somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হ্যামিলটনিয়ান সাইকেল এবং কিছু মধুর-স্মৃতি

১১ ই জুন, ২০০৮ রাত ৩:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০০২ সনের ঘটনা। আমি তখন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়নরত কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের ছাত্র। আমাদের Discrete Mathematics ক্লাস নিতেন মনজুর আশরাফ স্যার। স্যারের একটা বিশেষত্ব ছিল গল্পের ছলে পড়ানো। পড়ার বিষয়গুলোকে গল্পের মত করে উপস্থাপন করতেন; ফলে আমরা নিজেদের অজান্তেই পড়ার মাঝে ঢুকে যেতাম।

অন্যান্য দিনর মত একদিন স্যার এসে আমাদের একটা গল্প শোনাতে শুরু করলেন। এক গনিতবিদের গল্প যিনি একটা খেলনা প্রস্তুতকারী সংস্থার হয়ে কাজ করেছিলেন কিছুদিন। তাঁর দায়িত্ব ছিল বাচ্চাদের জন্য খেলনা ডিজাইন করা। কয়েকদিনের খাটাখাটুনির পর তিনি একটা খেলনা তৈরী করেন। খেলনাটা ছিল এ রকম - অনেকগুলো শহর আছে। একজন দর্শনার্থীকে সবগুলো শহর ঘুরে আবার প্রথম শহরে ফিরে আসতে হবে, কিন্তু শর্ত হলো কোন একটা শহরে সে দু'বার যেতে পারবে না, এমনকি অন্য শহরে যাবার জন্য পূর্বেই ঘুরে ফেলা কোন শহরের উপর দিয়েও যাওয়া যাবে না। বলাইবাহুল্য শহরের মানচিত্র যত জটিল হবে, সমাধানও তত কঠিন হবে। যদিও খেলনাটা বাননো হয়েছিল বাচ্চাদের জন্য, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে বড় বড় পন্ডিতদের চোখের ঘুম হারাম হয়ে গেল এর সমাধান বের করতে।

সেই গনিতবিদের নাম ছিল উইলিয়াম রাওয়ান হ্যামিলটন এবং তার নামানুসারে এই বিশেষ খেলনা বা পাজেলটার নামকরন করা হয় হ্যামিলটনিয়ান সাইকেল। যদি শর্তের ভেতরে থেকে সবগুলো শহর ভ্রমন করা যায় কিন্তু শুরুর শহরে ফিরে আসা না যায় তখন তাকে বলা হলো হামিলটনিয়ান পাথ।

স্যার আমাদের হ্যামিলটনের তৈরী করা প্রথম পাজেলের ছবিটা এঁকে দিলেন বোর্ডে। সাথে সাথে সেটা সমাধান করার জন্য আমরা ঝাপিয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুতেই সমাধানের দিকে যেতে পারছিলাম না। যখনই সমাধানকে প্রায় গুছিয়ে নিয়ে আসি, আবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিলাম। এই ব্লগের পাঠক চেষ্টা করে দেখতে পারেন। উপরের ছবির কালো বর্গগুলো শহর এবং লাল রেখাগুলো রাস্তা। কোন শহরে দু'বার না গিয়ে যেকোন একটি শহর থেকে যাত্রা শুরু করে সব শহর ভ্রমন করে আবার সূচনাকারী শহরে ফিরে আসতে হবে। বাচ্চাদের জন্য তৈরী করা এই খেলাটি হ্যামিলটন Icosian Calculus ব্যবহার করে সমাধান করেছিলেন! যে সকল পাঠক সমাধান বের করতে ব্যার্থ হবেন তারা অনুগ্রহ করে পুরো ব্লগটি পড়ুন। কোন এক স্থানে সমাধান দেয়া আছে।

মূলপ্রসঙ্গে ফিরে আসি। সেদিন থেকে হ্যামিলটনিয়ান সাইকেল, ইউলার সার্কিট সহ এধরনের গ্রাফ থিওরী সংক্রান্ত বিষয়ের আমি ভক্ত হয়ে পড়ি। পরবর্তিতে আরও বড় ক্লাসে ওঠার পর আরও অনেক জেনেছি এবং শিখেছি। কিন্তু সেদিনের সে ক্লাসের স্মৃতি মনের মাঝে আজও অমলিন, যেন গেঁথে গিয়েছে সারা জীবনের জন্য।

২০০৭ সনের ঘটনা। আমি তখন উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের শিক্ষক। সেমিস্টারের শেষের দিকে ছাত্রদের নিয়ে বিতর্ক প্রতিযোগীতার আয়োজন করছিলাম। কারো কারো অন্যান্য বিষয়ের ভাইবা পরীক্ষা ছিল। তাই মিটিং-এ বারবার বাধা পড়ছিল। এক সময় মিটিং থামিয়ে ছাত্রদের সাথে গল্প করতে শুরু করলাম। দেখা গেল বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রীর Discrete Mathematics পরীক্ষা। জিজ্ঞেস করলাম হ্যামিলটনিয়ান সাইকেল পড়েছে কি না। খুব একটা জোরের সাথে উত্তর পেলাম না। বুঝলাম ওরাই বোঝেনি আসলে ওরা কি পড়েছে। খারাপ লাগলো খুব। এত মজার বিষয়টা ওরা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধিই করতে পারলো না। মার্কার নিয়ে বোর্ডের সামনে এসে দাড়ালাম। মনজুর আশরাফ স্যারের নেয়া পাঁচ বছর আগের সেই ক্লাসের মত করে বোঝাতে শুরু করলাম। সেই একই গল্প, একই উপস্থাপনা। এক সময় দেখলাম অন্য ডিপার্টমেন্টের ছাত্রছাত্রীরাও বেশ মজা পাচ্ছে। সবার মাঝে সমাধান করার একটা ইচ্ছা। অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরে গেল মনটা। মনে মনে স্যারকে কুর্নিশ করে বললাম, "গুরু তোমায় সালাম"।

কেটে গিয়েছে আরও এক বছর। জীবন আমাকে নিয়ে এসেছে ইউরোপের একটি অনিন্দ সুন্দর দ্বীপদেশ আয়ারল্যান্ডে। চারশ বছরের পুরোনো ইংরেজী বিশ্বের সপ্তম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় - ট্রিনিটিতে আমি এখন মাস্টার্স করছি। পড়ার ফাকে ফাকে কাজ করি Disabled Student Service বিভাগের একাডেমিক টিউটর হিসেবে। আমার এক ছাত্রী আছে যাকে আমি নোট নিতে সাহায্য করি ক্লাসে উপস্থিত থেকে। অন্যান্য দিনের মত একদিন আমি তার হয়ে নোট নিচ্ছিলাম ক্লাসে। প্রফেসার ছাত্র-ছাত্রীদের জিজ্ঞেস করলেন তারা অনুমান করতে পারবে কি না এখন কোন বিষয় পড়ানো হবে। দেখা গেল কেউ পারছে না। সংকেত দেবার মত করে এবার তিনি বললেন এমন একটা বিষয় পড়ানো হবে যার প্রনেতা আমাদেরই একজন প্রাক্তন ছাত্র। ছাত্রদের মাঝে একটু ফিস-ফাস শোনা গেল, আমিও আগ্রহ নিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম কি পড়াতে পারেন তিনি। দেখা গেল তখনও আমরা মাঝ সাগরে সাতার কাটছি। সংকেত আরো বেড়ে চলল। বললেন, সেই ব্যাক্তির নামে একটা লাইব্রেরী আছে। সাথে সাথে আমার মাথায় বিদ্যূত চমকে গেল। ট্রিনিটির প্রাক্তন ছাত্রের তালিকায় অনেক বিখ্যাত মানুষের নাম আছে, যেমন জর্জ বার্কলে (দার্শনিক), অস্কার ওয়াইল্ড (স্বনামধন্য কবি ও লেখক), জোনাথাস সুইফট (গালিভারস ট্রাভেলস-এর লেখক), স্যামুয়েল ব্যাকেট (নোবেল বিজয়ী আইরিশ সাহিত্যিক), ব্র্যাম স্টোকার (ড্রাকুলার লেখক), জন সিনজ (প্লেবয় অব দ্যা ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড এর লেখক), আরনেস্ট ওয়ালটন (একমাত্র নোবেল বিজয়ী আইরিশ পদার্থ বিজ্ঞানী) প্রমুখ। তাঁদের ভীড়ে কোন দিন আমি চিন্তা করেও দেখিনি যে আমাদের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের লাইব্রেরীরর নাম কেন হ্যামিলটন লাইব্রেরী হলো। বলাইবাহুল্য, হ্যামিলটনই সেই প্রাক্তন ছাত্র।

আমি যখন চিন্তা করছিলাম, তখন প্রফেসার হ্যামিলটনের জীবন নিয়ে বক্তব্য দেয়া শুরু করে দিয়েছেন। এর খানিকটা আমি আগেই শুনেছি, কিন্তু যেটুকু বাকি ছিল তা যেন আমার জন্য নুতন বিস্ময়ের মাত্রা যোগ করেতে শুরু করলো। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এটা তাঁর তৈরী করা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোন একটা গবেষনা সংস্থার ওয়েব সাইট (নামটা বলেছিলেন, তবে এখন মনে নেই আমার) থেকে তিনি নামিয়েছেন। তিনি জানালেন হ্যামিলটন পাশ করে বের হবার আগেই ট্রিনিটিতে প্রফেসরশীপ পেয়েছিলেন। গনিত এবং এস্ট্রনমীতে ছিল তার সুবিশেষ দখল । গনিতের অনেক জটিল তত্ত্বের প্রনেতাও তিনি। তাঁরই সম্মানে এ্যালজাবরার 'এইচ' প্রতীকের প্রবর্তন। পরবর্তিতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন একটা প্রখ্যাত বিজ্ঞান সংস্থার (নাম ভুলে গিয়েছি) প্রথম অ-মার্কিনি হিসেবে ফেলো হয়েছিলেন।

তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময়টা তখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। তিনি তেরটা ভাষায় রিতিমত পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন যার মাঝে তিনটা এমন ভাষা ছিল যা কিনা সব সময় শেখা খুব কঠিন। সিনেমা হলের মত বড় স্ক্রিনে ভেসে আসলো প্রথমে হিব্রু, তার পর সংস্কৃত এবং সব শেষে...। আমি অনুভব করছিলাম আমার হাত তখন উত্তেজনায় কাঁপছে। তৃতীয় ভাষাটি ছিল বাংলা।

আজও আমি যখন প্রতিদিন দুপুরে হ্যামিলটন ভবনের নীচে ক্যাফেতে বসে লাঞ্চ করি, মনে মনে অদৃশ্য কুর্নিশ জানাই এই বিরল প্রতিভাকে। যদি কোন দিন টাইম মেশিনে করে অতীতে যেতে পারতাম, তাহলে হ্যামিলটনকে মজা করে বাংলায় একটা প্রশ্ন করতাম, "এত কিছু আপনি বুঝলেন, কিন্তু এটা বুঝলেন না যারা ওয়ান, টু-ই পারে না, তাদের জন্য Icosian Calculus একটু কঠিন হয়ে যায়!" (সমাধান ১, সমাধান ২)

১০ জুন ২০০৮
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৪০
৭টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×