ]।
মোদ্দা কথা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের গানকে নিয়ে অনেক কিছুই করা হচ্ছে, যাকে অনেকেই "ফিউশন" বা "এক্সপেরিমেন্ট" বলছেন। আমাদের দেশের "শিরোনামহীন" ব্যান্ডও রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছে। যারা মূল রবীন্দ্র সঙ্গীতের কদর করেন, তারা একটু গোঁড়া ধরনের বলে এই ব্যাপারগুলোকে সহজে মেনে নিতে পারেন না। তাই জাতীয় সংগীতের বিকৃতির ধূয়া তুলেছেন।
নতুন গায়কীতে ও ঢং-এ গাওয়া এই গানগুলো শ্রোতাদের ভাল লাগছে। এরফলে যাঁরা রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে টাকা আয় করেন, তাদের বাজার দর পড়ে যাবার আশংকা থাকে। এই জাতীয় মানুষেরাই কিছু প্রতিবাদ করবেন। সে কারনে হু লাল্লা হু লাল্লা করে "দি বং কালেকশান" সিনেমাতে গাওয়া পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে আমাদের রবীন্দ্র-বোদ্ধাদের কাছে বিষের মতই লেগেছিল। ঠিক যেমন লেগেছিল "শিরোনামহীন" ব্যান্ডের করা রবীন্দ্র-সঙ্গীতগুলোকে।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে ধরনের মানুষ ছিলেন বলে বিভিন্ন লেখায় পড়েছি, বা শুনেছি, তাতে মনে হয় না যে উনি জীবিত থাকলে এই সব নতুন "ফিউশন" বা "এক্সপেরিমেন্ট"-কে বর্জন করতেন। আমার মনে হয় উনি বরঞ্চ এইগুলিকে প্রশয়ই দিতেন।
সবশেষে আবারো বলি, জাতীয় সংগীতের সাথে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে গুলিয়ে না ফেলি।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জানুয়ারি, ২০১৩ সন্ধ্যা ৬:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



