আরো অনেকের মতো প্রথমে আমিও পড়িনি নিউজটা। আসলে পড়তে পারিনি। দেশের পত্রিকা, ব্লগের শিরোনাম এখন রাজনৈতিক হানাহানি। তাছাড়া এই ক্যাচালগুলোর মাঝে পড়ে সময় যে পত্রিকা + ব্লগ পড়ার জন্য বরাদ্দ সময়টুকু যে কীভাবে পার হয়ে যায় তা বোঝা কষ্টকর।
এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর অনুরোধে প্রায় সপ্তাহখানেক আগের লেখাটা খুঁজে বের করে পড়তে বাধ্য হলাম। পড়া শেষ করে একই সাথে বিস্ময় আর বেদনা বোধ করলাম।
পরিচয় একটাই - "বাংলাদেশি"। এই বাংলাদেশিরাই বিদেশের মাটিতে সাফল্যের দ্যুতি ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আবার তারাই নিজের দেশে নিজের ভাইকে ধারলো অস্ত্রের আঘাতে রাঙিয়ে দিচ্ছেন!
আর এইসব বিষয় নিয়েই প্রায় সারাদিন লড়ছি আমরা ব্লগাররা।
'ব্লগার' - যাদের কিনা ইন্টারনেটের মতো অত্যাধুনিক একটি প্রযুক্তির সংস্পর্শে থাকার সুযোগ রয়েছে। আমরা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার না করে করছি নষ্ট রাজনীতির গুনগান!!
এবার পড়ুন কিছু আশাজাগানিয়া গল্প। নিজের প্রচন্ড ভালো লাগা থেকেই ব্লগারদের সাথে লেখাটা শেয়ার করতে বাধ্য হলাম। [সূত্র: ছুটির দিনে, প্রথম আলো ১ মে ২০১০]
░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░
চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে ক্যানবেরার পার্লামেন্ট হাউসে। নৈশভোজের ঠিক আগমুহূর্ত। গোটা অস্ট্রেলিয়ার সামনের সারির সব শিক্ষক ও গবেষক সেদিন হাজির পার্লামেন্ট ভবনে। আছেন শিক্ষাক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য বিশেষ সম্মাননা পাওয়া ২৪ জন শিক্ষকও। উত্তেজনাটা মোটামুটি তাঁদের ঘিরেই। তাঁদের যেকোনো একজনই পাবেন এবারের প্রাইম মিনিস্টার অ্যাওয়ার্ড। পুরস্কারের অর্থমূল্য ৫০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার। অর্থের অঙ্কের চেয়েও বড় কথা, গোটা অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষক মহল জানে, এটাই তাদের দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার।
পাঁচ সদস্যের বিচারক পরিষদের ব্যাপক যাচাই-বাছাইয়ের পর নির্ধারিত হয় বিজয়ীর নাম। এমনতর পুরস্কার ঘোষণার আগে উত্তেজনা থাকবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। সম্মাননা পাওয়া ২৪ শিক্ষকের মধ্যে আছেন বাংলাদেশের সৈয়দ মাহফুজুল আজিজও। নাম ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে ঘটে গেল ছোট্ট একটা নাটক।
প্রতিবছর প্রধানমন্ত্রী নিজের হাতে পুরস্কার তুলে দেন, এটাই নিয়ম। জানানো হলো, বিশেষ কারণে অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড। সে জন্য দুঃখ প্রকাশ করে একটি বাণীও পাঠিয়েছেন তিনি। কেভিনের বাণী পড়ে শোনানো হলো। তারপর নীরবতা। নিচুস্বরে আলাপ করছিলেন কেউ কেউ। খানিক পর সে শব্দও স্তিমিত হয়ে এল। ঘোষণা হলো বহুল প্রতীক্ষিত সেই সম্মাননা বিজয়ীর নাম—ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ার সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ "মাহফুজুল আজিজ"।
‘মনে মনে যে একটু আশা হচ্ছিল না তা নয়। কিন্তু আশপাশে এত সব দিকপাল মানুষজন, তাই ভেতরে ভেতরে আবার সংকোচিতও ছিলাম একটু। প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড সেদিন বিশেষ কারণে আসতে পারেননি। তাঁর পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন সিনেটর মার্ক আরবিব।’—মাহফুজ আজিজ বলছিলেন মাস ছয়েক আগের সেদিনকার কথা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষক এবার দেশে ফিরেছিলেন তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক একটি সম্মেলনে যোগ দিতে। জানালেন, যত ব্যস্ততাই থাকুক, দেশের এ ধরনের কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সুযোগ সহজে ছাড়তে রাজি নন তিনি।
এত সব প্রথিতযশা শিক্ষকের মধ্যে মাহফুজ আজিজকে বেছে নেওয়ার কারণ কী? তার উত্তরও দিয়েছেন বিচারকেরা।
মাহফুজ আজিজ মূলত করেন ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট ডিজাইন ও কম্পিউটার হার্ডওয়্যার ডিজাইনের কাজ। কিন্তু পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার ওপরই জোর দেন বেশি। গুরুত্ব দেন ছাত্রদের স্বাধীন ভাবনাচিন্তা, নিজে মাথা ঘামিয়ে সমস্যার সমাধান, নতুন চিন্তা করার ক্ষমতা—এসব কিছুর ওপর। এই ঘরানার সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিরই কেতাবি নাম প্রজেক্ট-বেজ্ড লার্নিং। এই প্রজেক্ট-বেজ্ড লার্নিংই মূলত মুগ্ধ করেছিল বিচারকদের।
এই বিশেষ শিক্ষাপদ্ধতির মূল ব্যাপারটা আরেকটু খোলাসা হতে পারে মাহফুজ আজিজের কথায়—
‘আমি চাই ছাত্রদের একদম হাতে-কলমে ডিজাইন করার কাজটা শেখাতে। ছোট ছোট প্রকল্প থেকে ধীরে ধীরে তাদের বড় প্রকল্পে আগ্রহী করে তোলা হয়। ছাত্র অবস্থায়ই তারা পেশাদার লোকজনের মতো কাজ করতে শিখে যায়। ফলে কর্মজীবনে গিয়ে দ্রুত জায়গা করে নিতে তাদের কোনো সমস্যা হয় না।’

প্রবাসী কীর্তিমান এই মানুষটির বৃহত্ একটি অর্জনের কথা আমরা জেনেছি। তাঁর বেড়ে ওঠার কথা জানতে হলে আমাদের ক্যানবেরা থেকে ফিরতে হবে পুরান ঢাকার র্যাংকিন স্ট্রিটে। সময় ১৯৬১ সাল। এ বছরেই জন্ম মাহফুজ আজিজের। জানতে হবে সৈয়দ আবদুল আজিজের নাম। আদর্শ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ার প্রথম পাঠটা মাহফুজ আজিজ পেয়েছিলেন বাবা আবদুল আজিজের কাছ থেকেই। অসম্ভব বিদ্যানুরাগী মানুষ ছিলেন তিনি। বলাই বাহুল্য, অবদান কোনো অংশে কম নয় মা জোহরা খাতুনেরও। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও নটর ডেম কলেজের পাঠ চুকিয়ে আবদুল আজিজ ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮৯ সালে এল দেশের বাইরে যাওয়ার ডাক। মিলল কমনওয়েলথ বৃত্তি। ইংল্যান্ডের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেন পিএইচডি ডিগ্রি। তারপর দেশে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘদিন।
১৯৯৯ সালে তিনি পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ায় সরাসরি সিনিয়র প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এখন ইনফরমেশন টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড দি এনভায়রনমেন্ট বিভাগের একাডেমিক ডিরেক্টরের বিশাল দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। মা ও বাবা গত হয়েছেন বেশ অনেক দিন। সপরিবারে এখন তিনি বসবাস করছেন অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে তাঁর নিজের বাড়িতে। স্ত্রী তানজিমা রহমান। মেয়ে সাদিয়া মাহফুজ লেখাপড়া করেছে কম্পিউটারবিজ্ঞানে। ছেলে মারুফুল আজিজ পড়ে নবম শ্রেণীতে।
ঢাকার মোহাম্মদপুরে বোনের বাসায় এসে উঠেছিলেন তিনি। পরদিনই আবার রওনা হবেন অস্ট্রেলিয়ার পথে। আলাপ শেষে বেরিয়ে আসব। তিনি এগিয়ে দিতে এলেন লিফট পর্যন্ত। লিফটের দোরগোড়ায় পা রেখে মনে পড়ল আসল প্রশ্নটাই তো করা হয়নি। পেছনে ফিরে জানতে চাই, ভালো শিক্ষক হওয়ার মূলমন্ত্রটা আসলে কী? জবাবটা যেন তাঁর তৈরিই ছিল, ‘একজন শিক্ষক মানে আসলে আজীবনের ছাত্র। ভালো শিক্ষক হতে চাইলে আগে আজীবন ছাত্র হওয়া চাই।’
░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░░
খুব অবাক লাগে যখন দেখি এধরনের খবর দেশের সংবাদপত্রগুলোতে স্থান পায়নি, শীর্ষ সংবাদ হওয়া তো দূরে থাক! হানাহানি, টেন্ডারবাজি, খুন, দূর্ণীতি, তোষামোদি, মিথ্যাচারি আমাদের দেশের পত্রিকারগুলোর জন্য যোগ্য শিরোনাম।
একটি দেশের উন্নতি কি আসলেই এত সহজ!
ড: মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তো বলেই গেছেন: যে দেশে জ্ঞানের সমাদর নেই সেদেশে জ্ঞানী জন্মাতে পারে না!!
এদেশে যাদের সমাদর করা হয় তারা তো চক্রবৃদ্ধিহারে বংশবৃদ্ধি করে দেশের পাল উল্টোদিকে উড়িয়ে চলেছেন। আর আমরাও ভেসে চলেছি সেই পালে হাওয়া দিয়ে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

