মেজাজ খুব খারাপ। আমি একবার ওভারকোট খুলছি আবার পড়ছি। বাসায় আছি বলে রক্ষা, বাহিরে গেলে যন্ত্রনাটা পীড়ার পর্যায়ে অনুভুত হয়। রহস্য না করে খুলে বলছি। পরশুদিন ছিল ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম। আমি টি-শার্ট এর উপর শার্ট তার উপর সোয়েটার এবং তার উপর ওভারকোট পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম। ফলাফল অতি জঘন্য। এক সময় আমি অনুভব করলাম রিতিমত আমার শরীরে পিপড়ার মত কিছু দৌড়াচ্ছে! আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না আমার সামনের টেবিলে বসা জেনি বেচারী কেন তার উর্ধাঙ্গের প্রায় সব কাপড় খুলে ফেলেছে। আমিও শুরু করলাম। প্রথমে জুতা, তার পর মুজা তার পর একে একে ওভারকোট, সোয়েটোর এবং শার্টের সব বোতাম। তবুও গরম লাগছে। কি বিপদ! শেষ পর্যন্ত তিনটার সময় বাসায় চলে আসলাম। বাসে উঠে দেখি আমার সামনে একটা ছেলে বসেছে। সে পারলে বাসের জানালা ভেঙ্গে ফেলে, এত গরম। একটা বেশ নাদুশ-নুদুশ মেয়ে উঠেছিল। তার মুখে লাল লাল ছোপ পড়ে গিয়েছিল ডাবলিনের অসহনীয় গরমে।
পাঠক বিরক্ত হয়ে হয়তো ভাবছেন, এতই যখন গরম তখন কাপড় কম পড়লেই হয়। কিন্তু সমাধানটা অতটা সহজ নয়। এই গরমের দশ মিনিট পর শুরু হচ্ছে চরম স্নো-ফল। সূর্য প্রখর খরা তাপে সব পুড়িয়ে দেয়ার দশ মিনিট পর কাঁপতে কাঁপতে আবার সব গায়ে চাপাতে হচ্ছে। এই ব্লগটা যখন লিখছি তখন বাহিরে চরম রোদ। অথচ বিশ মিনিটও হয়নি বরফে ঢেকে ছিল এলাকা। আজব এই দ্বীপদেশটির প্রকৃতি বৈচিত্রের নামে চরম উপহাস শুরু করেছে। এখন মনে হচ্ছে গরমের থেকে শীত অনেক ভালো ছিল। অন্তত প্রকৃতির সরল-ছন্দিত পালাবদল দেখতে হতো না দশ মিনিট পর পর।
আমি যে কাপলদের সাথে বাসা শেয়ার করছি তারা চব্বিশ ঘন্টা প্রকৃতিকে গালি দিচ্ছে। পিটারের আফসোস সে এখন জগিং-এ যেতে পারবে না। আর মার্থার রাগ শপিং মিস হচ্ছে। আজকে সকাল থেকে কয়েকবার প্রচন্ড রোদ এবং এর পরপরই স্নো পড়েছে। প্রতিবার মার্থা আমার রুমে দৌড়ে এসেছে এবং চিৎকার করে বলেছে "দেখেছো নিয়াজ! এটার কোনও অর্থ হয়।" আমি বোকার মত একটা হাসি দেই আর মনে মনে বলি মিকাইল (অঃ)-এর নাম্বারটা আমার জানা নাই। থাকলে ফোন করে তোমার কম্প্লেইন পৌছানোর ব্যবস্থা করতাম। ভালো কথা, মিকাইল (অঃ)-তো রোদ-বৃষ্টি নিয়ন্ত্রন করে, তিনি কি স্নো নিয়ন্ত্রের দায়িত্বেও আছেন নাকি? গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন। পরে একসময় জেনে নিতে হবে ব্যপারটা।
ডায়েরী লিখতে বসে প্রকৃতি নিয়ে বকবক করছি। আসলে ডায়েরীতে লেখার মত তেমন কিছু নাই। উইক-এন্ড চলছে। তাই আজ এবং কাল দুইদিন পুরো রুমবন্দি। এরকম আবহাওয়াতে বাহিরে যেতেও মন চায় না। তাই ইন্টারনেট আর চ্যাটিং-এ সময় কাটাচ্ছি। কিন্তু এভাবেও দমবন্ধ লাগছে। মাঝে মাঝে মনে পড়ে দেশের কথা, আমার রুমটার কথা। বিরক্ত লাগলে কতকিছু করার ছিল। আমার লাইব্রেরী, আমার কি-বোর্ড আরও কতকিছু।
লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানুষকে কতকিছু ত্যাগ করতে হয় - তবু্ও কি মানুষ লক্ষ্যে পৌছাতে পারে? প্রতিনিয়ত মানুষ দৌড়াচ্ছে লক্ষ্যের পেছনে। দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় দৌড়ানোটাই তার লক্ষ্যে পরিনত হয় আর আসল লক্ষ্য থেকে যায় ধরা ছোয়ার বাহিরে। আমি আয়ারল্যন্ডের প্রকৃতির বৈচিত্র নিয়ে উপহাস করছিলাম। আমি কি আমার নিজের প্রকৃতিকে আজও পুরোপুরি বুঝতে পেরেছি? সম্ভবত না। এ জন্যই বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্রপূর্ন প্রাণী 'মানুষ'।
৬ এপ্রিল ২০০৮
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



