পুরো ডাবলিন শহর ঘুমিয়ে আছে। রাস্তায় কালে ভাদ্রে দু'একটা গাড়ি হুস করে বের হয়ে যাচ্ছে। ঘড়িতে রাত প্রায় এগারোটা। বঙ্গদেশে এ সময় আসলে রাতই না, কিন্তু এখানে অনেক রাত। যে দেশে সন্ধ্যা সাতটার আগে মার্কেট বন্ধ হয়ে যায়, রাত আটটার মধ্যে রাস্তাগুলো ধুয়ে মিউনিসিপেলিটির ট্রাকগুলো ফিরতে শুরু করে, সেই দেশে এগারোটা মানে গভীররাত বৈকি!
আমি ক্লান্ত পায়ে বাস থেকে নামি। প্রায় সোয়া দশটা পর্যন্ত থিসিসের কাজ করে বাসায় ফিরেছি। এখন আর রান্না করতে ইচ্ছে করছে না। বিষন্ন মন আর অবসন্ন শরীর নিয়ে ধীরেধীরে হেটে টেক এ্যাওয়ে চাইনিজ 'ফরচুন রেস্টুরেন্ট'-এর দিকে এগিয়ে যাই। আশেপাশের সব দোকান অনেক আগেই বন্ধ কয়ে গিয়েছে। শুধু এটা খোলা। সন্ধ্যা সাতটায় এরা দোকান খোলে, বন্ধ করে রাত একটায়। কিছু মানুষ হয়তো সব দেশেই থাকে যারা নিশাচর। তাদের জন্য এই 'ফরচুন' রেস্টুরেন্টটা সত্যিই ফরচুনের লক্ষন! সময়-অসময়ে খাবার পাবার নির্ভরযোগ্য সংস্থান। দোকানে আর কোন কাস্টোমার ছিলনা। আর্ডার দেয়ার প্রায় সাথে সাথেই ডিনার রেডী করে দিল।
ব্ল্যাকবিন সসে ডোবানো ডাক রোস্টটা নরম মাশরুমের সাথে মিশে নাকে সুবাস ছড়াতে শুরু করেছে তখন। দ্রুত পায়ে হাইওয়ের পাশ দিয়ে হেটে বাসার দিকে এগিয়ে যাই। ঠান্ডা বাতাস চশমার কাঁচের সাথে খানিক যুদ্ধ করে চোখের ভেতর এসে বাড়ি দিতে থাকে। মূহুর্তে চোখে পানি জমে যায়। ঝাপসা চোখে রাস্তার পাশ দিয়ে হাটতে হাটতে জীবনটাকে ব্যবচ্ছেদ করছিলাম। নিয়ন বাতির হলুদ আলোয় জীবনটাকে অন্যরকম দেখতে পাই। খানিক দিশেহারা, খানিক চঞ্চল। মনে পড়ে যায় মায়ের কথা। সকালে ছোটবোন লিখেছিল 'আম্মু তোমার কথা বলে, ফোন দিও।' দেয়া হয়নি সেই ফোন। ভালোবাসার মানুষটা বলেছিল, 'একটু আগে এসে কি ফোন করা যাবে?' সেই আগে আসাও হয়নি। দূর নক্ষত্রের দিকে তাকালে বাবাকে দেখতে পাই। বাবাই ভালো আছে, ফোন ইমেইলের যন্ত্রনা নেই! চাইলেই আমাকে দেখতে পায়। আচ্ছা বাবা, ঐ জগতটা কেমন? খুব জানতে ইচ্ছে করে!
এলোমেলো চিন্তাগুলোকে সরিয়ে রেখে হাটার গতি বাড়িয়ে দেই। বাসায় এসে খেয়ে, আগের বেশ কিছু জিনিস ধুয়ে, কালকের জন্য কিছু ব্যবস্থা করে - তবেই ঘুমাতে যেতে হবে। সময়ই যেখানে সময় দিতে চায় না, সেখানে আবেগকে লাই দেয়ার সুযোগ কই? তবুও ঠান্ডা বাতাসে হাটতে হাটতে চোখটাকে বড্ড বেশি ঝাপসা মনে হয়। অনুভব করি পানি টলটল করছে। মাঝেমাঝে অবচেতন মন জিজ্ঞেস করে বসে, এর সবটাই কি বাতাসের ঝাপটা খেকে এসেছে নাকি কিছুটা আবেগ থেকেও? দ্রুত মনকে শাসন করি। মানুষ হয়ে জন্মানোর এই এক যন্ত্রনা। মন কেবলই অবাধ্য হতে চায়!
১৭ ফেব্রুয়ারী ২০০৯
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।
সংযুক্ত ছবিতে সেই রাস্তাকে দেখা যাচ্ছে যেখানে হাটতে হাটতে মন অবাধ্য হতে চায়
ডাবলিনের ডায়েরী - এগারো (১৭ ফেব্রুয়ারী ২০০৯)
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার
বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?
কর্মসংস্থান? না।
বিনিয়োগ? না।
ডলার সংকট? না।
গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।
ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
পণ্ডশ্রম

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।