somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার মাটির ঘর

০৫ ই জুন, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বড় চাচাকে দেখে যে সালামটা দিলাম সেটা কেন যেন খুব ভেতর থেকে আসল!!! কথা এভাবে বলাটা হয়তো আশ্চর্য লাগবে। ব্যাখ্যাটা হচ্ছে এরকম, বড় চাচা আমার আপন চাচা না। আব্বুর বড় চাচার ছেলে, সেই অর্থে পরিবারের সবচেয়ে বড় তাই বড়চাচা। আমি আজন্ম শহরে মানুষ, গ্রামের বাড়িতে যাওয়াটা লং-ড্রাইভে যাবার মত ব্যাপার। সবার সাথে সম্পর্কটাও সালাম পর্যন্তই।
পৃথিবীর অনেক সত্যাই জানা হয়ে গেছে, আতুরঘর আর বেড়ে ওঠা কোল পিঠগুলোর সাথের সম্পর্কও এখন সালাম পর্যন্তই এবং জবাবের প্রত্যাশা না করায়। গুটিয়ে নেয়া জীবন হয়তো সুখের নয় তবে দুঃখেরও নয়। শান্তির! সাদা কাপড়ের মত, লোবান আর কর্পূরের গন্ধের মত, সব কিছুর উর্দ্ধে চলে যাবার মত। নিঃস্তব্ধ এবং শান্তির।

বৃষ্টি ঝরে যাচ্ছে। সড়কের পাড়ে জানি না কেন আমি ছাতা ছাড়া দাঁড়িয়ে আছি, হুস হুস করে বাস যাচ্ছে। বড়চাচা অনেক দূরে দাঁড়িয়ে, আমি ঠাওর করতে পাড়ছি না এটা কে? বড়চাচা না খুশিচাচা। আমার মনে হচ্ছে যেই হোক সে যেন আমার কাছে এসে বলে “তুমি কখন আইস?” কিন্তু সে আসে না, আজ কোন উৎসব না যে আমার কাছে আসতে হবে, কোন শোকও না যে আমাকে সান্তনা দিতে হবে। বড়চাচা হয়তো আমাকে ভাল করে চিনতেই পারেন না, তবু আবার তাকান। তারপর হাতের কাচিটা নিয়ে চলে যান। আমি তৃষ্ণার্থ চোখে বড় চাচার যাওয়া দেখি। বড় চাচার গায়ের রঙ দাদার মত টকটকে না, রীতিমত কালো তবু কেন মনে হয় দাদা হেঁটে যাচ্ছেন? এখনই মুখ ফিরিয়ে মুখে রহস্যভরা হাসি নিয়ে বলবেন, “তারাতারি আস তুমারে একটা জিনিষ দেখাই।”

বাড়িটা ভেঙ্গে ফেলছে, কবর জিয়ারত করে আমি বাড়িতে পা দিয়ে দেখলাম শুধু দেয়ালগুলি আছে, আমার অনেক চেনা নোনায় ধরা দেয়ালগুলি। দোতালা পুরাই নেই, নিচতলার ছাঁদও নেই। শুধু বড় গোলা ঘরের ছাঁটটা আছে। বুকের ভেতর হু হু করে উঠল, সেই কবেকার বাড়ি!!! আমি বোধ হয় ১বার কি ২ বার এই বাড়িতে রাত কাটিয়েছি, বাড়িটা আমি জন্ম থেকেই প্রেতপুরীর মত দেখছি। তবুও…. একজন বৃদ্ধ সেটাকে নানারকম করে সাজাতেন, অবশ্য তিনি নিজেই থকতেন না। আমরা সবাই থাকতাম পুরান ঢাকার বাড়িটায়। জীবন হচ্ছে উৎসবের ব্যাপার, আর অক্ষয় দাশ লেনের বড়িটা ছিল একটা স্থায়ী বিয়েবাড়ি।
৩টা তলা জুড়ে সবার বসবাস, ছোট ফুপুর ঘরে শুধু স্যান্ডেল খুলে যেতে হয় কোনাকুনি ঢুকে বের হয়ে গেলে অবশ্য দরকার নাই। জলু থাকত বারান্দার ঘরটায়, বড় হলে কে সেই ঘরটা নিবে তাই নিয়ে আমরা ঝগড়া করতাম। ছাঁদে জলুর মুরগীর ঘর ছিল। শখ তো ৫ মাসও টিকে নাই তবে ঘরটা ছিল। আমরা ওইটার ছাঁদে উঠতাম। চিলাছাঁদ। হাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠতে হত, পায়ের হাঁটু জীবনেও আর আগের রঙ্গে ফিরে আসবে না, ওইটার আসল চামড় তো নাই। মাঝ দিয়ে বড় চারকোনা ভিতরের বারান্দা, এখান দিয়ে সব তলার সাথে কথা বলা যায়, বাপরে এক একটার যেই গলা, সবাই সবার কথা শুনতে পারে আর সব ঘর দেখা যায়। মুক্ত স্বাধীন……

পিছনের বাড়িতে কিছু ভাড়াটিয়া থাকে। নিচ তলায় নেমে আবার ওই বাড়ির সিড়ি দিয়ে উঠতে হয়, কে যায় এত কষ্টে!!! লাগোয়া বাড়ি। তিন তলার ছাঁদের রেলিং এ উঠে পা ঘুড়িয়ে বসতে হয় তারপর শরীরটা মোচড় দিয়ে নামিয়ে দাও, শুধু হাত দিয়ে দেয়ালটা ধরে রাখা, তারপর ঝুপ করে নেমে যাও পিছনের বাড়ির চিলাছাঁদে। আস্তে করে মফিজ চাচার বাড়ির ছাদে নামলেই পিছনের বাড়ির ছাদে যাওয়া যায়। সিড়ি আছে তো কি হয়েছে? আমরা কি কখনও সিড়ি দিয়ে নামি? রেলিং দিয়ে পিছলা খাই। সিড়ি দিয়ে শুধু উঠি তবু তাও বিশাল উঁচু সিড়ি ২ টা একসাথে টপকে। শুধু জলুর হাতে পড়লে খবর আছে!! আমি বাদে সবাই পিটুনি খাবেই, আমার দিকে শুধু চোখ গরম করে তাকালেই ৩ দিন বাড়িতেই টেকা দায় হয়ে যাবে! তাকের উপড় আমার কতগুলো বই!! ইটগুলোর সাথে আমার কতদিনের বন্ধুত্ব!! দাদার চেয়ার নিয়ে বসে থাকা আর বলা “তুমি কখন আইস?” চিৎকার দিয়ে একে ওকে ডাকা, ছাঁদে উঠে ঘুড়ি উড়ানো, হাঁটু ছিলা, আর যেখানে খুশি সেখানে হারিয়ে যাওয়া। আবদার করার মানুষের অভাব নাই তাই আব্দারেও, গাল ফুলালে নখরা দেখার মানুষের অভাব নাই তাই নখরাও।

বাসটার নাম “নিসর্গ”।
সিটি সার্ভিসের অন্য বাসগুলোর মত না। সুন্দর ছিমছাম। মনে হয় ভিতরে অনেক আলো বাতাস খেলা করে। গায়ের রঙটাও অনেক সুন্দর, হালকা হলুদ আর পেষ্ট কালারে কি যে সুন্দর দেখতে!!! নাকি লাষ্ট স্টপেজ ধূপখোলা লেখা তাই আমার এত ভাল লাগে?
আমার মনে হয় আমি এক দৌড়ে বাসটায় উঠে যাই। আচ্ছা! বাসটা কই থামে? ইয়া মালিকুন ইয়া রহমানুর ইয়া রাহিমু লেখা দোতালা লাল বাড়িটার সামনে? ওইখান থেকে বাসা কত টাকা রিকশা ভাড়া নিবে এখন? আচ্ছা! রিকশায় যাওয়া খুব দরকার? হেঁটে হেঁটে যাওয়া যায় না? তাহলে টোনাটুনি থেকে মেশিন কোন খাওয়া যাবে, নাজির চাচার দোকান থেকে বড় একটা বাবলগাম কিনব, আইস্ক্রীম মুখে বাবলগাম জমে যায়, পরে গুড়াগুড়া হয়ে যায় আমার নরমাল হলে ফুলে…….নাকি ধূপখোলা মাঠ হয়ে উলটা পীরের গলি দিয়ে ঢুকব? এই সময় নিশ্চয়ই মাঠা পাওয়া যাবে না? ইসস রে একদিন সকাল সকাল যেতে হবে, সকালে আগে মাঠা খাব, তারপর সোনামিয়ার লুচি দিয়ে নাস্তা ততক্ষনে তো টোনাটুনি খুলে যাবে তখন মেশিন কোণও খাব……..বিকাল পর্যন্ত থাকব, বিকালে চা দিয়ে ভিজিয়ে পুরী খাব তারপর ফেরা ফেরি, এর আগে না…………
আমার চিন্তাগুলি বোধ হয় বাস ড্রাইভার বুঝতে পারে না। টান দিয়ে বাসটা নিয়ে চলে যায় চলে যায়, কক্ষনো আমার জন্য দাড়ায় না, আমাকে একবারো জিজ্ঞেস করে না আমি যাব কি না। বাস চলে গেলে আমি চট করে মাথাটা নামিয়ে নেই, বাস ষ্টপ কোন ইমোশনাল হবার জায়গা না।

বাস্তবতায় ফিরে আসি, “নিসর্গে” চড়া থেকে যে নিচে ঝাপ দেবার কষ্ট কম সেটা বুঝে ফেলি, স্বপ্ন ছুঁয়ে কষ্ট বাড়তে নেই সেটাও জেনে ফেলি। অক্ষয় দাশ লেনের বাড়িটা আমার বিজনেস ফার্ম, ভাল টাকা আসে। তবে সেটা আর আমার স্থায়ী ঠিকানা নয়। সেখানে যাওয়াটা বেহিসাবি হবে না, খুব অফিসিয়াল যাওয়া হয়, আসা হয়। দরজাগুলো বন্ধ থাকে, মন গুলোও।

কেউ ফোন করে বলে না “তুমি কবে আসবা?” কেউ বলে না “তুমি কখন আইস?” কেউ বলে না, “আর একটু থাকো” অথবা “তারাতারি চলে যাও, সন্ধ্যা কইরো না।” নতুন বাড়ির ইটগুলোর সাথে আমার সখ্যতা হয় নাই, লোকটার টানে যেতাম...........কর্পুরের গন্ধ, বড়ইপাতা আর লোবান। শান্ত, নিঃস্তব্ধ........নীল............ তবু শান্তি!!!

**ছবি-আমাদের বিক্রামপুরের বাড়ির সামনের অংশ, গত অক্টোবরে তোলা। পুরাতন ঢাকার বাড়িটার ছবি দিয়ে বাড়িটাকে বুঝানো সম্ভব না, অনুভুতি দেখা যায় না।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুন, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:১৫
৩৪টি মন্তব্য ৩২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×