somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের জন্মশতবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা

২৯ শে ডিসেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৫:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


(শিল্পীর তুলিতে জয়নুল আবেদীন)
কথা বলে যাঁর ছবি তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলা আন্দোলনের পথিকৃৎ। শিল্পকলায় অবদানের জন্য তাঁর জীবদ্দশায় তিনি পেয়েছেন শিল্পাচার্য খেতাব। বাংলার প্রকৃতি, জীবনাচার, ঐশ্বর্য, দারিদ্র্য এবং বাঙালির স্বাধীনতার স্পৃহা তিনি তার তুলি আর ক্যানভাসে বিশ্ববাসীর সামনে মূর্ত করে তুলেছিলেন। তার বিখ্যাত চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে -দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা, সংগ্রাম, সাঁওতাল রমণী, ঝড় এবং আরো অনেক ছবি। ১৯৬৯ সালে গ্রাম বাংলার উত্‍সব নিয়ে আঁকেন ৬৫ ফুট দীর্ঘ তাঁর বিখ্যাত ছবি নবান্ন। জয়নুল আবেদীন ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়ে আঁকা তাঁর একগুচ্ছ জলরং ছবির জন্যে ১৯৩৮ সালে নিখিল ভারত চিত্র প্রদর্শনীতে গভর্নরের স্বর্ণপদক লাভ করেন। মানবতাবাদী এই শিল্পীর জন্মশতবার্ষিকী আজ। ১৯১৪ সালের আজকের দিনে কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন শিল্পাচার্য। শিল্পীর জন্মশতবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।


শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার কেন্দুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা তমিজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন পুলিশের দারোগা। মা জয়নাবুন্নেছা গৃহিনী। নয় ভাইবোনের মধ্যে জয়নুল আবেদিন ছিলেন সবার বড়। পড়াশোনার হাতেখড়ি পরিবারের কাছ থেকেই। খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি ছবি আঁকা পছন্দ করতেন। পাখির বাসা, পাখি, মাছ, গরু-ছাগল, ফুল-ফলসহ আরও কত কি এঁকে মা-বাবাকে দেখাতেন। ছেলেবেলা থেকেই শিল্পকলার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। ১৯৩৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই স্কুলের পড়ালেখার বাদ দিয়ে কলকাতায় চলে যান এবং মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস-এ ভর্তি হন।


(শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের বিখ্যাত ছবি "দ্যা স্ট্রাগল")
তাঁর মা জয়নুল আবেদিন আগ্রহ দেখে নিজের গলার হার বিক্রি করে ছেলেকে কলকাতার তখন আর্ট স্কুলে ভর্তি করান। পরবর্তীতে ছেলে জয়নুল আবেদিনও মায়ের সেই ভালবাসার ঋণ শোধ করেছেন দেশের স্বনামধন্য শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। জয়নুল আবেদিন ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলে পড়েন। ১৯৩৮ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন।


এই শিল্পী ১৯৪২-৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের করুণ ছবি এঁকে আমাদের অন্তর আত্নাকে নাড়া দিয়েছেন। যে ছবি গুলোর মাধ্যমে আজো আমরা সেই দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা ও বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করতে পারি । শুধু দুর্ভিক্ষের ছবি নয়, তার আঁকা প্রতিটি ছবিই একেকটি সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বাস্তব অবস্থাকে আমাদের চোখের সামন্যে তুলে ধরে। বাংলা ১৩৪৯ সালের দুর্ভিক্ষের সময় রাস্তায় পড়ে থাকা ছিন্নমূল মানুষের ছবি ও স্কেচে জয়নুলের ক্যানভাস জীবন্ত হয়ে উঠে। এ ছবি একেঁই মানবতাবাদী এই শিল্পীর খ্যাতি ও সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। চিত্রশিল্পও যে কোন প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি বা প্রতিরোধের হাতিয়ার অথবা অধিকার-সাম্য-স্বাধীনতার ভাষা হতে পারে তা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আমাদের দেখিয়েছেন। শিল্পীর তুলিতে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপকতা কতটা বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে জ্যান্তরূপে আবির্ভূত হতে পারে, তা জয়নুলের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবিগুলো না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না।“ ১৯৭০ সালে জয়নুল এঁকেছিলেন দীর্ঘ এক ছবি,নবান্ন। এ ছবি গ্রাম বাংলার জীবনের প্রতিচ্ছবি । দেশের দক্ষিণে উপকূলবর্তী চর ‘মনপুরা’; যা শান্ত, সবুজ এক বনানী। ১৯৭০ সালের প্রলংয়করী ঘূর্ণিঝড় এ দ্বীপে আঘাত হানে। লক্ষাধিক লোকা মারা যায় সে ঝড়ের তাণ্ডবে। জয়নুল সেই ধ্বংসলীলার ছবি একছিলেন - ’মনপুরা ৭০’। তুলির আচড়ে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন প্রকৃতির সেই নির্মম আচরন। প্রচণ্ড ঢেউয়ের দাপটে তীরে উঠে আসা মৃত গবাদিপশু, নারী-পুরুষ, শিশুর মিছিল। এ যেন সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দী শ্বাসরুদ্ধকর মুহর্ত। প্রকৃতির তাণ্ডবে বেঁচে যাওয়া এক মানুষ হাঁটুমুড়ে বসে আছে-জীবন্মৃত, অসাড়। এ ছবি প্রকৃতির এক নির্মম, নিষ্ঠুর ইতিহাস।


(শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের বিখ্যাত ছবি ’মনপুরা ৭০’)
জয়নুল আবেদীন ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমীর সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি এখানে কাজ করেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর অন্যতম উপদেষ্টা মনোনীত হন। একই বছর জয়নুল বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় ১৯৭৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য জাতীয় জাদুঘরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জয়নুল আবেদীন গ্যালারী। প্রায় ৭০০ ছবি এতে সংগ্রহশালায় রয়েছে।


১৯৭৬ সালের ২৮ মে মৃত্যুবরণ করেন মানবতাবাদী এই শিল্পী। মৃত্যুর পরে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত চারুকলা অনুষদের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। আধুনিক শিল্প আন্দোলনের পথিকৃত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের জন্মশতবার্ষিকী আজ। মানবতাবাদী শিল্পীর জন্মশতবার্ষিকীতে আমাদের ফুলেল শুভেচ্ছা।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১৪ সকাল ১০:২৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্ধের দেশে আয়না বিক্রি করতে এসেছিলেন ইউনুস স্যার!

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩৪



অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার সার্বিক দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার। দীর্ঘ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন কিরকুট, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

*** জামাত শিবির এর যারা আছেন তারা দয়ে করে প্রবেশ করবেন না ***


বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এখন আর কেবল একটি দলের ভাগ্যের প্রশ্ন নয় এটি রাজনৈতিক ভারসাম্য, গণতান্ত্রিক কাঠামো... ...বাকিটুকু পড়ুন

পৃথিবীর বুকে এই দুর্যোগ যেন কোনওদিন না আসে

লিখেছেন অর্ক, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:২২



পৃথিবীর বুকে এই দুর্যোগ যেন কোনওদিন না আসে। দুর্ধর্ষ মাফিয়া একটি রাষ্ট্রের মালিক হতে যাচ্ছে। দেশ সীমানা ভূখণ্ডের গণ্ডি পেরিয়ে, পৃথিবীর জন্যই অত্যন্ত বিপদজনক। অবশ্য নির্মম বাস্তবতা হলো, আগাগোড়া অসভ্য,... ...বাকিটুকু পড়ুন

অবশেষে দেশে গণতন্ত্র কায়েম হইলো

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৩

দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এখন আমাদের আর কোন টেনশন রইলো না। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের বিজয়ী প্রার্থীদের আজ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই মূলত দেশ আবার গণতন্ত্রের ট্রেনে যাত্রা শুরু করলো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রঙিন ডালিম ফলের একটি ব্যতিক্রমি অঙ্গ বিশ্লেষন ( Anatomy of Pomegranate )

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১১


সবুজ পাতার আড়াল ভেঙে
ডালিম ঝুলে লাজুক রঙে
বাইরে রক্তিম খোলস কঠিন
ভিতরে দারুন জীবন রঙিন।
শত দানার গোপন ভুবন
একসাথে বাঁধা মধুর টান
হৃদয়ের হাজার স্বপ্ন যেন
লুকিয়ে থাকা রক্তিম গান।

উপরে প্রচ্ছদ চিত্রে রেনেসাঁ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×