দ্বিতীয় পর্ব
চারুকলার সামনে দাঁড়িয়ে নাইমা। এক পশলা বৃষ্টি শেষে মিষ্টি হাওয়া দিচ্ছে। এমন দিনে অনন্যাকে ধরে রাখা কঠিন, ক্লাস বাদ দিয়ে হলেও বের হয়ে পরবে। আজও তার ব্যাতিক্রম হয় নি। ম্যাক্রো-ইকোনমিক্স ক্লাস হচ্ছিল। কমপ্লেক্স মাল্টিপ্লায়ার আর গরম মিলে যখন ব্রেইন গলে ঘাম হয়ে যাচ্ছে তখনি আকাশ কালো করে বৃষ্টি’র ডাক দিল, ওম্নি অনন্যা ড. সুরাইয়া বানু’র কাছে আবদার করে বসল, “ম্যাম প্লিজ আজ আর না বৃষ্টিতে ভিজব” পুরা ক্লাস অনন্যার সাথে হইহই করে উঠল। সুরাইয়া বানু’র মত রসকষহীন কোন মহিলা’র কাছে এই দাবি করা আর একটা খাম্মার সামনে গিয়ে আবদার করা প্রায় সমান। নাইমা শ্বাস আটকে বসে ছিল, ম্যাম কি বলে দেখার জন্য। ম্যাম কিছু বলার আগেই স্বাতী বলল, “না ম্যাম ছুটি দিবেন না, আগে অনন্যা একটা গান গাইবে, বছরের প্রথম বর্ষনকে আনুষ্ঠানিক স্বাগতম জানাতে হবে। তারপর ছুটি।” আগের চেয়েও জোরে চিৎকার দিয়ে উঠল পুরা ক্লাস। সবাই মোটামুটি একটা বিশাল উপদেশ শোনার প্রস্তুতি নিয়েই ছিল, কিন্তু এই ক্লাসে বিশেষত্ব হচ্ছে এরা যাবতীয় আকামকুকাম একসাথে করে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সুরাইয়া বানু মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বললেন “প্রতিশোধটা পরীক্ষার সময় নিব। এখন বৃষ্টি নামতে নামতে একটা গান হোক। অন্তত ঝড়ের হাত থেকে পাগলী ২টা কে রক্ষা করি।”
গান গেতে অনন্যার কখনো না নাই। অন্যদের মত ঢং করেও বলেও না আজ গলা ব্যাথা। বরং মুখিয়ে থাকে কখন গান গাইবে। সানন্দে সে গান শুরু করে-
একি আকুলতা ভুবনে ! একি চঞ্চলতা পবনে।।
একি মধুরমদির রসরাশি আজি শূন্যতলে চলে ভাসি,
ঝরে চন্দ্রকরে একি হাসি, ফুল- গন্ধ লুটে গগনে।।
একি প্রাণভরা অনুরাগে আজি বিশ্বজগতজন জাগে,
আজি নিখিল নীলগগনে সুখ- পরশ কোথা হতে লাগে।
সুখে শিহরে সকল বনরাজি, উঠে মোহনবাঁশরি বাজি,
হেরো পূর্ণবিকশিত আজি মম অন্তর সুন্দর স্বপনে।।
এটা গেয়ে নিজে থেকেই আবার একটা গান ধরে-
দারুণ অগ্নিবাণে রে হৃদয় তৃষায় হানে রে।।
রজনী নিদ্রাহীন, দীর্ঘ দগ্ধ দিন
আরাম নাহি যে জানে রে।।
শুষ্ক কাননশাখে ক্লান্ত কপোত ডাকে
করুণ কাতর গানে রে।।
ভয় নাহি, ভয় নাহি। গগনে রয়েছি চাহি।
জানি ঝঞঝার বেশে দিবে দেখা তুমি এসে
একদা তাপিত প্রাণে রে।।
গাইতে গাইতেই ওর চোখে অল্প অল্প পানি জমে, গলা ধরে আসে। হাসি হাসি মুখে কান্না, যেন কত সুখে সে কাদঁছে!!!
“জানি ঝঞঝার বেশে দিবে দেখা তুমি এসে, একদা তাপিত প্রাণে রে” অনন্যার কিন্নর কন্ঠ কনে লেগে আছে নাইমার। ঠান্ডাটা কাঁপিয়ে দিচ্ছে ওকে। ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে নেয়, বারবার আশে-পাশে দেখছে। একটু চঞ্চল ওর চোখ। অনন্যা অনেক করে বলছিল ওর সাথে যেতে, নাইমা যায় নি। অনন্যা স্বাতী আর মানব রিক্সা নিয়ে ধানমন্ডি’র দিকে গিয়েছে। আজ অনন্যার খুব প্রিয় বৃষ্টি ভেজা দিন। মনে মনে একটু হাসে নাইমা, অনন্যা’র সব কিছুই খুব প্রিয়. খুব প্রিয় বলা অনন্যার অভ্যাস।
অপেক্ষার প্রহরের সাথে ভয় বাড়তে থাকে নাইমার। অনন্যারা যদি আবার ফিরে আসে? না অনন্যা বোধ হয় বাসায় চলে যাবে, ধানমন্ডি থেকে ফিরে আসার কোন কারনই নাই। নিজেই নিজেকে বুঝ দেয়, তারপরও ভয় কাটে না।
হুসস করে ওর পাশ দিয়ে একটা গাড়ী এসে থামে। আবার চোরা চোখে চারদিক দেখে চট করে নাইমা গাড়িতে চড়ে বসে। কাঁচ তোলাই ছিল তবু আরেকবার নিশ্চিত হয়। পাশে বসা সায়েম হেসে উঠে। “কি নাইমা? এত টেন্সড কেন তুমি? কিছু হয়েছে?” “নাহ! কিছু না” বলে আলতো করে মুখটা ঘুরিয়ে নেয় নাইমা। জানালার বাইরে কি যেন খুঁজে। “অনন্যাকে গিফট দিয়েছ?” উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেষ করে। মুখ না ফিরিয়েই মাথা কাত করে হ্যাঁ সূচক সংকেত জানায় নাইমা। পরিতৃপ্তির একটা হাসি দেয় সায়েম নিজের মনে গুনগুনিয়ে গান গেয়ে উঠে।
খিলক্ষেত মোড়ে নাইমাকে নামিয়ে দেবার আগ পর্যন্ত তেমন কোন কথাই আর হয় না নাইমার সাথে শুধু জিজ্ঞেস করে, “রাস্তা পাড় হয়ে যেতে পারবে, না আমি মোড় ঘুড়িয়ে দিয়ে যাব?” কিছু না বলে গাড়ী থেকে নেমে যায় নাইমা। সায়েম আবার বলে, “আপু কাল কিন্তু দেরী করো না। আমার সকালে ক্লাস আছে।” “ভাইয়া আমি কাল একাই যেতে পারব, আপনার কষ্ট করতে হবে না।” খুব কাঠকাঠ গলায় জবাব দেয় নাইমা। সায়েম হেসে দেয় বলে, “আচ্ছা বাবা, সরি! তোমার কি কোন কারনে মন খারাপ আপু?” নাইমা এই প্রশ্নের জবাবও খুব শুকনা গলায় দেয় তারপর দরজা বন্ধ করে চলে যায়। সায়েম ওর ব্যাবহারে ভারি অবাক হয়। কিছুটা বিরক্তও। অনন্যার জন্য যার না তার মেজাজ সহ্য করতে হচ্ছে, এই কথাটা ভাবতেই মেজাজ গরম হয়ে যায়। গাড়ি জোরে টান দেয়। গোঁ গোঁ করে ইঞ্জিন প্রতিবাদ করে এয়ারপোর্ট রোড ধরে গাড়ী উত্তরার পথে রওনা দেয়।
ধানমন্ডি লেকে নৌকা নিয়ে নেমে পড়েছে অনন্যা। সাথে মানব আর স্বাতী। বৃষ্টি কমে গেছে। কিন্তু আকাশ মেঘলা। ঝির ঝির করে ঝড়ছে। বৃষ্টিতে ভিজে অনন্যা তির তির করে কাঁপছে, একটু ভয়ও পাচ্ছে ও সাঁতার জানে না বলে। স্বাতী অনন্যার কাজে খুব মজা পাচ্ছে। ওর গায়ে পানি ছিটিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। “ছি এই পানি দেখে ভয় পাচ্ছিস? যমুনার বর্ষা দেখলে তো তুই অক্কা পাবি অনু!!” নৌকাটা রাইফেলসের কাছাকাছি চলে এসেছে। পানিতে কৃষ্ণচূড়া’র পাপডি ভাসছে, লাল প্রতিবিম্ব বার বার ভেঙ্গে শত টুকরো হচ্ছে, জোড়া লাগতে চাইছে তবু টুকরো হয়ে যাচ্ছে। অনন্যা সেদিকে নৌকা নেবার নির্দেশ দিয়ে বলল “ আমি অক্কা পেতে চাই না রে, অক্কায় টেষ্ট নাই। পটল তুলতে চাই, পটল আমার ভারি প্রিয়। হিহিহি...” বলেই মানবের দিকে চেয়ে চিলের মত চিৎকার করে লাফ দিয়ে উঠে “মানব!!! বিড়ি ফেল!! খুন করে ফেলব!!!” চিৎকার দিয়েই ছপাং করে পানিতে পড়ে যায়। মানব সিগারেটটা হাত থেকে ফেলে পানিতে নেমে পড়ে। স্বাতী উপর থেকে হাসতে থাকে। “মানব ধরিস না। পানি বেশি গভীর না, ওকে একটু চুবতে দে” মানব স্বতীর কথা শুনে না টেনে-হিচড়ে অনন্যাকে নৌকায় তুলে। নৌকায় উঠেই অনন্যা আবার হি হি করে হাসি শুরু করে। এবারের গন্তব্য অনন্যার বাসা।
ওদের ভিজা চেহারা দেখে অনন্যার মা হেসে খুন হয়। “ও মানব, স্বাতী না হয় অনুর জামা পড়বে তুই কি পরবি? তোর আংকেলের কাপড়ে তো তোর মত ৪টাকে ঢুকিয়ে দেয়া যাবে।” ভেবে চিন্তে মানবকে শেষে একটা লুঙ্গি দেয়া হয়, তাই দেখে অনন্যা আর স্বাতী একজন আর একজনের গায়ে উলটে পড়ে যায় হাসতে হাসতে। অনন্যা আবদার ধরে, “মা, আমরাও শাড়ী পরব।”
শাড়ী পরে নিজেরাই রান্না শুরু করে, তার আগে বাবাকে কল করে, “বাবা, আজ তোমার দাওয়াত। জলদি আস পরে কিন্তু ভাগে পাবে না। তখন আমাকে কিছু বলতে পাড়বে না” অনন্যার রান্না’র হাত বেশ ভাল। স্বাতী এখন অনন্যার এ্যাসিট্যান্ট। দুজনে মিলে চুলায় মুগের ডালের খিচুরী চাপিয়ে ডিমের রেজালা করে। এক ফাঁকে অনন্যা একটা এস. এম. এস. করে দেয় “kushi, khicuri ranna korechi, khub moja hocche. missing u. parle chole ay plz”
ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বাসায় ঢুকে নাইমা। ঢুকেই বাবার হাতে পরে যায়। সম্প্রতি তিনি এল. পি. আর’এ গিয়েছেন। সারাদিন বাসায় থাকেন। নাইমার ভেজা অবস্থা দেখে ভ্রু তুলে তকালেন। নাইমা তা পুরোপুরি উপেক্ষা করে নিজের ঘরে ঢুকে যায়। আজ ওর নিজের সাথে অনেক বোঝাপড়া আছে। মোবাইলটা মেসেজ আসার সংকেত দিচ্ছে। খুব আগ্রহ নিয়ে মোবাইলটা হাতে নেয়। অনন্যা!!! ছুঁড়ে ফেলে দেয়, ঝেড়ে ফেলতে চায়, এভাবে সে নিজের অক্ষমতা ঝেড়ে ফেলতে চায়।
………………………………………………………………………………………………
অনেক অনেক দিন পরের কথা
অনন্যা তৃষার্ত চোখে বৃষ্টি দেখছে। মাথাটা টেবিলে নামিয়ে রেখেছে। স্বাতী বাইরে থেকে অনন্যাকে দেখল। পাশ দিয়ে গিয়ে আস্তে করে ওর মাথায় হাত রাখলো। “অনু, চল বৃষ্টিতে ভিজি।”
চলবে………
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০১০ রাত ১১:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



