somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার চলচ্চিত্র দর্শন - চোরাবালি

২৩ শে ডিসেম্বর, ২০১২ রাত ৮:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনলাইনে বেশকিছুদিন আগেই চোরাবালির একটি পোস্টার সকলের নজর কাড়ে,আমি সকলের বাইরে নই। সুতরাং শার্ট খোলা সুঠাম দেহের নায়কের একহাতে পিস্তল আর অন্যহাতে ধরে নায়িকাকে টানাটানির কারনেই বা অন্য কোনো কারনে নায়িকার ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখের পোস্টার চোরাবালি সম্পর্কে আগ্রহই তৈরি করেছিলো । অন্যদিকে রেদোয়ান রনি'র প্রথম ছবি সত্ত্বেও যেভাবে 'একটি রেদোয়ান রনি ফিল্ম' বলে পরিচয় দেয়া হয়েছিলো,তাতে গোটাছয়েক অস্কারজয়ী বহুলপরিচিত কোনো পরিচালকের ছবি মিস করা ঠিক হবে না ভেবেও যাওয়া ! জোকিং এপার্ট , স্মার্টদর্শন নায়ক নায়িকার কাস্টিং,ছবিটি দেখার আগ্রহ তৈরীর জন্য যথেষ্ট,তা অনেকেই একমত হবেন ।



২০ তারিখে বিকেলেই বসুন্ধরার সিনেমাহলের টিকেটের লাইনে সম্ভবত আমিই ছিলাম প্রথম অথবা প্রথম দিকের দর্শক,যে কিনা আশেপাশের ''স্কাইফল'' দেখতে আসা উচ্ছসিত দর্শকদের সামনে কৌতুকের লোক,যে টিকেটবক্সে গিয়ে চাইলো, ''চোরাবালি,ফার্স্ট শো !'' । আমাকে অবাক করে দিয়েই টিকেটবক্সে বসে থাকা লোক আমাকে অন্য কোনো মন পরিবর্তন করা দর্শকের ফেরত দিয়ে যাওয়া ''চোরাবালি''র টিকেট ধরিয়ে দিলেন। হয়তো এত তাড়াতাড়ি টিকেট পাওয়ার খুশিতেই অথবা জেমসবন্ডের সকল উন্মুক্তবক্ষা কন্যাদের রেপ্লিকাদের সাহচর্য্য পাওয়ার খুশিতে চোখ চকচক করে উঠলো ! তখনও বুঝিনি , হলের অর্ধেক সীটই ফাঁকা থাকবে ,নইলে এত তাড়াহুড়ো করে আসতে হতো না।

ছবি শুরু হবে বর্তমান সময় থেকে । আস্তে আস্তে ফ্ল্যাশব্যাক , কখনো ৩ মাসের কখনো ২০ বছরের । সুমন (ইন্দ্রনীল) হলেন পোষা খুনী , তার গডফাদার আলি ওসমান ( শহীদুজ্জামান সেলিম) । সুমনের বয়স যখন ১২-১৩,তখন তার বাবা বেচে নেই,মা বেঁচে ছিলো । সুমনের মা স্থানীয় চেয়ারম্যানের বাসায় কাজ করতে গিয়ে চেয়ারম্যানের লালসার শিকার হতে গিয়ে বেঁচে যায় সুমনের কারনে । তাই সে সুমনের মা কে স্থানীয় মওলানাদের সাহায্যে দোররা মারায়,এতে সুমনের মা মারা যায় গর্ভবতী অবস্থায়ই । সুমন প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে সেই চেয়ারম্যানকে খুন করে । এরপর সে পালিয়ে আসে গ্রাম ছেড়ে ,কাজ শুরু করে চা ফেরি করা বালক হিসেবে । এই সময়েও তুচ্ছ ঘটনায় সুমনের মা-কে গালিগালাজ শুরু করায় উঠতি এক মাস্তানকে খুন করে সুমন । তারপর আশ্রয় নেয় শহীদুজ্জামান সেলিমের কাছে । তখন থেকেই সেলিমের হয়ে সে খাটে ।

অন্যদিকে নবনী আফরোজ (জয়া আহসান) দৈনিক সত্যপ্রকাশের রিপোর্টার ।তার বাবা মা থাকে আমেরিকায় , ঢাকায় উনি একাই থাকেন । ঢাবি তে সাংবাদিকতায় অনার্স এবং মাস্টার্স, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার । আলি ওসমানের চাদাঁবাজি নিয়ে সে রিপোর্ট করে , ফলে আলি ওসমানের চক্ষুশূল হয়ে ওঠে । আলি ওসমান সামনের ইলেকশনে নমিনেশন চায়,কিন্তু সৎ চরিত্রবান ব্লা ব্লা ব্লা রাজনীতিবিদ হায়দার খান ( সোহেল রানা) তার প্রতিবন্ধকতা । সোহেল রানা আর সেলিম-দুইজনেরই গডফাদার এটিএম সামসুজ্জামান । সামসুজ্জামানের গ্রীন সিগন্যাল পেয়ে সেলিম সুমনকে দিয়ে খুন করায় সোহেল রানাকে । কিছুদিন আগেই আলী ওসমানের নির্দেশে চাঁদা না পেয়ে সুমন খুন করে এক ব্যবসায়ীকে । এটা আলি ওসমানের মোবাইল নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আলি ওসমানের বান্ধবী কাম রক্ষিতা কাম মডেল কাম অভিনেত্রী সুজানা (পিয়া) জেনে ফেলে খুনের ঘটনা । এর কয়েকদিন পরেই সে গর্ভবতী হয় । আলি ওসমানকে সে বলে বিয়ে করতে । আলি ওসমান রাজি হয় না। সুজানা ক্ষুব্ধ হয়ে আলি ওসমানের সব অপকর্মের কথা বলে দেয় নবনীকে । একইসাথে আরেক ডাক্তারের প্রেমেও পড়ে সুজানা ! আলি ওসমানের নির্দেশে সুজানাকে খুন করে সুমন । খুন করেই সে বুঝতে পারে সুজানা গর্ভবতী ছিলো ।মায়ের কথা মনে পড়ে অনুশোচনায় দগ্ধ হয় সুমন । সুজানার খুনের পরপরই নবনী পত্রিকায় সুজানার খুনের পেছনে আলি ওসমানের হাত আছে জানিয়ে রিপোর্টিং শুরু করে । এতে করে আলি ওসমান রুষ্ট হয় । সুমনকে বলে নবনীকেও খুন করতে । অনুশোচনায় দগ্ধ সুমন নবনীকে খুন করতে গিয়েও করেনা । তাকে অপহরন করে নিয়ে লুকিয়ে রাখে জঙ্গলে,আর খুন করেছে বাসায় চলে এসেছে বলে মিথ্যা জানায় আলি ওসমানকে । লুকিয়ে থাকা অবস্থাতেই জয়া আর সুমনের মাঝে মন আদানপ্রদান,প্রেম ভালোবাসা । জয়া সুমনকে রাজসাক্ষী হবার আহবান জানায়,ভালো হবার কথা বলে। সুমন রাজি হয় । অন্যদিকে আলী ওসমানের সন্দেহ হয় । সে মোবাইলে ট্র‌্যাক করে দেখে সুমনের লোকেশন । সেখানে লোক পাঠিয়ে দেখে নবনী বেঁচে আছে । ধুন্ধমার মারপিট শুরু,নবনীকে তুলে আনা হলো । মারামারি করতে করতে নায়ক নায়িকা পালায় । নবনীকে নিরাপদ স্থানে রেখে সেলিমকে মারতে যায় সুমন । চোরাবালিতে আটকে থাকা সুমন কি হত্যা করতে পারবে সেলিম কে ? রাজস্বাক্ষী হলেও কি চোরাবালি থেকে মুক্ত হতে পারবে ?

সো , দিজ ইস দ্যা স্টোরিলাইন ফেলাস !

আমি কিডন্যাপারের সাথে প্রেম হয়ে যাওয়া ২০টি ছবির নাম দেখাতে পারি,তবে এই স্টোরী বাংলাদেশের জন্য ভিন্নই বটে ! নবনীকে অপহরণ করতে যাওয়ার আগের আ্ইয়ুব বাচ্চুর 'কেয়ারফুলি কেয়ারলেস' গানটি দর্শককে রক মিউজিকের সাথে উন্মাতাল করবে । এটা দারুন একটি রক গান -এইক্ষেত্রে পরিচালকের রুচির প্রশংসা করতে হবে। আইটেম গান ''দে ভিজিয়ে '' কিছুটা অশ্লীল ইঙ্গিত ধারন করলেও মোটের উপর মোটামুটি চলেছে । আইটেম গার্ল শারীরিক দিক দিয়ে আবেদনময়ী,তবে তার ডান্স মুভগুলো খুবই রিপিটেড । কিছুক্ষন চেষ্টা করলেই আমিও হয়তো নেচে দেখাতে পারবো । শিলা কি জাওয়ানী'র ডান্স মুভ আর চিকনী চামেলির কস্টিউম নকল স্পষ্টতই চোখে ধরা পড়বে। অন্য গানগুলো ততটা ভালো হয় নি।ভুল বলছি,একেবারেই ভালো হয় নি । কারন আজকাল বাংলা ছবিতে এর চেয়ে ভালো গান থাকে । কেউ যদি হৃদয় খানকে তার চিরস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য-যুক্ত ভয়েস থেকে মুক্তি দেন,কথা দিচ্ছি-সারা জীবন দোয়া করবো । ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর প্রশংসা করার মত । মুগ্ধই করেছে বলতেই হবে ।

চিত্রধারন পুরোটাই প্রফেশনাল,কোনো অ্যামেচারের ছাপ মনে হয় নি । সিনেমাটিক প্রায় সব ধরনের এঙ্গেলই দেখলাম । ফ্ল্যাশব্যাকে গিয়ে ছোট্ট সুমনের দৃঢ় প্রত্যয়ে আগুনের মাঝে আঙ্গুল চালনা,কঠিন মুখ,দোররা খেতে থাকা মায়ের জন্য আর্তনাদ আর শুন্যে পা ছুড়তে থাকা সুমনের মুক্ত হতে চাওয়ার আকুতি - ভালো সব সিকোয়েন্স । তবে কয়েকবার ব্যস্ত ঢাকা শহর দেখাতে গিয়ে কাওরানবাজারের মোড় মনে হলো রিপিটেশান। প্রথম থেকেই যা আপনাকে ছবিতে টেনে রাখবে,তা হলো শহীদুজ্জামান সেলিম । এই চরিত্রের জন্য নেয়া হয়েছিলো প্রয়াত হুমায়ুন ফরীদিকে ,আমি হুমায়ুন ফরীদি সাহেবকে মিস করিনি ,শহীদুজ্জামান সেলিমের দুর্ধর্ষ অভিনয়ের জন্য ! তবে আমার বিশ্বাস,সেলিমকে ছোট করছিনা ...এই চরিত্রে অভিনয় করলে ফরিদীর ঝুলিতে জাতীয় পুরষ্কার যাওয়া ন্যায্য হতো ! মাতিয়ে রেখেছেন সেলিম পুরো ছবিতেই !

বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে হবে এই ছবির স্ক্রিপ্টরাইটারকে , যার অভাব আমরা সাম্প্রতিক বাংলা ছবিগুলোতে দেখেছি । নাহ , চোরাবালি স্ক্রিপ্টে বেশ ভালো । স্থুল নয় , অনেকক্ষেত্রেই সুক্ষ সব উইটের ব্যবহার দেখলাম এখানে । ধরুন , এটিএম সামসুজ্জামানে কাছে যখন বড়সড় কোলবালিশ ভর্তি টাকা দেয়,তখন সামসুজ্জামন বলে ওঠেন, '' চিকন কোলবালিশে আমার চলেনা '' ! অথবা কত টাকা ঘুষ দিতে হবে,তা মনে করিয়ে দিয়ে সেলিম বলে , ''সাইজ থ্রি এক্স,নোটের সাইজ ডাবল এক্সএল''। পোস্টে বোঝানো যাবেনা ,তবে পুরো ছবিতেই আমাকে মুগ্ধ করেছেন সেলিম । আজব লাগে ,৯০ এর দশকের টিভি অভিনেতা অভিনেত্রীরা কি রকম শক্তিশালী ছিলেন,আর আজকালকাল ছাপোষা ইমন-নীরব-হাফটাকলু সজল....এরাও অভিনেতা !


নায়ক ইন্দ্রনীল নায়কোচিত শরীর নিয়ে হাজির হয়েছেন পর্দায়,তবে ভয়েসটা ছিলো শতাব্দীর । সেকন্ড হাফ ছাড়া তার মুখে তেমন কোনো ডায়লগ পেলাম না । পোষা খুনীর মতন খুন করে গিয়েছেন একটার পর একটা । যেন রেস্টুরেন্টে গিয়ে অর্ডার দিলাম,''মাম্মা চা লাগাও,দুইটা পুরী,তিনটা ডিম '' ,ঠিক তেমনি খুনের অর্ডার আর খুন হয়ে যাচ্ছে ক্যারেক্টারগুলো । অদ্ভুত ! এই ক্ষেত্রে পরিচালক কিছুটা বাড়াবাড়ি করেছেন বলে মনে হয়। বাংলাদেশের অন্যান্য নায়কের তুলনায় তিনি দেখতে বেশ স্মার্ট এবং এটা পর্দার জন্য জরুরী ।এটা এখনও বাংলাদেশের নায়কদের ব্যর্থতা,তারা ঠিক নায়কোচিত চেহারা বা আকর্ষনীয় ফিগার তৈরী করতে পারেন নি । তিনিও অভিনয়ে সাবলীলই ছিলেন,অভিব্যক্তি ঠিক পোষা খুনির মত নির্দয় না দেখালেও কাঠিন্য তো ছিলোই । তিনি সত্যি বলতে,সেলিমের অভিনয়ে ঢাকা পড়ে গিয়েছিলেন । ব্যাড লাক ।

ছবিতে জয়ার উপস্থিতি ছিলো কিঞ্চিত বিরক্তিকর । তাকে দেখতে অনুসন্ধানী সাংবাদিক মনে হয়নি মোটেও,বরং বিনোদন পাতার মডেল হিসেবেই ভালো চালানো যেত । তার গেটাপ সাংবাদিকসুলভ ছিলো না , সর্বদাই তিনি ছিলেন নতুন ফ্যাশনের ধুতি পাজামায় আর আচকানে ঢাকা । উচ্চারনে ডিজুস চাবানো ভাব প্রবল,যা কানে বিরক্তিই ঢেলেছে । শুদ্ধ বাংলা উচ্চারন কি অতই কঠিন ? এখনো বাংলা উচ্চারন শেখার বয়স শেষ হয়নি । তাছাড়া এখানে স্ক্রিপ্টরাইটার ও পরিচালককে বলা দরকার , তিনটা লাইনের মাঝে দুইটা ইংরেজি শব্দ আমি স্মার্টই মনে করি ,তবে সমস্যা হচ্ছে ব্যাপারটা বাস্তবিক নয় । কারন জয়া যখন ধুপুরধুপুর ইংরেজিতে নায়কের সাথে ঝগড়া করছেন,তখন মাথায় রাখা উচিত ছিলো ছবিতে নায়ক ১২-১৩ বছরের পর লেখাপড়াই করে নি ! আসলে ছবিতে জয়াকে প্রায়ই মনে হয়নি সে সাহসী সাংবাদিকের রোল প্লে করছে ,দর্শককে মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেয়ার জন্যই সাংবাদিক বলা হয়েছে ,বোধ করি । তবে নায়িকা বলতে যা বোঝায়,তেমনি সুদর্শনা,ভালো ফিগার এবং (একইসাথে উচ্চারনের কিছু ত্রুটি বাদ দিলে) তিনি অভিনয়ে বরাবরের মতই সফল। নায়িকার বাইক চালানো অথবা শেষ দৃশ্যে মারামারিতে খানিকটা অংশগ্রহন- বাংলা সিনেমার জন্য অভিনবই ! গুড গোয়িং !

মডেলকন্যা সুজানা (পিয়া) অভিনয়ে ভালো ছিলেন । উচ্চারন নিয়ে বলতে পারি না, ছবি দেখার সময় বেশ কয়েকবার মনে হচ্ছিলো লিপ মিলছেনা।পরে জেনেছি,দীপা খন্দকার ডাব করে দিয়েছেন।

ইন্টারমিশনের আগ পর্যন্ত একটার পর একটা খুন দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম । বেশ কয়েকটা অদরকারী ক্যারেক্টারে ভর্তি , সম্ভবত রনির সাথে মিলেমিশে এরা একসাথে নাটকে কাজ করেন,তাই তাদের মুখটা ছবিতে দেখিয়ে দেয়া । তা যে কোনোভাবেই হোক ! যেভাবেই হোক, বাজেট ছেঁটে ফেলার প্রচেষ্টা কিনা বলতে পারি না , তবে সোহেল রানা বর্তমান যুগের ''আনোয়ার হোসেন'' হোসেবে আবির্ভুত হতে যাচ্ছেন । ছবির শুরুর দিকেই তিনি পার্কে গিয়ে শহীদ হলেন । তার আগে শহীদানের টিকেট কাটলেন এক ব্যবসায়ী । তার পরই ইরেশ যাকের গ্রিল খেতে গিয়ে গ্রিলড হলেন । তারপর এক ডাক্তার । মাঝখানে বেইলি রোডের চ্যাংড়া ছেলেপুলের মতন র‌্যাগড স্যান্ডওয়াশড জিন্স পড়ে হাজির হলেন হিল্লোল । পুলিশের ভুমিকায় উনার এন্ট্রি ভালোই লেগেছে ,তবে বড্ড বুড়িয়ে গেছেন । এই চরিত্রও ''একটার সাথে একটা ফ্রী'' টাইপ । কোথা থেকে এলেন আর কোথায়ই বা গেলেন ! তারপর এক ডাক্তার নামের উদ্ভট লোক কোথা থেকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে বলতে পারি না । এই লোকটা সারাক্ষনই মাতালের মতন অভিনয় করছিলেন । আমার বাসার দেড় বছরের ভাগ্নিও এর চেয়ে ভালো অভিনয় করতে পারে । জড়ানো গলা,আবেগহীন রোবোটের মতন একঘেয়ে ডায়লগ যেন নামতা পড়ছেন অথবা বাজারের ফর্দ আওড়াচ্ছেন । এও টেঁসে গেলো ছবির শেষের দিকে ।

এবার কাহিনী সংক্রান্ত কিছু বিষয় না বললেই নয় ।
শুরুতেই দেখা গেলো , ইন্দ্রনীল জয়াকে কিডন্যাপ বা মারার জন্য রিভলবার হাতে নিয়ে বুলেট চেক করছেন । কিন্তু মাথায় ধরলেন পিস্তল ! (ফেসবুক লিংক,১৪ এবং ৩২ তম সেকেন্ড দেখুন। ) আবার জয়াকে এমনভাবে পাঁজাকোলা করে কিডন্যাপ করে হাটা ধরলেন ফ্ল্যাটবাড়ির ভেতরেই,যেন মাত্রই ডিএইচএলের প্যাকেজ সাপ্লাই দিতে এসেছে কোনো বিক্রেতা । অপহরণ করে গাড়িতে করে তিনি নিয়ে যাচ্ছিলেন,কিন্তু কার ভরসায় তিনি জয়ার মুখ না বেঁধেই গাড়িতে তুললেন,আবার কারই ভরসায় তিনি জয়ার মুখ না বেঁধে প্রাসাদোপম বাড়িতে লুকিয়ে রাখলেন- যেই বাড়ির দেয়ালে হাজারো ফুটো ! ইচ্ছে করলেই বাইরে থেকে মানুষ দেখতে পাবে ভেতরে কাকে বেঁধে রাখা হয়েছে । নায়িকাও কোনো চিৎকার না করে বাধ্য বালিকার মতন গাড়িতে শুয়ে রইলেন,আবার নায়ককে আহলাদের সাথে জিজ্ঞেস করলেন তাকে কি কোনো অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কিনা (লুলদের জন্য চোখ টিপি ) । বলিহারি মা , শিখলাম,মুখ না বাধঁলেও অপহরণ সম্ভব,যদি নায়িকা একটু সহযোগিতা করেন (আবারো চোখ টিপি) । আরো শিখলাম, প্রেম হবার জন্য কিডন্যাপ করুন,আর বলুন আপনি ভালো হতে চান । আমার বিশ্বাস , প্রেমটা আপনার হয়েই যাবে । অবশ্য নায়িকার মত প্রেমে পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকতেও হবে,নইলে চপ্পলের বাড়ি গালটা ছাড়া অন্য কোথাও নয় ।

সুমনের মা যাকে সাজানো হয়েছিলো,তাকেই গর্ভবতী হবার অপবাদ দেয়া দেখে আমারই হাসি চলে এসেছিলো । সুমনের মা সাজানো মহিলাটির বয়স প্রায় পয়তাল্লিশের আশেপাশেই ছিলো,যা মেকাপেও ঢাকা পড়ে নি । এই মহিলাকে গর্ভবতী হবার অপবাদে দোররা মারা দেখে আমার মনে হয়েছিল স্ক্রিনে চলে যাই , গিয়ে হাসতে হাসতে মওলানা সাহেব কে বলি ,'' মওলানা সাহেব,জীবনেও শুনছেন নানীর সমান বয়সী প্রেগন্যান্ট ?? '' ! রনি , কাস্টিং একটু দেখে নেয়া উচিত ছিলো না ? নানীর সমান বয়সী মহিলাকে গর্ভবতী সাজিয়ে দিলেই মানাবে ? এখানেই শেষ নয় , সুমনের মা কিভাবে গর্ভবতী হলো,তারও কোনো স্পষ্ট বক্তব্য ছিলোনা না। চেয়ারম্যান তো আর রেপ করতে পারেনি,সুমনের বাবাও অনেক আগে মারা গিয়েছে , তবে ? হুম... কাহিনীকার রেইপ করে দিয়েছেন ।

রক্ষিতা সুজানা নিজেও জানেন উনি রক্ষিতা,উনি আবার স্ত্রীও হতে চান । সোনার পাথরবাটি নয় , ব্যাপারটা টেরা প্যাট্রিকের ফিল্মে নামার পর ভার্জিন থাকার সাথেই মেলে । উনি জানেন আলি ওসমান আইটেম গানের মেয়ের সাথে রগড় করেন,মানুষ খুন করেন-উনিই আবার আলি ওসমানের সন্তানের মা হতে চান ! তার সন্তান জন্ম দেয়ার ইচ্ছে এতই প্রবল করলেন পরিচালক, যে আলি ওসমানের কাছে লাথি খাওয়ার পরই তিনি পরেরদিনই এক ডাক্তারের প্রেমে পরলেন এবং ঘোষনা দিলেন উনি এখন ''পূর্ন'' ! মাইরি ! রিজেক্ট হবার পরেরদিনই প্রেম পাওয়ার এবং সন্তানের পিতা হবার চিন্তা রেডিমেড গার্মেন্টসের মালিকেরা ভেবে দেখতে পারেন । এক্সপোর্টেবল আইটেম । এখানে কাহিনির কন্টিউনিটি ব্রিচ লক্ষনীয় , অন্তত ডাক্তার যে আগে থেকেই সুজানার পেছনে ঘুরতেন এবং তিনি হুট করেই হাজির হননি ,তা দেখানো গেলে গাঁথুনি পাকাপোক্ত হতো । ডাক্তার সাহেব তার একদিনের প্রেমিকার জন্য উপহার পাঠালেন একবাক্স ভর্তি ৪-৫ বছরের বাচ্চার পোষাক । ভুল হলো , জুতা । পুরো বাক্স ভর্তি জুতো আর জুতো । ডাক্তারের জুতোর সাইড বিজনেস ছিলো সম্ভবত । অথবা ভুল চিকিৎসায় কাউকে মেরে উপহার পেয়েছিলেন, সুভ্যেনির দান করে দিলেন । অন্যদিকে এই গর্ভবতী সুজানাকে মেরে সুমন ইন্দ্রনীল অনুশোচনায় পড়লেন,তার মায়ের কথা মনে পড়লো । ২০ বছরের খুনী জীবনে তার অনেককেই খুন করতে হয়েছে, কিন্তু এক সুজানাকে মেরেই তার অনুশোচনা দেখানো আবেগের সুনামিই ।যাকগে, নট এ বিগ ডিল।

ছবিতে এক বাটকু মতন লোকের দেখা পাবেন,যার কাজ হাতানো । মানে তার কোলে থাকবে একটি খরগোশ,সে পুরো ছবিতেই খরগোশটি হাতিয়ে গেছে । হলের ভেতরেই তার নাম হয়ে গিয়েছিলো ''হাতাও'' ! হাতাও-বাবা বিশাল একটা টুইস্ট দিলেন ছবির শেষ অংশে ,বাংলা ছবির জন্য বেশ ভালো ধাক্কা বলতে হবে। টুইস্ট মুগ্ধ করেছে,টুইস্টের জাস্টিফিকেশন তেমনটা মুগ্ধ করে নি । নট ভেরি ইমপ্রেসড....বাট ইমপ্রেসড তো বটেই।

প্রথম অংশে কাহিনী বেশ শ্লথ ছিলো,পরিচালক প্রতিটি ক্যারেক্টারের ডিটেইল ধরে এগিয়েছেন ,সময় বেশ ক্ষয় করেছেন । হলিউডি টানটান উত্তেজনা না থাকলেও কোলকাতার মেইনস্ট্রীম ন্যাকাবাবু ফিল্মের চেয়ে অনেক বেশিই উপভোগ্য ।

বাংলাছবি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ এগিয়ে যাচ্ছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে । কোনো ছবি গানের জন্য,কোনো ছবি লোকেশনের জন্য ।আমরা অনেকেই হাহুতাশ করেছি অভিনয় দেখে,কখনো অপটু দৃশ্যায়ন দেখে,কখনো হাস্যকর উদ্ভট কাহিনী দেখে । আজকাল ভালো লোকেশনের শ্যুট করা বাংলা ছবির জন্য সাধারন ঘটনা, কিন্তু চোরাবালি দামী কোনো লোকেশন ব্যবহার না করেই নির্মান দক্ষতায় তার কোনো অভাব টের পেতে দেয় নি। কাহিনী , কাস্টিং,অভিনয় এবং প্রফেশনাল মেকিং-প্রায় সবদিকেই তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো করেই চোরাবালি একটি কমপ্লিট সিনেমা । যতটুকু ত্রুটির কথা বললাম,তা খুব বড় কিছু নয় বলা যেতে পারে । মোদ্দা কথা - সিনেমা নামের আড়ালে লম্বা নাটক নয়,রনি আসলেই একটা সিনেমা বানিয়েছেন । আগ্রহভরে আমি অপেক্ষায় ছিলাম ছবিটির,অনেকটাই মিটেছে । সত্যি বলতে কিক অফ দেখার পর আমি রেদোয়ান রনির নির্মান নিয়ে শংকিত হয়ে পড়েছিলাম , বাট ইটজ সামথিং ইউ মাস্ট সী ! বেশ কয়েকবার হলের দর্শককে সিনেমার মাঝে কয়েকটা সীনেই তন্ময় হয়ে যেতে দেখেছি,তখন পিনড্রপ সাইলেন্স ! না দেখলে ঠিক বুঝবেন না।

সামারি ?

চোরাবালি, ইট'জ অ্যা গুড মুভি ... বাট ফার বেটার দ্যান দ্যা ক্যালকেশিয়ান শিট । চোরাবালি কোনো ভালো সিনেমা নির্মানের 'প্রয়াস' নয় , চোরাবালি দেখার মতন 'সিনেমা' । নাক সিঁটকানোর অবস্থা থেকে উত্তরনের বানিজ্যিক সিনেমা ।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ডিসেম্বর, ২০১২ রাত ৮:৫৮
২৪০টি মন্তব্য ২২৭টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সুপ্রিয় কবি নীলপরির "মহিয়সী" কবিতার অনুভবে

লিখেছেন ভ্রমরের ডানা, ১৯ শে অক্টোবর, ২০১৭ রাত ১০:৪৭




ভ্রমরের ডানা

আর তাকেও বলা যায় নক্ষত্র বলাকা পাখা~
হিম হিম বাতাস যার ভালবাসা মধু মাখা..
যে ছুঁয়ে গেছে রহস্যাবৃত উষ্ণসাগর ঘেঁষে
মিহিদানা মিহি প্রেম বালুকা বেলার দেশে...
উত্তর থেকে দক্ষিণ বলয় কোলে..
প্রকাণ্ড সুনামি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একরাত থাকা যাক সুইডেনের আরলান্ডা বিমানবন্দরে, হোটেল যখন বিশালাকার বোয়িং ৭৪৭-২০০ জাম্বো জেট

লিখেছেন মাহবুবুল আজাদ, ১৯ শে অক্টোবর, ২০১৭ রাত ১১:২৬




সুইডেনের আরলান্ডা বিমানবন্দর, অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা হতে পারে যে কারো জন্য। এখানে একরাত কাটাতে পারেন ইচ্ছে করলে বিশালাকার বোয়িং ৭৪৭-২০০ বিমানের মধ্যে, আকাশে উড়তে হবেনা্‌ মাটিতেই থাকবে। এটা বিমানবন্দরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অস্তিত্ব

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ১৯ শে অক্টোবর, ২০১৭ রাত ১১:৩৯

সন্ধ্যার বেশ কিছু সময় পরের কথা, সারা দিনের খাটাখাটনির পরে বাসে করে বাসায় ফিরছি। সকাল ৭ টায় বের হয়ে বাসায় ফিরছি প্রায় রাত ১০ টার কিছু পরে।

মাঝখানে তিনবার হালকা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি ক্ষুদ্র সাফল্যঃ

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২০ শে অক্টোবর, ২০১৭ সকাল ৮:১৪

আমাদের মধ্যে হয়তো এমন অনেকেই আছেন, যারা মাঝে মধ্যে একটু আধটু কিংবা নিয়মিতভাবেই ইংরেজীতেও লেখালেখি করে থাকেন। ইংরেজীতে মাঝে মধ্যে দু’চারটে কবিতাও লিখেছেন, স্রেফ মনের ইচ্ছের কারণেই, এমনও হয়তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রকৃতার্থ...

লিখেছেন কথাকথিকেথিকথন, ২০ শে অক্টোবর, ২০১৭ বিকাল ৪:৩৭


আমি কী হারিয়ে যাচ্ছি ? দিনের পর দিন বাড়ছে দেহ ভস্মের ঘ্রাণ। বৃষ্টির জলে আঁকাবাঁকা পথে ভেসে যায় সদ্য ঝরে পড়া ফুল। আমি তার পথ ধরে মিশে যাই জলস্রোতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×