জামায়াত-শিবিরঃ সন্ত্রাসী, নাকি সন্ত্রাসের শিকার?
ডঃ আবু রাউসাব
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ব্যাপারে অনেক কথা প্রচলিত আছে। যেমন তারা রগ-কাটা, সন্ত্রাসী, মৌলবাদী, স্বাধীনতা বিরোধী ইত্যাদি। অনেকে ঠিকভাবে যাচাই-বাচাই না করে রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী পত্র-পত্রিকার জামায়াত-শিবির সংক্রান্ত খবরগুলো হুবহু বিশ্বাস করে ফেলেন। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে শক্ত এক জামায়াত-শিবির বিরোধী ধারণা পাকা-পোক্ত হয়। এ পর্যায়ে গিয়ে তারা জামায়াত-শিবির সংক্রান্ত কোনো ভালো খবর হজম করাতো দূরে থাক, কানেই শুনতে চান না। শুনলেই চরম ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ ‘রাজাকার’ বা ‘মৌলবাদী’ শব্দটা বেরিয়ে পড়ে।
জাতি হিসেবে এটা আমাদের একটা বড় সমস্যা। কোনকিছু শুনেই ভালোরকম যাচাই-বাছাই না করে আমরা যে হুজুগে মেতে উঠি, নিজেদের মন-মানসিকতাকে সে অনুসারে খুব সহজে ধোলাই করে ফেলি, এবং শেষ পর্যন্ত জীবন দিতেও প্রস্তুত হয়ে যাই—এ কথা শুধু আমার নয়, বরং অনেক নৃবিজ্ঞানী এবং ঐতিহাসিকদের। ক্রুদ্ধ এবং ঘৃণাভরা মন এক ধরণের মানসিক ব্যাধী, যা মানুষকে সঠিকভাবে বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করতে দেয় না। বাংলাদেশে আবহমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে এতবেশী ক্রুদ্ধতা এবং পারস্পারিক ঘৃণাবোধ তৈরি করেছে যে আমরা শান্তমনে বিবেক দিয়ে চিন্তা করার সব দরজাই বন্ধ করে দিয়েছি। ফলে তৈরি হয়েছে আমাদের নিজেদের মধ্যেই সংঘাত। ব্রিটিশরা এই হাতিয়ার দিয়ে Divide and Rule পলিসির প্রবর্তন করে আমাদেরকে শোষণ করেছে প্রায় দু’শ বছর। দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতা পেলেও উপনিবেশ দ্বারা সৃষ্ট সেই নীচু মানসিকতা থেকে আমরা উর্ধ্বে উঠতে পারি নাই। আমরা এখন নিজেরাই এখন ব্রিটিশদের চাল নিজেদের উপর প্রয়োগ করে নিজেরাই মারা-মারি করে শেষ হয়ে যাচ্ছি। আর এগুলো দেখে আমাদের প্রাক্তণ এবং বর্তমান ‘প্রভুরা’ দাঁত শিটকিয়ে হাসছে, কেও আনন্দে বোগল বাজাচ্ছে। হায়রে বাঙ্গালী! আমরা কি এভাবেই শেষ হয়ে যাব?
বাংলাদেশের নামী-দামী অনেক পত্রিকাই চলে বিদেশী টাকায়। বিশ্বের অন্যান্য জাতির তুলনায় আমাদের নৈতিক মান অনেক নিম্নমানের। ইরাকের আহমেদ চালাবীকে কিনতে সি আই এ’র খরচ হয়েছিল কয়েক মিলিয়ন ডলার, আমাদের জন্য কয়েক হাজারই যথেষ্ট। অন্যদিকে হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, আবেগ, অল্প পরিশ্রমে সব পাওয়ার মানসিকতা, স্বার্থপরতা—এসব ক্ষেত্রে আমরা অনেক জাতি থেকে এগিয়ে। এ বৈশিষ্টগুলোই আমাদের জন্য কাল হয়েছে বিভিন্ন সময়। মীর জাফর যেমন বিদেশী প্রভুদের ক্রিড়ানক হিসাবে কাজ করেছে, তেমনি আজও অনেকে আগ্রাসী বিদেশী শক্তির ক্রিড়ানক হিসাবে কাজ করছে। ৯/১১’র পর এটা বরঞ্চ একটা লোভোনীয় পেশায় (Lucrative Career) রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আপপ্রচার, কাল্পনিক ফিল্ম বানিয়ে ইন্টারনেটে ছেড়ে বাংলাদেশকে মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে লেবেল দেওয়ার চেষ্টা—এ সবই এসব পেশার অংশ।
একটু খোলা-খুলি ভাবেই বলি। “To exploit the difference” আমেরিকার একটা পররাষ্ট্রনীতি। আমাদের প্রতিবেশী ‘প্রভু’র ও (যারা স্বীয় স্বার্থে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিল, এবং দঃএশিয়ার ব্যাপারে যাদের ইম্পেরিয়াল এম্বিশান আছে) বাংলাদেশের আভ্যন্তরিন ব্যাপারে তাদের পররাষ্ট্রনীতি আমেরিকার মত। ঐদেশের কয়েকটা প্রখ্যাত থিংক-ট্যাঙ্ক থেকেই এটা পরিস্কার হলো যে “যুদ্ধপরাধীদের বিচারের” ধারণাটা ওখান থেকেই আসা। মুক্তিযুদ্ধের সাথে আমাদের হৃদয়ের বন্ধন অনেক গভীরে। এটা ভালোকরে জেনেই আমাদের মাঝে চির-ভেদাভেদ রচনা করার জন্য প্রথমে কিছু বুদ্ধিজীবি এবং মিডিয়া এবং শেষে মহাজোটকে বেছে নেয় ‘প্রভুরা’। “যুদ্ধপরাধীদের বিচারের” ইস্যুটা আমাদের চলমান উন্নতি-অগ্রগতির গতিধারার সাথে “সময়ের দাবি” মনে করা হচ্ছে। নিরপেক্ষ পর্যালোচনায় আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, এই মীমাংসীত বিষয় নিয়ে মাতা-মাতি আমাদেরকে জাতি হিসাবে আরও একশ’ বছর পিছিয়ে দিবে।
“যুদ্ধপরাধীদের বিচারের” ইস্যুটাকে আমি এজন্য মীমাংসীত বলছি যে, এ সংক্রান্ত সকল বিষয়ের নিস্পত্তি পুর্বেকার সরকারগুলো করে গেছেন। ‘ইন্টান্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইবুনাল) এ্যাক্ট ১৯৭৩’ অনুসারে ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধপরাধীদের সনাক্ত করা হয়। পরে ১৯৭৪ সালের ৯ই এপ্রিল ত্রিপাক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধপরাধীদেরকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। ঐ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন আওয়ামীলীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রি ডঃ কামাল হোসেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রি সোয়ারান সিং, এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রি মিঃ আজিজ আহমেদ। এভাবেই রাষ্ট্রপর্যায়ে বিষয়টি মীমাংসীত হয়।
১৯৭২ সালের ২৪শে জানুয়ারি পাকবাহিনীকে সহযোগিতাকারী এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরধীতাকারীদেরকেও বিচারের আওতায় আনার জন্য “কোলাবরেশনএ্যাক্ট ১৯৭২” পাশ করা হয়। এই আইনে লক্ষাধিক লোককে গ্রেফতার করা হয় এবং ৩৭,৫৭১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। আদালত সর্বশেষে ৭৫২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ খুঁজে পায়, এবং তাদেরকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়া হয়। বাকিরা বেকসুর খালাশ পায়। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ ক্ষমা (General Amnesty) ঘোষণার মধ্যদিয়ে যুদ্ধপরাধ ইস্যুর চুড়ান্ত ইতি টানেন।
‘প্রভুদের’ কথামত মানুষের গভীর আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিরোধীদলগুলোকে ঘায়েল করার জন্যই যে ‘যুদ্ধপরাধ’ ইস্যুর মূল লক্ষ্য, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ আছে? সন্দেহ থাকলে নীচের পয়েন্টগুলো নিয়ে ভেবে দেখুনঃ
১। বর্তমান সরকার আসল যুদ্ধপরাধীদের (১৯৫ জন পাকিস্তানী) বিচারের ব্যাপারে কিছুই বলছে না। আওয়ামীলীগ কি পারবে তাদের করা ত্রিপাক্ষীয় চুক্তি বাতিল করতে? পারবে ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করার ‘অপরাধে’ মরহুম বংগবন্ধুকে আসামীর কাঠগড়াই দাঁড় করাতে?
২। ১৯৭১ সালে আওয়ামীলীগের আনেকেই বিহারীদের হত্যা, লুন্ঠন, এবং ধর্ষণসহ অনেক যুদ্ধপরাধ করেছে। তাদেরকেও বিচারের আওতায় আনা হবে না।
৩। ‘ইন্টান্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইবুনাল) এ্যাক্ট ১৯৭৩’কে বর্তমানে কিছুটা সংশোধন করা হলেও তাতে ফ্রি এবং ফেয়ার বিচারের কোন গ্যারান্টি নেই বলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, এবং কানাডার কয়েকজন প্রখ্যাত আইনবিদ মতামত ব্যাক্ত করেছেন।
৪। এই বিচারে ভারতের মৌন সমর্থন ছাড়া জাতিসংঘ এবং অন্য কোন দেশের সমর্থন নেই।
৫। আমেরিকা মনে করে, এই ধরণের স্পর্শকাতর এবং জটিল বিষয়ের সুষ্ট বিচারের যোগ্যতা আওয়ামী প্রশাসনের নেই। তাছাড়া রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত বাংলাদেশের বিচার ব্যাবস্থায় সুবিচারের আশা সুদুরপরাহত।
৬। “কোলাবরেশনএ্যাক্ট ১৯৭২” এর আওতায় যেসব অভিযুক্তদের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়া হয়েছিলো, তাদের কেউ জামায়াতে ইসলামীর ছিলনা। অর্থাৎ এরা রাজনৈতিক ভাবে পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও কোনো যুদ্ধাপরাধের (হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদি) সাথে জড়িত ছিলোনা।
৭। পূর্বের ট্রায়ালে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধের কোনো প্রমাণ নেই। বর্তমানে বিচারের পূর্বে তাদেরকে একতরফাভাবে ঘায়েল করে “যুদ্ধাপরাধ” হিসাবে খেতাব দেয়াটা দুনিয়ার যে কোনো সভ্য আইনের চরম বিরোধী।
৮। ১৯৭১ সালে জামায়াত আজকের মত এত বড় রাজনৈতিক দল ছিলোনা। জামায়াত ছাড়াও আরও অনেক দল পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা পাকিস্তানের সমর্থক ছিল, বর্তমান জামায়াতে তাদের সংখ্যা ৫ ভাগেরও কম। জামায়াতের বাকী ৯৫ ভাগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান যাই থাকুকনা কেনো, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা বাংলাদেশের অস্তিত্বকে মেনে নিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিরোধী কোন অবস্থান জামায়াতের কারো কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোন কাজ করেছে বলেও কোন প্রমাণ নেই।
৯। শিবিরের প্রতিষ্ঠা ১৯৭৭ সালে। যারা আজ শিবির করেন, তাদের সবার জন্ম বাংলাদেশের জন্মের অনেক পরে। শিবিরকে ‘রাজাকার’ বা ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ বলা কেবল হাস্যকরই নয়, বরং আমাদের নৈতিক এবং রাজনৈতিক দৈন্যতার এক চরম এবং নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
দৃষ্টি ফেরাই বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে। প্রধানমন্ত্রি এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রির ঘোষণামতে বর্তমানে যেভাবে “চিরুনী অভিযানের” মাধ্যমে “শিবিরের আস্তানাকে গুড়িয়ে দেওয়ার” মহাপ্রলয় চলছে, তাতে সচেতন মানুষের কাছে আওয়ামীলীগের পূর্বেকার বাকশালী এবং একদলীয় শাসনের প্রলয়ংকারী পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। উল্লেখ্য, আমাদের ‘জাতির পিতা’ তার শাসনামলে তার প্রায় ৪০,০০০ সন্তানকে (অধিকাংশই জাসদের কর্মী) হত্যা করেছিলেন। সরকারের এই ধ্বংসযজ্ঞের মহামাতমে সম্ভবত প্রতিবেশী ‘প্রভুরা’ নগ্ন উল্লাসে মেতে উঠেছে। শিবির কি সন্ত্রাসী, নাকি চরম সন্ত্রাসের শিকার, সে বিচারভার পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম। তবে তার আগে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করুনঃ
১। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩৫ জন শিবির কর্মীকে নিঃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। অন্যান্য দলের তুলনায় শিবিরকেই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন গত ২৮ বছরে শিবিরের ১৬ জন, ছাত্রলীগের ৫, ছাত্রদলের ১, মৈত্রীর ১, এবং ছাত্রইউনিয়নের ১ জন নিহত হয়েছে।
২। শিবির কোথাও আগে আক্রমণ করেছে, কোন নিরপেক্ষ তদন্তে আজো তার কোন প্রমাণ মেলেনি। এ ব্যাপারে পার্লামেন্টে challenge পর্যন্ত করা হয়েছে, কেউ প্রমাণ করতে পারেনি। শিবিরের আক্রমণ শুধু আত্মরক্ষা এবং বেঁচে থাকার তাগিদে, যা সবারই মৌলিক অধিকার।
৩। ১৯৮২ সালে শিবিরের ৪ জন নেতাকে হত্যার মধ্যদিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যার রাজনীতি শুরু হয়। এ হত্যাকান্ডে ছাত্রলীগ জড়িত ছিলো। গত বছর ১৩ই মার্চ শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক শরিফুজ্জামান নোমানী কে ছাত্রলীগের দুধ্বর্ষ ক্যাডাররা নির্মমভাবে হত্যা করে। খুনীদেরকে শাস্তিদেয়া তো দূরে থাক, আদালতে কেস করতে গিয়েছিলো বলে নোমানীর অসহায় পরিবারকে চরমভাবে হেনস্থ করেছে ছাত্রলীগের ‘সোনার ছেলেরা’!
৪। ১৯৮২ সালের পরথেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা রাজশাহীতে শিবির দ্বারা ‘রগ’কাটার যতগুলো খবর ছাপানো হয়েছে, তা সবগুলো একসাথে করলে রাজশাহীতে কয়েক হাজার লোকের পা ‘বোচা’ থাকার কথা। অথচ ফরেনসিক রিপোর্টে আজো প্রমাণ মেলেনি যে শিবির কখনো কারো রগ কেটেছে। কারো সন্দেহ থাকলে রাজশাহীর সব হাসপাতাল এবং ক্লিনিকে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। শিবিরের ‘রগ’ কাটার বিষয়টা মিডিয়ার আবিস্কার এবং নগ্ন প্রপাগান্ডা ছাড়া কিছু নয়।
৫। সম্প্রতি ফারুক হত্যাকান্ডের সাথে শিবিরকে জড়িয়ে বাংলাদেশের ‘প্রভু’পন্থি মিডিয়া শিবিরের বিরুদ্ধে যেভাবে কাঁছা দিয়ে লেগেছে, তাতে আরো পরিস্কার হয়েছে যে, ওরা এই ধরণের খবরের অপেক্ষায় অনেক দিন থেকে প্রহর গুনছিলো। আওয়ামী শাসনের প্রথম এক বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় (যার প্রায় সবগুলোর হোতা সরকারী দলের ক্যাডার বাহিনী) ২৫১ জন নিঃশংসভাবে খুন হলেও এত বড় মিডিয়া কাভারেজ কখনো পাইনি। ছাত্রলীগের বেপরয়া ক্যাডার বাহিনীর হাতে কয়েক ডজন নারকীয়ভাবে খুন হলেও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধের ব্যাপারে কোনো কথা ওঠেনি, প্রয়োজন হয়নি ‘চিরুনী অভিযানের’ । রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারীদলের ক্যাডারবাহিনীর ক্রমাগত খুন, জখম, ধর্ষণ, টেন্ডারবাজী, শিক্ষক-পেটানো, উলংগকরণ, এবং সর্বশেষ দলীয় কোন্দলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবুবকর নিহত হওয়ার পর সরকারী দলের অবস্থা ছিলো খুবই নাজেহাল। অন্যদিকে ভারতের সাথে স্পর্শকাতর গোপন চুক্তির ফলে বিরোধীদলসহ আপামর জনসাধারণের সমালোচনায় আওয়ামীলীগ ছিলো ক্ষত-বিক্ষত। এ সময় সবার দৃষ্টিকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য ফারুকের মত একটা লাশের প্রয়োজন ছিলো আওয়ামীলীগের। ফারুক যে আওয়ামীলীগের নোংরা রাজনীতির একজন নির্মম শিকার—সেটা ধীরে ধীরে পরিস্কার হচ্ছে। যারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য বাসে আগুন ধরিয়ে নিরিহ মানুষকে পুড়িয়ে মারতে পারে, লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ মেরে তার উপর নৃত্য করতে পারে, নিজ স্বার্থে ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো নিজ দলের লোককে নির্মমভাবে হত্যা করে, চরম ডাহা মিথ্যা নিঃলজ্জভাবে অবলিলায় বলে যেতে পারে--তাদের জন্য সবই সম্ভব।
গত নির্বাচন নিয়ে অনেকের সন্দেহ থাকলেও আমরা আশা করেছিলাম দেশে এক সুস্থ পরিবেশ ফিরে আসবে। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের চরম ফ্যাসিস্ট এবং বাকশালি চরিত্র দিন দিন বিশ্ববাসীর কাছে পরিস্কার হচ্ছে। রাজশাহীর ঘটনাকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবিরের উপর যেভাবে সারা দেশে হত্যা, লুন্ঠন, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, গণ-গ্রেফতার, হয়রানী, রিমান্ডে নিয়ে টর্চারসহ রাষ্ট্রীয় এবং মিডিয়া সন্ত্রাসের নগ্ন মাতমে যেভাবে আওয়ামী সরকার মেতে উঠেছে, তাতে ‘বাকশালী খায়েশ’ ক্ষণিকের জন্য মিটলেও অদুর ভবিষ্যতেই এর চড়া মূল্য আওয়ামীলীগকে দিতে হবে। কারণ, আল্লাহপাক বেশীদিন জালেমকে অবকাশ দেননা।
***
লেখকঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং কলামিস্ট। ইমেইল- [email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

