somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সেকালে ঢাকায় সেহেরী ও ইফতার পালন

৩০ শে আগস্ট, ২০০৯ বিকাল ৩:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিশ শতকের শুরুর দিকে মাহে রমজানে ঢাকার চিত্র কেমন ছিল ? কিভাবে পালন করা হতো ইফতার ও সাহরি ? এ নিয়ে লিখেছিলাম দশ বছর আগে ১২ জানু ১৯৯৯ তারিখে দিনকালে । এটি ২৯ অক্টোবর ২০০৪ তারিখে আমারদেশে পুনঃপ্রকাশিত হয় । নিচে লেখাটি শেয়ার করলাম ।

দীর্ঘকালের পরিক্রমায় ঢাকার অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে । সেকালে যেভাবে রোজা পালন করা হতো, একালে সেভাবে পালন করা হয়না । তবে ইফতারীর দিক দিয়ে প্রাচীন চকবাজারের ঐতিহ্য কিছুটা হলেও আজও আছে ।

সেকালে ঢাকায় প্রত্যেক জায়গায় শবে বরাতের পরই পবিত্র রমজানের আগমন হয়েছে বলে ধরা হতো । এ সময় মসজিদে মসজিদে পরিষ্কার পরিছন্নতা , চুনকাম, ধনীদের বাড়িতে রাজমিস্ত্রী এবং মজুরদের আসা দেখে বুঝে নেয়া হতো যে পবিত্র রমজান আসন্ন । অন্যদিকে যাদের তেমন সামর্থ্য ছিল না অর্থাৎ গরীব মানুষেরা পরিষ্কার মাটি দিয়ে ঘর -দুয়ার মুচে সুন্দর করে নিতো । কলসি , বাটি, গ্লাস পরিষ্কার করা হতো এবং রমজান উপলক্ষে কেনা হতে নতুন ঘড়া, মাটির তৈরি হুক্কা, নতুন নৈচা ইত্যাদি । এ সময় বালির তৈরি নতুন সুরাই এবং ছোলা কিনে রাখা হতো ।

পহেলা রমজানে অংকুরিত মুগ খাবার জন্য সাতাশে শাবানে নতুন হাড়িতে ভিজিয়ে রাখা হতো । ছেলেদের গোসল করানো হতো খৈল , সাজিমাটি এবং বেসন দিয়ে । এরপর প্রস্তুতি নেয়া হতো চাঁদ দেখার ।

পুরনো ঢাকার বড় কাটরা , ছোট কাটরা , হোসনী দালান, আহসান মঞ্জিলের মত উচু দালানে মুসল্লিরা উঠে চাঁদ দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতো । এছাড়া কিছু কিছু যুবক বুড়ুগঙ্গার মাঝখানে নৌকায় করে
চাঁদ দেখার চেষ্টা করতো ।

ঢাকাবাসীরা সেহেরীর জন্য কোর্মা এবং দুধের পায়েস বেশি পছন্দ করতো । সেহরীর জন্য খাবারের আইটেম কম থাকতো । সাধারণতঃ যে খাবার সন্ধ্যায় ভালো মনে হতো সেটায় সেহেরীর জন্য রেখে দেয়া হতো । সেকালে পান বা সিগারেট খাওয়া অবস্থায় কোন মুসলমানকে রাস্তায় দেখা যেত না । পহেলা রমজানের সেহরীতে প্রায় প্রত্যেক বাড়ীতে অবশ্যই কোফতা রান্না হতো । এছাড়া কোন কোন বাড়ীতে কোর্মা কালিয়া রান্না হতো । ঢাকাবাসীদের এগুলো খুব পছন্দের খাবার ছিল ।

জোহরের নামাজের পর ভেজানো ছোলা বের করে তা’ থেকে ডাল বের করা হতো বা ইফতারের জন্য আস্ত রেখে দেয়া হতো । ইফতারের সময়
দস্তরখানায় ডাল বুট ফুলরী গরম গরম পরিবেশন করা হতো । ইফতারীতে প্রত্যেক বাড়ীতে মুড়ি অপরিহার্য ছিল । মুড়ি, পিয়াজ মরিচ ও তেল সহযোগে মেখে খাওয়া হতো । ভাল ভাল গৃহে ভাজা মুড়ি ,পনির , ভাজা মাখনার খই ইত্যাদি ইফতারীতে খাওয়া হতো । ইফতারের সময় দস্তরখানায় আবে জমজমের পানি রেখে প্রত্যেকে যেন একটু পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা হতো । আজান শোনার পর শরবতের সাথে আবে জমজমের পানি মিশিয়ে রোজা খোলা হতো । এসব খাওয়া সওয়াবের বলে ধারণা করা হতো ।

সেকালে ঢাকায় রমজানের সময় অনেক প্রকার শরবত তৈরী হতো । এছাড়া অনেকে ফালুদা বেশ পছন্দ করতো । সে সময় বেদেনার শরবতও প্রচলিত ছিল । প্রায় সব ঘরেই এ সময় পেয়াজু, ফুলুরী, সমুচা, কাচা ও ভাজা ডাল, মুড়ি, কয়েক প্রকার মিষ্টি, ফল ইত্যাদি ইফতারীতে পরিবেশন করা হতো । এছাড়া বাজার থেকে আনা হতো ভুনা চিড়া, দোভাজা, গোলাপি উখরে ( খৈ জাতীয় মিষ্টি এক ধরণের খাবার ), টেপিখুসুরি, মাসকালাইয়ের বড় ডালবুটও আসতো ।

মাগরিবের নামাজের পর রোজাদাররা পুনরায় দস্তরখানায় এসে বসতেন । সেখানে সাদা বা পনির যুক্ত বাকরখানির উপস্থিতি ছিল অপরিহার্য । এছাড়া অবশ্যই থাকতো পছন্দনীয় কাবাব ও মৌসুমের বিভিন্ন ফল । সে আমলে মাহে রমজান যে মাস বা মৌসুমে হোকনা না কেন প্রত্যেক রমজানে আখ পাওয়া যেত । এই আখ টুকরো টুকরো করে কেওড়া ও গোলাপ জল দ্বারা সুবাসিত করে খাওয়া হতো । এ মাসে হুক্কার বিশেষ বন্দোবস্ত করা হতো । ধনী লোকেরা এ সময়ের জন্য মাটির হুক্কা ব্যবহার করতেন । তারা ইফতারের শেষে মিঠাকড়া এবং সেহেরীর পর কড়া তামাক পান করতেন ।

চকবাজারে ইফতারীর জমজমাট দোকান বসতো । মনে হতো যেন ভাল একটা মেলা বসেছে । প্রতিদিন সেখানে প্রচুর লোকের সমাগম হতো । বিভিন্ন মহল্লার মসজিদে ধনীদের গৃহ হতে ইফতারী পাঠানো হতো । যারা ইফতারী প্রতিদিন মসজিদে পাঠাতে পারতেন না তারা সপ্তাহে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার মসজিদে ইফতারী পাঠিয়ে রোজাদারদের ইফতার করাতেন ।


সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০০৯ বিকাল ৩:৩২
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×