somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাইব্রিড বীজ,আধুনিক কৃষি ও বাংলাদেশের গণমাধ্যম

২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১০ রাত ৮:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশ ও কৃষি একই সূত্রে গাঁথা । পুঁজিবাদের এরাম রাজত্বের ও বাংলাদেশকে আধা সামন্তবাদী কৃষি প্রধান দেশের তকমা দেওয়া হয়। শহরমুখী গনমাধ্যমে কৃষির জন্য স্থান নগন্যই বলা চলে । তারপরেও যতটুকু জায়গা জুড়ে কৃষি থাকে তা কর্পোরেট কৃষি এবং নেতিবাচক সংবাদে ঢাকা থাকে। গনমাধ্যমে আজ বহুলাংশে- ঢাকা উফশী ও হাইব্রিড ধান মুখী যা সার- কীটনাশকের বেশি ব্যবহারকেই উৎসাহিত করে । গনমাধ্যমে থাকেনা আমাদের দেশীয় প্রযুক্তিতে চাষাবাদের কথা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১০ অনুযায়ী ২০০৯-১০ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের কৃষির অবদান ছিল ২০.১৬ শতাংশ এবং মোট জনসংখ্যার ৪৩.৬ শতাংশ এখনো কৃষি কাজে নিয়োজিত। সে তুলনায় আমাদের গনমাধ্যমে দ্বিদলীয় রেষারেষির রাজনীতির খবর বেশি গুরুত্ব পায়। যতটা জুড়ে কৃষি সংবাদ থাকে তা আধুনিক কৃষির কথা বলে যা এক অর্থে কর্পোরেট কৃষি সংবাদ।

আধুনিক কৃষি নিয়ে কিছু কথা
১৯৬০ দশকে রকফেলার ও ফোর্ড ফাউন্ডেশন এবং মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় লাল বিপ্লবকে ঠেকাতে সবুজ বিপ্লবের তত্ত্ব পাচার করে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলোতে। পাল্টে যায় আমাদের কৃষির ইতিহাস ও মনস্তত্ত্ব । প্রথম দিকে ইরি ধানের উৎপাদন বাড়লেও কয়েক বছরের মধ্যে ইরি ধানের উৎপাদন কম হওয়ার কারণে কৃষক আরো বেশি সেচ, সার প্রয়োগ করতে থাকে। এর ফলে দেশের অধিকাংশ জমি উর্বরতা ইরিয়ে এক ফসলী জমিতে পরিণত হয়। হারিয়ে যায় ৭ থেকে ১২ হাজার ধানের জাত। ইরির মতো উফশী ধানের পর বিশ্বব্যাংক ও আর্ন্তজাতিক ধান গবেষনা প্রতিষ্ঠান (ইরি) হাইব্রিড ধানের প্রেসক্সিপশন দেয়। হাইব্রিড ধানের বীজ থেকে দ্বিতীয় বার বীজ উৎপাদন করা যায় না। একইভাবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কপোরেশনের কাছ থেকে বীজ উৎপাদন ও আমদানি চলে যায় এসিআই, ব্যংাক, প্রশিকা, সিনজেন্টার মতো বড় বড় আমদানিকারকদের কাছে। শুধু ২০০৮ সালেই বেসরকারি খাত দিয়ে আমদানি হয়েছে ৪০০ কোটি টাকার হাইব্রিড বীজ। বীজ আমদানির পুরোটাই বেসরকারি খাতে চলে যাওয়ার কৃষক এখন এসব আমদানিকারকদের হাতে জিম্মি।
আধুনিক কৃষির আরেক কারসাজি প্যাটেন্ট। ২০০৭ সালে আন্তজাতিক ধান গবেষনা প্রতিষ্ঠান (ইরি) হাইব্রিড ধান গবেষনা কনসোর্টিয়াম গঠন করে। এখন সেই কনসোর্টিয়াম মাধ্যমে ইরি তার কাছে সংরক্ষিত হাজারো ধানের জাতে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের গবেষনার জন্য খুলে দেয়। এর ফলে সিনজেন্টা, মনসান্টোর মতো কোম্পানি গুলো ইরিতে সংরক্ষিত ধানের কিছু পরিবর্তন করে নতুন হাইব্রিজ বীজ উৎপাদন করে তা আবার ধান উৎপাদনকারি দেশগুলোতে বিক্রি করছে। অথচ এ বীজের উৎস হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, ভিয়েতনামের মতো দেশ গুলোতে থেকে সংগৃহীত হাজারো ধানের জাত। এখন কইয়ের তেলে কই ভাজার মতেই অবস্থা। অধুনিক কৃষির নামে অধিক উৎপাদনের লোভে পড়ে সার, কীটনাশক ব্যবহার করছে। কীটনাশকের বিষে মারা পড়ছে পরিবেশের জন্য উপকারী প্রাণী বৈচিত্র্য। হাইব্রিড ধানে সেচ বেশি লাগে। দিনকে দিন তাই ভূগর্ভের পনি স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূগর্ভের পানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার দেশের আর্সেনিক দূষনের অন্যতম কারণ। এভাবেই আধুনিক কৃষি অধিক উৎপাদনের লোভ দেখিয়ে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। সার-বীজের উপর নির্ভরশীল করে তুলেছে।
গনমাধ্যমে কৃষি সংবাদঃ
পুঁজিবাদের এ জমানায় গনমাধ্যম কাঙাল হরিনাথদের মতো সেবার মানসিকতা নিয়ে থাকে না। গনমাধ্যমের অডিয়েন্স বাইরে আমাদের সনাতনী কৃষি সংবাদ গনমাধ্যমে স্থান পায় না। ধানের বাম্পার ফলন হলে, কৃষক হিমাগারে আলু রাখার জায়গা না পেলে- তা সংবাদ পত্রের প্রধান শিরোনাম হয় না। বাংলাদেশে ব্যবসায়ী গ্র“পগুলোর মালিকানাধীন পত্র-পত্রিকার কর্মসূচী সাধারন ভাবে প্রাইভেট সেক্টরের স্বার্থরক্ষা করা। আমরা কৃষি সংবাদের ক্ষেত্রে পত্রিকার সাথে টিভি চ্যানেল গুলোকেও এর সাথে মিলিয়ে পড়তে পারি। তা না হলে চ্যানেল গুলোর কৃষি সংবাদে হাইব্রিড বীজের কুফল নিয়ে প্রতিবেদন আসত। যে হাইব্রিড বীজের কারনে আমাদের দেশীয় ধানের জাত বিলুপ্তির মুখে। সে হাইব্রিড বীজ নিয়ে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো নিশ্চুপ। চ্যানেল আইয়ে কৃষি সংবাদের জন্য আলাদা স্লট আছে ভালো কথা। কিন্তু এ সংবাদের শিরোনাম ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে সুজলা- সুফলা হাইব্রিড বীজের নামে। এখন সর্ষেতেই ভূত। চ্যানেল আইয়ের হৃদয়ে মাটি ও মানুষের পাশাপাশি বাংলভিশনের শ্যামল বাংলা নামের কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। এ দুটো অনুষ্ঠানই কৃষিকে পোল্ট্রি ফার্ম, গরু মোটাতাজা করন, স্ট্রবেরি চাষ আর ছাদে পেয়ারা চাষে নামিয়ে এনেছে। এ ধরনের কৃষি সংবাদ প্রান্তিক কৃষকদের কোন উপকারেই আসে না। অথচ আমদানিকৃত জীব, সার, কীটনাশক ব্যবহারের জন্য ফি বছরই কৃষকের ব্যয় বাড়ছে। অথচ গনমাধ্যমে এ বিষয়ে নীরব। কারণ বর্তমানে গনমাধ্যম কর্পোরেট পুঁজির নিরাপদ প্রবাহের অতন্দ্র প্রহরী।
আর পত্রিকার কৃষি পাতায় ফিচার প্রতিবেদন সাধারন কৃষক পড়ে বুঝতে পারবে না। এসব ফিচার, প্রতিবেদনে থাকে হেক্টর, সেন্টিমিটার, মিলিগ্রামের গাণিতিক পরিমাপের উপর ভিত্তি করে চাষাবাদ পদ্ধতি। যা একজন কৃষিবিদের কাছেই বোধগম্য, সাধারন কৃষকের কাছে নয়। কৃষির কথা বলতে গিয়ে চলে আসে শাইখ সিরাজের নাম। তিনি বাংলাদেশ আধুনিক কৃষির এক বড় প্রবক্তা। তাই তিনি সর্বদাই হাইব্রিড বীজ, সার, নতুন প্রযুক্তির পক্ষে গুন গান গেয়ে যান। কৃষককে উৎসাহিত করেন এসব ব্যবপারে। তিনি কখনোই বলেন না বহুজাতিক কোম্পানির সার, বীজ, সেচের যন্ত্র ব্যবহারের ফলে কৃষক যে এসব কোম্পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছে তার কথা। তিনি তার বইয়ে ও বন্ধ্যা হাইব্রিড বীজের পক্ষে গুন গান করেন এভাবেই, খাদ্য চাহিদা পূরনের প্রশ্নে....... হাইব্রিড ধানের কোনো বিকল্প নেই। তাই শাইখ সিরাজের কৃষিসংবাদ আর হৃদয়ে মাটি মানুষ পুরো পুরি কর্পোরেট বহুজাতিক কোম্পানির অনুগামী।
ষাটের পশকের সুবজ বিপ্লবের ভূত এখনও আমাদের গনমাধ্যমের উপর সওয়ার। যার কারনেই আজ গনমাধ্যমে কৃষি আধুনিক প্রযুক্তি হাইব্রিড বীজ, কীটনাশক মুখী। কিন্তু আধুনিক এ কৃষির বাইরেও আমাদের সনাতন কৃষি আছে। যা আমাদের পরিবেশের সাথে মানানসই। কিন্তু কর্পোারেট পুঁজির প্রহরী গনমাধ্যম আমাদের সনাতনি কৃষিকে অবহেলা করে আধুনিক কৃষিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। আমাদের কৃষক সমাজ এ আধুনিক কৃষির নামে কি আজীবন বহুজাতিক কোম্পানির শৃঙ্খলে বাঁধা থাকবে? গনমাধ্যমের এ ভূমিকা নিয়ে “প্রগতিশীল” মিডিয়া ক্রিটিকরা একটু ভাবছেন কি?

তথ্যসূত্রঃ
১.শাইখ সিরাজ-মাটির কাছে,মানুষের কাছে
২.বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১০
৩.প্রথম আলো -২৪ জুলাই ২০১০
৪.| Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১০ রাত ৮:১৫
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ক্রাউড ফান্ডিং-এর সুযোগ তৈরি করে সরকারী লাভজনক প্রজেক্টে জনগণের বিনিয়োগ নিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৩১

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত, তা বুঝা যাচ্ছে। নাহলে, খোদ প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে জনগণকে অনুরোধ করতেন না। আমার মন হয়, দেশের মানুষের কাছেই অনেক সম্পদ আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×