somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডাবলিনের ডায়েরী - চার (২০ এপ্রিল ২০০৮)

১১ ই জুন, ২০০৮ বিকাল ৫:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ডাবলিন আসার পর উইক-এন্ড শব্দটার মর্মার্থ বুঝতে পেরেছি। কেন যে মানুষ তীর্থের কাকের মত উইক-এন্ডের জন্য বসে থাকে সেটা নিজেই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। সপ্তাহের রান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর গোছানো এবং সর্বপরি দম ফেলার জন্য খানিকটা ফুরসত। সপ্তাহের পাঁচদিন চরম ব্যাস্ততার পর শুক্রবার রাত তথা প্রথম বিশ্বের ভাষায় ফ্রাইডে নাইট যেন জীবনে এক পশলা বৃষ্টি। গত একটা সপ্তাহ মানসিক এবং শারীরিক পরিশ্রম এত হয়েছে যে শুক্রবার রাতে বাসায় ফিরে মনে হলো এত শান্তির ছুটি যেন আর হয় না।

বলার মত গল্প আছে অনেক। কিন্তু গুছিয়ে আনতে পারছি না। ট্রিনিটি ল ডে দিয়ে শুরু করি। এক দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখি রাগবী মাঠে কি সব এনে জড়ো করা হচ্ছে। প্রথমে লক্ষ্য করিনি, পরে দেখলাম মেয়েরা হলুদ টি-শার্ট পরে ঘুরছে। টি-শার্টের লেখা পড়ে বুঝতে পারলাম ট্রিনিটি ল ডে উপলক্ষে কোন বিশেষ অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে। কিছুক্ষন পর শুরু হলো বাঞ্জি জাম্প সহ আরও অদ্ভুত সব খেলা। মেয়েরাই প্রধানত লাফালাফি করছে আর ছেলেরা সব ঠিকঠাক করে দিচ্ছে। হাত নিচে দিয়ে পা শুন্যে তুলে কিছু মেয়ে খেলার চেষ্টা করলো। কিছূ মেয়ে বালিশ নিয়ে মারামারি ধরনের খেলাও খেললো। তখন ক্যাম্পাসে অনেক টুরিস্ট ছিল । সবাই রিতিমত রাগবী মাঠের চার পাশে জড়ো হয়ে গিয়েছে। হাতে ক্যামেরা থাকায় আমি ছবি তুলতে শুরু করলাম। কিছুক্ষন পর দেখলাম ছাত্রছাত্রীরা টুরিস্ট এবং অন্য সবাইকে আমন্ত্রন জানাচ্ছে খেলার জন্য এবং রিতিমত অনেকে খেলতে শুরুও করে দিয়েছে। একটা মেয়ে আমন্ত্রনের ভঙ্গিতে আমার দিকে হাসি মুখে এগিয়ে আসছিল। বুঝলাম এই বেলায় বেইজ্জত হবার সময় হয়েছে। যদি হাত-মাথা নিচে দিয়ে পা উপরে তোলার খেলায় আমাকে ঢোকায়, আমি শেষ। ছবি তোলা বাদ দিয়ে এমন ভাবে হাটাদিলাম যেন আমি এত্ক্ষন কিছুই দেখিনি।

গত সপ্তাহেই ঘটলো একটা মজার ঘটনা। আমি ব্শ্বিবিদ্যালয় থেকে বের হয়েছি একটু সন্ধার দিকে। প্রচন্ড মাথা ব্যাথা করছিল। গবেষনার একটা জটিল কাজ কিছুতেই মিলছে না। সেটা নিয়ে সারা দিন যুদ্ধ করে সন্ধার দিকে হাল ছেড়ে বের হয়ে এসেছি। খানিকটা আনমনাও ছিলাম। বাস স্ট্যন্ডে এসে দাড়াতে না দাড়াতে দেখি আমার বাস চলে এসেছে। একটু অবাক হলাম বটে, তবে মনে মনে খুশি হলাম কারন চরম ঠান্ডায় আমার হাতগুলো জমে যাচ্ছিল তখন। বাসের ভেতরে ঢোকার পর মনে হলো উষ্ণতা যেন আমাকে আলিঙ্গন করে নিচ্ছে। সিটে বসার পর খানিকটা তন্দ্রার মত এসেছিল, হঠাৎ দেখলাম বাসটা একটা মোড়ে এসে বায়ে ঢুকে গেল। আমি তাড়াতাড়ি উঠে দাড়ালাম। বোঝার চেষ্টা করলাম কি হচ্ছে। অন্য যাত্রীরা খুব স্বাভাবিক ভাবে বসে আছে। কিন্তু যে রাস্তায় বাস চলছে সেটা সম্পূর্ন নুতন রাস্তা। আমার প্রতিদিনের আসা যাওয়ার রাস্তা এটা নয়। খানিক পরেই ব্যপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হলো। আমি 74 এর পরিবর্তে 74A বাসে উঠে পড়েছি। আমার ক্লান্তি আমার চোখে ভ্রান্তি হয়ে দেখা দিয়েছিল। দ্রুত চিন্তা করলাম কি করা যায়। বাস তখন বেশ নির্জন একটা রাস্তায় চলে এসেছে। চার দিকে ঘন জঙ্গল। মাঝে মাঝে ফাকা মাঠ, সেখানে আইরিশ ঘোড়া চরে বেড়াচ্ছে। এ যেন আমাদের দেশের মাঠে গরু চরে বেড়ানোর মতই স্বাভাবিক। একবার চিন্তা করলাম নেমে পড়ি, আবার দেখলাম এখন নামলে ঘোড়ায় চড়ে বাড়ি যাওয়া ছাড়া আর কোন পথ থাকবে না। চলতে চলতে আমি পাহাড়ের উপরে উঠে যেতে লাগলাম। অনেক নিচে ডাবলিন শহরকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলাম। তখনই ঠিক করলাম পরে একদিন এখানে এসে ছবি তুলবো। মুগ্ধতা ভাংতে সময় লাগেনি। আমি দ্রুতই দূরে সরে যাচ্ছি। ফিরে আসার চিন্তা তখন মাথায় ঘুরছে। হঠাৎ মনে হলো যেখানেই যাক এই বাস, এত চিন্তার কিছু নাই। ফিরেতো সে আসবেই। একে একে বাসের সব যাত্রী নেমে যাচ্ছিল কিন্তু যাত্রা যেন শেষ হয় না আর। আরও খানিকটা পরে এক নির্জন রাস্তায় বাস আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। এতটা বোকা আমি নয় যে এরকম জায়গায় নেমে পড়বো কারন ছাড়া। তত্ক্ষনে রাস্তায় আরেকটা বাসের নাম্বার দেখা দিতে শুরু করেছিল। সেটা আর কোন বাস না, খোদ 74। অতএব, কোন না কোন সময় এই রাস্তায় 74 যাবে এবং আমি তখন তাতে উঠে বসবো, এই আমার পরিকল্পনা। দশ-পনের মিনিট অপেক্ষা করার পর আমার অনুমান সত্য প্রমান করে 74 বাস আসলো। সম্পূর্ন খালি। বাস ড্রায়ভার একটু অবাক হয়ে বললো তুমি এখানে কি করছো? আমি একটা হাসি দিলাম। সেটার অর্থ "আমি ঘাস কাটছিলাম" থেকে শুরু করে "তোর কাজ বাস চালানো, প্রশ্ন করা না" পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল!

মাঝে মাঝে মনে হয়, ডাবলিনের এই কঠিন জীবনে আল্লাহ আমাকে কত ভালো রেখেছেন। UK-Ireland -এর সেরা দশটা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটাই পড়ছি, ১৪-১৫ লক্ষ টাকা টিউশন ফি, সেটাও দিচ্ছে সরকার। খরচের টাকারও চিন্তা নাই, মাস যেতেই ব্যাঙ্কে টাকা আসছে সরকার থেকে। মানের মত সুপারভাইজার পেয়েছি যে কিনা বন্ধুর মত সাহায্য করছে প্রতিনিয়ত। অথচ আমারই মত ছেলেরা কি কষ্টটা করছে এখানে। গত শুক্রবার নামায পড়ে বের হবার পর বাসে আরো কিছু বাংলাদেশী ছেলে উঠলো যারা এখানে পড়ছে। তাদের কথা শুনে বেশ খারাপ লাগলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি জোগার করতে দুটো কাজ করেও কুলাতে পারছে না। একজন বাধ্য হয়েছিল চুরি করতে। তবুও তারা সংগ্রাম করে যাচ্ছে। জীবনের সংগ্রাম। শিক্ষিত হবার সংগ্রাম।

এই ডাবলিন জীবনে অনেক কিছু শিখেছি এবং বুঝেছি। সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা পেয়েছি সেটা হলো যুদ্ধ করার শিক্ষা। জীবনে যতই পরিবার আর প্রিয়জন থাকুক না কেন, নিজের যুদ্ধ সব সময় নিজেকে করতে হয়। নিজের পায়ে দাড়ানোর অর্থ আমি গত পচিশ বছরে বুঝিনি। বুঝবো কি করে, দাড়িয়েতো ছিলাম নিজের পায়েই, কিন্তু ভর ছিল অন্য কোথাও। এখন যখন পায়ের উপর সত্যিকারের ভর অনুভব করতে শুরু করেছি তখন জীবনকেও নুতন করে উপলব্ধি করতে পারছি। সম্ভবত সত্যিকারের জীবনকে।

২০ এপ্রিল ২০০৮
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০০৮ বিকাল ৫:৫৯
৭টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×