অসাধারণ ইন্দ্রিয়ানুভুতি এবং গ্রহীতাশক্তির গুনে কিংবা নতুন উত্তাপ,অনুষঙ্গে,রূপে,রসে ,শব্দ ব্যবহারের নিপূনতায় কবি মানুষ হিসেবে অবশ্যই অসাধারণ।
কিন্তু এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, কবি অসাধারণ মানুষ হলেও তিনি একজন মানুষই সুতরাং তারও দোষগুন থাকতে পারে ।একিইভাবে একজন কবির যেমন তার সংসারের প্রতি দায়িত্ব থাকে ,তেমনি সামাজিক দায়িত্বও থাকে ।আবার অনেক সময় রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি দায়িত্ব থাকে।
কবি যেহেতু সমাজেরই একজন এবং তার নিজস্ব আবেগ,চিন্তা ,বিশ্বাস ও দৃস্টিভঙ্গির কারণে সমকালিন দেশীয় ও আর্ন্তজাতিক রাজনীতির দর্শণ,দল বা গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য ও সর্মথনও বিচিত্র নয়।
কবি রবীন্দ্রনাথ(বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন) ,নজরুল(কমেরেড মুজাফফর আহমেদের ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টি) ,সুভাস,সুকান্ত,সমর সেন,(মার্ক্সিস্ট) ফররুখ,(পাকিস্তান আন্দোলন ,ইসলাম পন্থী) হাসান হাফিজুর রাহমান(প্রগতিশীল রাজনীতি),শামসুর রাহমান /সৈয়দ শামসুল হক,(আওয়ামী লীগ সমির্থত ধর্মনিরপেক্ষতা ও মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলন ,আল মাহমুদ(পুের্ব জাসদ ,বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি) ,আহমেদ ছফা(আমি দশ বছর বিপ্লবী রাজনীতি করেছি-ছফা), ফরহাদ মজহার (এক সময়ে বিপ্লবী রাজনীতি,বর্তমানে ভাববাদ,মার্ক্সবাদ ও ইসলামী মৌলবাদের মিশেল ) প্রমুখ আনেক কবির রাজনৈতিক আদর্শ/দল/ গোষ্ঠীর কর্মকান্ডে সম্পৃক্ততা পরিলক্ষিত।
আনেকে ,আবার ক্ষমতকেন্দ্রীক রাজনীতি করেন অর্থাত্ যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে, তার সাথে সখ্যতা বজায় রাখা । এই ধারায় সবচেয়ে সফল হলেন কবি সৈয়দ আলী আহসান ।পাকিস্তানী আমলে তার সরকারসর্মথক ভুমিকার কথা না হয় বাদ দিলাম।বাংলাদেশের শাসকদের মধ্যে বিশেষত জেনারেল এরশাদের সাথে তার সখ্যতার জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হন।
কবিতার রাজনীতিঃ
এতো গেল প্রচলিত/প্রথাগত রাজনীতির কথা।এর বাইরে কবিদের আরেক ধরনের রাজনীতি করতে হয়।অবশ্য,শুধু কবি নয় ,শিল্প-সাহিত্যের সকলকেই সাফল্যের জন্য এই রাজনীতি কমবেশী করতে হয়। এই রাজনীতিটা না করলে /করতে ব্যর্থ হলে একজনের যত ভাল অভিনয় জানা থাকুক বা প্রতিভা থাকুক ,টিভিতে (তা সে সরকারী হোক আর বেসরকারী হোক) চ্যান্স পাবে না কিনবা চ্যান্স পাইলেও টিকবে না।ফিল্ম,মডেলিং, নৃত্য,মঞ্চ সব জায়গাতেই এই রাজনীতি । একি কারণে মিডিয়াতেও পাত্তা পাওয়া যাবে না।আজ যারা শীর্ষস্থানীয় "তারকা" হয়েছেন তা' এই মিডিয়ার কল্যাণে । আর মিডিয়ার আনুকল্য পাবার জন্য কি কি তরিকা লাগে তা' অনেকটা ওপেন সিক্রেট।
যাক সে সব কথা।আমরা বরং কবি হুমায়ুন আজাদ এর কাছ থেকে শুনি 'কবিতার রাজনীতি'এর কথাঃ
কবিতা লেখা এখন আর নিঃশব্দ ধ্যানচর্চা নয়, তা এখন শোরগোলয় রাজনীতিচর্চা ।কবিকে এখন আর শুধু কবিতা লিখলে চলে না,যোগ দিতে হয় কবিতা-রাজনীতিতে। রাজনীতিতে যতো সফল হবেন ,খ্যাতি আসবে ততো বেশী।এর জন্যে প্রচার অভিযান চালাতে হয় নিপুনভাবে, দখল করতে হয় প্রচারের সমস্ত মাধ্যম।যিনি শুধুই কবিতা লিখবেন কিন্তু কোনো প্রচার অভিযান চালাবেন না ,তাকে মহাকালের অপেক্ষায় থাকতে হবে; আর যিনি একটি কবিতা লিখে দশটি অভিযান চালাবেন , সমকাল তারই গুনগান গাইবে।প্রচার ভালভাবে চালানোর জন্যে দরকার হয় দল,কেননা একমাত্র দলের সাহায্যে আধুনিক প্রতিভারা প্রতিষ্ঠা পেতে পারেন।তরুন কবিযশোপ্রার্থিরা জড়ো হয় এসব দলে। দলেভুক্ত হলে কবিতা ছাপানো সহজ হয় । চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা পাওয়া যায়,-’ওস্তাদ’ খুশি হলে ছবিও ছাপা হয়।প্রভাবশালী ওস্তাদের চেলাসংখার ওপর নির্ভর করে ওস্তাদের কৌলিন্য।ওস্তাদ-আশ্রিত কবিদলগুলোর মধ্যে বোঝাপড়াও থাকে বেশ।যদিও নামে-বেনামে এক ওস্তাদ ওন্য ওস্তাদের বিরুদ্ধে তরুন লড়াকুদের খেপিয়ে দেয়।অনুসারীদের ওপর কড়া চোখ রাখা হয়, বিনয়ের অভাব ঘটলে বহিষ্কার করা দল থেকে ।ওস্তাদের প্রশংসা করতে হয় সবসময় ও সবখানে ।যে তরুন সব খানেই অবিনয়ী ,ওস্তাদের কাছে সেও ভীষন বিনয়ী হয়ে পড়ে, পা ছুয়ে সালাম করে।প্রচারের বেলা তারা শুধু বিচত্রগামী নন , সর্বত্রগামী।অন্তত একটি ক্ষেত্রে রবীন্দ্রব্যর্থতার ঘাটতি পূরণ হয়েছে এখানেঃ দৈনিক -সাপ্তাহিক-সিনেমাপত্রিকা থেকে নিয়মিত-অনিয়মিত সংকলন ,বেতার -টেলিভিশন অর্থাত্ সর্বত্র তারা প্রচারহানা দেন ।এরা নিজেরা পত্রিকা বের করে দল করে ,পত্রিকা বন্ধ হলে অন্যের ওপর ভর করে।
কবিতা রাজনীতি এদেশে নতুন নয়,অনেকদিন ধরে চলে আসছে।রাজনীতির মূলে কেবল
অবাস্তব খ্যাতিলিÌসা নেই,আছে বাস্তব লোভ ।আমাদের দেশে তরুন কবিকে হরহামেশা
উপহাসের চোখে দেখা হয়,কিন্তু প্রতিষ্ঠার পরে তার বৈষয়িক উন্নতিও কম ঘটে না। ওই উন্নতির জন্যই রাজনীতি; অমরতার জন্যে রাজনীতির দরকার হয় না।খ্যাতিবাদে যা থাকে তা হচেছ পুরষ্কার,অর্থ,উপাধি ইত্যাদি।যেমন,বাএ পুরষ্কারের রাজনীতিতে হেরে গিয়েছিলেন জসীম উদ্দীন, জিতেছিলেন ফররুখ আহমদ; তাই জসীম উদ্দীন আর বাএ পুরষ্কার
নেননি । সৈয়দ আলী আহসান যখন বুঝতে পারলেন তিনি কিছুতেই সেরা কবির শিরোপা পাবেন না , তখন দাড় করালেন আল মাহমুদকে শামসুর রাহমানের প্রতিপক্ষরূপে। সে সময়ে কবি মহলের গুজবঃ অসহায় আল মাহমুদ বড়ো আশ্রয়ে বা-লা একাডেমির পুরষ্কার পেলেন শামসুর রাহমানের আগে।(সুত্রঃ কবির লড়াই,হুমায়ুন আজাদ,সাপ্তাহিক বিচিত্রা ,২০ মার্চ ১৯৮১)
আমরাও দেখেছি ,৮০'র দশকে কবিকণ্ঠ ও পদাবলির লড়াই, কবিতা পরিষদে নেতৃত্তের দ্বন্দ্ব, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুললাহকে বহিষ্কার, কবিতাকেন্দ্র এর মাধ্যমে জেনারেল এরশাদকে কবি হিসেবে স্বীকৃতি আরো কতকি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


