somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যেভাবে আমি আজ ট্রিনিটিতে (দ্বিতীয় খন্ড)

১৯ শে জুন, ২০০৮ রাত ১২:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম খন্ড - Click This Link

২০০৭ এর মে মাসে আমি উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হসেবে জয়েন করি, একই মাসে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক লাভ করি এবং সে মাসেই বিশ্বের সেরা ২৫ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি, কিংস কলেজ লন্ডন থেকে মাস্টার্স এবং পি.এইস.ডি. কারার অফার লেটার পাই। উল্লেখ্য যে মে আমার জন্ম মাস এবং এতগুলো স্মরনীয় জন্মদিনের উপহার মানুষ সম্ভবত খুব কমই পায়। আল্লাহর অশেষ রহমত, আমি ইংল্যান্ডে যে এগারোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছিলাম, পরবর্তিতে একেএকে একটি বাদে সবগুলো থেকে অফার আসতে শুরু করে। কুইনমেরীতে বেশ ভালো একটা আংশিক স্কলারশীপও পেয়ে গেলাম, বলাইবাহুল্য আমার সেখানকার সুপারভাইজারও প্রচন্ড সাহায্য করে ছিলেন এবং তার অবদান এই স্কলারশীপের জন্য অনেক। কিন্তু আমার মূল লক্ষ্য কুইন মেরী ছিলনা। মাথায় তখনও চিন্তা কিংস-এ যাব। স্কলারশীপের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছি। কিংস-এর সুপারভাইজারও অনেক সাহায্য করছিলেন তখন।

এদিকে মে-এর শেষের দিকে অপ্রত্যাশিত ভাবে ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিকালের প্রফেসার মার্টিন আমাকে মেইল করে জানান তার একাওন্টে আমার লেখা মেইলটি লুকিয়ে ছিল যা তিনি দেখতে পাননি আগে। তিনি আরও জানান তার কাছে এই মুহুর্তে একটা স্কলারশীপ আছে যেটার জন্য তিনি আমাকে 'স্ট্রং ক্যানডিডেট' হিসেবে বিবেচনা করছেন। তিনি আমার ঢাকার প্রফেসারদের সাথে কথা বলে আমাকে চুড়ান্ত স্বীদ্ধান্ত জানাবেন। বলাইবাহুল্য অনেক আগে আমি যাদের মেইল করে ছিলাম, তিনি তাদেরই একজন।

যাই হোক, দেখতে দেখতে কেটে যাচ্ছিল দিন। উত্তরায় লেকচারারের কাজটা বেশ আনন্দের সাথেই করছি তখন। আমার কাছে 'কাজ' এর পরিবর্তে 'পরিবার'ই বেশি মনে হচ্ছিল। ছাত্রদের অসাধারন ভালোবাসা পেয়েছি। ভিসি স্যার এবং এ্যাসিসটেন্ট রেজিসট্রারার ম্যাডাম সহ সবার প্রচন্ড সাপোর্ট ছিল আমার প্রতি। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ডিবেটিং ক্লাব খোলা সহ আরো বিভিন্ন কাজে হাত দিলাম। ব্যস্ততা চারদিক থেকে ঘিরে ধরতে শুরু করলো এবং আমার বাহিরে পড়তে যাবার ব্যাপারটা কিছুটা চাপা পড়ে গেল।

১২ই জুন ই-এফ-ই-এস এ ছিল নর্থ সাউথ উইনিভার্সিটির ডিবেটিং ফেসটিভেলের গ্র্যান্ড ডিনার। সেখানে তুশার ভাই, বাবু ভাই সহ আনেকের সাথে দেখা হলো। সবাই আমার বাহিরে যাবার ব্যাপারে জানতে চাইলেন। আমিও সবাইকে মোটামোটি আপডেট জানালাম। তখনই মনে মনে ঠিক করলাম আজকে বাসায় গিয়ে আবার খোঁজ নিতে হবে, তবে আয়ারল্যান্ডের কথা চিন্তা করিনি, করেছিলাম ইংল্যান্ডের কথা। কিংস-এ আমি মে এর শেষ সপ্তাহে একটা বেশ ভালো স্কলারশীপের জন্য আবেদন করেছিলাম। সেটার ব্যাপারে একটা সমস্যা ছিল। সেটা নিয়ে আবার যোগাযোগ শুরু করার কথা ভাবছিলাম। বাসায় এসে যখন জি-মেইলটা ওপেন করলাম, আমি কিছু সময়ের জন্য 'হা' হয়ে বসে রইলাম। স্টিফান মেইল করেছেন। আমি যে ডকুমেন্টগুলো মেইল করেছিলাম সেগুলো তিনি প্রিন্ট করে আমার হয়ে ট্রিনিটিতে 'ট্রিনিটি কলেজ পোস্টগ্রাজুয়েট রিসার্চ স্টুডেন্টশীপ' স্কিমের জন্য আবেদন করে ছিলেন, যেটা সফল হেয়েছে, আর্থাৎ স্কলারশীপটা আমি পেয়েছি। একটা মানুষ নিজ উদ্যোগে এত বড় উপকার করবেন, এ যুগে ভাবাই যায় না।

এটা ছিল খুবই ভালো একটা স্কিম, ১৪,০০০ ইউরো (তখন ১০২ টাকা ছিল প্রতি ইউরো) টিউশন ফি পুরোটাই দিবে, তার উপর থাকা-খাওয়ার জন্য আরো ৮,০০০ ইউরো। এটা প্রতি বছরের হিসাব। মাস্টার্স করলে চলবে দুই বছর আর পি.এইস.ডি করলে তিন বছর। এখানে উল্লেখ্য যে আমি এ পর্যন্ত যতগুলো স্কলারশীপের জন্য আবেদন করে ছিলাম, সবগুলো টিউশন ফি পুরোটা বা আংশিক দিতো, কিন্তু থাকা-খাওর খরচের কথা চিন্তাও করি নাই। তাই এই অফারটা আমার জন্য হাতে চাঁদ পাওয়ার থেকেও বড় ব্যাপার ছিল।

আমার জন্য আরও বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল স্টিফানের পরবর্তি মেইলে। তিনি আমাকে জানালেন আমি যেন এই স্কলারশীপটা গ্রহন না করি। তিনি চান আমি আইরিশ সরকারের সবচেয়ে বড় যে স্কলারশীপটা আছে (এম্বার্ক ইনিশিয়েটিভ) সেটার জন্য আবেদন করি। কারন সেটায় টিউশন ফির পাশাপাশি থাকা-খাওয়ার খরচ পুরো দ্বিগুন, তার উপর কম্পিউটার কেনা এবং গবেষনার গন্য অতিরিক্ত আরও ৮,০০০ ইউরো। রিতিমত রাজার হালে থাকার মত ব্যবস্থা। তার উপর যারা এটা পাবে তাদের জন্য আছে বিশেষ ডেজিগনেশন, "গভর্নমেন্ট অভ আয়ারল্যান্ড স্কলার"। কিন্তু আমার মধ্যে একটা ভয় কাজ করতে শুরু করলো। আমি কি এত বড় স্কলারশীপের জন্য যোগ্য? মাত্র ১০টা স্কলারশীপ ছিল আন্তুর্জাতিক (ইউরোপ বাদে সারা পৃথিবী) ছাত্রদের জন্য। চীন এবং ভারতের দাপটে বাংলাদেশের ছাত্র কি টিকতে পারবে? ভয়টা স্টিফানকে জানানোর পর তিনি রিতিমত ফু দিয়ে উড়িয়ে দিলেন। বললেন এটা নাকি আমার না পাওয়ার কোন কারনই নেই! এর আগে তার চার জন ছাত্র 'গভর্নমেন্ট অভ আয়ারল্যান্ড স্কলার' হয়েছে। অতএব কি করে ডকুমেন্ট প্রস্তুত করতে হয় সেটা তার থেকে ভালো কম মানুষই জানে। আমরা পরবর্তি একমাস রিতিমত যুদ্ধ করলাম এবং যুদ্ধ শেষে যে ফলাফল বের হলো তা হচ্ছে নিঁখুত একটা পারসোনাল স্টেটমেন্ট এবং একটা দেড় পৃষ্ঠার মধ্যে লেখা কিন্তু গোছানো রিসার্চ প্রপোজাল। সব শেষে আমরা সফল ভাবে অনলাইনে সাবমিট করলাম সবকিছু।

সত্য কথা বলতে, যাদিও আমি আবেদন করলাম, কিন্তু নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না এটা আমি পেতে পারি। আর যাদি না পাই তখন এই কূল - ঐ কূল, দুকূলই যাবে কারন আমার বর্তমান স্কলারশীপের (ট্রিনিটিরটা) একটা শর্ত হচ্ছে এটা যদি আমি গ্রহন করি তাহলে আমি অন্য কোন ফান্ডের জন্য আবেদন করতে পারবো না। ব্যাপারটা স্টিফানকে জানানোর পর তিনি ইউনিভার্সিটির এই অযৌক্তিক পলিসির ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন এবং জানালেন গতবছর তার এক ছাত্রের সাথে এটা নিয়ে সমস্যা হয়েছে। অতএব একটা সমাধান খোঁজার চেষ্টা করলাম আমরা যেটার মাধ্যমে লাঠিও ভাঙবে না আবার সাপও মরবে। শেষ পর্যন্তু স্টিফানই বের করলেন সমাধান। তিনি ডিন অব গ্রাজুয়েট স্টাডিজকে অনুরোধ করে রাজী করলেন আমাকে কিছুটা সময় দিতে যাতে আমি আমার স্বীদ্ধান্তু (একসেপটেন্স) দেড় মাস পর জানাতে পারি।

এদিকে ট্রিনিটিতে তখন পর্যন্ত আমি অফিসিয়ালী আবেদন করি নাই। তাই স্টিফান আমাকে জানালেন আমি যেন দ্রুত সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সহ আবেদন করি। কিন্তু এই আবেদন করাটাই বাধালো এক চরম গন্ডগোল। ইংল্যান্ডে অক্সফোর্ড এবং কেম্ব্রিজ ছাড়া অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে ফি লাগে না। তাই আমি মনের খুশি মত একটার পর একটায় আবদেন করে গিয়েছিলাম। কিন্তু ট্রিনিটিতে ৪৬ ইউরো এর একাটা ফি আছে যেটা আমাকে হয় ক্রেডিট কার্ড অথবা ব্যাংক ট্রানসফার অথবা মানি-অর্ডার করে পাঠাতে হবে। তখন দেশে জরুরী অবস্থা, তাই বিদেশে টাকা পাঠানো এক কষ্টকর ব্যাপার। আনেক চিন্তার পর আমার কাজিনকে (পাভেল ভাইয়া) আমি লন্ডনে ফোন দিলাম। ভাইয়া বলল সে আমার হয়ে পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কাকে এবং কোথায় পাঠাবে, এই বিষয়টা আমি গুলিয়ে ফেললাম। এদিকে সময় কেটে যাচ্ছে। আমার ভিসার জন্যও দাড়াতে হবে। রিতিমত একটা ডেড-লক সিচুয়েশনের মাঝে আটকে আছি। একদিন পাভেল ভাইয়া বলল সে সারা দিন ফ্রি আছে। অতএব, যে ভাবে হোক আমার কাজটা সে করে দিবে। এখনও আমার ভাবলে কৃতঙ্গতায় মনটা ভরে উঠে। পাভেল ভাইয়া সারা দিন অনেক খেটে শেষ পর্যন্ত টাকাটা পাঠাতে পারে, প্রায় সমপরিমান ট্রান্সফার ফি দিয়ে। ভাইয়া ওদিক দিয়ে টাকাটা পাঠিয়ে দেয় আর এদিক দিয়ে আমি ডি-এইস-এল এ করে ফর্ম। দিন পনেরর মধ্যেই অফার লেটার এবং অন্যান্য কাগজপত্র সহ সব কিছু আমার হাতে এসে পৌছায়। প্রথমবারের মত একটা অদ্ভুত অনুভুতি আমাকে ঘিরে ধরেছিল। কারন ইংল্যান্ডের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অফারে আমার মনে হয়নি আমি যেতে পারবো কারন সেখানে পূর্নাঙ্গ স্কলারশীপ ছিল না। কিন্তু ট্রিনিটির অফারে সব কিছু আছে। যেন শুধু ভিসাটাই আমার আর ট্রিনিটির মাঝে সাময়িক বাঁধা হয়ে দাড়িয়ে ছিল। (চলবে)

৩১ মার্চ ২০০৮
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুন, ২০০৮ রাত ১২:৫১
১১টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×