রাগবী সম্পর্কে আমাদের একটা বদ্ধমূল ধারনা হলো এটা মারামারির খেলা। আসলে কিন্তু তা নয়। নিয়মগুলো জানা থাকলে রাগবী ফুটবল, এ্যাসোসিয়েশন ফুটবল (আমরা যেটাকে ফুটবল বলি) থেকে কোন অংশে কম উপভোগ্য নয়। তাছাড়া রাগবীর সাথে এ্যাসোসিয়েশন ফুটবলের রয়েছে সুগভীর সম্পর্ক। যেহেতু আমরা ফুটবল পাগল, তাই আমার বিশ্বাস রাগবীও সবার ভালো লাগবে। এই পোস্টে রাগবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হবে। পরবর্তিতে আগামী কাল নিয়ম-কানুন নিয়ে বিস্তারিত পোস্ট দেব এবং শুক্রবার সরাসরি চলে যাবো টানটান উত্তেজনায় জমে উঠা সিক্স নেশনস চ্যাম্পিয়ানশীপের আলোচনায়।
আদি ইতিহাস এবং মিথ
অনেকেই হয়তো জানেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত অনেকগুলো নাম করা খেলার জন্মস্থান ইংল্যান্ড। এই তালিকায় রয়েছে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বেইজবল, টেনিস, ব্যাডমিন্টন এবং অবধারিত ভাবে রাগবীও। রাগবীর রয়েছে খুব চমৎকার এক ইতিহাস। ইংল্যান্ডের একটা এলাকা আছে যার নাম রাগবী। সেখানে একই নামের একটা স্কুলও আছে - রাগবী স্কুল। সেই স্কুলের ছাত্র ছিল উইলিয়াম ওয়েব এলিস। ১৮২৩ সনে এলিস একবার ফুটবল খেলতে খেলতে হঠাৎ করে বল হাত দিয়ে ধরে দৌড় দিয়েছিল। এরপর রাগবী স্কুলের ছাত্ররা এ বিষয়টায় মজা পেতে শুরু করে এবং হাত দিয়ে ফুটবল খেলা শুরু করে। কালক্রমে তাদের এই খেলা ছড়িয়ে পড়তে থাকে চারপাশে এবং স্কুলের নামানুসারে এ খেলার নাম হয় রাগবী। যদিও এই গল্পের পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর মত রয়েছে, তবে ওয়েব এলিসকে আজও রাগবীর জনক হিসেবেই দেখা হয়। বিশ্বকাপ রাগবীর যে ট্রফি রয়েছে সেটার নামও ওয়েব এলিস ট্রফি।
ক্লাব পর্যায়ে রাগবী এবং বিভাজন
ক্লাব পর্যায়ে রাগবী খেলা শুরু হয় ১৮৪৩ সনের দিকে। কিংস কলেজ লন্ডনের বর্তমান মেডিকেল শাখা গাইজ হসপিটালে সে বছর রাগবী স্কুলের বেশ কিছু ছেলে ডাক্তারী পড়তে গিয়েছিল। সেখানে তারা গাইজ হসপিটাল ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে। এই ক্লাবটি যে কোন ধরনের ফুটবলের ক্ষেত্রে বিশ্বের সর্বপ্রথম ক্লাব বলে নিজেদের দাবী করে। যদিও পরিপূর্ন সংরক্ষিত রেকর্ড সহ পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন ফুটবল ক্লাব হিসেবে ইউনিভার্সিটি অব ডাবলিস - ট্রিনিটি কলেজের ফুটবল ক্লাবটিকেই ধরা হয়। এই ক্লাবটি ১৮৫৪ সনে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৫৮ সনে প্রতিষ্ঠিত লন্ডনের ব্ল্যাকহিথ রাগবী ক্লাব অবিশ্ববিদ্যালয়ীয় ক্লাব হিসেবে বিশ্বের সর্বপ্রাচীন।
১৮৬৩ সনের ২৬ অক্টোবর লন্ডনে ফুটবলের আইন প্রনয়নের জন্য দ্যা ফুটবল এ্যাসোসিয়েশন (এফ এ) গঠন করা হয়। সে সময় রাগবীকে ফুটবলেরই অংশ ধরা হতো। কিন্তু এফ এ বেশ কিছু আইন যা রাগবীর সাথে সম্পর্কিত, বাতিল করলে ব্ল্যাকহিথ ক্লাব এফ এ ছেড়ে বের হয়ে আসে এবং যারা রাগবীধর্মী ফুটবল খেলে তাদের নিয়ে রাগবী ফুটবল ইউনিয়ন গঠন করে। সে বছর থেকেই আমরা যেটাকে ফুটবল বলি সেটার নামকরন করা হয় এ্যাসোসিয়েশন ফুটবল।
১৮৭৯ থেকে ১৮৮২ সন পর্যন্ত ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্ঝলের কিছু ক্লাবের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হয়। পরবর্তিতে আইন প্রনয়ন নিয়েও মতভেদ দেখা দিলে রাগবী ইউনিয়ানের মধ্যেই ভাঙ্গনের শব্দ জোরালো হয়ে উঠে। ১৮৯৫ সনের ২৯ অগাস্ট ইয়র্কশায়ারের জর্জ হোটেলে এক মিটিং-এর মাধ্যমে উত্তর ইংল্যান্ডের ২০টি ক্লাব অফিসিয়ালী আলাদা হয়ে যাবার ঘোষনা দেয় এবং নর্দার্ন রাগবী ফুটবল ইউনিয়ন গঠন করে। পরবর্তিতে এই সংস্থাই রাগবী ফুটবল লীগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং জন্মদেয় রাগবীর আরেকটি ধারার। যদিও রাগবী ইউনিয়ানের মত রাগবী লীগ অতটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি।
আন্তর্জাতিক রাগবী
১৮৭১ সনের ২৭ মার্চ প্রথম আন্তর্জাতিক রাগবী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবরাতে। ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের মধ্যকার সেই খেলায় স্কটল্যান্ড আন্তর্জাতিক রাগবীর ইতিহাসে প্রথম বিজয়ী হবার গৌরব অর্জন করে। ১৮৮৪ সনে ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের মধ্যকার একটি খেলায় রেফারী কতৃক কারচুপির অভিযোগে ইংল্যান্ডের সাথে অন্য দেশগুলোর সম্পর্কের অবনতি ঘটতে শুরু করে। এরই রেশ ধরে ১৮৮৬ সনে ইন্টারন্যাশনাল রাগবী বোর্ড গঠন করা হলে সেখানে ইংল্যান্ড যোগ দেয়নি। এই বোর্ডই রাগবীর সর্বোচ্চ সংস্থা এবং এর মূল কাজ আইন প্রনয়ন এবং রাগবীর আন্তর্জাতিক অভিভাবকত্ব। সংস্থাটি আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে অবস্থিত। আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলস এই সংস্থার তিন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। প্রতিষ্ঠার সময় ইংল্যান্ড যোগদানে অসম্মতি জানালেও চারবছর পর তারা মত পরিবর্তন করে সদস্যপদ গ্রহন করে। বর্তমানে রাগবীর সুপার পাওয়ারগুলোর মধ্যে অন্যতম অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা এবং ইংল্যান্ড। এছাড়া আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস, ফ্রান্স এবং আর্জেন্টিনা শক্তিশালী দল হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রতিযোগীতা
রাগবীর সবচেয়ে পুরোনো প্রতিযোগীতা হলো সিক্স নেশনস চ্যাম্পিয়ানশীপ বা সংক্ষেপে সিক্স নেশনস। ১৮৮৩ সনে যখন এই প্রতিযোগীতা শুরু হয় তখন চারটা ব্রিটিশ হোম নেশন তথা ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড এবং ওয়েলস অংশ নিত। সে সময় প্রতিযোগীতার নাম ছিল হোম নেশন চ্যাম্পিয়নশীপ। ১৯১০ সনে ফ্রান্সের যোগদানের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগীতার নাম হয় ফাইভ নেশনস এবং ২০০০ সনে ইটালীর অংশগ্রহনের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় সিক্স নেশনস। এই প্রতিযোগীতাকে রাগবীর ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ানশীপও বলা হয়ে থাকে কারন ইউরোপের সর্বোচ্চ রেটিংধারী ছয়টা দল এখানে অংশ নেয়। আরেকটি প্রতিযোগীতা রয়েছে যাকে বলা হয় ট্রাইনেশনস। এখানে সাউথ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড অংশ নেয়। এছাড়াও চারটা ব্রিটিশ হোম নেশন এক হয়ে একটা দল গঠন করে যাকে বলা হয় ব্রিটিশ লায়ন্স (বর্তমানে পরিবর্তিত নাম ব্রিটিশ এন্ড আইরিশ লায়ন্স; যদিও এ নামে ডাকা হয় কম) বা শুধু লায়ন্স। প্রতি চার বছরে লায়ন্স একবার করে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড অথবা সাউথ আফ্রিকা ট্যুরে যায়। এই ট্যুরটাকেও রাগবীতে বেশ মর্যাদাপূর্ন প্রতিযোগীতা হিসেবে গন্য করা হয়।
রাগবীর সবচেয়ে বড় প্রতিযোগীতা হচ্ছে রাগবী বিশ্বকাপ। ১৯৮৭ সন থেকে অনুষ্ঠিত হওয়া এই প্রতিযোগীতায় এক সাথে অংশ নেয় বিশ্বের সব নাম করা রাগবী শক্তিগুলো। ২০০৭ সনে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হয় এর সর্বশেষ আসর। সেখানে ইংল্যান্ডকে ফাইনালে পরাজিত করে সাউথ আফ্রিকা চ্যাম্পিয়ান হয়। এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া দুবার, সাউথ আফ্রিকা দুবার, ইংল্যান্ড একবার এবং নিউজিল্যান্ড একবার করে রাগবী বিশ্বকাপ জয় করেছে। এছাড়া ফ্রান্স দুবার রানার্স আপ, ওয়েলস এবং আর্জেন্টিনা একবার করে তৃতীয় এবং স্কটল্যান্ড একবার চতুর্থ হয়েছিল।
রাগবীর ইতিহাস নিয়ে লেখা এই পোস্টটি আজ এখানেই শেষ করছি। ভিন্ন টাইম জোনের পাঠকদের জন্য আগামীকাল এটা রিপোস্ট করা হবে; একই সাথে বিস্তারিত নিয়ম-কানুন নিয়ে নুতন পোস্টও আসবে। আশা করি এই সিরিজের সাথে থেকে আপনিও ধীরেধীরে রাগবী খেলার ফ্যান হয়ে উঠবেন
১৮ মার্চ ২০০৯
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মার্চ, ২০০৯ ভোর ৪:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


