ব্লগার ভাইবোনেরা এই শিরোনাম দেখামাত্র ঘাবড়াবেন না। মনে করবেন না রাজাকারদের পক্ষে কথা বলছি।একটু সময় নিয়ে আমার লেখাটা পড়ে নেন। এরপর যা করার তাই করবেন - এই প্রত্যাশা রাখছি সর্বপ্রথমে।
গতকাল ‘কী লিখি!আহাম্মক পার্বত্য ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান” শিরোনামে একটা লেখা দিলাম এ ব্লগে। অনেকে অনেক মন্তব্য করেছেন, তাতে দোষের কিছুই নেই। কিন্তু জনৈক ব্লগার ‘জাতি জানতে চায়’ মন্তব্য করতে গিয়ে বললেন, “…তারপর ইদানিং জানলাম ৭১ এ নাকি আপনারা পুরা জাতিই যুদ্ধাপরাধী ছিলেন??!! শুনলাম সরকার নাকি হেগো বিচার করবো!!”
তিনি এ কথার মাধ্যমে তিনি বলতে চাচ্ছেন তা বুঝতে পেরেছি। শুধু ‘জাতি জানতে চায়’ নয়, আরো অনেকে আছেন যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে কিছু লিখলেই কটাক্ষ করে আমাদেরকে রাজাকার বলে গালি দেয়।কারণটা কি?।আমাদের এক রাজা পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেজন্যে সব আদিবাসীকে রাজাকার বা যুদ্ধাপরাধী বলে গালি দেয়া হয়, যেমনটা করেছেন, ‘জাতি জানতে চায়’। আজকে সেই ‘জাতি জানতে চায়’সহ জামাতী, জাতীয়তাবাদী ও তাদের ভাবশিষ্য ব্লগারদের ভন্ডামীর বিরুদ্ধে আজকে আমার এই লেখা।এসব ভন্ডদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, বাঙালি রাজাকার ও আদিবাসী রাজাকারদের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে।বাঙালি রাজাকাররা হলো শঠামি, ভন্ডামি ও নীতিহীনতায় আস্ত শয়তান; অন্যদিকে আদিবাসী রাজাকারটা (আদিবাসী রাজাকারদের সংখ্যা কত জানি না। জানা থাকলে জানাবেন)নীতি-নৈতিকতায় সমুজ্জ্বল। আদিবাসী রাজাকারের নীতি-আদর্শ যদি বাঙালি রাজাকাররা এক বিন্দুও অনুসরণ করতো তাহলে বাংলাদেশের অগ্রগতি অনেক হতো।
আমি যেই আদিবাসী (‘আদিবাসী’ শব্দ শুনলে অনেকের পিলে চমকে যায়।অন্তত: আজকে তা করবেন না) রাজাকারের কথা বলছি তিনি হলেন চাকমা রাজা ত্রিদীব রায়।রাজাকার শব্দের অর্থ স্বেচ্ছাসেবক। ত্রিদীব রায় কেমন রাজাকার/স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন আমার জানা নেই। অর্থাৎ তার হাতের ইশারায় বা নির্দেশে কয়জন বাঙালি ভাইবোনের জীবন-ইজ্জ্বত চলে গেছে সে বিষয়ে কোন রাজাকার বিশেষজ্ঞ বা রাজাকারের দোসর জামাতীদের কাছে কোন তথ্য থাকলে দয়া করে জানাবেন সেই প্রত্যাশা রাখছি। কেননা, ইতিহাস যতই নির্মম হোক সত্য উদঘাটন করা উচিত এবং জানা উচিত। আমার আদিবাসী রাজাকার স্বেচ্ছাসেবকগিরিতে গোআজম, মুজাহিদ ও নিজামিদের সমকক্ষ ছিলেন কি না - এ বিষয়ে তুলনামূলক একটা চিত্র ‘জাতি জানতে চায়’ বা তার ভাবশিষ্য কেউ দিতে পারবেন কি? আর তা দিতে না পারলে আমাদেরকে কোন যুক্তিতে ‘যুদ্ধাপরাধীদের’ কাতারে তুলে ধরেন তার জবাব চাই।
আমি যতটুকু জানি, ত্রিদীব রায় গোআজম, মুজাহিদ ও নিজামিদের মত ভন্ডামি, গুন্ডামি করেন নি।গোআজম-মুজাহিদ-নিজামীদের মত বুদ্ধিজীবী হত্যা, ধর্ষণ, লুন্ঠন ইত্যাদি মানবতাবিরোধী কাজে তিনি স্বেচ্ছাসেবকগিরি করেছিলেন বলে আমার জানা নেই।তিনি তার নীতি-নৈতিকতা ও সততায় অবিচল ছিলেন এবং আছেন।পরিস্থিতির চাপে রাজা ত্রিদীব রায়কে বাধ্য হয়ে পাকিস্তানকে সমর্থন করতে হয়েছিল।তবে পাকিস্তানকে যেমন সমর্থন দিয়েছিলেন তেমনি তিনি তার নীতি-নৈতিকতা ও সততা থেকেও বিচ্যূত হননি।পূর্ব-পাকিস্তানের পতন হওয়ার অনেক আগেই দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আর বাংলাদেশে আসেন নি, আসার চেষ্টাও করেন নি।গোআজমদের মত দেশে ফিরে এসে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দাবী করেন নি।এদেশে এসে কোন সুযোগসুবিধা বা সম্পত্তি দাবী করেন নি। সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে নাগরিকত্ব আদায়ের জন্যে মামলা করেন নি। গোআজমদের মত স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনীতিও করেন নি। তিনি পুরোদমে পাকিস্তানী ছিলেন, এখনও পাকিস্তানী হয়ে আছেন।পরিবার পরিজন সবকিছু ছেড়ে তিনি পাকিস্তানে আছেন। কাজেই পাকিস্তানের নাগরিককে বাংলাদেশের আবর্জনা গোআজম-মুজাহিদ-নিজামীসহ অন্য রাজাকারদের কাতারে তুলে ধরলে সেটা বড় অবিচার হবে।পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে তিনি কোন যুদ্ধাপরাধীও বিবেচিত হতে পারেন না। এখানেই পার্থক্য ধরা পড়ে নীতি-বিবেকবর্জিত বাঙালি রাজাকার গোআজম-মুজাহিদ-নিজামীদের সাথে নীতি-নৈতিকতা ও সততায় অবিচল আদিবাসী রাজাকার ত্রিদীব রায়ের মধ্যে।তাই ‘জাতি জানতে চায়’ ও তার চেলামুন্ডাদের বলছি, আপনারা বড় রাজাকার মুজাহিদের মত স্মৃতিবিস্মৃত হয়ে আন্দাজে যুদ্ধাপরাধী শব্দটা উচ্চারণ করবেন না।
নবীন প্রজন্মের মানুষ আমি। ইতিহাসের পাতা উল্টাতে গিয়ে জেনেছি, রাজা ত্রিদীব রায়কে অনেকটা বাধ্য হয়ে পাকিস্তানকে সমর্থন করতে হয়েছিল।কেন? এর পেছনে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তি ছিল।অনেক আদিবাসী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তখনকার আওয়ামী লীগ সে সুযোগ দেয়নি।বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম তখন রাঙামাটি জেলার ডেপুটি কমিশনার। এইচ টি ইমাম ও রাঙামাটি আওয়ামীলীগের নেতা সাইদুর রহমান(যিনি মূলত বাইরের লোক ছিলেন)কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে বুঝিয়েছিল, আদিবাসীরা পাকিস্তানপন্থী। সে কারণে আদিবাসীরা ব্যাপক সংখ্যায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চাইলেও তারা সুযোগ পায়নি। বরং তাদেরকে হয়রানি করা হয়। যেমন, ত্রিদীব রায়ের কাকা কোকোনাদক্ষ রায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্যে ভারতে গিয়েছিলেন। এইচ টি ইমামদের প্ররোচনায় তাকে গ্রেফতার করা হয় রাজাকার সন্দেহে।এসব বাধা সত্বেও অনেক আদিবাসী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।যেমন, পার্বত্য জেলার আরো এক রাজা - মং রাজার কথা বলা যায়।তার রাজভান্ডার থেকে অন্ন-বস্ত্র-খাদ্য দিয়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা দিয়েছিলেন।মুক্তিযুদ্ধের অবদানস্বরূপ তিনি বীর বিক্রম খেতাবও পেয়েছিলেন।কিন্তু দু:খের বিষয় এসব কথা তুলে ধরা হয় না। সেজন্যে ‘জাতি জানতে চায়’ ও তার চেলামুন্ডারা আদিবাসীদের ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে গালি দিতে সাহস পায়।অন্যদিকে আরো এক ব্লগার ‘মেক্সবিডি’ একটা পোস্ট লিখে বসলেন, “অডং চাকমাদের ভাবনা, বদলানোর সময় এখনও ফুরোয়নি......”। এ লেখার মাধ্যমে তাদেরকে ভন্ডামি পরিহার করে তাদের জামাতী ভাবনা বদলিয়ে সুষ্ঠু বিতর্কে নামার আহবান জানাচ্ছি।
বেশি আর কথা বাড়াবো না। ‘জাতি জানতে চায়’ ও ‘মেক্সবিডি’-দের উদ্দেশ্যে বলছি, জামাতী খোলসে থেকে দেশ প্রেমের কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা রক্ষার করার কথা বলা আপনাদের মানায় না।আদিবাসীদের দোষ দেবেন না।আদিবাসীরা নয়, বাঙালি রাজাকার গোআজম-মুজাহিদ-নিজামীদের মত লোকগুলোই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতায় বিশ্বাস করে না।আর আমাদের আদিবাসী রাজাকার কখনো বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা ধ্বংসের জন্যে গোআজম-মুজাহিদ-নিজামীদের মত রাজনীতি করেন নি। তিনি তাঁর মত করে আছেন পাকিস্তানে। এবার বলুন, কোন রাজাকার বেশি মারাত্মক - আদিবাসী রাজাকার নাকি বাঙালি রাজাকার?
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই এপ্রিল, ২০১০ সকাল ১১:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


