somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিশুর লাজুকতা যখন সমস্যা..

০৫ ই এপ্রিল, ২০০৮ রাত ৩:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ধরা যাক, আপনি আপনার কোন আত্মীয় বা বন্ধুর বাসায় গিয়েছেন। গিয়ে দেখলেন সেই আত্মীয় বা বন্ধুর সাত বছর বয়সী ছোট্ট মেয়েটি লজ্জায় আপনার সামনে আসছেই না। দরজার পর্দার আড়াল থেকে আপনাকে দেখছে, কিন্তু সামনে সামনে আসবে না। আবার একই ঘটনা ভিন্নভাবে ঘটছে আপনার বাসাতেও। আপনার ছয় বছর বয়সী ছেলেটি বাসায় সারাদিন গান গাচ্ছে, কবিতা বলছে, অথচ মেহমান এলেই তাদের সামনে দাড়িয়ে আর বলতে পারছে না। কী এক অদৃশ্য লজ্জায় সে যেন মূর্তি হয়ে পড়ছে!

লজ্জা মানুষের একটি স্বাভাবিক অভিব্যক্তি। সব মানুষের মাঝে এই বিষয়টি স্বাভাবিক মাত্রায় থাকাও উচিত। কিন্তু এর মাত্রা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখনই সমস্যার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে লাজুকতা বেশি হলে তা একই সাথে তার বাবা-মা সহ নিজের জন্য নানা রকম সমস্যার কারণ হয়। তবে বাবা-মায়েদের একটি বিষয় সবার আগে জানতে হবে যে, কিছু শিশু জন্মগতভাবেই হয় শান্ত স্বভাবের, তাদের মধ্যে হৈ চৈ থাকে কম, তারা বাইরেও যেতে ততটা পছন্দ করে না। তাই এমন বৈশিষ্ট্যের শিশুদের বিষয়ে প্রথমেই ধরে নেয়া যাবে না যে, তাদের লজ্জাবোধ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রায় রয়েছে। তবে, যদি লাজুকতার কারণে শিশুটির সামাজিক সম্পর্কে কিংবা স্কুলে সমস্যার সৃষ্টির হয়, কেবল তখনই বুঝতে হবে যে, অতিরিক্ত লজ্জাবোধ এখন তার জন্য একটি প্রতিবন্ধকতা। এই রকম পরিস্থিতিতে কীভাবে একজন অভিভাবক হিসেবে আপনি তাকে সাহায্য করতে পারেন বা দিক নির্দেশনা দিতে পারে সেই বিষয়ে কয়েকটি পরামর্শ এখানে উল্লেখ করা হলো:

১.
প্রথম কথাই হলো যে, শিশুকে বলা যাবে না যে, সে লাজুক। যে শিশুরা আসলেই লাজুক, অথবা শান্ত চরিত্রের অধিকারী বলে যাদেরকে ভুল করে লাজুক ভাবা হয়, তারা কেউই চায় না যে, তাদেরকে লাজুক বলা হোক। যারা লাজুক তারা জানে যে, তারা লাজুক; তাই তাদের কে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর দরকার নেই যে, তারা লাজুক। বরং যখন তারা স্বাভাবিক আচরণ প্রকাশ করে, তখন তাদের ভালো ভালো কমেন্ট করুন; এটি তাদের জন্য নীরব উৎসাহ হিসেবে কাজ করবে।
তাদেরকে তাদের অনুভূতি নিয়ে কথা বলতে দিন। তাদের কে তুমি লাজুকের মতো আচরণ করছো কথাটি না বলে বরং তাদের কাছে জানতে চান যে বিভিন্ন ধরণের পরিস্থিতিতে তারা কী অনুভব করে।

২.
শিশুকে সামাজিক সম্পর্কের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দিন। তাকে নিয়ে আত্মীয় বা বন্ধুর বাসায় বেড়াতে যান। তাদের সন্তানদের সাথে আপনার শিশুকে পরিচয় করিয়ে দিন। শিশুকে তার পরিপাশ্বের শিশুদের সাথে বন্ধুত্ব করতে বলুন, তাদেরকে বাসায় নিয়ে আসতে বলুন; কিংবা ঘনিষ্ঠতা বেশি হলে সেই বন্ধুদের বাসাতে তাকে নিয়ে বেড়াতে যান। শিশু যেসব মানুষদের পছন্দের করে, তাকে তাদের সানিধ্যে বেশি সময় থাকতে দিন। তাতে তাদের মধ্যে আত্মপ্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাস যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে মানুষের সাথে যোগাযোগ করার ক্ষমতা। ধীরে ধীরে তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিন বেশি বেশি মানুষের সাথে এবং বেশি বেশি ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থির সাথে।

৩.
শিশুদের সবচেয়ে কমন যে বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তা হলো বড়দের দেখে দেখে শেখা। তাই সে বিষয়টি মাথায় রেখে তাদের সামনে অন্যদের সাথে সামাজিক সম্পৃতি বজায় রেখে আচরণ প্রকাশ করুন। শিশুরা যদি দেখে যে, তাদের বাবা-মায়েরা অন্যদের সাথে সব সময়ই কথা বলে এবং তাদের এড়িয়ে চলে না, তখন তাদের মধ্যে তেমনটি হবার ইচ্ছা স্বাভাবিকভাবেই জন্মাতে পারে। শিশুদের ওপর কোন কিছু জোর করে চাপিয়ে দেয়া কোনমতেই ঠিক হবে না; যেমন, তাদের বলা যাবে না যে ওমুক আংকেলের সামনে তোমাকে গান গাইতেই হবে অথবা ওমুক আপুর সামনে তোমাকে নাচতেই হবে। বরং বেশি মানুষের ভিড়ে তাকে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করুন। তাকে এটা বোঝান যে, আপনি সব সময়ই তার সাথে ও পাশে রয়েছেন; এতে সে অনেক কমফোর্ট ফিল করবে।

৪.
শিশুদেরকে নতুন কিছু করতে সবসয়ই উৎসাহ দিন, সেটি হতে পারে ছবি আকা, গান গাওয়া, কবিতা লেখা ইত্যাদি এবং সেগুলি করতে তার কেমন লাগছে, সেটিও জিজ্ঞাসা করুন। তাদের সামনে তার জন্য ভীতিকর বা লজ্জাকর পরিস্থিতিগুলি এমন সহজভাবে উপস্থাপন করুন, যাতে তার মনে হয় এমন সব পরিস্থিতিতে ভয়ের বা লজ্জার কিছু নেই। তার বন্ধুদের সাথে কথা বলার জন্য আপনি তাকে বিষয় ঠিক করে দিন, হতে পারে সেটি টম অ্যান্ড জেরি বা পাপাইকে নিয়ে। এটি তার মাঝে কথা বলার একটি তাগিদ তৈরি হওয়ার বিষয়ে দারুন সাহায্য করবে। আর যে ধরণের মানুষের প্রতি তারা স্বভাবত আকর্ষণ অনুভব করে, তেমন মানুষদের সাথে যত বেশি সম্ভব তাদের পরিচয় করিয়ে দিন।

৫.
একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখবেন যে, শিশুরা সাইলেন্ট সিগনাল বা নীরব ইশারা ভালো বুঝতে পারে। তাই তাদের সামনে অবশ্যই নিজের মুড এমন রাখবেন না, যাতে তারা মনে করে আপনি নার্ভাস, বিষণœ কিংবা উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন। তারা যদি এটি বুঝতে পারে, তাহলে তাদেরও নার্ভাস, বিষণœ ও উদ্বিগ্ন হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তারা একথা নিশ্চিতভাবেই ভেবে নেয় যে, নিশ্চয়ই খুব খারাপ কিছু ঘটেছে।

৬.
শিশুদের সাথে আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন এবং আপনি যে তাদের অনুভূতি বুঝতে পারেন, এ বিষয়টিও তাদেরকে স্পষ্টভাবে বুঝতে দিন। আপনি তাদের মেসেজ দেবার মতো করে গল্পের আকারে জানান যে, সবার জীবনেই লজ্জা, নার্ভাসনেস, উদ্বিগ্নতা, ভীতি এই বিষয়গুলি থাকে, এমনকি আপনারও রয়েছে। তার পরপরই আপনি তাকে জানিয়ে দিন যে, এই সব পরিস্থিতি আপনি কীভাবে সামাল দেন। তাতে আপনার শিশুর মাঝেও এই বিষয়গুলিকে জয় করার সাহস সঞ্চারিত হবে।

৭.
শিশুদেরকে জানান যে, লজ্জাবোধ বেশি থাকাটা একটি স্বাভাবিক বিষয় এবং এই বিষয়টি চিরস্থায়ী নয়। আর এতে লজ্জারও কিছু নেই। শিশুরা তাদের প্রতিকুল পরিস্থিতিগুলিতে সেই সব পরিস্থিতির গভীরতার তুলনায় বেশি রিঅ্যাক্ট করতেই পারে, কারণ তারা শিশু। এই বিষয়টিও অভিভাবক হিসেবে আপনাকে বুঝতে হবে। আপনার কাজই হবে এই সব পরিস্থিতিতে তাদের সহযোগিতা করা। শিশুদের জন্য কঠিন, এমন সব পরিস্থিতিকে সহজ বর্ণনার মাধ্যমে তাদের কাছে আরো সহজ করে তুলুন। দেখবেন তারা একদিন না হোক, দুই দিন না হোক, তিন দিনের দিন অবশ্যই বুঝতে পারবে। তাকে জানান যে, সব কিছুই ঠিক রয়েছে এবং তাদেরকেও সেই সব পরিস্থিতিতে নার্ভাস না হওয়ার আহ্বান জানান।

মোটামুটিভাবে এই বিষয়গুলি মেনে চললে আশা করা যায়, অতিমাত্রার লাজুক শিশুদের ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব। তবে সবার আগে দরকার হবে অভিভাবকদের অপরিসীম ধৈর্যের। তাকে বলতে হবে উৎসাহমূলক অনেক অনেক ভালো কথা, দিতে হবে আন্তরিক আলিঙ্গন ও অফুরন্ত ভালোবাসা। খুব কম বিষয়ই রয়েছে যা নিরলস চেষ্টা, নিস্বার্থ ভালোবাসা এবং নিখাঁদ আন্তরিকতার কাছে পরাজয় স্বীকার করে না। কিন্তু এর পরও যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তখন নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, এবার তার প্রয়োজন প্রফেশনাল লেভেলের কারো সাহায্য; হতে পারে তিনি একজন শিশু বিশেষজ্ঞ, কিংবা একজন সাইকিয়াট্রিস্ট, অথবা একজন সোশাল ওয়ার্কার।

পুনশ্চ: আলট্রা মডার্ন অভিভাবকরা তাদের লাজুক শিশুদের হাতে ডিজুস সিম সহ একটি মোবাইল ফোন ধরিয়ে দিতে পারেন। দুই রাত আজইরা প্যাচাল আর এক্সট্রা খাতিরওয়ালা চালু কথা বললে লজ্জা-শরম কোথায় গিয়ে ঠেকবে!

১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×