
প্রিয় মা,
এখানে আজ সকাল থেকে অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। এমনিতেই উইকেন্ডের ছুটি বলে আজ একটু দেরী করে ঘুম থেকে ওঠার প্ল্যান ছিল! তা সকাল সকাল আচমকা এই অদ্ভুত বৃষ্টিটা এসে ঘুমটাকে আরো জমিয়ে দিল। এমনিতে এই সময়টায় নিউজার্সিতে কাঠফাটা রোদ্দুরের বদৌলতে দুর্দান্ত গরম পড়ে। বৃষ্টির দেখা পাওয়াই ভার! সেই হিসেবে আজকের এই বৃষ্টিটা একটু অপ্রত্যাশিতই বটে! বৃষ্টির আমেজটা উপভোগ করতে করতে ঘুম থেকে উঠতে একটু বেলাই হয়ে গেল। ঘড়িটা বলছে এখন বেলা এগারোটা বেজে পঁয়ত্রিশ। এখানকার সিংহভাগ লোকজনের এরই মধ্যে লাঞ্চ সারা হয়ে গেছে অথবা তার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আমাকে আজ রাজ্যের আলসেমিতে পেয়ে বসেছে! সেই সাথে নস্টালজিয়াও। বারবার শুধু মনে পড়ছে তোমার হাতের খিচুড়ি আর ইলিশ-ভূনার কথা। দেশে থাকতে তুমি আদর করে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে। সেই জিভে জল আনা গন্ধে মৌ মৌ করা খাবারের স্বাদ এখানে আর কোথায় বল? স্মৃতি দিয়ে তাই তৃষ্ণা মেটানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছি! তুমি আবার এটা পড়ে কাঁদতে বসে যেওনা যেন! প্রথম প্রথম তোমাকে ছেড়ে একা একা থাকতে খুব কষ্ট হলেও এখন এখানকার জীবনযাত্রায় অনেকটাই মানিয়ে নিয়েছি আমি। আর প্রতিমুহুর্তে নিজেকে বলি, আর তো মাত্র দুইটা বছর, দেখতে দেখতেই কেটে যাবে, তাইনা মা?
এখানকার একটা খারাপ খবর আছে। মূলতঃ এই খবরটা তোমাকে জানানোর জন্যই আজকের চিঠিটা লেখা। জানোই তো, ছেলেবেলা থেকেই যখনি আমার মন খারাপ হয় বা কোনকিছু নিয়ে মানসিক অস্থিরতায় ভুগি তখন তোমার সাথে সেটা শেয়ার করতে না পারলে আমার ভালো লাগে না। কিন্তু আজ যেই ঘটনাটা তোমাকে বলতে যাচ্ছি সেটা এতটাই মর্মান্তিক আর স্পর্শকাতর যে তাকে সঠিকভাবে ভাষায় বয়ান করার জন্য আমি কোনো রাস্তাই খুঁজে পাচ্ছি না। তাই এত আবোল তাবোল কথা বলা, তুমি বুঝে নিও মা............
আমার পাশের ফ্ল্যাটের বাঙালি কাপল নাফিস আর শাহানার কথা তো বলেছি তোমাকে! দুঃসংবাদটা ওদের নিয়েই। ভীষণ মিষ্টি আর ছিমছাম সুখী একটা কাপল ছিল ওরা। আমার খুব ভালো লাগত ওদের টোনাটুনির সংসার! কতদিন আমি আলসেমি করে রান্না করিনি বলি ওরা দুজন আমাকে ওদের ফ্ল্যাটে ধরে নিয়ে খাইয়েছে। ব্যাচেলর আমাকে নিয়ে ওদের দুজনের মধ্যে খুঁনসুটি চলত অবিরাম। নাফিস আমার কানের কাছে এসে চুপিচুপি বলত, ভাই যেমন আছ ভালই আছ, বিবাহ করে খাল কেটে কুমির ডেকে আনতে যেওনা আর! শাহানা তখন কপট রাগে নাফিসের চুলের গোছা টেনে ধরত। আমি মুগ্ধ চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে রইতাম! আর ভাবতাম সুখ পৃথিবীতে যদি কোথাও থেকে থাকে তো এখানেই.........আপনজনের এই নিশ্চিদ্র ভালবাসার মাঝে। অথচ কী অদ্ভুতভাবে একমুহুর্তের মধ্যে মানুষের গোটা জীবনটাই বদলে যায়,তাইনা মা?
ঘটনাটা আজ থেকে পাঁচদিন আগের। শাহানা এখানকার একটা ছোট ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কাজ করত। তুমিতো জানোই, এখানে সংসার চালানোর জন্য স্বামী স্ত্রী দুজনকেই সংসারের হাল ধরতে হয়।কাজটা শাহানার খুব একটা পছন্দ না হলেও সংসারের প্রয়োজনের কথা ভেবে ও কাজটা চালিয়ে যাচ্ছিল। স্টোরে আসা মালপত্রের চালানের সমস্ত হিসেব মিলিয়ে ঘরে ফিরতে ফিরতে প্রায় দিনই ওর বেশ রাত হয়ে যেত। কিন্তু সেদিন রাত প্রায় একটা বেজে যাবার পরও শাহানাকে ঘরে ফিরতে না দেখে নাফিস দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। বেশ কয়েকবার ফোন দেয়ার পরও শাহানা ফোন না ধরায় বিপদ বুঝতে পেরে নাফিস সোজাসুজি শাহানার স্টোরে গিয়ে হাজির হয়। সেখানে স্টোরের সামনে শাহানাকে পড়ে থাকতে দেখে রক্তাক্ত ও অজ্ঞান অবস্থায়!
কথাটা লিখতে গিয়ে আমার হাত কাঁপছে কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ মা ঐদিন রাতে শাহানার সাথে কী দুর্ঘটনা ঘটেছিল! ঘটনার আকস্মিকতায় শাহানা মানসিকভাবে পুরোপুরি বিধ্বস্ত ও নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা অনেক চেষ্টা করে ওর মুখ থেকে যেটুকু জানতে পেরেছিলাম সেটা হলো শুধু এই যে ওই ঘটনার জন্য দায়ী ছিল ওরই ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের ম্যানেজার হ্যারিসন গার্নার। আমি তখনি পুলিশে খবর দিতে চাইছিলাম কিন্তু শেষ মুহুর্তে নাফিস কি মনে করে যেন থেমে গেল। আমাকে বলল, শাহানার এই মানসিক অবস্থায় পুলিশ এসে ওকে জেরা করলে শাহানা সেই ধকল নিতে পারবে না। আমিও ভেবে দেখলাম নাফিসের কথা সত্যি তাই মেনে নিলাম। তাছাড়া এটা পুরোপুরি ওদের ব্যক্তিগত ব্যাপার তাই আমি বেশি কিছু বলতেও চাইনি। কিন্তু আজ খুব মনে হচ্ছে, হয়ত সেদিন নাফিসের কথা মেনে না নিলেই ভালো হত.........
পরবর্তী কয়েকটা দিন গেছে ঝড়ের মত! শাহানার ব্যাপারটা জানার পরপরই ঢাকা থেকে ওদের সমস্ত আত্মীয়স্বজনের ফোন আসা শুরু হয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্ধ ছিলেন শাহানার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি অর্থাৎ নাফিসের বাবা-মা। ছেলের বউ এর এত রাত অবধি বাড়ির বাইরে কাজ করাটা তারা কোনদিনই ভাল চোখে দেখেননি। আজকের এই দুর্ঘটনার জন্যেও তারা মূলতঃ দায়ী করলেন শাহানার এই "বেপরোয়া" চলনকে! শাহানা খুব স্পর্শকাতর মেয়ে ছিল। নাফিস বা ওর বাবা-মা ওকে সরাসরি কিছু না বললেও ওদের মনোভাবটা ও হয়ত আঁচ করে নিয়েছিল ঠিকই। তাছাড়া নাফিসের আচরণটাও বেশ অদ্ভুত হয়ে গিয়েছিল ,শাহানার সামনে এলেই কেমন যেন আঁটসাট হয়ে যেত,আগের মত সহজ সাবলীলভাবে কথা বলতে পারত না আর এমনকি শাহানার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারত না। সব মিলিয়ে অদ্ভুত অস্বস্তির চাদরে মোড়ানো একটা পরিবেশ। আমি প্রায় বাইরের মানুষ হওয়া সত্বেও এই বিপর্যয়ে ওদের পাশে থাকর তাগিদ থেকেই সকাল বিকাল বেশ কয়েকবার যাতায়াত করতাম ওদের ফ্ল্যাটে। এই ব্যাপারগুলি তখনই আমার চোখে পড়ে। একদিন বিকেলে ওদের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখলাম, শাহানা বারান্দার মেঝেতে বসে কোলের উপর মাথা রেখে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। তুমি তো জানো মা,কারো কান্না দেখলে আমি ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে যাই, সান্তনা দেয়ার মত ভাষা খুঁজে পাইনা। তবু সেদিন শাহানাকে সান্তনা দিয়ে বলতে চেয়েছিলাম, সব ঠিক হয়ে যাবে! জবাবে শাহানা চোখের পানি মুছে অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষণ। সেই দৃষ্টি আমি কোনদিন ভুলবোনা মা! তোমাকে যদি দেখাতে পারতাম তাহলে হয়ত বুঝতে - জীবিত মানুষের দৃষ্টিতে কী করে জীবন নয়, প্রকট হয়ে ওঠে মৃত্যুর ছায়া! অনেকক্ষণ বাদে মুখ খুলে শাহানা আমাকে শুধু একটা কথাই বলল, এখনি তো সব ঠিক হচ্ছে.......এতদিন যা ছিল সেটাই ছিল ভুল, সব ভুল......অথচ বুঝতেই পারিনি! আর যতটুকু ভুল আছে সেটাও আমি শিগ্রি ঠিক করে দেব........ - বিড়বিড় করে শাহানা কথাগুলো যেন আমাকে নয় নিজেকেই বলছিল। অশনির ছায়া আমি সেদিনই দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু করার মত বেশি কিছুই ছিল না আমার, তাই শুধু নাফিসকে শাহানার দিকে খেয়াল রাখতে বলে আমি চলে এসেছিলাম সেদিন।
পরশু সকালে ফ্ল্যাটের বাথরুমের ভেতর সিলিং থেকে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় শাহানার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে নাফিস।
পুলিশ,কেইস ফাইল,ময়নাতদন্ত,জবানবন্দী সবকিছু মিলিয়ে গত দুইদিন অদৃশ্য একটা ঝড় বয়ে গেছে। গতকাল সকালে শাহানার লাশ নিয়ে ঢাকাগামী প্লেনে চড়েছে নাফিস। পাঁচটা মাত্র দিনের ঘটনা অথচ আমার মনে হচ্ছে যেন একযুগ কেটে গেছে। যেন দীর্ঘকালের একটা ঘুমের ভেতর ভয়ঙ্কর সব দুঃস্বপ্ন দেখে বারবার শিউরে উঠছি আমি আর মনে হচ্ছে ঘুম ভাঙ্গলেই দেখতে পাব সবকিছু আগের মতই শান্ত, সুন্দর। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি, এই দুঃস্বপ্নটা আসলে সত্যি। এমন কেন হয় মা? বলতে পারো?
গত দুদিন ধরে এই ঘটনাটা নিয়ে অনেক ভেবেছি আমি। ভেবে ভেবে কোনো কুলকিনারা পাইনি। শাহানার এই আকস্মিক মৃত্যু - কোনো উপায় কি ছিল একে রোখার? নির্ঘুম দুচোখে সারারাত ভেবেও জবাব পাইনি আমি। সত্যিই তো! আর কিইবা করতে পারত ওই অসহায় মেয়েটা - একটা মাত্র ঘটনা যার গোটা জীবনটাকেই একটা বিরাট বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে, তার গোটা অস্তিত্ব আর আত্মসম্মানকে করেছে চরম অপমান! কিইবা করার ছিল তার যখন সে দেখেছে তার আপন স্বজনেরা তার পাশে দাঁড়ানোর বদলে দোষী সাব্যস্ত করেছে তাকেই? কেমন করে সে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখবে যেখানে তার প্রিয়তম জীবনসঙ্গী - যার হাত ধরে সে একটু একটু করে জীবনের সব স্বপ্ন সাজিয়েছিল- আজ তার হাত ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছে বাকি সব নীরব দর্শকের কাতারে! আর সবকিছু মেনে নিলেও এই কষ্টকি এত সহজে মেনে নেয়া যায়? যে চোখে সে সবসময় নিজের জন্য দেখেছে আকুল ভালবাসা আজ হঠাৎ সেই দৃষ্টির এই আমূল পরিবর্তন মেনে নেয়া একজন সংবেদনশীল মানুষের পক্ষে কি এতই সহজ মা? পারে কেউ মেনে নিতে?
আমি নাফিসের জায়গায় নিজেকে রেখেও ভেবে দেখেছি। তোমার কাছে মিথ্যে বলবনা মা, সেদিন আমি একটা জিনিস বুঝতে পেরেছি, যতই আমরা আধুনিকতার বড়াই করে বেড়াই না কেন, মনের ভেতরে শক্ত হয়ে এঁটে বসা আদিম গন্ধটা মুছে যাওয়ার এখনো আমাদের অনেক দেরী। মুখে যাই বলি, আমি নিজেই কি কখনো পারতাম আমার স্ত্রীর জীবনে অমন একটা দুর্ঘটনা খুব সহজভাবে মেনে নিতে ? কেউই কি পারে মা? না বোধহয়!
মা,আমি জানি এই চিঠিটা পড়ে তুমি অনেক কষ্ট পাবে। কিন্তু কি করব বল, তোমার ছেলেটাও যে অনেক কষ্টে আছে মা! ছেলেবেলা থেকেই যখনি অস্থির হয়েছি, মনে কোনো প্রশ্ন জেগেছে তোমার কাছে এসে হাত পেতেছি - সেই অভ্যাস আজ অবধি যায়নি! ছোটবেলায় যখন মন খারাপ হত তখন তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতাম,মনে আছে তোমার? তুমি যখন আদর করে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমার কপালে চুমু খেতে তখন মনে হত আমার সব কষ্ট ম্যাজিকের মত উধাও হয়ে গেছে! আজ আমাকে সেইভাবে একটু জড়িয়ে ধরো না মা!
আজ তোমার মুখটা খুব বেশি মনে পড়ছে। তুমি তো জানো,এখানে আসার পর থেকে এমন একটা দিনও যায়নি যেদিন তোমার মুখটা দেখতে না পারার কষ্টে আমি এক ফোঁটা চোখের জল ফেলিনি। এখন লোকে টিটকিরি দিক আর ছিঁচকাদুনে ছেলে যাই বলুক, আমি তো জানি আর তুমিও জানো মা তোমাকে আমি কতখানি ভালবাসি! কেন আজকের দিনটাতে তুমি আমার পাশে নেই মা? কত শান্তি পেতাম আমি যদি তুমি আমার কাছে থাকতে আজ!
আই মিস ইউ মা!
এবং তুমি যতই লুকোবার চেষ্টা কর আমি জানি you miss me too & even more than me !
Love you Maa!
ইতি
তোমারই আদরের অনু
আমি চিঠিটা হাতে নিয়ে স্থানুর মত বসে রইলাম। অনিন্দ্য- আমার তেইশ বছর বয়সী ছেলের চিঠিটা যেন আজ আমার অস্তিত্বের ভিতসুদ্ধ নাড়িয়ে একটা প্রবল ঝাঁকুনি দিয়েছে। আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না - আমার পায়ের নিচের মাটিটা যেন থরথর করে কাঁপছে। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি কান্না চেপে রাখার তবু আজ আমার দুচোখ ভেঙ্গে জল আসছে! অনু ঠিকই বলেছিল - চিঠিটা পড়ে আমার সত্যি খুব কষ্ট হচ্ছে! আমার আত্মজ, আমার রক্ত যার শরীরের কনায় কনায় আমার সেই অনু আজ জীবনের এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি যেখানে ভুল আর সঠিক এর সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে! আমি জানি ওর এই দ্বিধা,এই প্রশ্নের উত্তর আমার চেয়ে ভালো আর কেউ দিতে পারবে না। ছোটবেলা থেকে অনেক কথাই বলেছি আমি ওর সাথে, ওকে নিজের মত করে মানুষ করেছি আমি। তবু কিছু কথা রয়ে গেছে যেগুলো বলা হয়নি কখনই। আজ সময় এসেছে সেসব বলার। অনেকগুলো কথা জমা হয়ে গেছে ..........অনেক কথা বলার আছে আমার অনুকে.......অনেক অনেক কথা.........
***********প্রথম পর্ব সমাপ্ত***********
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মে, ২০১০ রাত ৮:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


