somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার লজ্জিত বিবেক এবং কিছু টুপি খোলা অভিবাদন

২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৭:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অস্থির লাগছে। প্রচন্ড অস্থির। গত ২৫ ও ২৬ তারিখ - দুই দিনে ঢাকার পিলখানায় মূহুর্তে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর কথা ভেবে যতটা না অবাক হচ্ছি, তার থেকে বেশি ঘৃনা হচ্ছে আমার। কিছুটা নিজের প্রতি, আর কিছুটা স্বাজাতির প্রতি। আমাকে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্থানী ছেলেগুলো একগুয়ে বলে জানে। সময় পেলেই যে আমি দু'কথা শুরু করি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। গর্ব ভরে আমি আমার দেশের বীরদের কথা শোনাই সবাইকে। কিছুদিন আগে বিডিআরের সাথে ভারতের বি.এস.এফ-এর সংঘর্ষে হাতেগোনা কয়েকজন বিডিআরের হাতে বিএসএফ-এর চরম ভাবে পরাজীত হবার গল্প বলতে বলতে আমি অনুভব করছিলাম যেন অন্য জগতে চলে যাচ্ছি। অথচ কাল আমি সেই পাকিস্তানী/ভারতীয় ছেলেগুলোর সামনে দাড়াতে লজ্জা পাবো। মনেমনে হয়তো পাকিস্থানীদের বলবো, তোমরা যা করে এসেছিলে ৭১-এ, সেটাই আমরা করে দেখালাম ২০০৯-এ।

রাগ-ক্ষোভ! আজ সব জল হয়ে গিয়েছে। নিজেদের রক্তে নিজেদের উল্লাস দেখে আজ আমি নির্বাক। ভালোবাসার মানুষটা যখন বলছিল "আমার খুব ভয় লাগছে" তখন আমি উত্তরে বলি "ভয় নেই, ওই দেশে আমি থাকবো না"। মাগো, আজ তোমাকে বাংলাদেশ বলতেও আমার কুন্ঠা হয়। 'বাংলাদেশ' শব্দটাকেই যেন গত দুদিন পিলখানায় পদদলিত ও ধর্ষিত হতে হয়েছে। আচ্ছা, বিডিআরের পুরো কর্মকান্ডটাকে কি বিপ্লব বলা চলে? অন্তত কিছু মানুষতো তাই মনে করে। বিডিআরের জোয়ানদের সাথে যে বৈষম্যমূলক আচরন করা হচ্ছিল তার যোগ্য জবাব তারা দিয়েছে। এটাই মানুষের কাছে মূখ্য। এক্ষেত্রে আমার একটা ছোট্ট প্রশ্ন ছিল, ওই যে ১২ বছরের মেয়েটা - সে কি দূর্নীতি করেছিল? যে নারীদের সাথে তারা লাঞ্ছনাকর আচরন করলো, তাদের দোষটা কোথায় ছিল? কিম্বা এরকম ঘটনা ঘটানোর পর সাধারন ক্ষমা চাওয়ার ধৃষ্টতাইবা তারা কি করে দেখায় এবং সর্বপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী - আপনাকে সাধারন ক্ষমা করার অধিকারই বা কে দিল? যেই আপনি সারা জীবন যুদ্ধ করে আসছেন বঙ্গবন্ধু সহ আপনার পরিবারের সবার বিচার চেয়ে, সেই আপনি কি কোন দিন দাড়াতে পারবেন বাবা-মাহারা ঐ ছেলেমেয়ে গুলোর সামনে যাদের বাবা-মার হত্যাকারীকে আপনি ক্ষমা করে দিয়েছেন? হয়তো পারবেন। তা না হলে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ আর কি হলেন।

যাক, এসব আবেগের কথায় গিয়ে কাজ নেই। এর থেকে বরং যুক্তির কথায় আসা যাক। অনেকে বলছে কয়েকটা জীবনের উপর দিয়ে হলেও একটা বৈষম্যমূলক যুগের অবসান ঘটলো। কথাটায় আপাতদৃষ্টে যুক্তি আছে বৈ কি! এখন বিডিআররা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। কে মরলো, কে ধর্ষিত হলো এটা আর কয় দিন মনে রাখবে মানুষ? কিন্তু সমস্যা হলো, আমার কাছে ঐ কয়েকজন আপাত তুচ্ছ মৃত ও লাঞ্ছিতাই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। যাদের আমরা কয়েকজন মৃত বলছি, তারাই কারো কারো কাছে প্রিয়তম স্বামী, স্নেহময়ী বাবা বা শেষ ভালোবাসার স্থান মা। যে নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে, সে যে আজ আমার কাছে একাত্তরের বিরঙ্গনা। তাদের যে আমি 'কয়েকটা প্রান' হিসেবে দেখতে পারিনা। ...ফেইসবুক খুলে কিছু সময় বসে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, যে অফিসারগুলো মারা গেলো তাদের ছেলেমেয়েরাওতো ফেইসবুক ব্যবহার করতো। ওরা এখন কি করছে? ওদের প্রোফাইল গুলোতে কি সেই ভয়াবহ রক্তের দাগ দেখা যায়? হয়তো যায়। আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু যে দেখতে পায়, তার কাছে এই দাগ কোন দিনও মোছার না।

একবন্ধু ফেইসবুকে লিখেছে (যার ভাই কিছু আগে সবকিছু ঘুরে দেখে এসেছে), "ভাইয়া এসেছে। যা বললো শুনে ভয় লাগছে। একাত্তেরেও নাকি মানুষ এত কষ্ট পায়নি। শুধু বুলেট দিয়ে মারেনি, মাজহার ভাইয়ের চোখ এবং মাথার এক অংশ নাই। মেয়েদের রেপ করে আর বাচ্চাদের ছাদ থেকে ফেলে মেরেছে।" খালাতো বোনের সূত্র থেকে শুনলাম, যার বাসা পিলখানার একদম পাশেই, তারা নিজচোখে লাশ পোড়ানো এবং ম্যানহোলে ঢোকানোর দৃশ্য দেখেছে। পরে নদী থেকে লাশ উদ্ধারের পর সেই কথার সত্যতাও পাওয়া যায়। এতো শুধু বিপ্লব না, রীতিমত মহা বিপ্লব। বিপ্লবে টগবগ করা জোয়ানদের উৎসাহ দেখে কিছু মানুষকে বলতেও শুনলাম 'হ্যাটস অফ টু বিডিআর'। বাহ, অতি চমৎকার! একেই না বলে বাপের বেটা। তবে সমস্যা হলো আমার এই খুতখুতে মন তাদের জন্যও একটা প্রশ্ন দাড় করিয়েছে। গতকাল যদি আপনাদের মায়ের শাড়ির আচল ধরে বিডিআর টান দিত, তাহলেও কি আপনারা একই কথা বলতেন? যদি পারেন, তবে এবার আমি বলবো হ্যাটস অফ টু ইউ।

আমার কাছে এতদিন বাঙালীর প্রতিভূ ছিল সিরাজ, তিতুমীর। কাল ভোর থেকে আমি মীরজাফরকেই বরং নেতা মানবো; কারন সেই তো আসল বিপ্লব ঘটিয়েছিল। ইন্ডাস্ট্রিলায় রেভুলেশনের দেশ ইংল্যান্ডকেতো সেই আমাদের কাছে তুলে ধরেছিল। মনেপড়ে কলকাতার ভিক্ট্রোরিয়া মেমোরিয়ালে দেখেছিলাম পলাশীর যুদ্ধের পর মীরজাফরের স্বাক্ষর করা বাংলাকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে তুলে দেয়ার সেই দলিল। এই দলিলইতো আমাদের নিয়ে গিয়েছিল এক নুতন সভ্যতার দেশে। কোথাকার কোন সিরাজ, তিতুমীর, ক্ষুধিরাম মরলো; ওই সব কেউ মনে রাখে নাকি? সময় সব ভুলিয়ে দেয়। বেঁচে থাকে কেবল মীরজাফর। তোমরা বলো সে বিশ্বাসঘাতক ছিল? ছিঃ! ওভাবে বলতে হয় না। আসো এক সাথে বলি - হ্যাটস অফ টু মীরজাফর! বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক!!!

২৭ ফেব্রুয়ারী ২০০৯
ডবিলিন, আয়ারল্যান্ড।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ৩:০০
২৩টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×