সিনেওয়ার্ল্ড বলে একটা গ্রুপ আছে যারা ইউকে - আয়ারল্যান্ড অঞ্চলে বেশ দাপিয়ে ব্যবসা করছে। ইংল্যান্ড, ওয়েলস এবং স্কটল্যান্ড বাদেও তাদের ব্যবসার একটা গুরুত্বপূর্ন অংশ আয়ারল্যান্ডে রয়েছে। এখানে তাদের হাইটেক থিয়েটারগুলোতে ঢুকলে কিছু সময়ের জন্য জাদুঘর খেতাব পেয়ে যাওয়া আয়ারল্যান্ডকে একটু অন্য রকম মনে হয়। ডাবলিনে আমার বাঙালী বন্ধু বলতে সৈকত ভাই এবং তার স্ত্রী নদী। তাদের সাথেই প্রথম সিনেওয়ার্ল্ড ভ্রমন। নদীর খুব ইচ্ছে ছিল ডিজনির নুতন এনিমেটেড মুভি ওয়াল-ই দেখবে। ফলে তাদের অতিথি হয়েই সিনেমা দেখা শুরু। যারা ওয়াল-ই দেখেননি, অনুরোধ রইলো একবার হলেও দেখুন। রোবটিক ভালোবাসাকে যে কতটা চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করা যায় তার এক মুগ্ধ হয়ে থাকার মত দৃষ্টান্ত এই এনিমেটেড চলচিত্রটি।
সেদিনই সৈকত ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম সিনে ওয়ার্ল্ড এর আনলিমিটেড অফারের কথা। ২০ ইউরো দিয়ে টিকেট কাটলে সারা মাসে যতবার যত খুশি মুভি দেখা যাবে। এই অফার শুধু আয়ারল্যান্ডের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয় বরং ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলসের সিনেওয়ার্ল্ড সিনেমা হলগুলোতেও সমান ভাবে কার্যকর। মনে মনে ভেবে খুশি হলাম যে লন্ডন বেড়াতে গেলে কয়েকটা মুভি মুফতে দেখে আসা যাবে!
যাইহোক, পরদিনই ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট সহ দৌড়ালাম সিনেওয়ার্ল্ডে, উদ্দেশ্য আনলিমিটেড গ্রাহক হওয়া। লাইনে দাড়িয়ে অন্যদের ফর্ম ফিলাপের দৃশ্য দেখতে দেখতে আমার একটু ভয় ধরতে শুরু করলো। সবাই পাসপোর্ট নিয়ে এসেছে আই. ডি. হিসেবে। তাছাড়া সবার কাছে পাসপোর্ট সাইজ ফটোগ্রাফও চাচ্ছে কাউন্টারের ছেলেটা। বলাইবাহুল্য দুটোর কোনটাই আমার কাছে নেই। কি করবো ভাবতে লাগলাম। পকেটে ট্রিনিটির স্টুডেন্ট আই. ডি. আছে। সেটা দিয়ে হয়তো পাসপোর্টের বিকল্প কাজ চালিয়ে নিতে পারবো কিন্তু ফটো? মেজাজটা চরম খারাপ হয়ে গেলো। ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট ইউনিয়ন শপের পাশেই ফটো তোলা যায়। আগে জানলে পাঁচ মিনিটে ফটো তুলে নিয়ে আসতে পারতাম। কি আর করা! চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। আমারও মাথায় নিত্য নুতন বুদ্ধি আসতে শুরু করলো, কিন্তু ঐ মূহুর্তে কি করনীয় সেটা ভেবে পেলাম না।
এক সময় আমার ডাক পড়লো। কাচুমাচু মুখে গিয়ে কাউন্টারের ছেলেটাকে বললাম আমার কাছে পাসপোর্ট নেই, তবে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের আই. ডি. আছে। ছেলেটা বেশ অমায়িক। হেসে বলল, কোন সমস্যা নেই; তাতেই চলবে। এবার আমি আরও বিগলিত হয়ে বললাম আমার কাছে ফটোও নেই তবে পেন ড্রাইভে সফ্ট কপি আছে, যদি প্রিন্ট করার ব্যবস্থা থাকে তাহলে ওটা প্রিন্ট করে নেয়া যাবে। ছেলেটা একটু সরু দৃষ্টিতে তাকালো এবার। তারপর বলল, গ্রাউন্ড ফ্লোরের উল্টা দিকে সেল্ফ ফটো টেকিং যন্ত্র আছে, সেখান থেকে ফটো তুলে তারপর আসতে। তবুও একটা সমাধান হওয়াতে প্রানে পানি পেলাম। আমার তখন মনে হচ্ছিল আজ আমি মেম্বার হতে না পারলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে! অতএব পৃথিবীকে রক্ষার জন্য আমি দৌড়ালাম ফটো তুলতে।
মেশিনের মধ্যে বসে আমি খুব করে নিজেকে দেখে-টেখে ফটো তোলার জন্য যেই প্রস্তুত হলাম দেখলাম পকেটে পর্যাপ্ত কয়েন নেই। ছয় ইউরো লাগবে ফটো তুলতে, পকেটে সাকুল্যে পাঁচ ইউরোর কয়েন আছে। কি আর করা! হতাশ ভাবে বের হয়ে এলাম। মনেমনে ভাবলাম কোন এক দোকানে গিয়ে কি বলবো যে আমাকে একটু ভাংতি দাও? এখানে গত আট মাসে এটা করিনি বা কাউকে করতে দেখিনি। ঘাড় ধরে আবার বের করে দিবে না তো? এখানে সবই সম্ভব। অনেক দোকানের সামনে লেখা থাকে - অথোরিটি কিপস দ্যা রাইট টু রিফিউজ এপমিশন! ভদ্রভাষায় লেখা কথাটার মানে যে ঘাড় ধরে বের করে দেয়া সেটা বেশ কয়েকবার স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে! অতএব সে পথে আর গেলাম না। বরং ঠিক করলাম কোথাও গিয়ে কিছু খেয়ে তারপর বিল দেয়ার সময় বলবো কয়েনে চেঞ্জ দিতে।
সিনেওয়ার্ল্ড থেকে বের হয়ে এসে পাশের একটা ফাস্টফুডের দোকানে ঢুকলাম। কি খাওয়া যায় চিন্তা করতে করতে হঠাৎ মনে হলো ডিনারটা করে নিলেই হয়। যদিও তখন বাজে বিকেল চারটা তবুও ডিনারই যথার্থ মনে হলো কারন টিকেট কাটার পর মুভি দেখতে ঢুকলে আর ডিনার করা হবে না। যেমন ভাবা তেমন কাজ, ডিনারে বসলাম। রাজকীয় স্টাইলে আস্তে ধীরে খাচ্ছি। তাড়া নেই। আজকে মেম্বার হয়ে রাত পর্যন্ত মুভি দেখে তবেই বাসায় যাবো, ঠিক করে ফেলেছি ততক্ষনে।
হঠাৎ দেখলাম আমার ঠিক কোনাকোনি ভাবে সামনে বসা দুটো মেয়ের একটা মেয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করছে। প্রথমে ভাবলাম আমার পেছনের কাউকে হবে, তাই পাত্তা দেইনি। কিন্তু না। আবার একই কাজ। ব্যপারটা কি? ভালো করে বোঝার জন্য আমি সরাসরি মেয়েটার চোখের দিকে তাকালাম। মেয়েটাও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অনেকটা পরীক্ষার মত আমিও তাকিয়ে আছি। দেখি কে আগে চোখ সরায়! হেরে গেলো মেয়েটাই। হেসে চোখ নামিয়ে নিল কিন্তু সাথে সাথে আবার চোখ তুললো। যখন দেখলো আমি সরাসরি তাকিয়ে আছি, অবার হেসে ফেললো, স্বলজ্জ হাসি। এবার আমি ভালো করে মেয়েটাকে দেখলাম। পাতলা গড়ন, কালো চুল। তবে সবচেয়ে সুন্দর চোখ। এদেশী মেয়েদের চোখে লজ্জাটা একটু কম থাকে তবে তাকে তেমনটা মনে হলো না। ততক্ষনে তার সাথে বসা অন্য মেয়েটাও বুঝে ফেলেছে সে আমার সাথে (নাকি আমি তার সাথে?) মজা করছে। সেই মেয়েও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে হাসতে লাগলো। মনেমনে ভাবলাম উঠে গিয়ে ওদের টেবিলে গিয়ে হাই দিয়ে পরিচয় করি, কিন্তু সাথে সাথে মনে পড়লো আমি এসব কি করছি? আমার আনলিমিটেড মেম্বারশীপ এবং তার জন্য ফটো এবং তার জন্য কয়েন লাগবে। হায় হায়! আমি কিনা এখানে বসে মেয়েদের সাথে টাঙ্কিবাজী করছি। দৌড়ে উঠে কাউন্টারে গিয়ে বিলটা দিয়ে কয়েনে চেঞ্জ নিয়ে বের হয়ে আসার আগে মনে হলো আরেকবার টেবিলে ফিরে যাই। কোন কারন ছাড়াই টেবিলে ফিরে গেলাম, একটা টিস্যূ পেপারে মোবাইল নাম্বারটা লিখে, মেয়েটাকে দেখিয়ে টেবিলে রেখে আসলাম। বের হয়ে আসার সময় দেখলাম মেয়েটা তখনও হাসছে। মেয়েটা কি পরে ফোন করেছিল? সে গল্প আজ আর বলবো না, অন্য কোন দিন অন্য কোন ব্লগে বলবো
যাইহোক, কয়েন হাতে পেয়ে আমি আনন্দে আত্মহারা। দ্রুত ছবি তুলে আবার লাইনে গিয়ে দাড়ালাম। একটু পরই আমার ডাক আসলো। মনেমনে বললাম এবার আমাকে কে আটকায় দেখি। কিন্তু আবারও বিধিবাম! এরা ক্যাশ ছাড়া পেমেন্ট নিবে না। আমি একটা পাউরুটি কিনলেও কার্ডে কিনি। এটা কোন ভাব নয়। কয়েনের জ্বালা থেকে বাঁচার একটা কৌশল মাত্র। ফলে পকেটে ক্যাশ প্রায় থাকেই না। তার উপর একটু আগে ডিনার করার সময় কয়েন ফেরত পাবার জন্য ক্যাশে পে করেছিলাম। ফলে পকেট প্রায় শূন্য তখন। কাউন্টারের ছেলেটা আবারও অমায়িক হাসি দিয়ে বললো যে কোন এ.টি.এম. থেকে টাকা তুলে নিয়ে আসতে। আমি হতাশ ভাবে বের হয়ে এলাম আবারও। এবার রাস্তায় রাস্তায় হেটে বেড়াতে শুরু করলাম এ.টি.এম বুথ খোঁজার জন্য। এখানে একটা জিনিস বেশ ভালো, তা হলো যে কোন ব্যাঙ্কের এ.টি.এম বুথ থেকে টাকা তোলা যায়। অর্থাৎ অন্য ব্যাঙ্কের এ.টি.এম থেকে আমি আমার ব্যাঙ্কের কার্ড দিয়ে টাকা তুলতে পারবো। ব্যাঙ্ক অব আয়ারল্যান্ড এখানকার সব চেয়ে বড় ব্যাঙ্ক যদিও আমি এ্যালাইড আইরিশ ব্যাঙ্ক (এ.আই.বি)-এর গ্রাহক। প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলাম আমার ব্যাঙ্কের কোন বুথ আসেপাশে নেই। অতএব, ব্যাঙ্ক অব আয়ারল্যান্ডের বুথ খোঁজা শুরু করলাম। কিন্তু সেটাও নেই। হতাশ হয়ে যখন রাস্তায় দাড়িয়ে আছি, তখন দেখলাম একটা স্পার শপ। স্পার হলো এখানকার সবচেয়ে কমন ডিপার্টমেন্টাল চেইন শপ। অলিতে-গলিতে দেখা যায়। স্পারের একটা বিশেষত্ব হলো মাঝে মাঝে এদের ভেতরে ব্যাঙ্ক অব আয়ারল্যান্ডের এ.টি.এম বুথ থাকে। তবে শতাংশের হিসেবে সেটা বড়জোড় পাঁচ শতাংশ। তবুও আশায় বুক বেঁধে ঢুকলাম। কিন্তু বুথ আর দেখতে পাই না। চার দিক তাকিয়ে যখন বের হয়ে আসবো তখন চিপায় নজর পড়লো এবং সাথে সাথে দেখতে পেলাম এ.টি.এম বুথটাকে। আনন্দে লাফ দিয়ে উঠলাম। পেয়েছি! আর্কিমিডিসও মনে হয় এতটা আনন্দিত হয়নি আপেক্ষিকগুরুত্ব আবিষ্কারের পর!
যাইহোক, দ্রুত বুথের সামনে গিয়ে পকেট থেকে কার্ডটা বের করে যেই ভরতে যাবো, দেখলাম লেখা - উই আর সরি! দিথ বুথ ইজ টেমপোরারিলি আউট অব অর্ডার!!! আমার চিৎকার দিতে ইচ্ছে করছিল তখন। মনেমনে পৃথিবীর সব ব্যাঙ্ক এবং তাদের এ.টি.এম বুথকে বাপ-মা তুলে গালি দিয়ে বের হয়ে আসার সময় হঠাৎ মনে হলো - আইডিয়া! স্পার শপগুলোতে, যদিও সবগুলোতে নয়, ক্যাশ ব্যাক বলে একটা অপশন থাকে। কোন কিছু কেনার পর টাকা দেয়ার সময় অতিরিক্ত টাকা কার্ডে পে করে ক্যাশ করে নেয়া যায়। অর্থাৎ, আমি যদি দশ ইউরো কিনি এবং পনের ইউরো কার্ডে পে করি, তাহলে আমাকে ওরা পাঁচ ইউরো ক্যাশ ব্যাক করবে। ওদের জিজ্ঞেস করলাম ওরা ক্যাশ ব্যাক দেয় কি না। কাউন্টারে একটা ভারতীয় লোক ছিলেন। তিনি জানালেন যদি পাঁচ ইউরো এর বেশি জিনিস কিনি তাহলে দিবে। শুরু হলো আরেক যন্ত্রনা। এখন কি কেনা যায়? দোকানে যাই কিনতে যাই দেখি এক-দুই ইউরো। হঠাৎ কি সবকিছুর দাম কমে গেলো নাকি? আবার মেজাজ খারাপ হতে শুরু করলো। তাছাড়া আমার মাথায় তখন ঘুরছে অন্য আরেকটা বিষয়। ক্যাশ ব্যাক খুব বেশি দেয়না। আমার লাগবে ৪০ ইউরো কারন সিনেওয়ার্ল্ড-এর নিয়ম প্রথম বার মেম্বার হবার সময় এক সাথে দুইমাসের টাকা দিতে হয়। ৪০ ইউরো পাওয়া যাবে কি না সেটাও একটা চিন্তার বিষয়। তাই দ্রুত কিছু কুকি এবং এধরনের খাওয়া কিনে কাউন্টারের অন্য প্রান্তে, যেখানে একটা অল্পবয়সী ছেলে ক্যাশে বসা, সেখানে গিয়ে পে করতে দাড়ালাম। ছেলেটার চেহারা দেখেই বোঝা গেলো চাকরীতে নুতন। যেই ৪০ ইউরো ক্যাশ ব্যাকের কথা বললাম, সে সরু দৃষ্টিতে আমাকে দেখতে লাগলো। আমি তাড়াতাড়ি বললাম তোমার বসই বলেছে দিতে। ছেলেটা বসকে জিজ্ঞেস করতে চাইলো কিন্তু বস তখন অন্য একজনের সাথে গল্প করছে। সুযোগটা নিয়ে আমি দ্রুত বললাম আমার বাস ধরতে হবে, একটু তাড়াতাড়ি করলে ভালো হয়। ছেলেটা কনফিউজড ভাবে ৪৬ ইউরো কার্ডে গ্রহন করে আমাকে ৪০ ইউরো ব্যাক করলো। আমিও এক দৌড়ে আবার সিনে ওয়ার্ল্ডে ফিরে আসলাম।
যথারীতি আবার গিয়ে লাইনে দাড়ালাম এবং এক সময় আমার পালা আসলো। এবার আর কোন সমস্যা হলো না। ফিসটা পে করার পর আমাকে ছেলেটা জিজ্ঞেস করলো আমি আজ কোন মুভি দেখতে চাই কি না? আমি মনেমনে বললাম, আবার জিগস! এত ঝামেলা কেন করলাম তাহলে? তারপর দ্রুত আ জার্নি টু দি সেন্টার অব দি আর্থের টিকেট কেটে দৌড় দিলাম স্ক্রিন খুঁজতে। এখানে ১৬টা স্ক্রিন আছে। সেখান থেকে আমারটা (১৪ নাম্বার) খুঁজে বের করে যখন আসন পেতে বসলাম, তখনও মুভি শুরু হতে প্রায় পনের মিনিট বাকি। মানেমানে বললাম, আহহহ! সারা বিকেলের ধকল শেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অপেক্ষা করতে লাগলাম থ্রি ডি মুভি দেখার জন্য, জীবনে প্রথমবারের মত। সেই সাথে শুরু করলাম এক নেশার যাত্রা - সিনেমা দেখা! (চলবে)
২৯ জুলাই ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


