somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আবু বকরঃ প্রতিদিনের অব্যক্ততায় শোকের বিবর্তন

০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১২ রাত ১২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :





শোকের আয়ু কতদিন? কতদিন মগ্ন থাকা যায় শোকের আচ্ছন্নতায়? বাস্তবতা বলে বেশীদিন শোকে মূহ্যমান না থাকাই ভালো। এই কথাটা বাংলা সিনেমার সহশিল্পীদের কাছ থেকে পাওয়া সান্ত্বনার মতো শোনায়। ‘যে চলে যাবার সে তো চলেই যাবে’।

আবু বকর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। অনেক মেধাবী ছাত্র ছিলেন। সেমিস্টার ফাইনালে প্রথমও হয়েছিলেন। ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারীতে স্যার এ এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে তিনি আহত হন। ২ দিন ধুঁকে মারা যান ৩ ফেব্রুয়ারী। মেডিকেল রিপোর্টে বলা হয় মাথার পেছনে ‘শক্ত ধাতব পদার্থের আঘাতে’ তিনি নিহত হন। সাঙ্গ হয় তার দিনমজুর বাবার দেখা স্বপ্নের। হলের বস্তিসম খুপরি ঘরে একটা প্রতিভার অপমৃত্যু ঘটে আবারো।

এসবের কোন কিছুই নতুন না। এমন অসংখ্য আবু বকর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে চলে গেছে না ফেরার দেশে। ছাত্র ইউনিয়নের একটা দেয়াল লিখনে পড়েছিলাম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চল্লিশ বছরে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র মারা গেছেন ৭৩ জন।

আবু বকরের কথা ভুলেই যাচ্ছিলাম। সস্তা পোস্টারে ছাপার অক্ষরে আবু বকর নামটা তার কথা মনে করিয়ে দিল। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আবু বকরের ছবিটার দিকে তাকালাম। স্ট্রাইপের নীল শার্টটার গলা পর্যন্ত বোতাম আঁটা। বাঁপাশে সিঁথি করা চুল আর দু’চোখে বিদ্যমান সরলতা গ্রামের গন্ধ এনে দেয়। এমন ছেলেকেই আমরা শহুরে সভ্যরা ‘ক্ষ্যাত’ বলে থাকি। যাদের রুটিনড জীবন নিয়ে হাসাহাসি করে আমাদের বিকেলগুলো কেটে যায়। যাদের চুল তেল চিপচিপে হয়ে থাকে, একটা টিউশনির জন্য যারা হাপিত্যেশ করে মরে, যারা হলের ক্যান্টিনে আমাদের বিস্ফোরিত চোখের সামনে গামলা গামলা ভাত হলুদাভ ডাল দিয়ে ক্যোঁৎ ক্যোঁৎ করে গিলে ফেলে, যারা একজোড়া শার্ট-প্যান্ট সম্বল করে প্রতিদিন ক্লাস করতে আসে।

এদের বাইরের কেউ আবু বকর ছিলো না। এ এফ রহমান হলের ৪০৪ নম্বর কক্ষ ও তার পরজীবী ছারপোকারাও আর আবু বকরের ক্লান্ত দেহের অপেক্ষা করে নেই। অপেক্ষায় নেই কোলাহলময় টিভি রুম। হিন্দি-তামিল গানের চটুল তরঙ্গ মাত্র একজোড়া সতর্ক কান মিস করে না একদমই। অথবা সেই মেয়েটা? যার দিকে তাকিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে চোরা চাহনি বিনিময় চলত। নাহ, সেও আবু বকরকে মিস করে না। আজকাল দুই বছর আগের কথা মনে রাখার সময় আছে কারো? ‘সদা সতর্ক’ জাতীয় দৈনিকরাই ভুলে গেল।


বাম দলগুলো কোন এক আশ্চর্য প্রতিভায় অসাধারণ সব শ্লোগান নির্বাচন করে। এ এফ রহমান হলের অপরদিকের সফেদ দেয়ালে লাল রঙের পরিষ্কার অক্ষরে ছাত্র ফেডারেশন লিখে রেখেছিলো, “আবু বকরের মৃত্যুই বলে দেয় প্রতিরোধ না করা মানে প্রতিদিন লাশ হওয়া”। দেয়াল লিখনের নিয়মিত পাঠক আমার দৃষ্টি ওই দেয়ালের মাঝে মাঝে সেঁটে থাকত। আজ আর লেখাটা নেই। তার স্থান দখল করেছে অন্য শ্লোগান। অন্য কোন ইস্যু এসে আমাদের বেমালুম ভুলিয়ে দিয়েছে আবু বকরের কথা। তার অপুষ্ট অশীতিপর মায়ের কথা। যাঁর অগোছালো ঘোমটার আড়ালে দু’চোখে নিরন্তর অশ্রু বিসর্জন, আবু বকরের কন্ঠে আহ্লাদি মা-মা ডাক।

পত্রিকায় পড়েছিলাম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ শুনলেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে আবু বকরের মায়ের। সেই সময়ে অজান্তে আমার মা’র মুখটার কথা মনে পড়েছিল। আস্তে আস্তে সব ভুলে গেছি। ভুলে গেছি আজও তার হত্যার বিচার হয়নি। নেপথ্য কুশীলবরা আজও মায়ের বুক সমানে খালি করে চলছে। তার প্রতিফলন আমরা দেখছি রাবি,চবি,জাবি,শাবিপ্রবি,ঢামেক,বুয়েট,জবি সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

প্রমোদ ভ্রমণে গিয়েছিলাম টাঙ্গাইল। বাসের জানালা দিয়ে সবটা দেখার অবকাশ কম। এরমাঝেও উঁকি দিয়েছি মধুপুরের প্রতিবেশে। জীবন চলছে। যেমন চলেছিলো চিরকাল।

পত্রিকার প্রথম পাতাটা সামুর প্রথম পাতার চেয়েও মূল্যবান। ওখানকার খবরটা যখন ক্রমশঃ ভেতরে চলে যেতে থাকে তখন পাল্লা দিয়ে পরে যেতে থাকে খবরের আবেদন।
আবু বকরসহ সব নিষ্পাপ এভাবেই আমাদের বিস্মৃতিতে ঠাঁই করে নেয়।


৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×