somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সরকার কি এ ব্যাপারটি ভেবে দেখবেন?

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ১১:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের দেশে যতগুলো বাসায় টেলিভিশন আছে, সবখানেই একটি খুব সুন্দর করে ছাপানো বই অনাদরে অবহেলায় পড়ে থাকে। যন্ত্রটি কেনার পর পরই নির্দেশিকাটি সবাই দুয়েকদিন খুব আগ্রহ নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে, তারপর মুখ বাকা করে একপাশে রেখে দেয়। এর পর সেটি বাচ্চাদের দখলে চলে যায়। ছবি রং করা, নৌকা বানানো ইত্যাদি বিচিত্র সৃজনশীল কাজে নিজেকে উতসর্গ করতে করতে একসময় নির্দেশিকাটি পরকালে পাড়ি জমায়। প্রায় আলো, বাতাস আর পানির মতই কেসিও ক্যালকুলেটর আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বলতে গেলে অপরিহার্য। এর নির্দেশিকাটির ভিতরের পাতাগুলো কখনও সূর্যের আলো দেখে না। আকৃতির কারনে এরা নৌকা হয়ে ঘুরে বেড়ানোর ভাগ্য পায়না। বাদামের ঠোঙগা হতে পারাটাই এদের জন্য অনেক বড় ব্যাপার। কেন আমরা এই নির্দেশিকাগুলো পড়িনা? সহজ কারণ, ইংরেজী আমাদের জন্য খটমটে ভাষা। ইদানীং বয়স্ক মানুষেরা আড্ডায় মোবাইল নিয়ে তাদের মজার মজার অভিজ্ঞতার কথা বলেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর কাহিনী কাছাকাছি, একজন প্রবীণ ব্যাক্তি মোবাইলে প্রাণপণ খেটেও পুরনো বন্ধুর নম্বর খুজে পাচ্ছেননা, হঠাত তার হাটুর বয়সী নাতনী এগিয়ে এসে এক তুড়িতে সেটা বের করে দিচ্ছে। প্রতিদিন আমরা বিভিন্ন রকমের যন্ত্র ব্যবহার করে থাকি। প্রথম দিকে কিছুদিন হাতড়ানোর পর আমরা কিছু জোড়াতালী মার্কা বুদ্ধি বের করে যন্ত্রটি ব্যবহার করি। কাজটা যে একেবারে মস্দ চলে, তাও না। তার পরও প্রশ্ন থেকে যায়। যন্ত্রটির নির্মাতা যে এত চমতকার একটি নির্দেশিকা সাথে দিয়ে দিল, সেটি কোথায় যাবে?

যদি যন্ত্রপাতিগুলো বাংলায় লেখা নির্দেশিকা সহ আসত কেমন হত? কোন খটমটে বাংলা নয়, আলিফ লায়লা মার্কা বাংলার প্রেতাত্মাও নয়। একদম শুদ্ধ সহজ সরল বাংলা। সত্যিই ব্যাপারটা দারুণ হত! এক ধাক্কাতেই আমাদের প্রিয় যন্ত্রপাতি গুলো নতুন চেহারা নিয়ে হাজির হতো। সপ্তাহখানেক নাড়াচাড়া করে যেসব উপায় বের করতে পেরে আমরা প্রায় নোবেল জয়ের আনন্দ লাভ করতাম, দেখা যেত তার প্রায় সবই নির্দেশিকাতে বলেই দেয়া আছে। নিজের ভাষাতে সবকিছুই কত সহজ, কত পরিচিত! নিত্য প্রয়োজনীয় কাজগুলোতে মাতৃভাষা ব্যবহারের সুযোগ না থাকলে জীবন আসলেই দুর্বিসহ হয়ে উঠে। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ও মায়ের ভাষা শ্রেষ্ঠ ও কার্যকর মাধ্যম। ২০০৫ সালে বুয়েটে মেকানিক্যাল ইন্জিনিয়ারিং এর একটি সম্মেলনে সরকারের বিদ্যুত বিভাগ একটি স্টলে তাদের বেশ কিছু বিদ্যুত কেন্দ্রের মডেল দেখানোর ব্যবস্হা করেছিল। মজার ব্যাপার হল সব মডেলের বিবরণ ছিল চীনা ভাষায়। বুঝাই যায় সেই স্টলটি থেকে দর্শনার্থীরা কতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল। স্টলের কর্মকর্তারাও আতংকে থাকতেন, যদি কেউ কিছু বুঝতে চায়!


এখন হয়ত পাঠক হয়তো প্রশ্ন করবেন, এই মহত কাজটা প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো করে না কেন? এখানেই চলে আসে ব্যবসার কথা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে আমাদের পিছিয়ে থাকার কথা। আমাদের দেশে খুব মুষ্টিমেয় কিছু লোক ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে। তাই বলে আমরাতো একেবারে ফেলে দেবার মত নই। কেসিও কোম্পানী নরওয়ের জন্য তাদের নিজেদের ভাষায় নির্দেশিকা তৈরি করে দিয়েছে। গোটা নরওয়ের জনসংখ্যা যেখানে ৫০ লক্ষ, সেখানে আমাদের দেশে প্রতি বছর এস. এস. সি. পরীক্ষাই দেয় কয়েক লক্ষ ছেলে মেয়ে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসম্ভব গতিময় জগতে আমাদের তেমন কোন অবদান নেই, সুচিন্তিত পরিকল্পনা নেই, নেই সরকারী বা বেসরকারী পর্যায়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। কাজেই কেউ আমাদের কথা ভেবে কোন গবেষণা বা উন্নয়ন করে না। এরকম একটা অব্যবস্থা নিশ্চয়ই অনির্দিষ্টকাল চলতে পারেনা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় কিছুটা হলেও আমাদের নিজস্ব অবদান থাকতে হবে। তাহলে আমাদের তৈরি হবে এ অগ্রযাত্রাকে নিজেদের প্রয়োজনীয় চেহারা দেবার ক্ষমতা। সরকার যদি তার নীতি নির্ধারনের জায়গাতে সূক্ষ পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলেই এ বিশাল কর্মজজ্ঞের সূচনা হয়ে যেতে পারে। শুরুর সেই নির্দেশিকার কথাই ধরা যাক। ঠিক এ মুহূর্তেই যদি সরকার একটি আইন করে দেয় যাতে বলা খাকবে, দেশে যতরকম যন্ত্রপাতি আমদানি করা হবে তার নির্দেশিকা ও যন্ত্রাংশের লেবেল অবশ্যই ইংরেজীর পাশাপাশি শুদ্ধ বাংলাতে ও ছাপাতে হবে, চিন্তা করুন পাঠক কি হতে পারে? আমাদের যন্ত্র দেখেই ভয়ে পাচ হাত দূরে লাফ দিয়ে সরে যাবার ব্যাপারটা আর খাকবে না। যন্ত্রের আগাগোড়া সব বাংলাতে হওয়ায় আমরা নিজেরাই অনেক কিছু করে নিতে পারব। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সব পর্যায়ে আমাদের যন্ত্র ব্যবহারের দক্ষতা অনেক বেড়ে যাবে। এটা আমাদের সার্বিক উতপাদন ক্ষমতা বেড়ে যাবে। তার সাথে এই বিশাল পরিমাণ নির্দেশিকা অনুবাদের যে কাজ - এটা অনেক টাকার ব্যবসা। আর শুধুমাত্র বাংগালীরাই এ অনুবাদের কাজটি করতে পারবে। তার সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানগুলো ইংরেজী থেকে বাংলা অনুবাদের সস্তা কিন্তু উন্নত কৌশল নিয়ে গবেষণার জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টাকা দিবে।

এই অসম্ভব সুন্দর সম্ভাবনা গুলো সত্য হতে পারে যদি সরকারের কর্তাব্যক্তিরা এই সিদ্ধান্তটির যৌক্তিকতা বুঝতে পারেন, এবং সিদ্ধান্ত নেন যে এখন খেকে আমরা কেবল পশ্চিমা দেশগুলোর প্রয়োজনে সৃষ্ট প্রযুক্তিগুলো চোখ বুজে গ্রহণ করব না। আমরা এখন খেকে নিজস্ব প্রয়োজন গুলো আলাদা করে ভাবব। সে অনুযায়ী আমাদের স্থানীয় চাহিদা তৈরি করে প্রযুক্তিও আমরাই উদ্ভাবন করব। আমাদের কোন ভিনদেশী কোম্পানীর পিছনে পিছনে ঘুরতে হবে না। আমাদের উপরে উঠার রাস্তা আমরাই গড়ে নিব। বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের ওয়েবসাইটে একটি চমতকার উদ্ধৃতি আছে - ইতিহাসে যুগে যুগে প্রত্যেক প্রজন্মকেই তার মুক্তির জন্য রুখে দাড়াতে হয়েছে, এবার আমাদের পালা।
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ বর্ষা এলো

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


বর্ষা এলো টিনের চালে
ফুটল কুসুম কদম ডালে
রুম ঝুমা ঝুম দুলকি চালে
বর্ষা এলো বিলে খালে। 

বর্ষা এলো আকাশ নীলে 
শাপলা শালুক জাগলো ঝিলে
বর্ষা এলো কেয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বীকৃতি

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:২৩


চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর পুরোনো বাড়িটায় সন্ধ্যা নেমেছে ধীরে ধীরে। বারান্দার টবে লাগানো জবা ফুলগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। দূরের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে। বসার ঘরে প্রতিদিনের মতো সংবাদপত্রে চোখ গুঁজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্তর্দহন: ক্ষুদ্র কাব্যে বৃহৎ জীবন

লিখেছেন Sujon Mahmud, ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০১

১°অন্ধ মোহ

সংগ্রহের মোহে অন্ধ যে জন,
উদ্বৃত্তই তার কাল;
মধুর সাগরে ডুবলো তরণী,
নিজেরই বোনা জাল।

২°


নিজের সুধায় ডুবছে ডানা, খাঁচায় মুক্তির ভয়,
প্রাপ্তির চড়া মূল্য চুকিয়ে জীবন হারায় জয়।
পরার্থপরতার মোম গলে যায়, পাথর... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাফিয়া ট্রাম্পের নজর এবার ফুটবল বিশ্বকাপে....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৪৫


একটা ফোন কল কতটা শক্তিশালী হতে পারে, সেটা এবার হাড়ে হাড়ে টের পেল গোটা ফুটবল দুনিয়া। বসনিয়ার বিপক্ষে লাল কার্ড দেখে মার্কিন ফুটবলার বালোগুনের নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল বেলজিয়াম... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুমি আমি চিরন্তন

লিখেছেন সামিয়া, ০৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০৮



মানুষজন আমাকে জিজ্ঞেস করে, তোমার সঙ্গে নাকি আর যোগাযোগ নেই? আমি শুধু হাসি। কীভাবে বোঝাই, কথা না হলেও কিছু মানুষ প্রতি রাতেই এসে মনের ভেতর চুপচাপ বসে থাকে; ঘুমানোর প্রস্তুতি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×