মানুষ আর পশু এক নয়। পশু জ্ঞানার্জন করতে পারেনা, মানুষ পারে। মানুষের মতো বিবেক বুদ্ধিও পশুর নেই। মানুষ নিজের মেধা ও প্রতিভার বিকাশ সাধন করতে পারে, পশু পারেনা। মানুষ গবেষণা, উদ্ভাবন ও আবিষ্কার করতে পারে, বিরাট বিরাট কাজ সম্পাদন করতে পারে। কিন্তু পশু এগুলো পারেনা। মানুষ উন্নতি সাধন করতে পারে, পশু পারেনা। মানুষ বুদ্ধি ও যুক্তি দেয়ে বিচার বিবেচনা করে সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ ও ন্যায় অন্যায় নির্ধারণ করতে পারে। পশু তা পারেনা। তাই মানুষ আর পশু এক নয়।
মানুষকে ভাবতে হবে, কে তাকে সৃষ্টি করেছেন? সৃষ্টিকর্তা কেন তাকে পশু না বানিয়ে মানুষ বানিয়েছেন? কেন তাকে বুদ্ধি, বিবেক ও যোগ্যতা দান করেছেন ? এর পেছনে কি কোন উদ্দেশ্য নেই?
যুক্তি ও বিবেক বলে এবং নবুয়্যতের নির্ভুল সূত্র থেকেও আমরা জানতে পারি, মানুষকে বিশেষ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। সেই উদ্দেশ্যেই তাকে জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেক দেয়া হয়েছে। সে উদ্দেশ্যটা হলো, মানুষ যেনো তার সৃষ্টিকর্তার সঠিক পরিচয় জেনে জীবন যাপন করে। সে যেনো কেবল তাঁরই দাসত্ব করে।
দাসত্ব করা মানুষের জন্মগত স্বভাব।
‘দাসত্ব’ কথাটা শুনলে অনেকেরই গা জ্বলে উঠে। রাগে গোস্বায় রক্ত টগবগ করে। ঘৃণায় গতর ঘিন্ ঘিন্ করে। করবেই তো। কারণ, দাসত্বের জিঞ্জির থেকে মুক্তি পাবার জন্যে মানুষ সব সময়ই সংগ্রাম করেছে, এখনো করছে, ভবিষ্যতেও করবে। কার ইচ্ছে হয় মুক্ত পৃথিবীতে দাসত্ব করবার? দাস হয়ে জীবন যাপন করবার? বন্দী জীবনের গন্ডিতে আবদ্ধ থাকবার ?
হ্যাঁ ঠিকই, মানুষ দাসত্ব করতে চায়না। দাসত্বকে সে ঘৃণা করে। সে মুক্তি পাগল। সে চায় মুক্ত স্বাধীন জীবন । কিন্তু চাইলেই কি সব হয় ? হয় না, হতে পারেনা। কারণ, মানুষ তো নিজের স্রষ্টা নিজে নয়। সে অন্যের সৃষ্টি। তার স্রষ্টা তাকে যেভাবে সৃষ্টি করেছেন, সে ঠিক সেরকম। তার স্রষ্টা তার মধ্যে যে স্বভাব প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য অন্তরগত করে দিয়েছেন, সে কিছুতেই সে স্বভাব প্রকৃতি থেকে মুক্ত ও স্বাধীন হতে পারেনা।
তার স্রষ্টা তাকে সৃষ্টি করবার সময়ই তার মধ্যে দাসত্ব করবার স্বভাব প্রকৃতি অন্তরগত করে দিয়েছেন। ‘দাসত্ব’ শব্দটি ব্যাপক অর্থবহ। এর প্রকৃত অর্থ হলো : কারো দাসত্ব করা, শৃংখলাবদ্ধ থাকা, হুকুম পালন করা, আনুগত্য করা, পূজা ও উপাসনা করা, তার নিকট বিনয়ী হয়ে থাকা, তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা এবং তার কাছে আরাধনা করা।
মানুষের মহান স্রষ্টা দাসত্বের এই গুণবৈশিষ্ট্যগুলো মানুষের স্বভাবগত করে দিয়েছেন। মানুষ কিছুতেই তার এই স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত ও স্বাধীন থাকতে পারেনা। তাই দাসত্ব তাকে করতেই হবে। এ থেকে কিছুতেই তার মুক্ত নাই, নিস্তার নাই।
মানুষ কার দাসত্ব করবে ?
হ্যাঁ, দাসত্ব মানুষকে করতেই হবে। সব মানুষই দাসত্ব করে। মানুষ জন্মগত ভাবেই দাস। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষকে কার দাসত্ব করা উচিত ?
এ প্রশ্নের জবাব দেবার আগে আমরা একটু মানুষের অবস্থা দেখে নিই। আমরা একটু দেখে নিই মানুষ কার কার দাসত্ব করে ? আসলে মানুষ এতো অসংখ্য জিনিসের দাসত্ব করে যার হিসেব নিকেষ করা কঠিন। তবে মানুষ যেগুলোর দাসত্ব করে সেগুলোকে কয়েক শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। হ্যাঁ, মানুষ তার স্রষ্টাকে ছাড়া এসব শ্রেণীর দাসত্ব করে :
১. সে তার আত্মা তথা জৈবিক কামনা-বাসনা ও প্রবৃত্তির দাসত্ব করে।
২. কল্পিত কারো দাসত্ব করে।
৩. বংশ, গোত্র, সমাজ , সম্প্রদায়, স্বজাতি ও স্বদেশের পূজা করে।
৪. জাগতিক ক্ষমতাবানদের দাসত্ব করে।
৫. রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দাসত্ব করে।
৬. অর্থ সম্পদের পূজা করে।
মানুষ অন্যসব জীবের মতো নয়। অন্যসব জীবের প্রকৃতিতে স্রষ্টার দাসত্ব এবং জৈবিক চাহিদা ও কামনা -বাসনা পূরণের প্রবৃত্তি উভয়টাই সহজাত করে দেয়া হয়েছে। এটাই তাদের সৃষ্টিগত বা সহজাত প্রবৃত্তি। সৃষ্টিগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে তারা কেবল নিজেদের এই প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ীই তাড়িত হয়। এর বাইরে অন্য কোন তাড়া তাদের মধ্যে নেই।
কিন্তু মানুষের প্রকৃতি অন্যসব জীবের প্রকৃতির চাইতে ভিন্ন। তার স্রষ্টা তার সৃষ্টিগত প্রকৃতির মধ্যে দুটি জিনিস অন্তরগত করে দিয়েছেন। এর একটি হলো, অন্যসব জীবের মতো জৈবিক চাহিদাও কামনা-বাসনা। আর অপরটি হলো জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেক। এই দ্বিতীয়টি অন্যান্য জীবকে দেয়া হয়নি। এই দ্বিতীয়টি ভিত্তিতে মানুষের প্রকৃতিতে সৃষ্টি হয় আরেকটি দাবি বা চাহিদা। সে দাবিকে বলা হয় যুক্তি, বুদ্ধি ও বিবেকের দাবি।
মানুষের এই দুটি দাবি ও চাহিদার মধ্যে প্রথমটি তার কাছে কেবল চায়, কেবল দাবি পেশ করে, কেবেল উদগ্র কামনা-বাসনা পূরণের জন্য তাড়িত করে এবং দাবি, চাহিদা ও কামনা-বাসনার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বাধা-বন্ধন ও সীমা-রেখা মানতে সে চায় না। তার একটি দাবি মেনে নিলে, একটি কামনা পূরণ করলে সে আরেকটির জন্যে উদগ্র ও অজেয় হয়ে উঠতে চায়।
অপরদিকে দ্বিতীয়টি অর্থাৎ তার অন্তরগত বিবেক বুদ্ধি প্রতিটি কামনা-বাসনা, চাওয়া-পাওয়া এবং দাবি ও চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে তাকে বিচার-বিবেচনা করতে বলে, ভেবে দেখতে বলে, চিন্তাভাবনা করতে বলে, ভালো মন্দ যাচাই করতে বলে, ন্যায়-অন্যায় পরখ করে দেখতে বলে, সত্য মিথ্যা তলিয়ে দেখতে বলে, বাস্তবতা ও অবাস্তবতা খতিয়ে দেখতে বলে, উচিত-অনুচিত ভেবে দেখতে বলে, তার মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখতে বলে, তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা স্মরণ রাখতে বলে।.......(চলবে)
(সংকলিত ও সংযোজিত)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



