somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলার ইতিহাসে সাম্প্রদায়িকতার অবস্থান - ৩ (কলোনিয়াল যুগ)

০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১০:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হাজার বছর ধরে চলে আসা বাঙ্গালী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্বভাবতই বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। কখন-ও বা কিছুটা ধর্মীয় উত্তেজনা লক্ষ্য করা গেলেও সেটা ছিল অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। ব্রাক্ষ্মাণ্য ধর্মের অনুসারী গুপ্ত রাজ্যে নব বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার, বৌদ্ধ পাল রাজ্যে বিপুল পরিমান ব্রাক্ষ্মণ মন্ত্রী, বেশিরভাগ সেন রাজাগণ-ও একই পথ অনুসরণ করেন। সুদীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন রাজার শাসনামলে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু প্রাকৃত, ব্রাক্ষ্মাণ্য, বৌদ্ধ, জৈন, ইসলাম একই সংস্কৃতির মিথস্কৃয়ায় এক মহান অন্তঃশক্তি এনে দিয়েছিল যার কারনে বাঙ্গালী তাদের জাতিগত বন্ধন সুদৃঢ় রাখে আর তা ছিল ধর্মীয় সহনশীলতা বা টলারেন্স। মূলত বাঙ্গালী জাতির মূলে রয়েছে রিলিজিয়াস টলারেন্স বিষয়টি। এজন্য দেখা যায়, ইউরোপ যখন অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল (মধ্যযুগীয় স্পেন ব্যতিত), তখন বাংলা ছিল বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী রাজ্য। একারনেই প্রাচীন যুগে মহামতি আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে মধ্যযুগে তিব্বতী, আফগান, তুর্কিদের ও প্রাক রেঁনেসার যুগে ইউরোপিয়দের নজর ছিল এইদিকে। মধ্যযুগে যখন মৌলবাদী ধর্মান্ধ সম্প্রদায় ক্রুসেড নামক রক্তের হোলিখেলায় মেতে উঠেছিল তখন বাংলায় তুর্কি-আফগানদের প্রবেশ ধর্মযোদ্ধা হিসেবে নয় বরঞ্চ তারা শাসক হিসেবে দেশ জয় করতে এসেছিল। পূর্বতন রাজাদের মতন মুসলমান শাসকরাও যথেষ্ট উদার ছিল, তা আগের ব্লগেই বিস্তারিত উল্লেখ আছে।

উপমহাদেশে খৃষ্ট ধর্মের প্রবক্তা ব্রিটিশ, এ ধরনের ভূল ধারনা আমাদের অনেকেরই আছে। প্রকৃতপক্ষে সম্রাট আকবর কর্তৃক হুগলীতে পার্তুগিজদের বসতি স্থাপনের অনুমতি পেলে রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায় জেসুইটস ও অগাস্টিনিয়ানদের দ্বারা এদেশে খৃষ্ট ধর্ম প্রচার কার্য শুরু হয়। পার্তুগিজ ছাড়াও এদেশে ওলন্দাজ,দিনেমার,ব্রিটিশ,ফরাসী,আর্মেনীয় এমনকি আমেরিকানরা পর্যন্ত বানিজ্য ও ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্য এদেশে আসত। পরবর্তিতে হামার্দ জলদস্যুগণ চট্রগ্রামে আস্তানা গাড়ে আর দস্যুতাকালে অপহৃতদের খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করা হয়। কিন্তু তাই বলে এদেশর খৃষ্ট ধর্মের বিকাশ দস্যুদলের মাধ্যমে এসেছে এটা মনে করার কোন কারন নেই। যশোরের রাজপুত্র নিজেই খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে এন্টনিও-ডি-রোজারিও নাম ধারন করেন ও বাংলায় খৃষ্ট ধর্ম বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই এটা বলা যায় বাকি সব ধর্মের মত খৃষ্ট ধর্মও এদেশীয় পরিমন্ডলে উদ্ভাসিত।

কিন্তু এই ধর্মীয় সম্প্রীতির ওপর সর্বপ্রথম বড় আঘাত আসে ব্রিটিশ শাসনামলে। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলমানেরা বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে মিশে গিয়েছিল, কিন্তু ইউরোপিয়দের ধ্যান-ধারনা ছিল শাসন ও শোষণ। এজন্য তারা এক ঘৃণ্য পথ বেছে নেয়, আর তা হল ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি। ব্রিটিশরা নিজেদের নব্য আর্য হিসেবে বিবেচনা করত, আর তাদের সাম্প্রদয়িক ঔদ্ধত্য এতখানি বৃদ্ধি পায় যে তারা ভাবতে শুরু করে ভারতীয়দের সভ্য করা তাদের এক মহান গুরু দয়িত্ব। কিন্তু ভারতবাসী বিদ্রোহ ঘোষনা করলে তারা তাদের ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি বাস্তবায়নের জন্য এদেশীয় কিছু দালাল তৈরি করে যাদের প্ররচোনায় এদেশে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এরফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা হিন্দু-মুসলমানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের এক তিক্ত ও হৃদয়বিদারক অবসান ঘটে এবং হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে গড়ে ওঠে পারস্পরিক অবিশ্বাস যা আজও বিরাজমান।

এতদিন সাম্প্রদায়িকতা ছিল ধর্মের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু পাকিস্থান সৃষ্টির পর বাঙ্গালী ও অবাঙ্গালীদের মধ্যে শুরু হয় তিক্ততা। মূলত এসময় বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। আবার হিন্দু-মুসলমান সবাই মিলে ইসলামের কপট ধ্বজ্জ্বাধারী পাকিস্তানীদের বিতারিত করে স্বাধীন হল বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলার সংবিধানে সকল জাতি-ধর্মগোষ্ঠীর লোকজনকে বাঙ্গালী বলে পরিচয় দেয়াকে পার্বত্য চট্রগ্রামের উপজাতীরা চ্যালেঞ্জ করে এবং তারা নিজেদের বাংলাদেশী, কিন্তু জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচয়ের দাবী জানায়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সাম্প্রদায়িক বিবাদে উভয় পক্ষের বহু ক্ষয়ক্ষতি হয়। বর্তমানে তাদের দাবী মেনে নিয়ে এক শান্তিচুক্তি এই বিবাদ মিমাংসা করতে সাহায্য করে। (চলবে...)
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হিন্দু খতরে মেঁ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


শুধুমাত্র মুসলিম বিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে শুভেন্দু। তার বক্তব্যের মূলপ্রতিপাদ্য হলো হিন্দু খতরে মেঁ! আশ্চর্যের বিষয় হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা নাকি মুসলিমদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে, কিছুদিন পরেই নাকি পশ্চিমবঙ্গ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সময় খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে।

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ১৩ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩০

দিনগুলো কেমন যেন দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে!
দেখতে দেখতে মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে,
এইতো সেদিন থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন করলাম,
আর এদিকে দেখি চার মাস শেষ হয়ে পাঁচ মাস চলছে। অথচ আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরাও পারবো.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৩ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:১৩

আমরাও পারবো.....

ইদানিং সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন এক জোশ উঠেছে-
“বাংলাদেশকেও ইরান, পাকিস্তান বা উত্তর কোরিয়ার মতো সামরিক শক্তিধর হতে হবে- তাহলে আমাদের দিকে কেউ চোখ রাংগাতে পারবে না!”
শুনতে দারুণ লাগে। বুকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সূর্য পশ্চিম দিকে উঠে:)

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৩ ই মে, ২০২৬ রাত ১১:২০


আমাদের দেশে রাজনীতিতে নেতা যাই বলে তার কর্মীরা সেটাকে সঠিক মনে করে। সেটা নিয়ে দ্বিমত করে না। এখন ধরুন নেতা মুখ ফসকে বলে ফেলেছে “সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠে।” তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডেঙ্গু আবার ধেয়ে আসছে তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি সমন্বিত কার্যক্রম রূপকল্প

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই মে, ২০২৬ সকাল ১০:৪১


লেখাটির উপক্রমনিকা
মাস কয়েক আগে সামুর পাতায় ব্লগার কলা বাগান ১ এর একটি গুরুত্বপুর্ণ লেখা প্রকাশিত হয়েছে । লেখাটিতে থাকা মুল কথাগুলি ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×