আজকে আমার লেখার শিরোনামটা ছিল একটা গালি ।অনেক আগে সেনাবাহিনীর এক সদস্যের কাছে স্কুলে যাওয়ার পথে ঐ গালিটা শুনেছিলাম।তখন ১৯৮৩ সাল।প্রাইমারী স্কুলের শিশুশ্রেণীর ছাত্র।হয়ত অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, চাকমা শিশু হয়ে আমি কিভাবে ঐ বাংলা গালিটা মনে রেখেছিলাম? চাকমারাও শালাকে শালা বলে, মারামারিকে মারামারি বলে আর শান্তিবাহিনী তো অতি পরিচিত নাম।ঐ গালিটা মনে রাখার আরো অনেক স্মৃতি আছে। ঐ সময়েই আমাদের গ্রামে আর্মি ক্যাম্প (বর্তমানে বিডিআর ক্যাম্প) প্রথম স্থাপন করা হয়েছিল এবং আমাদের পুরনো বাড়ীর জায়গাতেই করা হয়েছিল।যেখানে আর্মি ক্যাম্প করা হয়েছিল, সেটার মধ্যদিয়ে ছিলো আমার এবং আমাদের স্কুলে যাওয়ার পথ।তখন ক্যাম্প তৈরী হয়নি। রাতের বেলায় সৈন্যরা (তখন আর্মি ও বিডিআরের সৈন্য একসঙ্গে ঘুরতো এবং থাকতো) আমাদের স্কুল ঘরে গিয়ে থাকতো আর দিনের বেলায় স্কুল চলাকালীন সময়ে সেখান থেকে বের হয়ে গ্রামের আশেপাশে ঘুরতো।গাছের তলায় তলায় বসে থাকতো। আমরা ভয়ে ভয়ে সেসব সৈন্যের পাশ দিয়ে হেঁটে স্কুলে যেতাম। স্কুল ছুটি শেষে ঘরে ফিরতাম। আসা-যাওয়ার পথে অনেক সৈন্য আমাদের আদর করতো, আবার অনেকে রুঢ় কথা বলতো।একদিন এক সৈন্য আমাদের সাথে কথা বলছিল, তখন আরো এক সৈন্য একটু দূর থেকে চিৎকার করে বলছিল, “শালা শান্তিবাহিনীর বাচ্ছা, বড় হলে মারামারি করবা”।তখন কথাটার পুরো অর্থ বুঝিনি, তবে ‘শালা’ গালিটা মনে খুব লেগেছিল।কেননা, আমাদের এলাকায় ‘শালা’, ‘বেটা’, ‘শালার বেটা’ এগুলো খুব অপমানজনক গালি ছিল।আর্মিরা এ গালিগুলো এত প্রয়োগ করেছিল এখন তা বলতে খুব কষ্ট লাগে।মন দুমড়েমুচড়ে উঠে।
আজকে নতুন করে ঐ গালিটা মনে পড়ে গেলো আমার পোস্টে জনৈক ফালতু মিয়ার মন্তব্য দেখে। গতকাল “রাঙামাটির টেগামুখ বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা” শিরোনামে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম।ঐ পোস্টে ফালতু মিয়া মন্তব্য করেছেন,
“মিঃ চাকমা, শান্তিবাহিনীর দাপট শেষ হয়েছে তাই না? সীমান্ত রক্ষা হোক আর যাই হোক দেশের সরকার যে কোন স্থানে সৈন্য সমাবেশ করতে পারে। স্বাধীনতা ও সার্বোভৌমত্ব রক্ষার জন্য।আপনার সেনাবাহিনী ও বিডিআরের প্রতি এতো ক্ষোভের কারণ তো বুঝলাম না। শান্তিবাহিনী দিয়ে বিডিআর মারার কথা কি ভুলে গেছেন? এধরণের পোষ্টে মাইনাস দিতেও ঘৃণা”।
ফালতু মিয়াদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, শান্তিবাহিনীর দাপট শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু আর্মি-বিডিআরের দাপট এখনো শেষ হয়নি।তবে এ লেখার মাধ্যমে সেনাবাহিনী কিংবা বিডিআরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝারতে চাচ্ছি না। মনের বেদনাগুলো ব্যক্ত করতে চাচ্ছি। ফালতু মিয়ারা আজকে অডং চাকমাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ঝারতে পারেন, আমার পোস্টে মাইনাসের উপর মাইনাস দিতে পারেন।শান্তিবাহিনী দিয়ে বিডিআর মারার অভিযোগ আনতে পারেন। তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। তবে তা করার আগে ফালতু মিয়াদের আত্মজিজ্ঞাসা করতে বলি, “সেনাবাহিনী ও বিডিআর দিয়ে আপনারা কাদের মেরেছিলেন? এবং এখনো মারছেন?” কার সার্বভৌমত্বের কথা বলছেন? জনসমষ্টি ছাড়া কী সার্বভৌমত্ব রক্ষা হয়? জনসমষ্টি বলতে সেখানে কী কেবল বাঙালিরা অন্তর্ভুক্ত? স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে কী রাষ্ট্রের খুন খারাবিকে জায়েজ করতে চান?
জানি জবাবে ফালতু মিয়ারা অনেক যুক্তি দেবেন। আমিও দেবো। তবে ফালতু মিয়াদের উদ্দেশ্যে আরো বলতে চাই, সেনাবাহিনী ও বিডিআরের বিরুদ্ধে আমাদের ক্ষোভ নেই। কিন্তু সেনাবাহিনী ও বিডিআর দিয়ে যা করান সেটার বিরুদ্ধে আমাদের ক্ষোভ আছে, দু:খ আছে। সেনাবাহিনী ও বিডিআর দিয়ে আকাম-কুকাম করে রাষ্ট্র সেগুলো বৈধতা দিতে চায় সংবেদনশীল আবরণ যেমন, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সীমান্তরক্ষা, অস্ত্রধারী দমন ইত্যাদি নাম দিয়ে।আর সেটা আপনারা সমর্থন দেন বিনাবাক্যে, বিনাপ্রশ্নে।কিন্তু এ অডং চাকমা তা করে না, এবং করতে পারে না অতীত অভিজ্ঞতা থেকে। অডং চাকমা প্রশ্ন করে, কার স্বাধীনতা? কার সার্বভৌমত্ব? কোন সীমান্তরক্ষা? কোন অস্ত্রধারী দমন?
সেনাবাহিনী-বিডিআর প্রতিদিন অস্ত্রধারন করে আমার সামনে হাজির হয়। মানুষ খুন (সম্ভবত বাঙালি ছাড়া) করলেও তার কিছুই হয় না।কল্পনা চাকমাদের মত কোন নারীকে হরণ ও অপহরণ করলেও তার বিচার হয় না।এ প্রেক্ষাপটে আমি কী নীরব থাকবো? কোন প্রশ্ন করবো না? সম্ভবত সব দু:খবেদনা হজম করে অডং চাকমারা নীরব থাকলে, ফালতু মিয়ারা খুব খুশি হবেন, কোন ঘৃণা প্রকাশ করবেন না।তখন টেলিভিশনের গুড়ো দুধের বিজ্ঞাপনের শিশুটির মত বলবেন, আম্মু (অডং) তুমি খুব লক্ষী।আর অডংরা প্রশ্ন তুললে বলবেন, “এ ধরণের পোষ্টে মাইনাস দিতেও ঘৃণা হয়”।কী বিচিত্র চরিত্র!
সময় অনেক গড়িয়ে গেলো। বড় হয়ে গেছি। কিন্তু সেই সৈন্যের কথা সত্যি হয়নি। আমি শান্তিবাহিনীর বাচ্চা হতে পারিনি। অস্ত্র কিভাবে ধরতে হয় তা শিখতে পারিনি। মারামারি করতে পারিনি। তবে যা করতে পারছি তা হলো: এখন কলম চালাতে পারি। কম্পিউটারের কী বোর্ড চাপতে পারি। ফালতু মিয়াদের বিরুদ্ধে কলম চালাতে পারি, কী বোর্ডে আঙ্গুল চালাতে পারি।ফালতু মিয়ারা ঘৃণা করুক কিংবা ভালবাসুক অডং চাকমার কলম চলতে থাকবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




