শ্রদ্ধেয় আব্বাজান, ২১ই মাঘ, ১৪৭১৭ বঙ্গাব্দ
আমার সালাম নিবেন। আশা করি ভাল আছেন। প্রত্যহ পাশের পড়ার ঘরে আপনার দৃপ্ত পদচারনা শুনিয়া বুঝিতে পারি আপনি কুশলেই আছেন। আম্মার কাছে শুনিলাম আপনি নাকি আমার আয়ুষ্কাল নিয়া জ্যোতিষ শাস্ত্র ঘাটিতেছেন। শুনিয়া ভাল লাগিল। আপনার দেওয়া ঔষধ গুলো আমি নিয়মিত খাইতেছি, যদিও মাঝে মাঝে ভূলিয়া যাই। কিন্তু আপনি আমাকে আগের মত ডাটের সহিত কড়া গলায় ঔষধ খাওয়া কথা এখন আর মনে করাইয়া দেন না। মাঝে মাঝে সে কথা ভাবিয়া কষ্ট লাগে, কিন্তু মুখ ফুটিয়া কিছু বলিতে পারিনা। আপনি কি লক্ষ করিয়াছেন আমার চুল অনেক বড় হইয়া গিয়াছে? নাকি দেখিয়াও না দেখার ভান করেন? ঠিক মত যে দাঁড়ি কামাই না ইদানীং, সেটাও কি লক্ষ করেন নাই? আমার চুল দাঁড়ির এহেন অবস্থা পর্যবেক্ষন করিয়াও আপনি কিছুই বলিতেছেন না আমাকে, ডাঁটিতাছেন না। আমার কষ্ট লাগে। আগে যখন কম্পিউটার চালাইতাম, আপনি আসিয়া দেখিতেন ছেলেটা কি করিতেছে কম্পিউটারে। কিম্বা যখন লেখা লেখি করিতাম আপনি পিছনে আসিয়া নীরবে আমার লেখা দেখিতেন। আমার অনুপস্থিতিতে আমার অর্ধ অসমাপ্ত পান্ডুলিপি গুলো লুকাইয়া পড়িতেন, বাসায় ফিরিয়া যাহাতে আমি আপনার হাতের স্পর্শ পাইতাম। আমার গুছাইয়া রাখা লেখা গুলার পৃষ্ঠা নাম্বার ওলট পালট করিয়া ফেলিতেন ভূল করিয়া- আমি টের পাইতাম। কিন্তু কিছু বলিতাম না। কিন্তু এখন যখন ঘরে ফিরিয়া আসি, আমি বড় উতসুক নয়নে দেখি আমার লেখা গুলি আমার অবর্তমানে কেউ উল্টাইয়া দেখিয়াছে কি না? হতাশ হই। না, কেউ ছুইয়েও দেখে নাই। বড় কষ্ট লাগে তখন। আব্বা আপনি কি জানেন আগে আপনি বাসায় ফিরিলে কিম্বা বাহিরে গেলে আম্মাই দরজা খুলিত, কিন্তু এখন আমি খুলি কেন? আপনার জন্য। যাতে একটিবার আপনি আমাকে ডাকিয়া বলেন "পুত্তর, দরোজা খানা লাগাইয়া দেও, ঠান্ডা বাতাস ঢুকিবে ঘরে"। আপনি কি লক্ষ করিয়া দেখিয়াছেন এখন আমি অনেক রাত অবধি জাগিয়া বই পড়ি নয়তো কম্পিউটার টিপাই? যাতে আপনি একটিবার আমকে ডাঁটিয়া বলেন 'চোখের ক্ষতি হইবে! শুইয়া পরো!' আব্বা আমার পড়াশোনাতে মন বসে না এখন। আগে আপনি আমাকে ধমক দিয়া পড়িতে বলিতেন, এখন কেন বলেন না? আমার ক্ষুদ্র এই জীবনে আপনার ধমক আর ডাঁটের যে অভ্যাস আমাকে ফালাইয়া দিয়াছেন, তাহা এই জনমে যাইবার নয়। সন্তান হইয়া জন্মাইয়াছি বিধায় অন্যায় কিম্বা অবাধ্যতা উভয়ই করা সম্ভব আমার দ্বারা, আপনি তাহা মমতা ভরে না হোক, শাসন ভরে শুধরাইয়া দিবেন- ক্ষমা করিবেন, এমনটাই ত হয় সবখানে। তাই বলিয়া অধম সন্তানের উপর এমন রাগ করিয়া কথা বন্ধ করিয়া দিলেন কেন যাহাতে আমি ভেতরে ভেতরে নরক যন্ত্রণা অনুভব করি? আব্বা আমি তো মহা মানব হইয়া জন্মাই নাই, অতি তুচ্ছ এক মানব হইয়া জন্মাইয়াছিলাম, তাহা হইলে শাস্তিটা এত ভয়ানক কেন? আব্বা আমি অতি সামান্য সাহস লইয়া জন্মাইয়াছিলাম, দুই পা হাটিয়া আপনার ঘরে গিয়া আপনার পা জড়াইয়া ধরিয়া করুন সুরে যে ক্ষমা চাহিব সে সাহস পর্যন্ত আমার নাই। কিন্তু আপনি কি কিছুই বোঝেন না? প্রত্যেক রাতে যখন আপনি ঘুমায় থাকেন, আমি অন্ধকারে আসিয়া আপনার বিছানার পায়ের দিকে আসিয়া মাটিতে বসিয়া থাকি? কখনও কি খেয়াল করিয়া দেখিয়াছেন আপনার বিছানার পায়ের দিকটায় প্রত্যেক দিন ফোটা ফোটা পানি জমিয়া থাকে ভোর বেলায়? আব্বা আপনি আর কত দিন চুপ করিয়া থাকিবেন বলিতে পারেন? আমার ভেতরে বোবা কান্নায় প্রত্যহ একটা করিয়া লাশ নামিতেছে কবরে....... আব্বা আমি আপনাকে আম্মার থেকিয়া কয়েক চিমটি কম ভালবাসি, কিন্তু তাহা কোনো অংশেই কম নয় আম্মার থেকিয়া। আপনার ছেলের হৃদপিন্ডে প্রত্যেক দিন একটা করিয়া শেল বিধিতেছে আপনার মৃণ্ময়তার কারণে। এই অধম সন্তান কে ক্ষমা করিয়া দিন আব্বা। আমি বাক শক্তিহীন শিশু হইয়া জন্মাইয়াছিলাম আপনাদের দুইজনের কাছে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাক রুদ্ধই থাকিয়া যাইব।
আপনার শারীরিক স্বুস্থতা ও সার্বিক কল্যাণ কামনা করিতেছি মহান আল্লাহ পাকের দরবারে। ভাল থাকিবেন, আমার ঘরে আপনার পদ ধূলির প্রত্যাশায় রইলাম আমি।
শ্রদ্ধাস্পদেষু
আপনার পুত্র
( নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক )
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মার্চ, ২০১১ রাত ১১:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




