আমার প্রিয় পোস্ট
- রাজাকার সহজ চেনার উপায়: শিবির কাহিনী - নোমান মীর
- একদিন বুঝবে (উৎসর্গ মহাকবি মাইকেল মেহেদী) - হাসান বিপুল
- মাছের কাটলেট - জরিণা
- সব ব্লগারের ইমেল এড্রেস সংকলন , আপডেটেড - তারকে
- কাঙাল, আলেয়ার সন্ধানে - নীল নিঃসঙ্গতা
- বাবা (বাবা'র স্মরণে) - কালপুরুষ
- আরও একটি ভদ্রগোছের এ্যাডাল্ট জোক ১৮+ - বহুরূপী মহাজন
- হে কবরবাসীরা,তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক - ফারহান দাউদ
- মানুষের মহারাজা,তোমাকে অভিবাদন - ফারহান দাউদ
- ইসলাম শান্তির/অশান্তির ধর্ম নিয়ে ব্লগার আরিফুর রহমানের সাথে আলোচনা। - হ্যারি সেলডন
- একজন মুমূর্ষ রোগীকে বাচাতে এগিয়ে আসুন। - মাহিরাহি
.... তবুও আমি স্বপ্ন দেখি ... (স্বপ্ন, বাস্তব এবং ব্লগের সর্বস্বত্ব ব্লগার কতৃক সংরক্ষিত)

তরল [শারদদা] (গল্প)
০২ রা আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:৩৩
“আরে দেখি, দেখি!”
পুরোনো ওষুধের বোতলটা যখন মানিক ফেলতে যাচ্ছিল তখন প্রায় কেড়েই নিলেন শারদদা। তারপর ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন কিছুসময়। এরপর হতাশ ভাবে বললেন, “আচ্ছা ফেলেই দাও”।
আজ সকাল থেকে মেসটা পরিষ্কার করছি সবাই। শারদদা খুব একটা কাজ করছেন না, তবে কি ভাবে কাজ করতে হয় সে সব বিষয়ে বিভিন্ন জ্ঞানগর্ভ মন্তব্য ইতিমধ্যে শুনতে শুনতে আমরা অস্থির। অপু একবার নিচু স্বরে বলেছিল বলার থেকে করে দেখানোটা কি শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিক উপযোগী নয়? কিন্তু অপুর বলা কথাটার কম্পাঙ্কই হয়তো শারদদার কানের জন্য উপযোগী ছিল না, তাই শুনেও শুনতে পাননি তিনি। তবে শারদদার একনিষ্ঠ ভক্ত ইদ্রিস ঠিকই শুনেছিল এবং সাথে সাথে চটে উঠে অপুকে দুকথা শুনিয়ে থামিয়েছে। এরপর আর কেউ শারদদাকে কিছু করার ব্যপারে অনুরোধ করেনি। তিনিও নুতন উদ্যামে উপদেশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এরকম সময় হঠাৎ পুরোনো ওষুধের বোতলগুলো থেকে একটা বড় বোতল যখন মানিক ফেলতে যাচ্ছিল তখনই শারদদা “দেখি দেখি” বলে আর্তনাদ করে উঠলেন।
মানিক তখনও বোতলটা হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। কি করবে বুঝতে পারছে না। মানিকের দ্বিধান্বিত চেহারা দেখে শারদদা মলিন ভাবে হেসে বললেন, “ফেলে দাও। যা ভেবেছিলাম তা নয়।”
শারদদার সব কথাতেই ইদ্রিস এখন অতি উৎসাহী। সাথে সাথে বললো, “কি ভেবেছিলেন শারদদা?”
পাশের চেয়ারটা টেনে নিয়ে, যেন এতক্ষন কাজ করে ক্লান্ত, এভাবে বসতে বসতে বললেন, “প্রোপাইলেন গ্লাইকল মনোমিথাইল ইথার।”
ইদ্রিস স্বপ্রশ্ন দৃষ্টিতে প্রথমে তাকালো আমার দিকে। কিন্তু আমার মুখের অবস্থা দেখে সুবিধা হবে না বুঝতে পেরে পরমূহুর্তে তাকালো মানিকের দিকে। সেখানেও অবস্থা অভিন্ন। কথাটা রায়হান আর অপুর কানেও গিয়েছিল। ওরাও ইতিমধ্যে আমাদের পাশে এসে দাড়িয়েছে। তারপর একসাথে সবাই মিলে যে প্রশ্নটা শারদদার দিকে ছুড়ে দিলাম সেটা হলো - “এটা কি জিনিস শারদদা?”
শারদদা হাসলেন। তারপর বললেন, “এ এক ইতিহাস। এক কথায় জবাব দেয়া সম্ভব নয়।”
গল্পের গন্ধ পেয়ে সাথে সাথে ইদ্রিস বললো, “এক কথায় কে বলতে বলেছে আপনাকে? আপনি খুলেই বলেন। তবে পাঁচ মিনিট পর। আমি এক দৌড় দিয়ে ডালপুরি নিয়ে আসি।”
“এই অসময়ে ডালপুরি?” মানিক বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে ইদ্রিসের কানে সে কথা পৌছায়নি। ততক্ষনে সে ফরিদের দোকানে হয়তো!
পরবর্তি দশ মিনিটের মধ্যে আসন পেতে আমরা গোল হয়ে বসে শারদদাকে ঘিরে ধরেছি। গরম গরম পুরির গন্ধ মনে হয় শারদদাকে ভেতর থেকে রসদ যোগাচ্ছিল। পুরিতে কামড় দিতে দিতে উৎফুল্ল গলায় শারদদা বললেন, “বছর পাঁচেক আগের ঘটনা। তখন থাকি ইউরোপের এক অনিন্দ সুন্দর দেশ স্কটল্যান্ডে।”
ইদ্রিস কথার মাঝখানে ফোড়ন কেটে বললো, “হ্যা, হ্যা। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। শার্লক হোমসের বইতে পড়েছি।”
শারদদা হেসে বললো, “ওটা আসলে ইংল্যান্ডের গ্রেটার লন্ডন পুলিশ বিভাগের হেডকোয়ার্টারের নাম। এ নামের পেছনে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, সে গল্প অন্য একদিন বলবো। শুধু এতটুকু জেনে রাখ স্কটল্যান্ড হলো ইংল্যান্ডের উপরের দিকে গ্রেট বৃটেন দ্বীপে অবস্থিত আরেকটি দেশ। যে চারটি সাংবিধানিক রাষ্ট্র মিলে যুক্তরাজ্য গঠন করেছে, স্কটল্যান্ড তাদেরই একটা।”
“আচ্ছা।” যেন অনেক কিছু বুঝে ফেলেছে এভাবে ইদ্রিস মাথা নাড়লো।
শারদদা বলে চললেন, “আমি থাকতাম ইনভারক্লাইড নামে স্কটল্যান্ডের একটা ছোট শহরে। কথিত আছে স্কটল্যান্ডের প্রকৃতির মত প্রশাসন, মানুষ এবং জীবনও নাকি বিশুদ্ধ। বলা হয় যে কোন কিছুর শুদ্ধতম রুপ দেখতে চাইলে স্কটল্যান্ড যাও। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমার জীবনে বিষয়টা উল্টা হয়ে গেলো।”
শারদদা একটু থেমে আরেকটা ডালপুরি তুলে নিলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, “আমি কাজ করতাম একটা রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার হিসেবে। আমার কাজ ছিল সব কিছু গুছিয়ে রাখা, বিশেষত ক্যাশ। কাজটা আমি বেশ বিশ্বস্ততার সাথেই করছিলাম গত ছয় মাস। কোনদিন একটা পাউন্ডও এদিক সেদিক হয়নি। আমার উপর মালিকের আস্থাও ছিল প্রবল।
যাইহোক, সে বছরের থার্টি ফার্স্ট ডিসেম্বরের রাতে নিউইয়ার পার্টি করতে অনেক মানুষ আসলো আমাদের রেস্টুরেন্টে। হু হু করে বিক্রি হচ্ছিল খাবার এবং পানীয়। ক্যাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম এত বিক্রি গত ছয় মাসে হতে দেখিনি। পার্টি চললো শেষ রাত পর্যন্ত। ভোরের দিকে দোকানের কর্মচারীদের যা যেমন আছে তেমন রেখেই চলে যেতে বলি। সেদিন সবার পরিশ্রমও হয়েছিল অনেক। তাই জনুয়ারীর প্রথম দিন ছুটি কাটিয়ে পরদিন একটু আগে আগে আসতে বললাম সব কিছু পরিষ্কার করার জন্য।
ক্যাশ রাখার জন্য আমাদের একটা লকার রুম আছে। ওখানেই সব সময় ক্যাশ রাখি। পরে এক সময় মালিক এসে ক্যাশ গুনে নিয়ে যায়। সবাই চলে যাওয়ার পর আমি ক্যাশ গুনে লকারে ভরে রুমটা লক করে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আসি। এরপর সাটার নামিয়ে তালা দিয়ে কাছেই আমার বাসায় চলে যাই।
একদিন বাদে আবার আমরা রেস্টুরেন্ট খুললাম। মালিক আসলো ক্যাশ নিতে। আমি মালিক সহ লকার রুমে ঢুকে যেই লকার খুলেছি, আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। ক্যাশে একটা পাউন্ডও নেই। অথচ আমি নিজ হাতে ক্যাশ গুনে গুছিয়ে রেখে গিয়েছিলাম। কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। মালিক বললেন আবার মনে করে দেখতে অন্য কোথাও রেখেছি কি না। কিন্তু আমি কি করে বোঝাই ক্যাশ আমি এখানেই রেখেছিলাম!
এরপর মালিকই পুলিশকে খবর দিলেন। স্থানীয় থানার ইন্সপেক্টার জেমস্ ব্রুস আধ ঘন্টার মধ্যে আমাদের রেস্টুরেন্টে আসলেন। হালকা ছিপছিপে গড়নের ভদ্রলোককে দেখলে প্রথমে পুলিশ বলে মনেই হয় না। কিন্তু যখন কথা বলেন তখন তার গলার স্বর বলে দেয় এ লোক যুক্তরাজ্যের বনেদি পুলিশ বিভাগগুলোর একটি, স্কটল্যান্ড পুলিশ থেকে এসেছেন।
ইন্সপেক্টার জেমস্ লকার ঘরটা ভালো করে দেখে আমাকে এসে জিজ্ঞেস করলেন সেদিন আমি ঠিক মত ঘরটার দরজা আটকে ছিলাম কিনা। এখানে বলে রাখি স্কটল্যান্ড-আয়ারল্যান্ডের দিকের দরজাগুলোও ঐতিহ্যবাহী। ওদের দরজার লকগুলো অনেকটা অংটার মত হয়। ভেতর থেকে ঘোরালে খুলে যায়। বাহির থেকে চাবি দিয়ে খুলতে হয়। এমনকি ঘোরানর মত কোন নবও থাকে না। দরজা আটকানোর পর অপনাআপনি লক হয়ে যায়। আমি প্রতিদিন দরজা আটকে বারদুয়েক ভেতরে চাপ দিয়ে দেখি ঠিক মত লক হয়েছে কি না। ইন্সপেক্টারকে সে কথা খুলে বললাম। তাছাড়া লকারে একটা ইলেকট্রিক কম্বিনেশন লক রয়েছে যেখানে ক্যালকুলেটারের মত একটা প্যাড থেকে চার সংখ্যার একটা নাম্বার দিতে হয় খোলার জন্য। এই কম্বিনেশন নাম্বারটাও আমি ছাড়া আর কেউ জানে না, এমন কি মালিকও নয়। যেহেতু লকার খোলা হয়েছে, অতএব এ নাম্বারটাই ব্যবহার করা হয়েছে। তাছাড়া লকারে কোন প্রকার আঘাতের চিহ্ন নেই যে কেউ জোর করে এটা খোলার চেষ্টা করেছে।
ইন্সপেক্টার আমার দিকে তাকিয়ে শীতল ভাবে বললেন আমি সম্ভবত সমস্যায় পড়তে যাচ্ছি। অতএব যা সত্য এখনই যেন বলে ফেলি। আমি কিছু না বলে বসে রইলাম। কিছু আসলে আমার বলারও ছিল না। যা সত্য সবই আমি তাকে ইতিমধ্যে জানিয়ে ফেলেছি।
বিকেলের দিকে থানা থেকে টেলিফোন আসলো। ফিঙ্গার প্রিন্ট এক্সপার্ট জানিয়েছে লকারে শুধু আমারই আঙ্গুলের ছাপ পাওয়া গিয়েছে। হয়তো ইন্সপেক্টার জেমসের সন্দেহ আরো বেশি ঘনিভুত হয়েছে আমার উপরে। তাই তিনি আমাকে একবার থানায় যেতে বলেছেন। ভেবে দেখলাম ঘাবড়ে গিয়ে লাভ নাই। সত্যকে সরাসরি মোকাবেলা করতে হবে।
স্কটল্যান্ডের শীত রীতিমত হাড়কাঁপানো। তার উপর ইদানিং রাতে কুয়াশা পড়ছে প্রচুর, ফলে শীত যেন আরো বেশি অত্যাচার শুরু করেছে। তাছাড়া এখানে শীতের সময় বিকেল চারটার পরপরই সূর্য ডুবে যায়। তাই ওভারকোটটা ভালো করে গায়ে দিয়ে, মাফলারে গলা ঢেকে তারপর থানার উদ্দেশ্যে বের হলাম।
থানায় পৌছে দেখি ইন্সপেক্টার আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। দ্রুত তার কক্ষে গিয়ে দেখা করলাম। আমাকে দেখে সে মুচকি হাসলো। তার পর বসতে বলে কফি আনতে গেলো নিজেই। বুঝলাম না ঠিক কি বলতে চাইছে। ডেকে আনার ধরনে মনে হচ্ছিল যেন বাংলাদেশি পুলিশের মত মারধর করবে, কিন্তু বাস্তব চিত্র বেশ অন্যরকম।
কফি এনে আমার সামনে বসলো সে। একটা মাগ আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো খেয়ে দেখো। আমার বানানো ব্ল্যাক কফি সবারই ভালো লাগে। কফিটা সত্যিই মন্দ ছিলনা। খেতে খেতে কেস নিয়ে কথা বলতে লাগলাম। আমি তখনও বুঝতে পারিনি আমাকে ডেকে আনার কারনটা। ধীরে ধীরে ইন্সপেক্টারের গলার স্বর বদলে যেতে শুরু করলো। এক সময় সে সরাসরি আমাকে বললো চুরির অভিযোগ স্বীকার করে নিতে না হলে তার কাছে নাকি একশ একটা রাস্তা আছে আমাকে দিয়ে স্বীকার করানোর। তাছাড়া সব প্রমান স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিচ্ছে এটা আমারই কাজ।
আমি হেসে বললাম, তুমি চিন্তা করে দেখো প্রমান আমার দিকে ইঙ্গিত করলেও যুক্তি কি আমাকে অপনাধী মানতে রাজী হচ্ছে?
ইন্সপেক্টার একটু অবাক হয়ে খুলে বলতে বললো। আমি তাকে বললাম, যদি আমি সত্যিই চুরি করতাম তাহলে বিষয়টা এতটা খোলাখুলি ভাবে কি আমার দিকে টেনে আনতাম? চুরির দিন আমিই সবার শেষে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়েছি। দরজার চাবিও আমার কাছেই থাকে। লকারের কম্বিনেশনও শুধু আমিই জানি। যেন আমি এত বোকা যে সব জেনেশুনে নিজের ঘাড়ে চাপাচ্ছি। তাছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন পয়েন্ট হলো, আমি চুরি করলে এখানে তোমার সামনে বসে থাকতাম না বরং পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। একবার যদি আমি যুক্তরাজ্য থেকে বের হতে পারতাম তহলে স্কটল্যান্ড, ইংল্যান্ডের সব পুলিশ মিলেও তোমরা আমাকে আর ছুতে পারতে না। তারপর জানালাম এই শীতের বিকেলে খবর দেয়ার সাথে সাথে থানায় ছুটে আসার মূল কারন আমি তাকে কেসের ব্যপারে সাহায্য করতে চাই।
ইন্সপেক্টার জেমস আমার দিকে তিখ্ন ভাবে তাকিয়ে রইলো বেশ কিছু সময়। তারপর বলল যদিও সে আমাকে বিশ্বাস করতে পারছে না, তবে সে চায় আমাকে একটা সুযোগ দিতে। আমি হেসে বললাম, আমি নিরুপায়; অতএব সুযোগ আমি নিচ্ছি। আমি চেষ্টা করবো সর্বাত্বক সাহায্য করতে যাতে প্রকৃত অপরাধী ধরা পড়ে। এরপর আমরা পরিকল্পনা করলাম যে ইন্সপেক্টার সবাইকে বলবে সে ধারনা করছে আমিই চুরিটা করেছি এবং সে জন্য সে আমার ব্যপারে সবার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করবে যাতে অভিযোগ প্রমান করা সম্ভব হয়। এই তথ্য সংগ্রহের নাম করেই প্রধানত অন্যদের জেরা করা হবে। এই পরিকল্পনার মূল কারন ছিল আমরা চাচ্ছিলাম না অন্যরা বুঝতে পারুক সন্দেহ এখন তাদের উপরে চলে এসেছে।
সেদিনের মত পরিকল্পনা শেষ করে আমি উঠে দাড়ালাম। রাতও তখন অনেক, প্রায় দশটা। যে দেশে বিকেল চারটায় সন্ধা নামে সেখানে রাত দশটা মানে বেশ রাত। ইন্সপেক্টার জেমস মানুষ খারাপ ছিল না। নিজ খেকে গাড়ি দিয়ে বাসায় পৌছে দিতে চাইলো। তবুও আমি না করলাম কারন সেটা আমাদের পরিকল্পনাকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে। কেউ যদি দেখে যাকে আসামী ভাবছে ইন্সপেক্টার, তাকেই কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের রাতে গাড়ি করে বাড়ি নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, ব্যপারটা বেশ সন্দেহের সৃষ্টি করবে। আমার যুক্তি শুনে জেমস খুশি হলো। তারপর একটা টর্চ লাইট দিয়ে বললো অন্তত এটা নিয়ে বাড়ি যেতে। লাইটটা শুধু টর্চই না, বিভিন্ন অপশন রয়েছে তাতে, তার মধ্যে একটা ফগ লাইট। রাতের কুয়াশা ভেদ করে পথ চলতে যাতে সমস্যা না হয় সে জন্যই দেয়া।
আমি জেমসকে ধন্যবাদ দিয়ে রাস্তায় বের হয়ে আসলাম। মাথায় তখন একটাই চিন্তা, কে করতে পারে এই কাজ? যেই করুক সে পরিষ্কার ভাবে আমাকে ফাসিয়েছে। এটা কি আমার প্রতি বিদ্বেষ থেকে নাকি নিতান্তই একটা চুরি? এছাড়াও সব চেয়ে বড় চিন্তা, চুরিটা করলো কি করে? দরজা খোলার একটা সম্ভাব্য সমাধান আমি খুঁজে পেয়েছি কিন্তু লকার? সেটা তো কম্বিনেশন জানা না থাকলে খোলা সম্ভব নয়। তাছাড়া আমার কম্বিনেশন নাম্বারটা যত্রতত্র ব্যবহৃত কোন নাম্বার নয় যে এত সহজে অনুমান করে নিবে। চিন্তাগুলো মাথায় ঘুর পাক খেয়ে খেয়ে অস্থির করে তুলছিল।
আমি যখন রাস্তায় হাটছি তখন চারদিক নিরব। কোন জনমানবের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। কুয়াশা যেন আরো বেড়েছে। ফগ লাইটটের আলোয় পথ চলতে সমস্যা হচ্ছিল না কিন্তু লাইটটা না থাকলে সমস্য হতো নিশ্চিত করে বলা যায়। মনেমনে জেমসকে আবার ধন্যবাদ দিলাম।
হঠাৎ মনে হলো এখন বাড়ি ফিরে না গিয়ে বরং লকার রুমটা আরেকবার ভালো করে খুঁজে দেখি। যদি কোন ক্লু আবিষ্কার করতে পারি। দ্রুত ফেরার পথ পরিবর্তন করে রেস্টুরেন্টের দিকে চলে এলাম। আজ মালিকই রেস্টুরেন্ট বন্ধ করেছে। তবে তালার চাবির দুটা সেট রয়েছে। একটা মালিকের কাছে, আরেকটা আমার কাছে। ফলে ঢুকতে কোন সমস্যা হলো না।
লকার রুমে গিয়ে আবারও চার দিক খুঁজে দেখতে শুরু করলাম। রুমটা মোটামোটি বড়। একটা টেবিল আছে, ছোট একটা টয়লেটও আছে যদিও ব্যবহার করা হয়না বরং এখন গুদাম হিসেবে বেশ কার্যকরি, কাগজপত্র রাখার একটা সেল্ফও আছে। টর্চটা জ্বেলে টয়লেটটা ভালো করে দেখলাম। কিছু পাওয়ার আশা করা বৃথা কারন পুলিশ এটাও ঘেটে ফেলেছে। ধুলায় তাদের বুটের দাগ দেখতে পেলাম। সেল্ফের কাগজপত্র নেড়ে বুঝলাম এখানেও একই অবস্থা।
খানিকটা হতাশ হয়ে যখন বের হয়ে আসছিলাম তখন একটা ঘটনা ঘটলো। রুমের হিটার এবং লাইট নিভিয়ে বের হয়ে আসার সময় টর্চ দিয়ে পুরো রুমটা আবার একবার দেখে নিচ্ছিলাম। তখন টর্চের আলোতে রুমের এক প্রান্তে খুব ছোট নীল রঙ্গের একটা কিছু নড়তে দেখলাম। দ্রুত লাইট জ্বলিয়ে যেই দেখতে গেলাম, ততক্ষনে সেটা গায়েব হয়ে গিয়েছে। ঠিক বুঝতে পারলাম না জিনিসটা কি ছিল। পোকার মত কয়েকটা বিন্দু বিন্দু ছিল, অনেকটা জোনাক পোকার মত তবে নীল রঙ্গের।
সেদিনের মত রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে আসি বাসায় চলে আসলাম। পরদিন ইন্সপেক্টার জেমস আমাদের পরিকল্পনা মত অন্যদের থেকে তথ্য সংগ্রহের বাহানায় জেরা করতে আসলো। রেস্টুরেন্টের কর্মচারি রয়েছে তিনজন। একটা মেয়ে, জেনিফার এবং দুটো ছেলে, মার্ক এবং ড্যানিয়েল। জেনিফার জার্মানীর মেয়ে। খুব চুপচাপ প্রকৃতির। কাজে কখনও অবহেলা করতে দেখিনি। যখন যা করতে বলতাম সাথে সাথেই করতো এবং বেশ গুছিয়েই করতো। মার্ক ছিল ঠিক উল্টা। সে স্থানীয় স্কটিশ। সব সময় উঁচু স্বরে কথা বলতো। রেস্টুরেন্টে উল্টাপাল্টা প্রকৃতির কোন ছেলে আসলে মার্কের সাথে লেগে যেত সহজেই। তবে কাজের ক্ষেত্রে সেও বেশ চটপটে এবং কখনও ফাকি দেয়ার চেষ্টা করতো না। ড্যানিয়েল একটু অন্য ধরনের ছেলে ছিল। কথা প্রায় বলতই না। কারো সাথে মিশতোও না। আমাদের স্বভাব ছিল আমরা কাজের ফাকে মাঝে মাঝে আলোচনার আসর বসাতাম। সেখানে সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম – সব কিছু নিয়েই আলোচনা হতো। ড্যানিয়েল সাধারনত সে সব আলোচনায় আসতো না। যদি কখনও এসে বসতো, তবে সেটা হয়তো আলোচনা শোনার আগ্রহে না বরং টিভিতে কি সংবাদ হচ্ছে সেটা দেখার জন্য।
জেমস একটা রুমে আলাদা আলাদা ভাবে সবার সাথে কথা বলছিল। সবাইকে প্রশ্ন করা শেষ হলে সে আমাকে ডাকলো। রুমে ঢুকে দেখলাম জেমসের ভ্রু কুচকে আছে। কারন জানতে চাইলে বললো কাজে লাগতে পারে এরকম কোন তথ্যই নাকি সে সংগ্রহ করতে পারেনি। হয় রেস্টুরেন্টের কর্মচারীরা অতি চালাক না হলে আমিই আসল অপরাধী। যদিও সবাই বলেছে আমি চুরি করতে পারি এটা তারা কোন ভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না। বিশেষত জেনিফার বলেছে এটা সে কোন দিনও বিশ্বাস করবে না। মার্ক এবং ড্যানিয়েলের অভিমতও তাই তবে ড্যানিয়েল নাকি এটাও বলেছে যে কখনও কখনও মানুষ বদলেও যায় তবে আমার মধ্যে সেরকম কোন চিহ্ন সে দেখেনি।
আমি জেমসকে অনুরোধ করলাম আমাকে আরো কিছুদিন সময় দিতে। জেমস গম্ভিরভাবে বললো যা করার যেন দ্রুত করি। না হলে হয়তো আমাকে সে গ্রেফ্তার করতে বাধ্য হবে।
আমিও বুঝতে পারছিলাম এই কেসের কোন সমাধান করতে না পারলে হয়তো আমাকেই জেলে যেতে হবে। আবারও চিন্তা করতে শুরু করলাম। কোথায় যেন একটা সূত্র দেখতে পাচ্ছিলাম কিন্তু বিচ্ছিন্ন। জোড়া দিয়ে মালা গাঁথার মত অবস্থায় তখনও আসেনি।
তবে মালিক তখনও আমার উপর আস্থা রেখে চলেছে আগের মত। কাজ থেকে ছাড়ানোতো দূরে থাক, বরং বরাবরের মত আমাকে সে পূর্নমাত্রায় বিশ্বাস করছিল এত ঘটনার পরও। হয়তো তার জন্য বিষয়টা ততটা চিন্তার ছিলনা কেননা রেস্টুরেন্টের নামে ইনসুরেন্স করা ছিল। ফলে ক্ষতিপূরনবাবদ হয়তো সে যে টাকা চুরি গিয়েছে তার থেকে বেশিই পেতো।
যাইহোক অন্যসব দিনের মত আমার নিয়মিত রুটিন একই রইলো। পরদিন সকালে রেস্টুরেন্টের জন্য কাঁচা খাবার কিনতে স্কটল্যান্ডের রাজধানী শহর এডিনবার্গের একটা পাইকারী দোকানে গেলাম। যা যা কেনার সেগুলো অর্ডার করে বসেছিলাম ডেলিভারীর অপেক্ষায়। কিন্তু সেখানেও আমার মাথায় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল একই ঘটনা। কে করলো এই চুরি এবং কিভাবে?
একসময় বিরক্ত হয়ে মনটা অন্যদিকে নিয়ে যেতে চাইলাম। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। যাই চিন্তা করার চেষ্টা করি, মনে পড়ছিল শুধু চুরির ব্যপারটা। তাই সামনে রাখা পুরোনো ম্যাগাজিনের স্তুপ থেকে একটা ম্যাগাজিন তুলে পড়তে শুরু করলাম। পড়তে পড়তে একটা আর্টিকেলে আমার চোখ আটকে গেলো। হঠাৎ করে অনুভব করলাম আমার রক্তে যেন ঝড় উঠতে শুরু করেছে। কেন যেন মনে হাচ্ছিল বিচ্ছিন্ন মালার জোড়াটা আমি দেখতে পাচ্ছি। ততক্ষনে আমার ডেলিভারীও তৈরী। কাউন্টারে আমার টোকেন নাম্বার দেখাচ্ছে। দ্রুত কাউন্টারে গিয়ে অনুরোধ করলাম ম্যাগাজিনটার একটা অংশ জেরক্স করে আনার সুযোগ দেয়ার জন্য। কাউন্টারের ছেলেটা হেসে বললো এটাতো অনেক পুরোনো ম্যাগাজিন। জেরক্স করার প্রয়োজন নেই। আমি চাইলে পুরো ম্যাগাজিনটাই নিতে পারি।
ছেলেটার অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হলাম। তাকে ধন্যবাদ দিয়ে জিনিসগুলো নিয়ে আমি প্রায় ঝড়ের গতিতে ইনভারক্লাইডের বাস ধরার জন্য বের হলাম। পথে বাসে ম্যাগাজিন থেকে পুরো আর্টিকেলটা আবার পড়লাম। আমার মন তখন বলছে এ কেসের মূল অংশ আমি সমাধান করে ফেলেছি।
রেস্টুরেন্টে ফিরে প্রথমেই আমি কাউন্টারে গিয়ে ইন্সপেক্টার জেমসের দেয়া টর্চলাইটটা খুঁজলাম। কিন্তু পেলাম না। জেনিফারকে জিজ্ঞেস করার পর জানতে পারলাম লাইটটা ইন্সপেক্টার গতকাল সাথে করে নিয়ে গিয়েছে। ফলে দ্রুত আবার ছুটলাম থানার দিকে। জেমস এই অসময়ে আমাকে দেখে একটু অবাক হলো। আমি তাকে শুধু জানালাম কেসটা সম্ভবত আমি সমাধান করে ফেলেছি। আমার তার টর্চলাইটটা প্রয়োজন। জেমস অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো। তারপর ড্রয়ার থেকে টর্চটা বের করে দিল। লাইটটা হাতে নিয়ে আমি বিভিন্ন অপশনের দিকে তাকিয়ে হাসলাম। মিলে যাচ্ছে সব। জেমস তখনও অন্ধকারে। বললো সবকিছু খুলে বলতে। আমি জানালাম খুলে বলার মত তেমন কিছু নেই। যদি সে ম্যাজিক দেখতে পছন্দ করে তাহলে আমার সাথে আসতে পারে। জেমসের বোকার মত চেয়ে থাকাটা সেদিন বেশ উপভোগ করছিলাম। স্কটল্যান্ডের পুলিশ ইন্সপেক্টার আমার কথার হেয়ালীতে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ভাবতেই ভালো লাগছিল।
অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই আমরা ফিরে আসলাম রেস্টুরেন্টে। আমি এবং জেমস লকার রুমে ঢুকে দরজাটা আটকে দিলাম। তারপর লাইট নিভিয়ে এবং পর্দা টেনে রুমটা অন্ধকার করে ফেললাম। এর পর টর্চটায় ব্ল্যাক লাইট বলে একটা অপশন ছিল, সেটা সিলেক্ট করে লকারের উপর ফেললাম। সাথে সাথে ম্যাজিকের মত কাজ হলো। লকারের উপর কিছু নীল আলো জ্বলে উঠলো। আমি গিয়ে লকারের ডালাটা খুলে কম্বিনেশন নাম্বার ইনপুট দেয়ার প্যাডটার উপর টর্চটা ধরলাম। যা ভেবে ছিলাম ঠিক তাই। ১, ৭ এবং ৯-এর উপর নীল আলো জ্বলে আছে। ইন্সপেক্টার তখন একটু একটু করে করে বুঝতে শুরু করেছে। তাই আমার দিকে স্বপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো। আমি হেসে বললাম, তুমি ঠিকই ধরেছো। প্রোপাইলেন গ্লাইকল মনোমিথাইল ইথার-এর ম্যাজিক এটা!”
এ পর্যন্ত বলে শারদদা থামলেন। আমরা এতসময় যেন দমবন্ধ করে শুনছিলাম। শারদদা থামার সাথে সাথে রায়হান প্রায় চিৎকার করে বললো, “ন্যাশনাল ট্রেজার!”
শারদদা হেসে রায়হানের পিঠ চাপড়ে দিলেন। তারপর বললেন, “হ্যা। ঠিকই ধরেছো। হলিউড চলচিত্র ন্যাশনাল ট্রেজারেও এরকমই দেখানো হয়েছে। তবে ছবিটায় এ বিষয়ে কোন তথ্য দেয়া হয়নি। ফলে দর্শক দেখার পর বরাবরের মত একটা আজগুবী কিছু দেখানো হয়েছে ভেবেছে। প্রকৃত ঘটনা হলো প্রোপাইলেন গ্লাইকল মনোমিথাইল ইথারকে কিটোনের সাথে মিশিয়ে একটা সলিউশন তৈরী করা যায় যেটা কেবল আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মির নিকটবর্তি তরঙ্গ দৈর্ঘ্যেই দেখা সম্ভব। এ রশ্মিকে ব্ল্যাক লাইট বলা হয় যা দৃশ্যমান রশ্মির খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। সাধারন আলোতে সলিউশনটা দেখা যায় না কিন্তু অন্ধকারে যদি এর উপর ব্ল্যাক লাইট ফেলা হয় তাহলে নীলচে ভাবে জ্বলে উঠে। এই বিশেষ প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে সেদিন আমাকে বোকা বানানো হয়েছিল। ম্যাগাজিনের সেই আর্টিকেলটা না পড়লে হয়তো এ ধাধার সমাধান করা সম্ভব হতো না। যাইহোক, যে চুরিটা করেছে, সে কোনভাবে আমার হাতে সলিউশনটা লাগিয়ে দিয়েছিল। এই সলিউশনের আরেকটা বিশেষত্ব হচ্ছে এটা শুকিয়ে গেলেও স্পর্শের সাথে সাথে অন্য যায়গায় লেগে যায়। ফলে আমি যখন লকারে ক্যাশ রাখতে কম্বিনেশন নাম্বার প্রবেশ করাই তখন সলিউনটা আমার হাত থেকে লকারের কম্বিনেশন টাইপ করার প্যাডে লেগে যায় এবং সেই সূত্র ধরেই চোর লকারটা খুলতে সক্ষম হয়েছিল।
সেদিন রাতে আমি যখন আবার লকার রুমটা সার্চ করতে এসেছিলাম তখন কোন ভাবে চাপ লেগে ব্ল্যাক লাইট অপশনটা অন হয়ে গিয়েছিল। ব্ল্যাক লাইট যেহেতু জ্বললেও দেখা যায় না, আমি তাই সেটা লক্ষ্য করিনি। লকারের কভারে আমারই হাতের অঙ্গুল থেকে সলিউশনটা লেগেছিল খোলার সময়। সে দাগগুলোকেই আমার কাছে নীল জোনাকির মত মনে হয়েছিল।
ইন্সপেক্টার জেমসকে সব কিছু খুলে বলার পর জেমস বললো তাহলেতো লকারে চারটা নাম্বারে নীল চিহ্ন থাকার কথা যেহেতু কম্বিনেশন কোড চার ডিজিটের। তাছাড়া শুধু নাম্বারগুলো জানলেওতো চলবে না। কোনটার পর কোনটা সেটাও জানতে হবে। এবং সবচেয়ে বড় কথা লকার রুমের মূল দরজাই বা খুললো কি করে? আমি হেসে বললাম, দরজা খোলার রহস্যটা আগেই সমাধান করে ফেলেছিলাম। বাকি ছিল লাকার খোলা। এখন দেখতে পাচ্ছি সেটাও খুব একটা কঠিন কিছু নয়।
জেমস মুগ্ধ শ্রোতার মত তাকিয়ে রইলো। আমি রুমের লাইট জ্বালিয়ে টেবিলটার পাশে চেয়ার টেনে নিয়ে জেমসকে বসতে বলে নিজেও বসলাম। তারপর বললাম, দরজা আসলে বাহির থেকে খোলা হয়নি। দরজা ভেতর থেকে খোলা হয়েছে। জেমস একটু অবাক হলো। আমি বুঝিয়ে বললাম, যে চুরি করেছে সে আগে থেকেই এ রুমে লুকিয়ে ছিল। রুমের সাথে লাগোয়া পরিত্যাক্ত টয়লেটটা লুকিয়ে থাকার জন্য আদর্শ জায়গা। সেটা জেমসকে দেখানোর পর জেমসও স্বীকার করলো যুক্তিটা। আমি দরজা বাহির থেকে লক করে চলে যাওয়ার পর সে বের হয়ে এসে লকার খোলে। তারপর পাউন্ডগুলোকে নিয়ে ভেতর থেকে লকাররুমের দরজাটা খুলে আবার টেনে দেয়, ফলে দরজা আবার আটকে যায়। এর পর সম্ভবত পেছনের দরজা দিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে যায়। সেই দরজা আমি কখনও লক করি না। দোকানের কর্মচারীরাই করে। ফলে ওটা খোলা রেখে চলে গিয়ে পরে আবার এসে যদি লক করে সেটা ধরার উপায় নেই।
এবার জেমস লকার খোলার বিষয়টার ব্যাখ্যা জানতে চাইলো। আমি উঠে লকার প্যাডের জ্বলজ্বল করা নাম্বারগুলো দেখিয়ে বললাম, এখানে তিনটা দাগের কারন আমি একটা নাম্বার দুবার চাপ দিয়েছি। যদি চারটা ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা ব্যবহার করতাম তাহলে মূল কম্বিনেশনটা বের করা চোরের জন্য তুলনামূলক ভাবে সহজ হতো কারন তাহলে মাত্র ২৪টা কম্বিনেশনের ভেতর থেকে তাকে অনুমান করতে হতো। কিন্তু এখন কাজটা হয়ে গেলো একটু জটিল। তাকে এখন ৭২টা কম্বিনেশনের ভেতর থেকে খুঁজে বের করতে হয়েছে আসলটাকে; অর্থাৎ ১,৭ এবং ৯-কে আলাদা ভাবে দুইবার করে ব্যবহার করে কম্বিনেশনটা সাজাতে হয়েছে। বলে রাখা ভালো লকারে পরপর পাঁচবার ভুল কম্বিনেশন প্রবেশ করালে পরবর্তি ১২ ঘন্টার জন্য এটা লক হয়ে থাকে। অতএব অনুমান করতে হলে তাকে সর্বোচ্চ পাঁচ বারের মধ্যে অনুমান করতে হতো, এটা হয়তো চোর জানতো।
জেমস বললো, এই ৭২টা কম্বিনেশন হাতে সাজানোওতো অনেক সময়সাপেক্ষ এবং ধৈর্যের ব্যাপার। আমি আবারও হেসে বললাম এটা ঠিক যে কাজটা বেশ সময়সাপেক্ষ। কারন তাকে অনেকটা এভাবে বের করতে হয়েছে:
১৭৯৯
১৯৭৯
৯১৭৯
৯৭১৯
…….
এভাবে ৭২টা কম্বিনেশন সাজিয়ে তারপর সে অনুমান করেছে সম্ভাব্য পাঁচটা কম্বিনেশনকে। আমার ধারনা এটা হাতে করা হয়নি। জেমস জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। আমি জানালাম যেই এটা করেছে সে কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারে। একটা ছোট সি-প্রোগ্রাম ৭২টা সম্ভাব্য কম্বিনেশন এক সেকেন্ডেরও অনেক কম সময়ে তৈরী করে দিতে সক্ষম। সাথে একটা ল্যাপটপ থাকলে এটা কোন ব্যপারই না।
এরপর বাকি থাকলো অনুমানের বিষয়টি। এটা করার জন্য সে আমাকে খুব ভালো করে পর্যবেক্ষন করেছে। আমি কিভাবে চিন্তা করি, কি কি বিষয়কে গুরুত্ব দেই, আমার আবেগ-অনুভুতি ইত্যাদি তাকে খুব ভালো করে জানতে হয়েছে।
লকারের কম্বিনেশন নাম্বার হলো ১৯৭১। এটা যে আমার কাছে শুধুই একটা সন নয়, সেটা আমার সাথে যারা নিয়মিত ইতিহাস এবং রাজনীতি নিয়ে কথা বলে তারা সহজেই অনুমান করতে পারবে। ৭২টা কম্বিনেশনের মাঝে চোর যখন ১৯৭১-কে দেখবে, তখন অবধারিত ভাবেই এটাকে সে ব্যবহার করবে।
আমার ব্যাখ্যা শুনে জেমসের চোখ উজ্বল হয়ে উঠলো। বলল, তাহলেতো দোকানেরই কেউ সম্ভবত কাজটা করেছে। আমিও মাখা নেড়ে সম্মতি জানালাম। রেস্টুরেন্টের কেউ ছাড়া আমার ব্যপারে এতটা গভীর ভাবে জানা খুবই কঠিন কারন আমি বাহিরে খুব একটা মেলামেশা করিনা। আতএব রেস্টুরেন্টের তিনজনের একজন কাজটা করেছে সে বিষয়ে আমি মোটামোটি নিশ্চিত। আরো স্পষ্ট ভাবে বললে বলা যায় ছেলেদুজনের কেউ কারন জেনিফার কম্পিউটারে খুব একটা পারদর্শি নয়। তাছাড়া আমার জানামতে মার্ক এবং ড্যানিয়েলের ল্যাপটপও রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সন্দেহটা মার্কের উপরই বেশি কারন নিয়মিত কথা বলা মানুষের তালিকাটা মার্ক এবং জেনিফারের মাঝেই স্বীমাবদ্ধ যেহেতু ড্যানিয়েল কালেভাদ্রে আমাদের আলোচনায় আসতো তাও আবার টেলিভিশন দেখার জন্য।
এবার জেমস হেসে বললো, এছাড়াও চোর স্বয়ং চোরের ফাঁদেই পা দিয়েছে। মানে বুঝতে না পেরে আমি তকিয়ে রইলাম। জেমস হাসতে হাসতে বললো, নোটগুলোতেও তোমার হাত থেকে সলিউশনটা লেগেছে। অতএব ঘর সার্চ করে যে নোট পাওয়া যাবে, সেগুলোতে ব্ল্যাক লাইট দিয়ে পরীক্ষা করলে সম্ভবত এখনও কিছু নোট জ্বলবে। শেষ বেলায় এসে জেমসের মাথা বোধয় সত্যিই খুলতে শুরু করেছিল। সাথে আমি একটু খোঁচা দিয়ে যোগ করলাম, তারপর তোমারতো অপরাধ স্বীকার করানোর একশ একটা উপায় জানাই আছে!
শেষ পর্যন্ত মার্কের বাসা থেকেই নোটগুলো উদ্ধার হলো। চাপে পড়ে অপরাধও স্বীকার করতে বাধ্য হলো সে। মেধা ছিল তার কিন্তু বদস্বভাবও কম ছিলনা। ক্রিকেটের বেটিং-এ অনেক টাকা হেরে তার আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ যাচ্ছিল। হয়তো সেজন্যই চুরি করাটা জরুরী হয়ে পড়েছিল। জুয়া জিনিসটাই এমন, যাকে একবার ধরবে শেষ করে ছাড়বে। মেধা থাকা স্বত্ত্বেও মার্ককে তাই জীবনের স্বর্নসময়টুকু জেলের অন্ধকারে কাটাতে হলো।”
শারদদা যখন থামলেন তখন ঘরে পিনপতন নিরবতা। মানিক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আবারও বোতলটা দেখালো। তবে তখন আর শারদদার সেদিকে নজর নেই। ডালপুরির প্লেট খালি হয়ে যাওয়াতে মেজাজ মনে হয় একটু বিগড়ে গিয়েছিল। তাই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ছিলেন আমাদের দিকে। ইঙ্গিতটা ইদ্রিসের জন্য যথেষ্ট ছিল। বিনাবাক্য ব্যয়ে সে তাই দৌড় দিল ফরিদের দোকানের উদ্দেশ্যে। (সমাপ্ত)
২ অগাস্ট ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।
*** শারদদার অন্যান্য গল্প ***
স্বপক্ষ-বিপক্ষ - Click This Link
শারদদার আগমন - Click This Link
ইমরান মামা বলেছেন:
পরে পড়মু শরীর খারাপ লাগতেছে
লেখক বলেছেন: ওরাল সেক্স ![]()
আলী আরাফাত শান্ত বলেছেন:
পড়তেছি আপাতত +
লেখক বলেছেন: অসংখ্য ধন্যবাদ। পড়ে ফিডব্যাক দিলে খুশি হবো।
শুভেচ্ছা রইলো।
একরামুল হক শামীম বলেছেন:
বাহ! নিয়াজ ভাই গল্পের ধারাটা বেশ ভালো লেগেছে।অফলাইনে আপনার গল্পগুলা পড়ি মাঝেমধ্যে।
ভালো থাকবেন।
লেখক বলেছেন: অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি কেমন আছেন? আজ দেখলাম ৯০০০ কমেন্টের কাছাকাছি চলে এসেছেন। এমন অনুপ্রেরনা আসলেই খুব কম দেখা যায়। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।
লেখক বলেছেন: অসংখ্য ধন্যবাদ ফারহান। আসলে গল্পটা একটু বড় হয়ে যাচ্ছিলতো, তাই প্রধানত চোর ধরার অংশটা একদম ছোট করে দিয়েছি। মূলত ফোকাসটা ছিল ধাধার অংশের উপর।
দূরন্ত বলেছেন:
অনেকদিন পরেই পড়লাম। খুব ভালো লাগলো। আরেকটু বড় করতে পারতেন।তবে চোর নাম্বারটা আগে থেকে অনুমান করতে পারবে এ ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে একটু কষ্ট হচ্ছিলো। এক্ষেত্রে আরেকটা অপশন আছে, চোর যদি ৭২টা কম্বিনেশন নিয়ে পরপর কয়েকদিন ট্রাই করে তাহলে নিশ্চয়ই একদিন খুলতে পারবে...
ধন্যবাদ।
লেখক বলেছেন: ফিডব্যাকের জন্য ধন্যবাদ। রিরাইট চলছে ![]()

















